রায়হান রাহিম

হিরোসেন্ট্রিক সিনেমাটিক ইউনিভার্সরে ফিল্মবাফরা অনেক আগেই টাটা গুডবাই বইলা দিছেন। আজকাল মাস্ক পরা হিরোর চেয়ে ডার্ক ক্যারেক্টারগুলার প্রতি মানুষ বেশি কিউরিয়াস। আর এই চেইনটা যারা স্টার্ট করছিলেন, তাদের একজন হিথ লেজার।
হিথ লেজার নাম শুনলেই আপনার চোখের সামনে নিশ্চিত ‘দ্য ডার্ক নাইট’-এর সেই জোকার ভাইসা উঠতেছে। কিন্তু ঘটনা হইলো, হিথ যখন এই রোলের অফার পান, তখন উনি জিনিসটারে শুধু ‘অ্যাক্টিংয়ের জন্য অ্যাক্টিং’ হিসেবে নেন নাই। কে জানত গোথাম সিটির ‘প্রিন্স অব ক্যাওস’ তারে একদম কবর পর্যন্ত নিয়া যাবে? ২০০৮ সালে হিথের অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথের পর তার বাপ কিম লেজার দুনিয়ার সামনে একটা ডায়েরি রিভিল করেন। এই ডায়েরিটাই ছিল হিথ লেজারের ‘জোকার’ ক্যারেক্টার প্লেয়িং টাইমের অন্ধকার সফরের একমাত্র সাক্ষী। জোকার হওয়ার নেশায় তিনি ডায়েরির পাতায় কী এমন বিষ ঢালছিলেন? আজ সেই ‘দ্য ডায়েরি অব এ ডেড ম্যান’ নিয়া আলাপ করব আমরা।
[সতর্কবার্তা: মানসিক স্বাস্থ্য বা ইনসোমনিয়ার সমস্যায় ভুগতেছেন এমন পাঠকদের এই লেখাটা স্কিপ করার পরামর্শ দিচ্ছি]
হিথ লেজার যখন ‘দ্য ডার্ক নাইট’-এর জন্য সাইন করেন, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিলো? আই গেজ জ্যাক নিকলসনের জোকার ইমেজ। নোলান তারে বইলা দিছিলেন, ‘আই ওয়ান্ট সামওয়ান হু ইজ নট ক্লাউন, বাট অ্যা কমপ্লিট সাইকোপ্যাথ’। এই চ্যালেঞ্জটারেই হিথ ইগোতে নিয়া নিছিলেন।
২০০৭ সালের শুরুর দিকে শুটিং শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে হিথ লন্ডনের একটা নিরিবিলি হোটেল রুমে আইসোলেশনে ঢুইকা যান । এবং ওইখানেই বাইরের জগতের সাথে সমস্ত কমিউনিকেশন শাট ডাউন মাইরা টানা ৪ সপ্তাহের আইসোলেশনে জোকারের অমানবিক সাইকোটিক ভয়েসটা নিজের মধ্যে একটু একটু খুঁইজা পাইতে শুরু করেন।
কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক বেশিক্ষণ একলা থাকতে পারে না। হিথ যখন একলা একলা আয়নার সামনে দাঁড়ায়ে নিজের মেকআপ আর ম্যানারিজম নিয়া এক্সপেরিমেন্ট করতেছিলেন, তখনই তিনি অনুভব করেন যে জোকার ক্যারেক্টারটা আস্তে আস্তে তার ভিতর ডালপালা মেলা শুরু করে দিছে। সেই ট্রান্সফরমেশনের প্রতিটি মুহূর্ত ধইরা রাখার নিয়তেই উনি এই এই ডায়েরিটা লেখা শুরু করেন।
নোলান একবার বলছিলেন, হিথ তারে ডায়েরিটা দেখাইছে বাট পড়তে দেয়নাই।
নখড়ামি বহুত হইছে, চলেন এইবার ডায়েরির ভিতর ঢুকি। কী ছিলো সেই ডায়েরিতে?

ডায়েরিটা দেখলে কোনো সিরিয়াল কিলারের ক্রাইম ফাইল দেখার ফিল আসে।
হিথ সেই ডায়েরিতে আঠা দিয়া ম্যালকম ম্যাকডোয়েলের কাল্ট ক্যারেক্টার ‘অ্যা ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ’-এর ছবি লাগায়ে রাখছিলেন। অনেকে বলে জোকারের ভিতরে আল্ট্রা ভায়োলেন্স আর ল্যাক অব এম্প্যাথি ইঞ্জেক্ট করতে চাইছিলেন হিথ। হিথ চাইছিলেন জোকারের ভায়োলেন্সটা হবে টোটালি র অ্যান্ড লজিকলেস।

ডায়েরিতে হায়েনার ছবি ছিলো। তিনি ডায়েরিতে লিখছিলেন, ‘দ্য জোকার ইজ লাইক হায়েনা। হি লাফজ টু কিল।’ তিনি চাইছিলেন জোকারের হাসিটা যেন কোনো ক্লাউনের হাসি না হইয়া একটা পশুর আর্তনাদ হয়। ডায়েরির পাতায় পাতায় তিনি হায়েনার এনাটমি নিয়া নোট রাখতেন কীভাবে একটা পশু ব্যথার মধ্যেও হাসতে পারে।
কিন্তু ডায়েরির টক্সিসিটি এইখানেই শেষ না। হিথ সেইখানে এক কোণায় ভাঙা পুতুলের স্কেচ করছিলেন। তিনি জোকারের মেন্টালিটিরে তুলনা করতেন একটা ব্রোকেন ডলহাউজের সাথে। যেখানে সে যা ইচ্ছা তা-ই ভাঙতে পারে। ডায়েরিতে তিনি নিজেরে বারবার মনে করায়ে দিতেন ‘স্টপ ফিলিং। স্টার্ট ব্রেকিং।’
ফলে ডায়েরিটা স্রেফ অ্যাক্টিং নোট ছিল–এইটা বলা যায় না। আমার কাছে লাগে ওই ডায়েরিটা ছিলো একটা জ্যান্ত মানুষের তিলে তিলে মনস্টার হইয়া ওঠার ব্লুপ্রিন্ট।
এমনকি ডায়েরির কালার প্যালেটটাও ছিল ভীষণ ডিস্টার্বিং। হিথ ওইখানে প্রচুর লাল রং ইউজ করছিলেন। অনেকে মনে করেন, জোকারের সেই আইকনিক মেকআপের শেড মেলানোর জন্য তিনি ডায়েরির পাতায় লিপস্টিক আর নিজের ড্রাগসের প্রেসক্রিপশনের কাটআউট ঘইষা ঘইষা দাগ বানাইতেন। সেখানে একটা কোটেশন ছিল সরাসরি নিৎশে থিকা ইন্সপায়ার্ড, ‘হোয়েন ইউ লুক ইনটু অ্যান অ্যাবিস, দ্য অ্যাবিস অলসো লুকস ইনটু ইউ।’ হিথ ডায়েরিতে এর নিচে বড় বড় অক্ষরে লিখছিলেন— ‘দ্য অ্যাবিস ইজ লাফিং ব্যাক।’

এই লাইনটাই প্রমাণ করে যে, হিথ তখন আর ডায়েরি কন্ট্রোল করতেছিলেন না, বরং ডায়েরিটাই তারে কন্ট্রোল করা স্টার্ট করছিল। ডায়েরির ভেতরের সেই ‘হ্যান্ডরাইটিং’ খেয়াল করলে দেখবেন, প্রথম দিকের পাতাগুলাতে লেখা বেশ পরিপাটি ছিল। কিন্তু সময় যত আগাইছে, হিথের হাতের লেখা তত আঁকাবাঁকা আর ক্যাওস হয়া গেছে। যেন কলম ধরার সময় তার হাত কাঁপতেছিল কিংবা অন্য কেউ তার হাত দিয়া এইগুলা লেখায় নিচ্ছিল।
জোকারের চরিত্রের সবচেয়ে ভীতিকর দিকটা কী? সে মানুষকে মারে, কিন্তু মারার পর হাসে। তার কাছে ডেথ কোনো ট্র্যাজেডি না হইয়া একটা কৌতুক হিসেবে আসে। হিথ লেজার এই বিকৃত মানসিকতা নিজের ভেতরে ইনজেক্ট করার জন্য ডায়েরিতে একটা আলাদা সেকশন রাখছিলেন, যার নাম দেওয়া যায় ‘দ্য সিক জোকস গ্যালারি’।
একজন সুস্থ মানুষের কাছে যা ইনসেইন, জোকারের কাছে তাই ছিল হাসির খোরাক। হিথ ডায়েরিতে ‘ফানি’ বিষয় হিসেবে একটা লিস্ট বানাইছিলেন। সেই লিস্টে ছিল ব্লাইন্ড বেবি, ল্যান্ড মাইন আর এইডসের মতো জিনিস। হিথ নিজেরে এমন ভাবে ট্রেইন করতেছিলন যাতে শিশুর কান্দা বা মানুষের আর্তনাদ শুনলে তার করুণার বদলে হাসি পায়।
ডায়েরিতে হিথ নিজের হাতে এমন সব জোকস লিখছিলেন যেখানে মানুষের অসহায়ত্বই ছিল পাঞ্চলাইন। যেমন: ‘একটা জ্বলন্ত হাসপাতালের সামনে দাঁড়ায়ে তালি দেয়া’ কিংবা ‘কাউরে খাবার পরিবেশন করার সময় তার পা টাইনা ফেলে দেওয়া।’ হিথের লক্ষ্য ছিল হিউম্যান এমপ্যাথি শব্দটা নিজের ডিকশনারি থেকে মুইছা ফেলা। উনি ডায়েরিতে বড় বড় অক্ষরে লিখছিলেন, ‘লাফটার ইজ মাই উইপন অ্যান্ড ক্যাওস ইজ দ্য পাঞ্চলাইন।’
সারা দুনিয়ার সাইকোলজিস্টরা এই ডায়েরি নিয়া একটা কথাই বলছেন। সবার কাছেই মনে হইছে হিথ লেজার জোকারের লেন্স দিয়া দুনিয়ারে দেখা শুরু করছিলেন। সেটে থাকার সময় যখন ক্যামেরা বন্ধ হইত, তখনও হিথ এই ডার্ক জোকসগুলার অ্যাম্বিয়েন্সে থাকতেন। ক্রিস্টোফার নোলান একবার বলেছিলেন, হিথ মাঝেমধ্যে শুটিংয়ের ফাঁকে ডায়েরিটা বাইর কইরা একলা একলা হাসতেন।

শ্যুটিং শুরু হবার পর থিকাই হিথের ওপর জোকার পুরাপুরি ডিভোর করা শুরু করে এবং হিথরে হিথের ক্যারেক্টার থিকা বের কইরা গোথাম সিটির সাইকোপ্যাথে পরিণত করে।
হিথ তখন দিনে হাইয়েস্ট দুই ঘণ্টা ঘুমাইতে পারতেন। হিথ ঐ সময়টারে এক্সপ্লেইন করতে গিয়ে বলতেছিলেন, ‘মাই বডি ওয়াজ এক্সস্টেড, অ্যান্ড মাই মাইন্ড ওয়াজ স্টিল গোয়িং।’ ওই সময়গুলাতে ডায়েরির শেষ পাতাগুলায় চোখ বুলাইলে দেখা যায় তার হাতের লেখা কোন সুস্থ মানুষের মতো ছিল না। এবড়োখেবড়ো, কাঁপা কাঁপা অক্ষরে সেখানে বড় বড় লাল দাগ দিয়া লেখা ছিল ‘ক্যাওস’!
ডায়েরির এক কোণায় ছোট করে লেখা একটা টেক্সট দেখলে হিথের তখনকার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে একটা আঁচ পাওয়া যাইতে পারে। সেই টেক্সটা ছিল– ‘দ্য জোকার স্টেইস অ্যাওয়েক। হি ইজ ওয়াচিং মি স্লিপ।’ জিনিসটা অনেকটা এমন যে জোকার হবার দরজাটা খুইলা ভেতরে ঢুকছেন, কিন্তু সেই দরজা বন্ধ করার ওয়ে আপনি হারায় ফেলছেন।
ঐ সময়টাতে হিথ প্রচুর পরিমাণে ঘুমের ওষুধ, বিশেষ করে ‘অ্যামবিয়েন’ আর ‘স্টিলনক্স’ নেওয়া শুরু করেন। ডায়েরিতে জোকারের সংলাপের পাশে পাশে উনি নিজের বডিতে নেওয়া ড্রাগসের ডোজের হিসাব রাখা শুরু করছিলেন। সেটে থাকার সময় যখন ক্যামেরা অফ হইতো, তখনও হিথ জোকারের সেই অদ্ভুত লিপ স্ম্যাকিং (ঠোঁট চাটা) আর কর্কশ গলায় বিড়বিড় করতেন। একবার এক ইন্টারভিউতে ওই সময়টা নিয়া উনি বলতেছিলেন, ‘আই প্রবাবলি স্লেপ্ট এন অ্যাভারেজ অব টু আওয়ার্স অ্যা নাইট ফর অ্যা উইক।’
সারা দুনিয়ার পপ কালচার এনালিস্টরা তার এই পিরিয়ডটারে ‘দ্য পজেশন অব হিথ লেজার’ হিসেবে মার্ক কইরা থাকেন।
দ্য ফাইনাল গুডবাই: ‘BYE BYE’
শুটিং শেষ হওয়ার পর হিথ যখন জোকার ক্যারেক্টার থিকা বের হওয়ার চেষ্টা করতেছিলেন, তখন অলরেডি অনেক দেরি হয়া গেছে। জোকার ততক্ষণে তারে চিবায়া খেয়ে ফেলছে। ডায়েরিটার একদম শেষ পাতার দিকে তাকাইলে এই জিনিসটা আপনার মনে হইতে বাধ্য।
ডায়েরিটার একদম শেষ পাতায় হিথ বড় বড় হরফে আঁকাবাঁকা কইরা লেখছিলেন “BYE BYE.”

কিম লেজার যখন ২০১২ তে ‘টু ইয়াং টু ডাই’ নামের একটা ডকুমেন্টারিতে এই পাতাটা প্রথমবার দুনিয়ারে দেখান, তখন সবার মগজে একটা ঝটকা লাগছিল। এটা কি কেবল একটা চরিত্রের শুটিং শেষ হওয়ার আনন্দ ছিল নাকি হিথ লেজার আসলে বুঝতে পারছিলেন যে এই চরিত্রের খোলস থিকা বের হওয়ার কোনো রাস্তা উনার জানা নাই? ডায়েরির সেই ‘বাই বাই’ লেখাটা ছিল সবচেয়ে হন্টিং কো ইন্সিডেন্স। যেন-বা জোকার ক্যারেক্টারটা শেষ করার লগে লগেই নিজের জীবনের ফুলস্টপটাও দেইখা ফালাইছিলেন প্রিয় হিথ।
২২ জানুয়ারি ২০০৮। নিউইয়র্কের ফ্ল্যাটে যখন হিথ লেজারের নিথর দেহ পাওয়া যায়, তখন ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বলা হইছিল এইটা অ্যাক্সিডেন্টাল প্রেসক্রিপশন ড্রাগ ওভারডোজ। কিন্তু যারা সেই ডায়েরির ‘বাই বাই’ লেখাটা দেখছেন, তারা জানেন হিথ লেজারের ভেতরকার সেই হাসিখুশি মানুষটা অনেক আগেই মারা গেছিল। যেনো বা জোকার তারে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার কইরা জাস্ট একটা আবর্জনার মতো ছুইড়া ফেলে দিছে।
হিথ লেজার মরণোত্তর অস্কার পাইছেন, তার জোকার সর্বকালের সেরা ভিলেনের স্বীকৃতি পাইছে। ডাক্তাররা হয়তো বলবেন ড্রাগের কারণে হিথ মইরা গেছেন, কিন্তু আমরা যারা ‘দ্য ডার্ক নাইট’ ফ্যান আমাদের কাছে ‘দ্য অটোপসি অব হিস সৌল উড প্রবাবলি শো দ্যাট দ্য জোকার ওয়াজ দ্য প্রাইমারি কজ অব হিজ ডেথ।’
আজকে হিথ লেজারের বার্থ ডে! কাজের প্রতি ডেডিকেশন কোন লেভেলে নিয়া যাইতে হয় হিথ আমাদের তা শিখায় গেছেন। আজকের এই দিনে আমরা তার আত্মার শান্তি কামনা করি!

হিরোসেন্ট্রিক সিনেমাটিক ইউনিভার্সরে ফিল্মবাফরা অনেক আগেই টাটা গুডবাই বইলা দিছেন। আজকাল মাস্ক পরা হিরোর চেয়ে ডার্ক ক্যারেক্টারগুলার প্রতি মানুষ বেশি কিউরিয়াস। আর এই চেইনটা যারা স্টার্ট করছিলেন, তাদের একজন হিথ লেজার।
হিথ লেজার নাম শুনলেই আপনার চোখের সামনে নিশ্চিত ‘দ্য ডার্ক নাইট’-এর সেই জোকার ভাইসা উঠতেছে। কিন্তু ঘটনা হইলো, হিথ যখন এই রোলের অফার পান, তখন উনি জিনিসটারে শুধু ‘অ্যাক্টিংয়ের জন্য অ্যাক্টিং’ হিসেবে নেন নাই। কে জানত গোথাম সিটির ‘প্রিন্স অব ক্যাওস’ তারে একদম কবর পর্যন্ত নিয়া যাবে? ২০০৮ সালে হিথের অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথের পর তার বাপ কিম লেজার দুনিয়ার সামনে একটা ডায়েরি রিভিল করেন। এই ডায়েরিটাই ছিল হিথ লেজারের ‘জোকার’ ক্যারেক্টার প্লেয়িং টাইমের অন্ধকার সফরের একমাত্র সাক্ষী। জোকার হওয়ার নেশায় তিনি ডায়েরির পাতায় কী এমন বিষ ঢালছিলেন? আজ সেই ‘দ্য ডায়েরি অব এ ডেড ম্যান’ নিয়া আলাপ করব আমরা।
[সতর্কবার্তা: মানসিক স্বাস্থ্য বা ইনসোমনিয়ার সমস্যায় ভুগতেছেন এমন পাঠকদের এই লেখাটা স্কিপ করার পরামর্শ দিচ্ছি]
হিথ লেজার যখন ‘দ্য ডার্ক নাইট’-এর জন্য সাইন করেন, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিলো? আই গেজ জ্যাক নিকলসনের জোকার ইমেজ। নোলান তারে বইলা দিছিলেন, ‘আই ওয়ান্ট সামওয়ান হু ইজ নট ক্লাউন, বাট অ্যা কমপ্লিট সাইকোপ্যাথ’। এই চ্যালেঞ্জটারেই হিথ ইগোতে নিয়া নিছিলেন।
২০০৭ সালের শুরুর দিকে শুটিং শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে হিথ লন্ডনের একটা নিরিবিলি হোটেল রুমে আইসোলেশনে ঢুইকা যান । এবং ওইখানেই বাইরের জগতের সাথে সমস্ত কমিউনিকেশন শাট ডাউন মাইরা টানা ৪ সপ্তাহের আইসোলেশনে জোকারের অমানবিক সাইকোটিক ভয়েসটা নিজের মধ্যে একটু একটু খুঁইজা পাইতে শুরু করেন।
কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক বেশিক্ষণ একলা থাকতে পারে না। হিথ যখন একলা একলা আয়নার সামনে দাঁড়ায়ে নিজের মেকআপ আর ম্যানারিজম নিয়া এক্সপেরিমেন্ট করতেছিলেন, তখনই তিনি অনুভব করেন যে জোকার ক্যারেক্টারটা আস্তে আস্তে তার ভিতর ডালপালা মেলা শুরু করে দিছে। সেই ট্রান্সফরমেশনের প্রতিটি মুহূর্ত ধইরা রাখার নিয়তেই উনি এই এই ডায়েরিটা লেখা শুরু করেন।
নোলান একবার বলছিলেন, হিথ তারে ডায়েরিটা দেখাইছে বাট পড়তে দেয়নাই।
নখড়ামি বহুত হইছে, চলেন এইবার ডায়েরির ভিতর ঢুকি। কী ছিলো সেই ডায়েরিতে?

ডায়েরিটা দেখলে কোনো সিরিয়াল কিলারের ক্রাইম ফাইল দেখার ফিল আসে।
হিথ সেই ডায়েরিতে আঠা দিয়া ম্যালকম ম্যাকডোয়েলের কাল্ট ক্যারেক্টার ‘অ্যা ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ’-এর ছবি লাগায়ে রাখছিলেন। অনেকে বলে জোকারের ভিতরে আল্ট্রা ভায়োলেন্স আর ল্যাক অব এম্প্যাথি ইঞ্জেক্ট করতে চাইছিলেন হিথ। হিথ চাইছিলেন জোকারের ভায়োলেন্সটা হবে টোটালি র অ্যান্ড লজিকলেস।

ডায়েরিতে হায়েনার ছবি ছিলো। তিনি ডায়েরিতে লিখছিলেন, ‘দ্য জোকার ইজ লাইক হায়েনা। হি লাফজ টু কিল।’ তিনি চাইছিলেন জোকারের হাসিটা যেন কোনো ক্লাউনের হাসি না হইয়া একটা পশুর আর্তনাদ হয়। ডায়েরির পাতায় পাতায় তিনি হায়েনার এনাটমি নিয়া নোট রাখতেন কীভাবে একটা পশু ব্যথার মধ্যেও হাসতে পারে।
কিন্তু ডায়েরির টক্সিসিটি এইখানেই শেষ না। হিথ সেইখানে এক কোণায় ভাঙা পুতুলের স্কেচ করছিলেন। তিনি জোকারের মেন্টালিটিরে তুলনা করতেন একটা ব্রোকেন ডলহাউজের সাথে। যেখানে সে যা ইচ্ছা তা-ই ভাঙতে পারে। ডায়েরিতে তিনি নিজেরে বারবার মনে করায়ে দিতেন ‘স্টপ ফিলিং। স্টার্ট ব্রেকিং।’
ফলে ডায়েরিটা স্রেফ অ্যাক্টিং নোট ছিল–এইটা বলা যায় না। আমার কাছে লাগে ওই ডায়েরিটা ছিলো একটা জ্যান্ত মানুষের তিলে তিলে মনস্টার হইয়া ওঠার ব্লুপ্রিন্ট।
এমনকি ডায়েরির কালার প্যালেটটাও ছিল ভীষণ ডিস্টার্বিং। হিথ ওইখানে প্রচুর লাল রং ইউজ করছিলেন। অনেকে মনে করেন, জোকারের সেই আইকনিক মেকআপের শেড মেলানোর জন্য তিনি ডায়েরির পাতায় লিপস্টিক আর নিজের ড্রাগসের প্রেসক্রিপশনের কাটআউট ঘইষা ঘইষা দাগ বানাইতেন। সেখানে একটা কোটেশন ছিল সরাসরি নিৎশে থিকা ইন্সপায়ার্ড, ‘হোয়েন ইউ লুক ইনটু অ্যান অ্যাবিস, দ্য অ্যাবিস অলসো লুকস ইনটু ইউ।’ হিথ ডায়েরিতে এর নিচে বড় বড় অক্ষরে লিখছিলেন— ‘দ্য অ্যাবিস ইজ লাফিং ব্যাক।’

এই লাইনটাই প্রমাণ করে যে, হিথ তখন আর ডায়েরি কন্ট্রোল করতেছিলেন না, বরং ডায়েরিটাই তারে কন্ট্রোল করা স্টার্ট করছিল। ডায়েরির ভেতরের সেই ‘হ্যান্ডরাইটিং’ খেয়াল করলে দেখবেন, প্রথম দিকের পাতাগুলাতে লেখা বেশ পরিপাটি ছিল। কিন্তু সময় যত আগাইছে, হিথের হাতের লেখা তত আঁকাবাঁকা আর ক্যাওস হয়া গেছে। যেন কলম ধরার সময় তার হাত কাঁপতেছিল কিংবা অন্য কেউ তার হাত দিয়া এইগুলা লেখায় নিচ্ছিল।
জোকারের চরিত্রের সবচেয়ে ভীতিকর দিকটা কী? সে মানুষকে মারে, কিন্তু মারার পর হাসে। তার কাছে ডেথ কোনো ট্র্যাজেডি না হইয়া একটা কৌতুক হিসেবে আসে। হিথ লেজার এই বিকৃত মানসিকতা নিজের ভেতরে ইনজেক্ট করার জন্য ডায়েরিতে একটা আলাদা সেকশন রাখছিলেন, যার নাম দেওয়া যায় ‘দ্য সিক জোকস গ্যালারি’।
একজন সুস্থ মানুষের কাছে যা ইনসেইন, জোকারের কাছে তাই ছিল হাসির খোরাক। হিথ ডায়েরিতে ‘ফানি’ বিষয় হিসেবে একটা লিস্ট বানাইছিলেন। সেই লিস্টে ছিল ব্লাইন্ড বেবি, ল্যান্ড মাইন আর এইডসের মতো জিনিস। হিথ নিজেরে এমন ভাবে ট্রেইন করতেছিলন যাতে শিশুর কান্দা বা মানুষের আর্তনাদ শুনলে তার করুণার বদলে হাসি পায়।
ডায়েরিতে হিথ নিজের হাতে এমন সব জোকস লিখছিলেন যেখানে মানুষের অসহায়ত্বই ছিল পাঞ্চলাইন। যেমন: ‘একটা জ্বলন্ত হাসপাতালের সামনে দাঁড়ায়ে তালি দেয়া’ কিংবা ‘কাউরে খাবার পরিবেশন করার সময় তার পা টাইনা ফেলে দেওয়া।’ হিথের লক্ষ্য ছিল হিউম্যান এমপ্যাথি শব্দটা নিজের ডিকশনারি থেকে মুইছা ফেলা। উনি ডায়েরিতে বড় বড় অক্ষরে লিখছিলেন, ‘লাফটার ইজ মাই উইপন অ্যান্ড ক্যাওস ইজ দ্য পাঞ্চলাইন।’
সারা দুনিয়ার সাইকোলজিস্টরা এই ডায়েরি নিয়া একটা কথাই বলছেন। সবার কাছেই মনে হইছে হিথ লেজার জোকারের লেন্স দিয়া দুনিয়ারে দেখা শুরু করছিলেন। সেটে থাকার সময় যখন ক্যামেরা বন্ধ হইত, তখনও হিথ এই ডার্ক জোকসগুলার অ্যাম্বিয়েন্সে থাকতেন। ক্রিস্টোফার নোলান একবার বলেছিলেন, হিথ মাঝেমধ্যে শুটিংয়ের ফাঁকে ডায়েরিটা বাইর কইরা একলা একলা হাসতেন।

শ্যুটিং শুরু হবার পর থিকাই হিথের ওপর জোকার পুরাপুরি ডিভোর করা শুরু করে এবং হিথরে হিথের ক্যারেক্টার থিকা বের কইরা গোথাম সিটির সাইকোপ্যাথে পরিণত করে।
হিথ তখন দিনে হাইয়েস্ট দুই ঘণ্টা ঘুমাইতে পারতেন। হিথ ঐ সময়টারে এক্সপ্লেইন করতে গিয়ে বলতেছিলেন, ‘মাই বডি ওয়াজ এক্সস্টেড, অ্যান্ড মাই মাইন্ড ওয়াজ স্টিল গোয়িং।’ ওই সময়গুলাতে ডায়েরির শেষ পাতাগুলায় চোখ বুলাইলে দেখা যায় তার হাতের লেখা কোন সুস্থ মানুষের মতো ছিল না। এবড়োখেবড়ো, কাঁপা কাঁপা অক্ষরে সেখানে বড় বড় লাল দাগ দিয়া লেখা ছিল ‘ক্যাওস’!
ডায়েরির এক কোণায় ছোট করে লেখা একটা টেক্সট দেখলে হিথের তখনকার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে একটা আঁচ পাওয়া যাইতে পারে। সেই টেক্সটা ছিল– ‘দ্য জোকার স্টেইস অ্যাওয়েক। হি ইজ ওয়াচিং মি স্লিপ।’ জিনিসটা অনেকটা এমন যে জোকার হবার দরজাটা খুইলা ভেতরে ঢুকছেন, কিন্তু সেই দরজা বন্ধ করার ওয়ে আপনি হারায় ফেলছেন।
ঐ সময়টাতে হিথ প্রচুর পরিমাণে ঘুমের ওষুধ, বিশেষ করে ‘অ্যামবিয়েন’ আর ‘স্টিলনক্স’ নেওয়া শুরু করেন। ডায়েরিতে জোকারের সংলাপের পাশে পাশে উনি নিজের বডিতে নেওয়া ড্রাগসের ডোজের হিসাব রাখা শুরু করছিলেন। সেটে থাকার সময় যখন ক্যামেরা অফ হইতো, তখনও হিথ জোকারের সেই অদ্ভুত লিপ স্ম্যাকিং (ঠোঁট চাটা) আর কর্কশ গলায় বিড়বিড় করতেন। একবার এক ইন্টারভিউতে ওই সময়টা নিয়া উনি বলতেছিলেন, ‘আই প্রবাবলি স্লেপ্ট এন অ্যাভারেজ অব টু আওয়ার্স অ্যা নাইট ফর অ্যা উইক।’
সারা দুনিয়ার পপ কালচার এনালিস্টরা তার এই পিরিয়ডটারে ‘দ্য পজেশন অব হিথ লেজার’ হিসেবে মার্ক কইরা থাকেন।
দ্য ফাইনাল গুডবাই: ‘BYE BYE’
শুটিং শেষ হওয়ার পর হিথ যখন জোকার ক্যারেক্টার থিকা বের হওয়ার চেষ্টা করতেছিলেন, তখন অলরেডি অনেক দেরি হয়া গেছে। জোকার ততক্ষণে তারে চিবায়া খেয়ে ফেলছে। ডায়েরিটার একদম শেষ পাতার দিকে তাকাইলে এই জিনিসটা আপনার মনে হইতে বাধ্য।
ডায়েরিটার একদম শেষ পাতায় হিথ বড় বড় হরফে আঁকাবাঁকা কইরা লেখছিলেন “BYE BYE.”

কিম লেজার যখন ২০১২ তে ‘টু ইয়াং টু ডাই’ নামের একটা ডকুমেন্টারিতে এই পাতাটা প্রথমবার দুনিয়ারে দেখান, তখন সবার মগজে একটা ঝটকা লাগছিল। এটা কি কেবল একটা চরিত্রের শুটিং শেষ হওয়ার আনন্দ ছিল নাকি হিথ লেজার আসলে বুঝতে পারছিলেন যে এই চরিত্রের খোলস থিকা বের হওয়ার কোনো রাস্তা উনার জানা নাই? ডায়েরির সেই ‘বাই বাই’ লেখাটা ছিল সবচেয়ে হন্টিং কো ইন্সিডেন্স। যেন-বা জোকার ক্যারেক্টারটা শেষ করার লগে লগেই নিজের জীবনের ফুলস্টপটাও দেইখা ফালাইছিলেন প্রিয় হিথ।
২২ জানুয়ারি ২০০৮। নিউইয়র্কের ফ্ল্যাটে যখন হিথ লেজারের নিথর দেহ পাওয়া যায়, তখন ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বলা হইছিল এইটা অ্যাক্সিডেন্টাল প্রেসক্রিপশন ড্রাগ ওভারডোজ। কিন্তু যারা সেই ডায়েরির ‘বাই বাই’ লেখাটা দেখছেন, তারা জানেন হিথ লেজারের ভেতরকার সেই হাসিখুশি মানুষটা অনেক আগেই মারা গেছিল। যেনো বা জোকার তারে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার কইরা জাস্ট একটা আবর্জনার মতো ছুইড়া ফেলে দিছে।
হিথ লেজার মরণোত্তর অস্কার পাইছেন, তার জোকার সর্বকালের সেরা ভিলেনের স্বীকৃতি পাইছে। ডাক্তাররা হয়তো বলবেন ড্রাগের কারণে হিথ মইরা গেছেন, কিন্তু আমরা যারা ‘দ্য ডার্ক নাইট’ ফ্যান আমাদের কাছে ‘দ্য অটোপসি অব হিস সৌল উড প্রবাবলি শো দ্যাট দ্য জোকার ওয়াজ দ্য প্রাইমারি কজ অব হিজ ডেথ।’
আজকে হিথ লেজারের বার্থ ডে! কাজের প্রতি ডেডিকেশন কোন লেভেলে নিয়া যাইতে হয় হিথ আমাদের তা শিখায় গেছেন। আজকের এই দিনে আমরা তার আত্মার শান্তি কামনা করি!

২০২২ সালের নভেম্বর মাসে ‘বাছবিচার’ পাবলিকেশন থেকে কবি ও ক্রিটিক ইমরুল হাসানের বই ‘অ্যা ক্রিটিক্যাল হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশি সিনেমা’ পাবলিশ হয়। এই লেখাটা সেই বইটারই প্রথম চ্যাপ্টার ‘ফ্রম এমেচার-আর্ট টু ইন্ডাস্ট্রি’র কিছু অংশ নিয়া সাজানো হইছে। বাংলাদেশের ফিল্ম আর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির আর্লি ডেইজগুলা আসলে কে
১ দিন আগে
ঈদের তৃতীয় দিন। এলাকার সিনেমা হলের অ্যাপে টিকেট বুক করতে গিয়া দেখি সব সিনেমার টিকেট সোল্ড আউট। খালি ‘প্রেশার কুকার’-এর সিট কিছু ফাঁকা আছে। সব সিনেমা দেখার নিয়ত থাকলেও টু বি অনেস্ট, ‘প্রেশার কুকার’ ছিল লিস্টে সবার নিচে।
৯ দিন আগে
১৬ মার্চ ২০২৬। ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ দোস্ত আমেরিকার তথাকথিত বিশ্বসেরা সিনেমঞ্চে ধ্বনিত হইছে ‘নো টু ওয়ার’ এবং ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’। এইটা নিঃসন্দেহে একটা ইতিবাচক দিক। কিন্তু আজকের আলাপ এইসব পপুলিস্ট স্লোগান নিয়া না।
১১ দিন আগে
ইমাজিন করেন তখন ফেসবুক, ইউটিউব, নেটফ্লিক্স কিছুই নাই। ঘরের সবাই একসাথে বইসা বিটিভি দেখতেছেন। রাত আটটার বাতাবি লেবুর নিউজ শেষ হওয়ার অপেক্ষা। নিউজ শেষ হইলেই কেউ কেউ অবিরাম চুপি চুপি মিউজিক বাইজা উঠল।
১৬ দিন আগে