রিলস দেখলে হুঁশ থাকে না কেন, কীভাবে এড়াবেন এই ফাঁদ

অ্যালার্ম দেওয়ার জন্য ফোনটা হাতে নিতেই ভাবি, ‘আচ্ছা, একটু রিলস দেখি… মাত্র পাঁচ মিনিট।’ তারপর কী হয়? পাঁচ মিনিট কখন যে এক ঘণ্টা হয়ে যায়, বুঝতেই পারি না। যখন হুঁশ ফেরে, দেখি রাত অনেক হয়ে গেছে।

রিলস দেখলে হুঁস থাকেনা কেন? স্ট্রিম গ্রাফিক

‘আজ আর দেরি নয়, ঠিক ১১টায় ঘুমিয়ে পড়ব।’

প্রতিদিন রাতে আমি নিজেকে এই কথা দিই। বাতি নিভিয়ে বিছানায় যাই। কিন্তু অ্যালার্ম দেওয়ার জন্য ফোনটা হাতে নিতেই ভাবি, ‘আচ্ছা, একটু রিলস দেখি… মাত্র পাঁচ মিনিট।’ তারপর কী হয়? পাঁচ মিনিট কখন যে এক ঘণ্টা হয়ে যায়, বুঝতেই পারি না। যখন হুঁশ ফেরে, দেখি রাত অনেক হয়ে গেছে।

এটা শুধু এক দিনের ঘটনা না। প্রায় প্রতিদিনই এমন হয়। আবার রিলস দেখা শেষে যখন ঘড়ির দিকে তাকাই, তখন বুকের ভেতর একধরনের খারাপ লাগা কাজ করে। এত সময় শুধু রিলস দেখে কাটিয়ে দিলাম! মাঝে মাঝে আফসোসও হয়। কিন্তু তবুও আবার একই কাজ করি। শুধু আমি না; অনেকেরই একই অভ্যাস।

আসলে এটা শুধু আমাদের সমস্যা না। এখন সারা দুনিয়ার মানুষই ছোট ছোট ভিডিওতে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হয়? কেন আমরা এই অভ্যাস থেকে সহজে বের হতে পারি না?

রিলসে আমরা আসলে কী দেখি

আমরা যে রিলস বা শর্টস দেখি, সেগুলোতে আসলে কী থাকে—একবার ভেবে দেখেছেন? কেউ দেখায় সকালে উঠে কী করল, কেউ দেখায় ৫০০ টাকায় কী খাওয়া যায় কিংবা কীভাবে দরদাম করে ৮০০ টাকার জুতো ৩০০ টাকায় কিনলাম। কিংবা কেউ দেখে একটা বোতল সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে বা কীভাবে এক মিনিটে ২০টা ফুচকা মুখের টপাটপ গালে দিয়ে প্লেট খালি করা যায়।

এখন সারা দুনিয়ার মানুষই ছোট ছোট ভিডিওতে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। সংগৃহীত ছবি
এখন সারা দুনিয়ার মানুষই ছোট ছোট ভিডিওতে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। সংগৃহীত ছবি

এগুলো শুনতে মজার, দেখতে আরও মজার। কিন্তু সত্যি কথা হলো এসব ভিডিও আমাদের নতুন কিছু শেখায় না। অনেক সময় আমরা নিজেরাই প্রতিদিন এসব কাজ করি। তারপরও কেন যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা এগুলো দেখে যাই।

এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের মনের ভেতরে। মনোবিজ্ঞানে একটা বিষয় আছে, যাকে বলে ‘অনিশ্চিত পুরস্কার’। এই ধারণাটা নিয়ে কাজ করেছিলেন মনোবিজ্ঞানী বি. এফ. স্কিনার। তিনি অনেক আগে একটি পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি দেখান, মানুষ সেই কাজগুলো বারবার করতে পছন্দ করে, যে কাজের ফলাফল অনিশ্চিত থাকে। ক্যাসিনোর জুয়া খেলার মেশিনগুলো ঠিক এই নিয়মেই কাজ করে। আপনি জানেন না পরের দানে জিতবেন নাকি হারবেন।

ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের রিলসও ঠিক একইভাবে কাজ করে। এটা ঠিক জুয়ার মেশিনের মতো। আমরা যখন স্ক্রল করি, তখন জানিনা পরের ভিডিওটা কেমন হবে। হয়ত প্রথম ভিডিওটি খুব একঘেয়ে ছিল। পরেরটাও বেশ সাধারণ। কিন্তু তিন নম্বর ভিডিও দেখে আপনি হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়লেন। এই যে অনিশ্চয়তা, ‘পরের ভিডিও দারুণ হতে পারে’—এই আশাই আমাদেরকে থামতে দেয়না। আর এভাবেই, অজান্তেই, মিনিট গড়িয়ে ঘণ্টা হয়ে যায়।

রিলসের কোনো শেষ নেই

কোনো বই পড়া শুরু করলে তার শেষভাগ পড়ার জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি। টিভিতে কোনো নাটক বা সিনেমা যতই দীর্ঘ হোক না কেন, এর শেষ আছে। আমাদের মস্তিষ্কে থাকে থামার সংকেত।

এই যে অনিশ্চয়তা, ‘পরের ভিডিও দারুণ হতে পারে’—এই আশাই আমাদেরকে থামতে দেয়না। আর এভাবেই, অজান্তেই, মিনিট গড়িয়ে ঘণ্টা হয়ে যায়।

কিন্তু রিলসের কোনো শেষ নেই। অনন্তকাল ধরে স্ক্রল করার এই প্রযুক্তির নাম ‘ইনফিনিট স্ক্রল’। ২০০৬ সালে প্রযুক্তিবিদ আজা রাস্কিন এই ধারণা এনেছিলেন। এর ফলে একটি ভিডিও শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি সামনে চলে আসে। মস্তিষ্ক থামার জন্য কোনো সংকেতই পায় না। কোনো বিরতি থাকে না। ফলে আমরা অবচেতনভাবেই রিলসের স্রোতে গা ভাসাই। হারিয়ে ফেলি সময়জ্ঞান।

মন খারাপ হলেই হাত চলে যায় ফোনের দিকে

আমরা অনেক সময় রিলস দেখি বাস্তবতা থেকে একটু পালানোর জন্য। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে থাকে নানা চাপ—পড়াশোনা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, টাকার চিন্তা। এসব ভাবনা মাথায় ঘুরতেই থাকে। কিন্তু রিলস দেখা শুরু করলে প্রতি কয়েক সেকেন্ডে নতুন ছবি, নতুন শব্দ আমাদের সামনে আসে। এত দ্রুত সবকিছু বদলাতে থাকে যে মস্তিষ্ক অন্য কোনো চিন্তা করার সুযোগই পায় না।

এই কারণেই রিলস আমাদের কাছে খুব সহজ একটা আশ্রয় হয়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘এস্কেপিজম’, অর্থাৎ বাস্তবতা থেকে সাময়িক পালানো। কিছু সময়ের জন্য আমরা হালকা অনুভব করি, দুশ্চিন্তাগুলো ভুলে থাকি। তাই মন খারাপ হলেই হাত চলে যায় ফোনের দিকে। কিন্তু এই স্বস্তিটা ক্ষণস্থায়ী। কারণ রিলস আমাদের সমস্যার সমাধান করে না—শুধু কিছু সময়ের জন্য সেগুলোকে আড়াল করে রাখে।

গবেষণা বলছে: নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে আমাদের মন

ছোট ভিডিও আমাদের মস্তিষ্কে কী প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই অনেক গবেষণা করেছেন।

রিলসের কোনো শেষ নেই। সংগৃহীত ছবি
রিলসের কোনো শেষ নেই। সংগৃহীত ছবি

২০২১ সালে চীনের ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা শর্ট ভিডিও আসক্তি নিয়ে গবেষণা করেন। তারা এমআরআই স্ক্যানের মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করেন। তারা দেখেন, মানুষ যখন পছন্দের রিলস দেখে, তখন মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড পাথওয়ে’ বা পুরস্কার পাওয়ার অংশগুলো খুব বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। মানুষ তখন ধীরে ধীরে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ভিডিও দেখা বন্ধ করা তাদের জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়ে।

আরেকটি গবেষণা করে মাইক্রোসফট। সেখানে দেখা গেছে, রিলস আর ছোট ভিডিওর প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। আমরা এখন আগের মতো দীর্ঘ সময় ধরে কোনো কাজ বা বিষয়ের ওপর মনোযোগ দিতে পারি না। আমাদের মস্তিষ্ক খুব দ্রুত নতুন কিছু পেতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।

কীভাবে এই ফাঁদ থেকে বের হবেন

রিলস দেখা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়ত সম্ভব নয়। এর দরকারও নেই। তবে কিছু ছোট নিয়ম মেনে এর আসক্তি কমানো সম্ভব।

প্রথমত, ফোনের সেটিংসে রিলস বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন। সময় শেষ হলে অ্যাপ নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। এটা আপনাকে থামার একটা সংকেত দেবে।

ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন দূরে সরিয়ে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এই সময়টা বই পড়া, হালকা গান শোনা বা পরিবারের সঙ্গে কথা বলায় কাটাতে পারেন। এতে ঘুমও ভালো হবে, আর অকারণ স্ক্রলিংও কমবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজেকে প্রশ্ন করা। যখনই মনে হবে আপনি উদ্দেশ্যহীনভাবে স্ক্রল করছেন, একটু থামুন। ভাবুন, আপনি কি সত্যিই ভিডিওগুলো উপভোগ করছেন, নাকি শুধু সময় পার করছেন?

রিলস আমাদের সাময়িক আনন্দ দেয়। মনকে হালকা করে। কিন্তু এই ছোট ছোট আনন্দ যেন আমাদের মূল্যবান সময় কেড়ে না নেয়, সেদিকে সচেতন থাকতে হবে। না হলে প্রতিদিন রিলস দেখা শেষে সময় নষ্ট করা নিয়ে যে আফসোস হয়, সেটাই হয়ে উঠবে আমাদের নিয়মিত সঙ্গী।

সম্পর্কিত