জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

যেসব কারণে অস্কার অ্যাওয়ার্ডকে এত পাত্তা দেওয়ার কিছু নাই

ফয়সাল আহমেদ
ফয়সাল আহমেদ

স্ট্রিম গ্রাফিক

১৬ মার্চ ২০২৬। ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ দোস্ত আমেরিকার তথাকথিত বিশ্বসেরা সিনেমঞ্চে ধ্বনিত হইছে ‘নো টু ওয়ার’ এবং ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’। এইটা নিঃসন্দেহে একটা ইতিবাচক দিক। কিন্তু আজকের আলাপ এইসব পপুলিস্ট স্লোগান নিয়া না।

সরাসরি বলতে চাই, অস্কারের মতো বছরের পর বছর ধইরা চলা ‘বিতর্কিত’ একটা পুরস্কার আজ সিনেমার জন্য কার্যত অদরকারি হইয়া উঠছে।

কেন এই দুঃসাহসিক মন্তব্য করলাম? তা ব্যাখ্যা করতে হইলে আমাদের তর্কের খাতিরে খুলতে হবে অতীতের খাতা। আর ব্যাখ্যা করতে হইলে আমার যেহেতু একাকোন একটা জায়গা থিকা শুরু করা লাগবে। আমি তাই যেকোন একটা জায়গা থিকা শুরু করতেছি।

শুধু কি কোম্পানির প্রচারের স্বার্থ

মার্টিন ম্যাকডোনাহরে দিয়াই আলাপটা শুরু করি। মার্টিন ম্যাকডোনাহ হইতেছেন অস্কারের ময়দানে বারবার অবহেলিতের এক জীবন্ত উদাহরণ।

ছবি: মার্টিন ম্যাকডোনাহ
ছবি: মার্টিন ম্যাকডোনাহ

২০০৬ সালে ‘সিক্স শ্যুটার’ শর্টফিল্মের জন্য লাইভ অ্যাকশন ক্যাটাগরিতে অস্কার জেতার পর তিনি একে একে ‘ইন ব্রুজেস’, ‘থ্রি বিলবোর্ডস আউটসাইড ইবিং, মিসৌরি’ এবং ‘দ্য বানশিজ অফ ইনিশেরিন’ এর মতো গ্রেট গ্রেট ফিচার ফিল্ম বানাইছেন। মার্টিন ম্যাকডোনাহ যে বছর ছবি বানান, সেই বছরের অস্কার আসলেই দেখা যায় অরিজিনাল স্ক্রিনপ্লে বা সেরা সিনেমার দৌঁড়ে তিনি একাধিক মনোনয়ন পান, কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে দেখা যায় শেষমেশ তারে খালি হাতে ঘরে ফিরতে হয়। তার লাস্ট সিনেমা ‘দ্য বানশিজ অব ইনিশেরিন’ ৯টা নমিনেশন পাইয়াও, একটা ক্যাটাগরিতেও অস্কার না জেতায় খোদ সমালোচকরাই অবাক হইছিলেন।

ছবি: ‘দ্য বানশিজ অফ ইনিশেরিন’ এর পোস্টার
ছবি: ‘দ্য বানশিজ অফ ইনিশেরিন’ এর পোস্টার

এইরকম আরও আরও কত কত হতাশাজনক ঘটনা যে ঘইটা যায় অস্কারের মঞ্চে সেকথা জানে অনেকেই, কিন্তু কয়টা আর উল্লেখ করা যায়!

ঘটনা হইলো, অস্কার এখন আর কেবল মেধার মাপকাঠি না। এইটা হয়ে উঠছে একটা ব্যয়বহুল মার্কেটিং ক্যাম্পেইন। স্টুডিওগুলা ‘ফর ইউর কন্সিডারেশন’ বিজ্ঞাপনের পেছনে লাখ লাখ ডলার খরচ করে। একাডেমির মেম্বারদের মন জয় করতে যে পরিমাণ লবিং এবং পিআর যুদ্ধের প্রয়োজন হয়, ম্যাকডোনাহর মতো স্বাধীনচেতা নির্মাতারা সেইখানেই পিছায়ে পড়েন। অর্থাৎ, এইখানে শৈল্পিক মানের চাইতে ক্যাম্পেইনের শক্তিই বড় হয়ে দেখা দেয়।

যখন টানা কয়েক বছর ধইরা ডকুমেন্টারি বিভাগে এমন সব সিনেমা পুরস্কৃত হইতেছে, যা সরাসরি আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক শত্রুদের (যেমন: রাশিয়া) বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান তৈরি করে, তখন কি আর এইটারে কাকতালীয় বলা যাবে?

রাজনীতিতে অস্কার: কার ফায়দা, কার লস?

আপনি যদি অস্কারের গত তিনবারের ডকুমেন্টারি ফিল্মের উইনিং লিস্ট দেখেন, দেখবেন তিনটা ছবির দুইটাই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধরে কেন্দ্র কইরা। গত তিন বছরের বিজয়ী ডকুমেন্টারি তিনটার ভিন্ন দেশ, ভিন্ন নির্মাতা, কিন্তু একটা অভিন্ন বৈশিষ্ট্য। সবই এমন সংঘাতের গল্প, যা সরাসরি বৈশ্বিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রে দাঁড়ায়ে আছে।

যখন টানা কয়েক বছর ধইরা ডকুমেন্টারি বিভাগে এমন সব সিনেমা পুরস্কৃত হইতেছে, যা সরাসরি আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক শত্রুদের (যেমন: রাশিয়া) বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান তৈরি করে, তখন কি আর এইটারে কাকতালীয় বলা যাবে?

২০২৪ এর ‘টুয়েন্টি ডেইজ ইন মারিউপোল’ এবং ২০২৬ এর ‘মিস্টার নোবডি এগেইন্সট পুতিন’ — দুইটাই বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আমেরিকার শত্রু হিসেবে রাশিয়ার ইমেজ নির্মাণে বিরাট ভূমিকা পালন করছে। এবং খেয়াল করলে দেখবেন দুইটা সিনেমাই এমন সময় অস্কার জিততেছে, যখন পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার বিরুদ্ধে এক বিশাল রাজনৈতিক ও তথ্যযুদ্ধে লিপ্ত। রাশিয়া ভালো না খারাপ–আমি এই আলাপে যাইতেছি না। আমি জাস্ট অস্কারের লেন্সটা কী, কেমনে ফাংশন করে এই উদাহরণটা টানার জন্য জিনিসটা বললাম।

এবং এইগুলারে বলা হয় মোরাল পজিশনিং সিনেমা, যা দর্শকদের অবচেতন মনরে একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষ নিতে বাধ্য করে।

সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার আর হলিউড নিয়া ফিল্ম ক্রিটিকদের একটা ইন্টারেস্টিং অবজার্ভেশন আছে বাজারে। সেইটা হইতেছে, ‘হলিউড হ্যাজ হিস্ট্রিক্যালি হেল্পড ফ্রেম দ্য এনিমি ইন অয়েজ দ্যাট এলাইন উইথ ন্যাশনাল ইন্টেরেস্টস।’

এই অবজার্ভেশনটা আজকের দিনের জন্যও অনেক র‍্যালিভ্যান্ট ।

হলিউডের ইতিহাসে একটা অন্যতম শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন হইলো #OscarsSoWhite বিতর্ক, যেইটা আসলে অস্কারের স্বচ্ছতা এবং বৈচিত্র্যের অভাবরে আঙুল দিয়া দেখায় দিছিলো।

ব্যালান্স গেইম নাকি গোঁজামিল, গোঁজামিল আর গোঁজামিল?

এইবার আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, তাইলে ২০২৫ এ যে একাডেমি ফিলিস্তিন-ইসরায়েল যুদ্ধের ডকুমেন্টারি পুরস্কৃত করলো?

‘নো আদার ল্যান্ড’ ছবিটারে পুরস্কৃত করা একদিকে যেমন মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অবস্থান, অন্যদিকে এইটা অস্কারের জন্য একটা ‘নৈতিক ভারসাম্য’ তৈরির উপায়ও। অর্থাৎ মাঝেমধ্যে মিত্র রাষ্ট্রের সমালোচনামূলক গল্পরে সামনে আনা হয় যাতে প্রতিষ্ঠানটারে সম্পূর্ণ পক্ষপাতদুষ্ট মনে না হয়। এই ধরনের স্বীকৃতি দিয়া তারা এইটা বুঝাইতে চায় যে আমেরিকান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলা সব পক্ষের সমালোচনা করতে পারে। এইগুলা তারা করে মূলত নিজেদের নিরপেক্ষ দেখানোর পায়তারা ও পিওর ব্যালেন্স গেইম হিসেবে।

প্রশ্ন জাগে, এই ব্যালেন্স গেম খেলতে খেলতে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস কি শেষমেশ কারওয়ান বাজার ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল হয়ে যাইতেছে না?

হোয়াই অস্কার ইজ সো হোয়াইট?

এখন একটু ইতিহাসের দিকে তাকাই চলেন।

হলিউডের ইতিহাসে একটা অন্যতম শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন হইলো #OscarsSoWhite বিতর্ক, যেইটা আসলে অস্কারের স্বচ্ছতা এবং বৈচিত্র্যের অভাবরে আঙুল দিয়া দেখায় দিছিলো।

২০১৫ সালের জানুয়ারি। ৮৭তম অস্কারে একজনও কালো অভিনেতাকে মনোনয়ন না দিয়া, ২০ জন সাদা অভিনয়শিল্পীরে মনোনয়ন দেওয়ার পর কালো এক আইনজীবী ও অ্যাক্টিভিস্ট এপ্রিল রেইন তার টুইটারে প্রথম #OscarsSoWhite হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করলেন। তিনি ব্যঙ্গ কইরা লিখলেন, ‘#OscarsSoWhite they asked to touch my hair.’ তার এই এক টুইট সেদিন অস্কারের ভিত নাড়ায়া দিছিল। বিশ্বজুড়ে সিনেমাপ্রেমীরা একাডেমির স্বৈরাচারী মনোভাব ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সেদিন সোচ্চার হয়া ওঠে।

ছবি: এপ্রিল রেইনের টুইট
ছবি: এপ্রিল রেইনের টুইট

কিন্তু ২০১৬ সালের ৮৮ তম অস্কারে ফের একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। ওই বছর ‘স্ট্রেইট আউট্টা কম্পটন' বা ‘ক্রিড’ এর মতো প্রশংসিত সিনেমাগুলা থাকা সত্ত্বেও কালো শিল্পী ও নির্মাতারা উপেক্ষিত হইলেন। প্রতিবাদস্বরূপ, অভিনেতা উইল স্মিথ, জাডা পিঙ্কেট স্মিথ এবং পরিচালক স্পাইক লি অস্কার অনুষ্ঠান বয়কট করলেন। সেই বছর অস্কারের উপস্থাপক ছিলেন কালো কমেডিয়ান ক্রিস রক। তিনি তার পুরা মনোলগ জুইড়া অস্কারের এই সাদা আধিপত্যরে ব্যাপক ব্যঙ্গ করতে থাকলেন।

এইসবের প্রতিক্রিয়ায় একাডেমি তাদের মেম্বারশিপে আমূল পরিবর্তন আনে বা আনতে এক প্রকার বাধ্য হয়। আর এই পরিবর্তনের ফলেই ইদানীং আমরা দেখতেছি কালো বা সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর শিল্পীরা পুরস্কৃত হইতেছে। হালের মাইকেল বি. জর্ডান বা অটাম ডুরাল্ড অর্কপাওয়ের মতো প্রতিভারা স্বীকৃতি পাইতেছে।

কিন্তু প্রশ্ন থাইকা যায়, এই পুরস্কার কি কেবলই মেধার জন্য, নাকি একাডেমির হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা ফিইরা পাওয়ার অর্থাৎ ক্রেডেবিলিটি ম্যানেজমেন্ট টেকনিকের অংশ?

অস্কার হয়তো একটা নির্দিষ্ট সময়ের ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিকগনিশন হইতে পারে, কিন্তু সিনেমার আসল বিচারক হইলো সময়। পপ কালচারে ট্যাক্সি ড্রাইভার বা পাল্প ফিকশনের প্রভাব অস্কারজয়ী অনেক বিস্মৃত সিনেমার চাইতেও অনেকগুণ বেশি।

অস্কার, তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়াছি জলাঞ্জলি

অস্কার যে সিনেমার চূড়ান্ত মানদণ্ড না, তার বড় প্রমাণ ইতিহাস নিজেই। আইএমডিবির শীর্ষ তালিকায় থাকা ‘দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন’ কিংবা সিনেমার ভাষা বদলায়া দেয়া ‘সিটিজেন কেইন’, ‘পাল্প ফিকশন’, ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ , এমনকি হিচককের ‘সাইকো’–কোনোটাই সেরা সিনেমা ক্যাটাগরিতে অস্কার পায় নাই।

একইভাবে হিচকক, কুবরিক, টারান্টিনো, ফিনচার বা কুরোসাওয়াসহ অনেক জগদ্বিখ্যাত নির্মাতা, সিনেফাইলদের কাছে যারা মায়েস্ত্রো, অস্কারের মঞ্চ তাদের ‘সেরা পরিচালক’ হিসেবে বরণ কইরা নিতেও ব্যর্থ হইছে। কখনো কখনো কাউরে শেষ বয়সে ‘সম্মানসূচক অস্কার’ দিয়া একাডেমি আসলে নিজেরেই দায়মুক্ত করতে চাইছে। কিন্তু অস্কার না পাওয়ায় এই মাস্টার বা মাস্টারপিসগুলার কালজয়ী আবেদন এক বিন্দুও কইমা যায় নাই।

তো যেই পুরস্কার সমসাময়িক শ্রেষ্ঠ কাজগুলারে নিরপেক্ষভাবে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়, তারে ধ্রুব সত্য বইলা মাইনা নেয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নাই। অস্কার হয়তো একটা নির্দিষ্ট সময়ের ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিকগনিশন হইতে পারে, কিন্তু সিনেমার আসল বিচারক হইলো সময়। পপ কালচারে ট্যাক্সি ড্রাইভার বা পাল্প ফিকশনের প্রভাব অস্কারজয়ী অনেক বিস্মৃত সিনেমার চাইতেও অনেকগুণ বেশি।

তাই বলি, আজকের দিনে অস্কার বিশ্ব সিনেমা বিচারের মানদণ্ড হইতে পারে না। এইটা বড়জোর একটা বড় বিজ্ঞাপন মঞ্চ, আমেরিকার একটা রাজনৈতিক ঢাল। কিন্তু কখনোই সিনেমার, শিল্পের শেষ কথা না।

সম্পর্কিত