ইউএসডিএর পূর্বাভাস

চালের উৎপাদন সাড়ে ৭ লাখ টন কমার শঙ্কা, বাড়বে আমদানি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২: ২৫
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

চলতি ২০২৬-২৭ বিপণনবর্ষে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন আগের বছরের চেয়ে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন কমতে পারে। শুধু উৎপাদনই নয়, কমছে ধানের আবাদি জমিও। আউশ ও আমনের উৎপাদন কমার কারণে চলতি বছর চালের আমদানি বাড়াতে হবে বলে মনে করছে মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)।

ইউএসডিএর নিয়মিত প্রতিবেদন ‘গ্রেইন অ্যান্ড ফিড আপডেট’-এর সর্বশেষ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ বিপণনবর্ষে দেশে ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৫০ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়েছিল। তবে ২০২৬-২৭ বর্ষে তা কমে ৩ কোটি ৬৯ লাখ টনে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমবে সাড়ে ৭ লাখ টন।

উৎপাদন কমার পাশাপাশি ধানের আবাদি জমিও কমছে। গত বছর ১ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছিল। এবার তা এক লাখ হেক্টর কমে ১ কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজার হেক্টরে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ইউএসডিএ।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশে এখন ২০ লাখ ৩৬ হাজার ১০২ টন চাল এবং ৩৪ হাজার ৭০ টন ধান মজুত আছে।

ধাক্কা তিন মৌসুমেই

বাংলাদেশে প্রধানত বোরো, আউশ ও আমন—এই তিন মৌসুমে ধান চাষ হয়। ইউএসডিএর তথ্য বলছে, এবার তিন মৌসুমেই চালের উৎপাদন কমবে।

সবচেয়ে বেশি কমবে আমন মৌসুমে। এ বছর আমন উৎপাদন হতে পারে ১ কোটি ৪৫ লাখ টন, যা আগের বছরের চেয়ে ৩ লাখ টন কম। আউশের উৎপাদন আড়াই লাখ টন কমে ২১ লাখ টনে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে বড় ধানের মৌসুম বোরোতেও ধাক্কা লাগতে পারে। এ মৌসুমে চাল উৎপাদন ২ কোটি ৫ লাখ টন থেকে কমে ২ কোটি ৩ লাখ টনে নামতে পারে।

ধান উৎপাদনের পরিসংখ্যান। স্ট্রিম গ্রাফিক
ধান উৎপাদনের পরিসংখ্যান। স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) এগ্রিবিজনেস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম স্ট্রিমকে বলেন, ‘সম্প্রতি দুটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ চাল উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। প্রথমত, ভয়াবহ বন্যায় আমাদের আউশ ও আমনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অতিবৃষ্টির কারণে আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। ফলে ইউএসডিএ যে উৎপাদন ঘাটতির কথা বলছে, তা অনেকটাই বাস্তব।’

আমদানি বাড়বে ১৪ শতাংশের বেশি

দেশে চালের উৎপাদন কমার সরাসরি প্রভাব পড়বে আমদানিতে। ইউএসডিএর পূর্বাভাস বলছে, ঘাটতি মেটাতে ২০২৬-২৭ বিপণনবর্ষে বাংলাদেশকে প্রায় ১৬ লাখ টন চাল আমদানি করতে হতে পারে। এটি গত বছরের চেয়ে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। গত বছর চাল আমদানির পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ টন। খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে সরকারি ও বেসরকারিভাবে এই চাল আমদানি করতে হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘উৎপাদন কমলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের আমদানির দিকে ঝুঁকতে হবে। কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চাল কেনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আগে পরিবহন খরচ কম হওয়ায় ভারত থেকে সহজেই চাল আসত। কিন্তু নানা বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক কারণে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের যে টানাপোড়েন চলছে, তাতে সেখান থেকে সহজে চাল পাওয়া কঠিন হতে পারে। অন্য কোনো উৎস থেকে চাল আনলে তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’

মোটা চালের দাম কম, চিকন চাল চড়া

ইউএসডিএর প্রতিবেদনে দেশের চালের বাজারের চিত্রও উঠে এসেছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য উদ্ধৃত করে এতে বলা হয়, গত মে মাস থেকে বাজারে মোটা চালের দাম কিছুটা কমতির দিকে। তবে চিকন বা উন্নত মানের চালের দাম এখনো বেশ চড়া। গত জুলাই মাসে বাজারে চিকন চালের গড় দাম ছিল ৭৮ টাকা ১০ পয়সা, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য অস্বস্তিকর।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত আগস্ট পর্যন্ত সরকারি গুদামে চালের মজুত ছিল প্রায় ২০ লাখ ৮০ হাজার টন। তবে আমদানি নির্ভরতা ও উৎপাদন কমার কারণে বছর শেষে এই মজুত কমে ১৫ লাখ ৫৭ হাজার টনে দাঁড়াতে পারে।

অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সামনে আমাদের সবচেয়ে বড় মৌসুম বোরো। কিন্তু এই আবাদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন সেচ, বিদ্যুৎ ও সারের প্রয়োজন। গ্যাস-সংকটের কারণে দেশের পাঁচটি সার কারখানা প্রায় বন্ধ। সার আমদানি করাও অনেক ব্যয়বহুল। কৃষি উপকরণের এই ঘাটতি বোরো উৎপাদনে বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমদানি কখনোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। সরকারকে যেকোনো মূল্যে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ নানা বিষয়ে এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে খাদ্যসংকট তৈরি হলে তা বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করবে। তাই দেশের ন্যূনতম খাদ্য মজুত ঠিক রাখতে এখনই নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত