ad

শহীদুল জহিরের ক্যানভাস

ধ্রুব সাদিক
ধ্রুব সাদিক

শহীদুল জহির। স্ট্রিম গ্রাফিক
শহীদুল জহির। স্ট্রিম গ্রাফিক

শহীদুল জহিরের নাম তরঙ্গের শীর্ষে বুদবুদ চলমান ছায়াবাস্তবতা থেকে সরে জলের গভীরে জমে যাওয়া একপ্রস্ত দীর্ঘশ্বাস যেমন। নক্ষত্রের মত পুড়ে ছাই হয়ে, ছাইগুলোকে জমিয়ে পাথর করে, নক্ষত্র-পোড়া ছাইয়ের পাথর থেকে তাঁর জন্ম হয় বটে। আবার সাহিত্যের দুনিয়ায় তিনি বিরল মানবপাখিদেরও একজন। জহির মূলত বারবার জন্মলাভ করেন মানুষের হৃদয়ের গভীর তলদেশ ঘুরে ঘুরে সন্ধান করে স্বপ্নের পাখিটিকে ধরানোর নিমিত্তে। পাশাপাশি, মানুষের অনাবাদি, ঊষর, বন্ধ্যা হৃদয়-জমিনে সংবেদনশীলতা জাগিয়ে তোলার মহৎ কাজটিও তিনি করে থাকেন।

কিন্তু এই কাজটি শুধুই নিজের পরানের দিকে কিংবা বাহিরের জগতের দিকে তাকিয়ে থেকে করেছেন? না, শুধু তাই নয়। চারপাশের প্রাণপ্রবাহের সাথে নিজের পরান একীভূত করে পরানের উন্মুখ ছায়া অনুভব করে আমাদের সামনে হাজির করেছেন তার ক্যানভাসের নায়ক-নায়িকাদের।

আমরা খেয়াল করি: শহীদুল জহির কিন্তু নিজে কিছু বলেন না। নিজের আখ্যানেও তিনি অনুপ্রবেশ করেন না। প্রকৃত স্রষ্টার মতো অসামান্য উপায়ে বর্ণনা করে জহির জানিয়ে দেন যে, তার চরিত্ররা বলাবলি করছে, শুনছে বা শুনেছে। কে শুনেছে বা কার চিৎকার সে রাতে মহল্লার লোক শুনেছিল, সেটা যে ঠিক কার, কেউ নিশ্চিত থাকে না। এক অনিশ্চিত জগতের দিকে ঠেলে দিতে দিতে তার সৃষ্টি এগিয়ে যায়। আর পাঠক পিছু পিছু যেতে বাধ্য হয় শহীদুল জহির হ্যামিলন-এ।

এইসব বিষয় ও বস্তুর ব্যাপারে আমাদের তো অবগত করানই, এছাড়া শহীদুল জহির তার সাহিত্যে মানুষের আত্মার উৎকর্ষর বিষয়টিও গভীর মমতার সাথে ফুটিয়ে তোলেন। আমাদের আরও মনে রাখা জরুরি, শহীদুল জহির তাঁর কথাশিল্পে সূক্ষ্ম সব বিষয় ও বস্তু হাজির করেছেন পাঠ করে শুধু আনন্দলাভ করার জন্য নয়, জীবনের গভীরের জীবনটি যাতে মানুষ ছুঁয়ে দেখতে পারে তার জন্য।

কথাসাহিত্যিক ফয়জুল ইসলামের সাথে শহীদুল জহিরের বড় সখ্য ছিল। ফয়জুল ইসলাম বলেছিলেন, বড় নরম-কোমল ছিলো তাঁর হৃদয়। কিন্তু ঠিক ততটাই আবার সোচ্চার ছিলেন তিনি অন্তরে। আমলার চাকরি করায় সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো প্রতিবাদ হয়তো করতে পারেননি, কিন্তু একজন সাহিত্যিকের জন্ম-দায়, সমাজ-রাষ্ট্রের প্রতি দায়বোধ তাঁর সাহিত্যে ঠিকই দেখতে পাওয়া যায়। মানুষের প্রতিদিনকার সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা শুধু নয়, একইসাথে সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকেও তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ সহযোগে তিনি খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করেছেন। আমলার চাকরি করার পরও তার বিদ্রূপ থেকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও বেনিয়াদের অসৎ বাণিজ্য প্রবণতা রক্ষা তো পায়নি, এমনকি সুশীল সমাজ নামক বস্তুটিকেও কড়াভাবে বিদ্রূপ করতে তিনি ছাড়েননি। অস্পৃশ্য মানুষের বঞ্চনা ও শোষণ, ঘুণধরা রাষ্ট্রের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার কাঠামো কীভাবে চলে এইসব খুঁটিয়ে তুলে ধরার পাশাপাশি কোনো প্রাণ যে অস্পৃশ্য হতে পারে না, মানুষের আর্তচিৎকার দ্বারা সেই জীবনবোধ আমরা তাঁর থেকে পাই।

২০০৯ সালে মৃত্যুর পর প্রকাশিত নাতিদীর্ঘ উপন্যাস ‘আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু’তে শহীদুল জহির তো মানুষের মনের আকাঙ্ক্ষাগুলোর একধরনের একাকার করা প্রতিবিম্বনই ঘটিয়েছেন। আমাদের অনুধাবনে এসে ধরা দেয় যে অতি সাধারণ ঘটনাকেও এক গভীর ব্যঞ্জনায় রূপ দিতে পেরেছেন তিনি। ইব্রাহীমের মৃত্যুর পর মমতার আবু ইব্রাহীমকে সিরাজগঞ্জে নিয়ে যাওয়া; ইব্রাহীমের শব দাফন; ইব্রাহীমের পুরাতন প্রেম; বাচ্চার হাত ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যাওয়া; আইসক্রিম কিনে দেয়া... ইব্রাহীমের মধ্যকার মমতা বা মমতার যে ইব্রাহীম মমতার ঠাসবুনন—এমন মমতার মমতাই শহীদুল জহির আমাদের অনুভব করিয়ে দেন! আমাদের ভাবতে বাধ্যও করেন, যারা ইব্রাহীমকে মেরে ফেললো তারা কারা! মমতার সেই গগনবিদারী আর্তচিৎকার আর মমতারাই বা পরে কে আছে কোথায় কেমন...!

স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলের রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমিতে রচিত উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র আবু ইব্রাহীমের মাধ্যমে শহীদুল জহির এক গভীর বোধের সামনে আমাদের উপনীত করেন। আবু ইব্রাহীমের চারপাশের সকলেই ঘুষ, দুর্নীতি আর অনৈতিকতার স্রোতে গা ভাসিয়ে দিলেও ইব্রাহীম নিজের বিবেককে বাঁচিয়ে রাখেন। আর হ্যাঁ, এখানেই জহির মুন্সিয়ানার সাথে বলেন, পৃথিবীর অধিকাংশ লোক দুর্নীতিতে লিপ্ত হলেও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারার মানুষ থাকতে হয়।

চীনা কবি সিমা ছিয়েনের মৃত্যুর উপলব্ধি তাঁর ‘আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু’ গ্রন্থটিতে বিধৃত করা থেকে শহীদুল জহির আমাদের এও অনুধাবন করান: ‘মানুষের মৃত্যু অনিবার্য কিন্তু তার তাৎপর্য হবে থাই পাহাড়ের চেয়ে ভারী অথবা বেলে হাঁসের পালকের চেয়েও হালকা।’ সেদিন ইব্রাহীমের মৃত্যুতে মমতাই শুধু গগনবিদারী চিৎকার করেছিলেন। কিন্তু আজ, গগনবিদারী না হলেও, অনেকের মানসপটে একটা চাপা আর্তনাদ কাজ করে ইব্রাহীমের জন্য। এই যে একজন সৎ মানুষের নৈতিক লড়াই এবং আধুনিক সমাজের অবক্ষয়ের চিত্র, এসব অসম্ভব সুন্দর মুন্সিয়ানায় ফুটিয়ে তুলেছেন শহীদুল জহির।

শহীদুল জহিরের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পরিচিত পাঠকমাত্রই জ্ঞাত শহীদুল জহির তাঁর গল্প-উপন্যাসে জাদুবাস্তব ব্যাপারটি সচেতনভাবে প্রয়োগ করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে অকপটে বলেছেন, জাদুবাস্তব ব্যাপারটা তিনি মার্কেসের কাছ থেকে পেয়েছেন। প্রথমত, চিন্তার বা কল্পনার গ্রহণযোগ্যতার পরিধি অনেক বিস্তৃত হতে পারে এবং দ্বিতীয়ত, বর্ণনায় টাইমফ্রেমটাকে ভাঙতে চেয়েছেন বলে জাদুোস্তবতা গ্রহণ করলেও শহীদুল জহিরের কথাসাহিত্যে ইয়োরোপীয় বা লাতিন জাদুবাস্তব বা পরাবাস্তবতার উপাদান পাওয়া যায়, ব্যাপারটা ঠিক এমন নয়৷ অতীত খুঁড়ে বর্তমানে নিয়ে এসে ভবিষ্যৎ চোখের সামনে জাজ্বল্যমান রেখে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি জাদুবাস্তব, পরাবাস্তব একাকার করে। বড় আর্টিস্টদের মধ্যে সংশয় থাকা একধরনের নিয়তিই হয়তো। ফলে শহীদুল জহিরের সাহিত্যে আমরা হামেশাই প্রচুর সংশয়বাচক শব্দ পেয়ে থাকি। তবে, নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত তিনি নিজে নিতেন না, নাকি পাঠককে নিতে দিতে অপারগ, এই ব্যাপারটিও ভাবনার দাবি রাখে৷

শিল্প-সাহিত্য অনুরণিত হওয়ার ব্যাপারটি তো—হোমার, হোরাস আংশিকভাবে বলেছেন— এলিয়ট, পাস প্রমুখরা হোমার, হোরাসকে বিধৃত করে বিশদভাবে বলেছেন। সাহিত্যের পরশ-পাথরের ঠোকাঠুকির দিকে মনোনিবেশ করলে আমাদের অনুভব করতে বিশেষ বেগ পেতে হয় না, অনুরণিত হওয়ার ব্যাপারটি আদিকাল থেকে চলে আসছে। কিন্তু আমরা যদি শহীদুল জহিরের সাহিত্যকর্ম জাদুবাস্তব, পরাবাস্তব বা কোনো ধরনের ইজম দিয়ে ব্যাখ্যা করতে যাই, এই ব্যাখ্যা করতে যাওয়াটা আসলে কঠিনই। কেননা, যে জাদুবাস্তব তিনি মার্কেস-এর থেকে পেয়েছেন, মার্কেস আবার সেই জাদুবাস্তব পেয়েছেন ফ্রাঞ্জ রোহ-এর থেকে। তবে শহীদুল জহির আমাদের আরও গভীর কিছু বিষয় ও বস্তুর সাথে পরিচিত করান। তাঁর গল্প পাঠ করে আমরা অনুধাবন করতে পারি, গল্প নির্মাণের জন্য কৌশল এবং কল্পনার সহায়তা নেয়ার পাশাপাশি গল্পের উপাদান সংগ্রহের জন্য কতভাবে একজন লেখককে হেঁটে জীবন ফেরি করতে হয়, জীবন খুঁটিয়ে দেখতে হয়। আমাদের পারিপার্শ্বিক জগতকে এমন এক বাস্তবতার মাধ্যমে তিনি প্রতিবিম্বিত করেছেন যা পাঠ করে সেইসব দৃশ্যকল্প, চরিত্র চোখের সামনে ভেসে আসে৷ উল্লেখ করতে হয়, শেষপর্যন্ত কোনো ইজমের মধ্যে আবদ্ধ থেকেও না-থেকে তিনি আসলে বাংলার বাস্তবতা প্রতিবিম্বিত করেছেন এক অনন্য উপায়ে। ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’, ‘যে রাতে পূর্ণিমা ছিলো’, ‘মুখের দিকে দেখি’, ‘ডলু নদীর হাওয়া’ বা ‘চতুর্থমাত্রা’ প্রভৃতি সাহিত্যকর্মে তা প্রকাশিত হয়ে আছে।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপাদানের মধ্যকার আনন্দ কত গভীর হতে পারে, এই ব্যাপারটি মানুষকে অনুধাবন করতে বলেছেন ম্যাক্সিম গোর্কি। দেখতে পারার মত মগজচোখ থাকলে কত পথই দেখা হয়ে যায়। শহীদুল জহির বলেন, দেখতে না-চাওয়ার অনাগ্রহ মানুষকে আসলে আনন্দের সন্ধান দেয় না। সেই যে সন্ধ্যার কালে তুলসীতলায় বউদিদিদের প্রদীপ জ্বালানোর দৃশ্য দেখার অপার্থিব আনন্দ কিংবা অশীতিপর জীর্ণশীর্ণ মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে খোদার প্রতি সমর্পণের জন্য মুয়াজ্জিনের আহ্বান করার দৃশ্য—এইসব দৃশ্য দেখতে পাওয়ার আনন্দ শহীদুল জহির আমাদের অনুভবে বড় সুন্দর করে ধরিয়ে দেন। জীবন সুন্দরভাবে যাপনের ব্যাপার, জীবনের কাছে কখনো কোনো প্রত্যাশা না-করে জীবন পার করতে হয়, শহীদুল জহির আমাদের সেটাই যেন বলেন। তিনি এও অনুভব করিয়ে দেন, যে, জয়ী তো যে-কেউ হতে পারে কিন্তু জয়ের ভীষণ সন্নিকটে পৌঁছে ক’জন পারেন পরাজিত হতে। ক’জনই বা পরাজিত হতে পারার সেই চরম জীবনবোধের সন্ধান পায়! শহীদুল জহির পাঠ জানিয়ে দেয়, তিনি কখনই জয়ী হতে চাননি। তাঁর চরিত্রগুলো বড় ভালোবাসে পরাজিত হতে। সন্তানকে আইসক্রিম কিনে দিয়ে রাতের বেলা স্মৃতি আওড়ানো ইব্রাহীম তো পরাজিত মানুষই।

অগুনতি শান্তির দূত একসাথে ডানা ঝাপটিয়ে ওড়া শুরু করলে তাদের ডানা ঝাপটানোর শব্দটি বুকের গভীরে যেমন কেমন একধরনের আন্দোলন সৃষ্টি করে, ইব্রাহীমকেও আমরা তো অজান্তেই বুকের গভীরে ভালবেসে ফেলি। অথবা মমতা যখন সিরাজগঞ্জে ইব্রাহীমের শব নিয়ে যায়, আমাদের বুকের ভেতরে কি গগনবিদারী কান্নার রোল পড়ে না! পায়রাদের উড়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে একসাথে অগুনতি পায়রা ওড়ার মুহূর্তটির ধ্বনির প্রতিধ্বনি বুকের গভীরে শোনার চেষ্টা করলে মানুষ নিশ্চয়ই বুকের ভেতর পায়রা ওড়ার শব্দ শুনতে পারবে। সন্ধ্যা নামা-নামা গোধূলির দূর সিন্ধু পাড় না-দেখেও অনুভব করতে পারবে, সোনালি ডানার পাখিরা গান গেয়ে ফেরে।

ইব্রাহীমের কথা ভাবনায় আসলে আমার মনে হয় ইব্রাহীম যেন মমতা বা হেলেন বা মমতা-হেলেন উভয়কেই বলে: বলো তুমি, আমার তুমি, কোনোদিন পর হবে না। মমতা ইব্রাহীম কিংবা ইব্রাহীম আর মমতার সম্পর্কটা যেন এমনই। কারো যদি আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু-র গভীর পাঠ থেকে থাকে আর তিনি যদি বেইলি রোড দিয়ে যান, আমার মনে হয় বেইলি রোডে চেয়ে থাকার সময় তার বুকের ভেতর পায়রা উড়তে থাকবে। বুকের ভেতর পায়রা ওড়ানোর এই কঠিন কিন্তু সুন্দর কাজটিই করেছেন আমাদের শহীদুল জহির।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত