ইসলামী ব্যাংককে ২৫০০ কোটি টাকা ধার দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংকের লোগো। সংগৃহীত ছবি

তারল্য সংকট কাটাতে ইসলামী ব্যাংককে আড়াই হাজার কোটি টাকা বিশেষ ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রোববার (১৪ জুন) সকালে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে এই টাকা দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা পাওয়ার পর ইসলামী ব্যাংকে চেক নিষ্পত্তি আবার চালু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ধারের মোট অর্থের মধ্যে দুই হাজার কোটি টাকা নগদ অর্থ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, আন্তঃব্যাংক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সেবা সচল রাখতে অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকে গত দুই সপ্তাহ ধরে অস্থিরতা চলছে। পবিত্র ঈদুল আজহার আগে শেষ কর্মদিবস ২৪ মে, ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন। একই দিন রাত ৯টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ও নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকে ব্যাংকটি ঘিরে আন্দোলন, বিতর্ক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় সংসদেও। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের বিরোধিতা করে। সরকারি দল বিএনপি এই সিদ্ধান্তের সমর্থন করলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদের অধিবেশন। তবে কোনো সমাধান আসেনি। এতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা ও আতঙ্ক তৈরি হয়। এর প্রভাবে মাত্র এক সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা আমানত তুলে নেন গ্রাহকরা।

আমানত প্রত্যাহারের চাপ বাড়তে থাকায় ব্যাংকটির তারল্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, খুরশীদ আলমের নিয়োগের আগে ইসলামী ব্যাংকের সিআরআর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ছিল। ব্যাংকটির সিআরআর যেখানে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা থাকার কথা, সেখানে টানা আমানত উত্তোলনের ফলে তা কমে বর্তমানে প্রায় দুই হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

এতে দৈনন্দিন লেনদেন এবং গ্রাহকদের নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে থাকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা চেয়ে আবেদন করে ইসলামী ব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে প্রাথমিক পর্যায়ে আড়াই হাজার কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে জানান, ‘ঈদের আগের দিন সকাল থেকে তৎকালীন চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেওয়া হয় এবং বিকেলে তিনি পদত্যাগ করেন। ইসলামী ব্যাংকের মতো একটি বড় ব্যাংকে অন্তত ৫ জন সদস্যের বোর্ড থাকা জরুরি। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব অল্প সময়ে এবং অপ্রত্যাশিতভাবে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে হয়। এরপর থেকেই ব্যাংকটিকে অস্থির করার একটা চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে আমানতকারীদের ভয়ের কিছু নেই। তারা যে কোনো সময় টাকা তুলতে পারবেন। আমরা দ্রুত সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।’

এদিকে, আজ রোববার সকালেও চেয়ারম্যানের পদত্যাগসহ ৭ দফা দাবিতে মতিঝিলে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে অবস্থান কর্মসূচি হয়েছে। টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিতর্কিত ব্যক্তিকে শীর্ষ পদে বসানোর ফলে ব্যাংকের চলমান সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে চেয়ারম্যানের পদত্যাগ এবং তাদের বিভিন্ন দাবি মেনে নেওয়া না হলে, বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচি পালন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

এটিএম বুথ ফাঁকা, শাখায়ও মিলছে না চাহিদামাফিক অর্থ

এদিকে নগদ অর্থের সংকটের প্রভাব দেখা দিয়েছে ব্যাংকটির এটিএম বুথ ও শাখা পর্যায়ে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ইসলামী ব্যাংকের একাধিক এটিএম বুথে টাকা না থাকায় সেবা বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। কিছু বুথে মেশিন অচল থাকায় গ্রাহকরা ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। শাখাগুলোতেও পর্যাপ্ত নগদ অর্থ না থাকায় অনেক গ্রাহক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত অর্থ তুলতে পারছেন না।

রোববার দুপুরের আগে ইসলামি ব্যাংকের পান্থপথ শাখায় দেখা যায়, গ্রাহকদের দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদামাফিক অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা তানিম নামের এক গ্রাহক বলেন, ‘আমি পান্থপথ, কাওরান বাজার মেট্রোরেল স্টেশন ও মতিঝিল মেট্রো স্টেশনসহ ৪/৫টা এটিএম বুথে গিয়েও টাকা পাইনি।’ এস কে মণ্ডল নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘শুধু এটিএম বুথ নয়, অনলাইনে এনপিএসবি ও আরটিজিএস সার্ভিসও বন্ধ। তাই সরাসরি ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে এসেছি। তবে কোনও আতঙ্ক থেকে টাকা তুলতে আসিনি। দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য এসেছি।’

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত