জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

যুক্তরাষ্ট্রে ৮৫ থেকে ৮৬ শতাংশ পণ্য রপ্তানিতে শুল্কছাড়: বাণিজ্য উপদেষ্টা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪: ১২
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন উপদেষ্টা। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) ফলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা ৮৫ থেকে ৮৬ শতাংশ পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা মিলবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অর্থনীতির দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারের একটি অর্থনীতি। এই ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির যে আমদানির প্রয়োজন, সেখানে আমাদের রপ্তানির অপার সম্ভাবনা তৈরি হবে।’

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) চুক্তি সই নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনারা জানেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার একটি বাণিজ্যিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বিশ্ব বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছিল। মোটা দাগে এটাকে এমএফএন ভিত্তিক বাণিজ্য বলা হয়। এই এমএফএন ভিত্তিক বাণিজ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাশনাল ইমারজেন্সি ঘোষণা করে তাদের বাংলাদেশ ঘাটতি কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক আরোপ করা শুরু করে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের এক লাখ কোটি টাকার বেশি রপ্তানি হয় আমেরিকার বাজারে। আমেরিকা আমাদের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য উদ্বৃত্তের রপ্তানি গন্তব্য। আমাদের রপ্তানি গন্তব্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বৃত্ত যেখানে তৈরি হয়, সেটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের জন্য এই বাজারটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ। এই বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা সরকার হিসেবে একান্ত প্রচেষ্টায় প্রথম ধাপে ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নিয়ে আসতে সক্ষম হই। এর বিনিময়ে যে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, তা হ্রাসের লক্ষ্যে আমরা কিছু কাঠামোগত পদক্ষেপ এবং আমদানি উদারীকরণের উদ্যোগ নেই। পরে এই চুক্তিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুযোগে আমরা আরও দরকষাকষি করেছি। এখানে আমাদের দুটি বড় অর্জন রয়েছে। একটি হলো, আমরা ২০ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নিয়ে এসেছি। দ্বিতীয়ত, আমাদের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৬ শতাংশই গার্মেন্টস।’

শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘এই গার্মেন্টসে যদি আমরা যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করি, সেই তুলা দিয়ে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শূন্য সম্পূরক শুল্কে প্রবেশাধিকার পাবে। সহজভাবে বললে, আমাদের ৮৫ বা ৮৬ শতাংশ রপ্তানির ওপর শুল্ক শূন্য এবং ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ রপ্তানির ওপর সম্পূরক শুল্ক হবে ১৯ শতাংশ।’

এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে জানিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন,‘চুক্তির মধ্যে শর্ত যুক্ত আছে যে, প্রয়োজনে আমরা উপযুক্ত নোটিশ দিয়ে এই চুক্তি থেকে বের হয়ে আসতে পারব। পরবর্তী সরকার যদি মনে করে এটি তাদের জন্য উপযুক্ত নয়, সে বিষয়েও আমরা সচেতন ছিলাম। তাই এক্সিট ক্লজ চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটিই আমাদের সামগ্রিক অর্জন।’

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ তুলা আমদানিকারক দেশ। কারণ বাংলাদেশ যে পরিমাণ গার্মেন্টস রপ্তানি করে, তার তুলা দেশের ভেতরে উৎপাদিত হয় না বললেই চলে। মাত্র ২ শতাংশ তুলা দেশে উৎপাদিত হয়, বাকি ৯৮ শতাংশ আমদানি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আমাদের জন্য উপযোগী। এটি আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষি ও জ্বালানি পণ্য এবং ট্র্যাডিশনাল মেটাল স্ক্র্যাপসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিও করা যায়।’

আমরা কি রপ্তানি বৃদ্ধির চেষ্টা করব না, এতে ঘাটতি আবার আগের মতো থাকবে—এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি যে ৮৬ শতাংশকে শুধু গার্মেন্টস বলেছি, তার বাইরে শূন্য শুল্ক সুবিধার আরও কিছু পণ্য রয়েছে—যেমন ফার্মাসিউটিক্যালস, বোর্ড, প্লাইউড, ফার্নিচার কম্পোনেন্ট। ফলে ১৯ শতাংশ শুল্ক হয়তো মোট পণ্যের ১০ শতাংশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। বাকি ৯০ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক কার্যত শূন্য। এর ফলে আমাদের রপ্তানির বড় সম্ভাবনা তৈরি হবে।’

দ্বিতীয়ত, ‘আমরা আমদানির ক্ষেত্রে যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছি—যেমন কৃষিপণ্য—এসব আমাদের এমনিতেই আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের খাদ্যপণ্য আমদানি করতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা আমাদের বুঝিয়েছিলেন যে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু ১৫ বিলিয়ন ডলারের গম, ভুট্টা, তেলবীজসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য আমদানির বাস্তবতা সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে।’

উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের জনসংখ্যার জন্য এই খাদ্যপণ্যের প্রয়োজন আছে। আমরা চিনি আমদানি করি। এই আমদানি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক করলে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আমরা মনে করি। একই সঙ্গে আমাদের রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনাও যথেষ্ট। কারণ, এই ধরনের বাণিজ্য চুক্তি খুব কম দেশই পেয়েছে।’

‘কটন ফরওয়ার্ডে জিরো’—এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩৪০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক ভোগ করে। সেখানে শূন্য শুল্ক সুবিধা আমরা পেয়েছি—আমার জানা মতে, অন্য কেউ পায়নি। ফলে অন্যান্য দেশ, যারা শুল্কের মুখে পড়ে, তারা বাংলাদেশে এসে বিনিয়োগ করবে। আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করে সুতা ও পোশাক রপ্তানি করতে পারি, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। এতে শুধু গার্মেন্টস খাত নয়, টেক্সটাইল স্পিনিং ও উইভিং সেক্টরও বড়ভাবে লাভবান হবে। কারণ এখানে ডাবল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন হবে। তাই এটি শুধু গার্মেন্টস খাতের জন্য নয়, পুরো টেক্সটাইল শিল্পের জন্য সুখবর।’

সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছি, তার সঙ্গে তারা “পটেনশিয়াল ট্যারিফ অ্যাডজাস্টমেন্ট ফর পার্টনার কান্ট্রিস” নামে একটি ট্যারিফ সুবিধা দিয়েছে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই এটি কার্যকর হবে। এতে ২ হাজার ৫০০ আইটেমের ওপর ডিউটি-ফ্রি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফার্মাসিউটিক্যালস খাত অন্যতম। এই খাতের সব এইচএস কোড এবং কাঁচামালের ওপর ডিউটি-ফ্রি সুবিধা দেওয়া হয়েছে।’

এ ছাড়া প্লাস্টিক পণ্য, উড়োজাহাজের যন্ত্রপাতি, প্লাইউড বোর্ডসহ আরও অনেক পণ্য রয়েছে। যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করেছে, তাদের জন্য এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান সচিব।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা আসে। পরে দরকষাকষি করে এ হার ২০ শতাংশে নামানো হয়, যা ১ আগস্ট কার্যকর হয়। এর আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্যে ১৫ শতাংশ শুল্ক ছিল; সব মিলিয়ে শুল্ক দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ।

বাড়তি এই শুল্ক আরোপের পর অন্তর্বর্তী সরকার টানা ৯ মাসের বেশি সময় ধরে তা কমাতে আলোচনা চালিয়ে আসে। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুই দেশের মধ্যে চুক্তি সই হয়। নতুন চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে পারস্পরিক শুল্ক হবে ১৯ শতাংশ। এতে মোট শুল্কহার আগের ৩৫ শতাংশ থেকে কমে ৩৪ শতাংশে দাঁড়াবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত