স্ট্রিট ফুডের অর্থনীতি আসলে কত বড়

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ১৭: ৫০
এআই জেনারেটেড ছবি

সন্ধ্যার পর ঢাকা যেন অন্য রূপে হাজির হয়। অফিস শেষে ক্লান্ত হয়ে যখন বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হই, মানুষের ভিড়ে তখন মেট্রোস্টেশনগুলো হয়ে ওঠে ছোট ছোট জীবন্ত বাজার। ফুচকা, চটপটি, বার্গার, চিকেন ফ্রাই, ঝাল নুডলস, ধোঁয়া ওঠা চা…।

এত দোকানের মধ্যে হঠাৎ চোখ আটকে যায় এক নারীর ছোট্ট পাস্তার স্টলে। একটি সাধারণ টেবিল, পাশে চুলা, কয়েকটি সসের বোতল আর প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে তাঁর পশরা।

নারীটি ব্যস্ত হাতে প্যানে মাখাচ্ছেন সস, সবজি আর পাস্তা। ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে আসছে রসুন-চিলি ফ্লেক্সের গন্ধ। আশপাশের শব্দের ভেতরেও তার কণ্ঠ আলাদা করে শোনা যায়
‘ঝাল একটু কম দেব?’

বলছিলাম রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী মেট্রো স্টেশনের শারমিন আক্তারের ছোট্ট পাস্তার দোকানের কথা। পাস্তা তাঁর দোকানে স্পেশাল আইটেম হলেও পাওয়া যায় চিকেন চাপ, মিট বক্স, ফ্রেঞ্চফ্রাইসহ আরও বাহারি আইটেম।

বাংলাদেশের শহর থেকে মফস্বল—সব জায়গাতেই এখন স্ট্রিট ফুড এক পরিচিত অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, ভাজাপোড়া, চা, কাবাব কিংবা ভ্রাম্যমাণ ফাস্টফুড—সব মিলিয়ে দেশের স্ট্রিট ফুড খাত এখন অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির একটি বড় অংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান তাঁর শ্রমবাজার ও বাণিজ্যনীতি গবেষণায় বলেছেন, দ্রুত নগরায়ণ, কর্মব্যস্ত জীবন ও কম দামে খাবার পাওয়ার সুযোগের কারণে এই খাতের বিস্তার দ্রুত ঘটছে। একই সঙ্গে এটি লাখো মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্ট্রিট ফুড ব্যবসা এখন কয়েক লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার আয়ের প্রধান উৎস। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার মতো শহরে এই বাজারের বিস্তার সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশে স্ট্রিট ফুডের সুনির্দিষ্ট বাজারমূল্যের সরকারি পরিসংখ্যান না থাকলেও অর্থনীতিবিদদের ধারণা, প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয় এই খাতে।

বাংলাদেশ স্ট্রিট ভেন্ডর ম্যানেজমেন্ট ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১ থেকে ৩৫ কোটি টাকার স্ট্রিট ফুড বিক্রি হয়। উৎসবের দিনগুলোতে এই অংক আরও বেড়ে যায়। সেই হিসেবে ধারনা করা হয়, বছরে এই বাজারের আকার প্রায় ১৮,০০০ কোটি থেকে ২০,০০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড (বিটিবি) জানিয়েছে, শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন গড়ে ৬০ লাখ মানুষ ফুটপাতের খাবার খায়।

ঈদ, পয়লা বৈশাখ বা বিভিন্ন উৎসবকেন্দ্রিক সময়ে বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কম পুঁজিতে শুরু করা গেলেও সঠিক জায়গা ও জনপ্রিয় খাবার থাকলে মাসে ভালো আয় সম্ভব।

‘দ্য স্ট্রিট ফুড মাইক্রোএন্টারপ্রাইজেস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, অধিকাংশ স্ট্রিট ফুড ব্যবসা ক্ষুদ্র উদ্যোগ হিসেবে পরিচালিত হয় এবং প্রতিদিন শতাধিক ক্রেতা এসব দোকান থেকে খাবার কিনে থাকেন। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই রাস্তার পাশে, বাজার বা জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভলপমেন্টের (বিআইজিডি) গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে প্রায় আড়াই থেকে ৩ লাখ ক্ষুদ্র খাদ্য বিক্রেতা রয়েছেন।

‘স্ট্রিট ভেন্ডিং অ্যাজ অ্যান অলটারনেটিভ টু সেলফ-এমপ্লয়মেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, স্ট্রিট ভেন্ডিং বাংলাদেশে আত্মকর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে কম শিক্ষিত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এটি দ্রুত আয়ের সুযোগ তৈরি করছে।

গবেষণাটিতে ঢাকার ১৫২ জন ভেন্ডরের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগ বিক্রেতাই এই পেশার মাধ্যমে পরিবার চালানোর পাশাপাশি কিছু সঞ্চয়ও করতে পারছেন।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি এই খাতে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জও। খাদ্যের মান, স্বাস্থ্যবিধি, নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। অধিকাংশ স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে হয় এবং তাদের অনেকেরই নিরাপদ পানি বা স্যানিটেশনের সুযোগ নেই।

এ কারণে বিভিন্ন সময়ে সরকার ও বেসরকারি সংস্থা প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করেছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ), সিটি করপোরেশন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি, নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুতি ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

এছাড়া কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।

‘ইএসডিও স্ট্রিট ফুড প্রজেক্ট ইভ্যালুয়েশন’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন এবং উল্লেখযোগ্য অংশ ঋণ সুবিধা নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অংশগ্রহণকারী অনেক উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর ব্যবসায় লাভবান হয়েছেন।

ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং কিছু ব্যাংকও অনানুষ্ঠানিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধা দিয়ে থাকে। যদিও স্ট্রিট ফুড ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা বড় কোনো সরকারি ঋণ প্রকল্প এখনো ব্যাপকভাবে চালু হয়নি, তবু ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পভিত্তিক ঋণ কর্মসূচির আওতায় অনেকে সুবিধা পাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের স্ট্রিট ফুড খাত শুধু স্থানীয় অর্থনীতিতেই নয়, পর্যটন খাতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্ট্রিট ফুড এখন সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশেও পুরান ঢাকার কাচ্চি, চট্টগ্রামের মেজবান, ফুচকা,চটপটি কিংবা ভর্তাভিত্তিক খাবার বিদেশি পর্যটকদের কাছেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

সঠিক নীতিমালা, প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের স্ট্রিট ফুড শিল্প আগামী দিনে আরও বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি বেকারত্ব কমানো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরিতেও বড় ভূমিকা রাখবে।

সম্পর্কিত