আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ–১২

বনে মশা, সৈকতে মাছি—এই নিয়েই মিশিগানে আছি!

ভূ-পর্যটক তারেক অণুর ধারাবাহিক ভ্রমণ-কাহিনি ‘আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ’-এর ১৩তম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। চোখ রাখুন বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।

প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ১৬: ১১
বনে মশা, সৈকতে মাছি—এই নিয়েই মিশিগানে আছি! স্ট্রিম গ্রাফিক

লিটল বিভার হ্রদের পাশ দিয়ে সরু পায়ে চলা ট্রেইল চলে গেছে বনের গহীনে, সুপিরিয়র হ্রদের দিকে। মাঝে মাঝে জলা জায়গায় চলার জন্য সরু কাঠের তক্তা বিছিয়ে রাখা হয়েছে।

আর সেই জায়গাগুলো যে মশার আসল খনি, সেটা সেখানে ঢোকামাত্রই টের পেলাম! দলের সবার উদ্বাহু শাপশাপান্ত আর মশা মারার চড়-চাপড় শব্দে! এক মুহূর্তের জন্য জিরোনোর উপায় নেই, মশার দল যেন কামড়ে মাংস তুলে নেবে! তবে রক্ষে এখানকার মশার কামড়ে ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়া হয় না।

লিটল বিভার হ্রদের পাশ দিয়ে সরু পায়ে চলা ট্রেইল চলে গেছে বনের গহীনে। ছবি লেখকের সৌজন্যে
লিটল বিভার হ্রদের পাশ দিয়ে সরু পায়ে চলা ট্রেইল চলে গেছে বনের গহীনে। ছবি লেখকের সৌজন্যে

পথে কয়েকটা পাথরের গুহা দেখে মনে হলো এগুলো বুঝি কালো ভালুকের আস্তানা! প্রায় তিন কিলোমিটার পথ, কোথাও না থেমে দুলকি চালে হাঁটা আর আড়-দৌড় মিলিয়ে দেখা মিলল সুপিরিয়র হ্রদের মিহি বালির সৈকত আর দিগন্ত ছোঁয়া জলরাশির।

সেই সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হওয়ার চেয়েও বড় চিন্তা ছিল মশার হাত থেকে বাঁচা। ভেবেছিলাম রোদেলা সৈকতে গেলে বুঝি নিস্তার পাব, তাই ব্যাগ-বোঁচকা ফেলে বালুর দিকে দৌড় দিলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে পড়লাম যেন তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত আগুনে! সেখানে বিপদ আরও বেশি!

তাঁবুতে। ছবি লেখকের সৌজন্যে
তাঁবুতে। ছবি লেখকের সৌজন্যে

মাছি! মাছি! মাছি!

এরা আমাদের চেনা নিরীহ মাছি নয়, বরং ধারালো চোয়াল দিয়ে মাংস কামড়ে ধরা এক সন্ত্রাসী মাছির দল। মশাকে তাও চড়-চাপড় দিয়ে সামলানো যাচ্ছিল, কিন্তু এই মাছিদের সাথে আর পারা গেল না। দ্রুত ক্যাম্পিং এলাকায় গিয়ে বড় একটা তাঁবু খাটিয়ে ফেললাম, তবে উপরের ঢাকাটা দিলাম না। এতে জালের ভেতর দিয়ে বাইরের নিসর্গ উপভোগ করাও যাবে, মশাদের হুল থেকে রক্ষাও পাওয়া যাবে!

লেখক ও তাঁর সঙ্গীরা। ছবি লেখকের সৌজন্যে
লেখক ও তাঁর সঙ্গীরা। ছবি লেখকের সৌজন্যে

জন ডেনভারের সেই বিখ্যাত ‘Annie’s Song’ গানটা আমাদের সবার খুব প্রিয়।

‘You fill up my senses

Like a night in a forest

Like the mountains in springtime

Like a walk in the rain

Like a storm in the desert

Like a sleepy blue ocean’

গানের কথাগুলো যেন এখানে একদম মিলে গেল। বিশাল নীল লেক তো শান্ত মহাসাগরের মতোই। এখানে বসন্তকালে এলে ম্যাপল রাঙা পাহাড় দেখা যেত, আর বনে তো রাত কাটাচ্ছিই।

দোকানটা অনেকটা জাদুঘরের মতো। ছবি লেখকের সৌজন্যে
দোকানটা অনেকটা জাদুঘরের মতো। ছবি লেখকের সৌজন্যে

মিশিগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে অন্য অনেক অঙ্গরাজ্য থেকেও পর্যটকেরা এসেছেন। আমাদের মতো তাঁরাও তিতিবিরক্ত মশা-মাছি নিয়ে। গ্রেট লেকের বালির সৈকত আর অগুনতি মসৃণ নুড়িপাথরকে সাক্ষী রেখে সবাই মিলে যেন শিশির পড়ার মতোই নিঃশব্দে এক সন্ধ্যা নামালাম।

তাঁবুর জাল দিয়ে আকাশের জ্বলজ্বলে অনন্ত নক্ষত্রবীথি দেখা, ম্যাপলের সরসর বাতাসের হিমহিম অনুভূতি, আঁধার ঘেরা বনের ছমছমে আবহ আর হ্রদের সৈকতে আছড়ে পড়া তরঙ্গ ধ্বনি—সব মিলিয়ে খুব ভালো একটা স্মৃতি হয়ে থাকল মনে।

ছবি লেখকের সৌজন্যে
ছবি লেখকের সৌজন্যে

সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাঁবু গুটিয়ে আবার তিন কিলোমিটার হেঁটে গাড়ির কাছে ফিরলাম। প্রথমেই চলল পেটপুজো। ‘ভালুক-ফাঁদ’ নামের ৬০ বছরের পুরোনো এক জমকালো দোকানে বেশ সস্তাতেই জম্পেশ খাবার পাওয়া গেল। দোকানটা অনেকটা জাদুঘরের মতো; চারপাশে দোকানের ইতিহাস, শিকারিদের ছবি, কালো ভালুকের চামড়া, হরিণের মাথা, র‍্যাটল স্নেকের ঝুনঝুনি আর বিভারের দেহ খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা।

খাওয়া শেষে তিন-তিন কাপ কফি খেয়েই সোজা ট্রেইলে হাঁটা শুরু করলাম। ১৭ কিলোমিটার হেঁটে, বিশাল এক বৃত্তাকার পথ ধরে আমরা আবার ফিরে আসব এই গাড়ি রাখার জায়গায়।

প্রাকৃতিক কারণে বিচিত্র রঙে রাঙানো বিশাল সব পাথুরে দেয়াল। ছবি লেখকের সৌজন্যে
প্রাকৃতিক কারণে বিচিত্র রঙে রাঙানো বিশাল সব পাথুরে দেয়াল। ছবি লেখকের সৌজন্যে

তখন কি আর জানতাম যে, এই ট্রেইলটাই হবে আমার জীবনের এ পর্যন্ত হাঁটা সবচেয়ে চমৎকার পথ! যেখানে আছে ঘন সবুজ বন, নীল হ্রদ, পান্না সবুজ জল, হরেক পাথরের মেলা, সাদা বালির সৈকত, পাখির গান, জলপ্রপাত আর নদীর কলতান। যদিও সেই নদীর নাম মশা নদী! হাহা! তবে সেখানে আগের দিনের তুলনায় লাখ ভাগের একভাগও মশা ছিল না।

আরও দেখলাম প্রাকৃতিক কারণে বিচিত্র রঙে রাঙানো বিশাল সব পাথুরে দেয়াল, যার খাঁজে খাঁজে গাংচিলেরা ডিম পেড়েছে। ছিল রূপকথার মতো দেখতে কিছু প্রাচীন গাছও।

‘চ্যাপেল রক’-এর ওপর বেড়ে ওঠা সেই শতবর্ষী পাইন গাছটি। পাথরটির নিজের বয়স অবশ্য ৫ কোটি বছর! ছবি লেখকের সৌজন্যে
‘চ্যাপেল রক’-এর ওপর বেড়ে ওঠা সেই শতবর্ষী পাইন গাছটি। পাথরটির নিজের বয়স অবশ্য ৫ কোটি বছর! ছবি লেখকের সৌজন্যে

তার মধ্যে সবচেয়ে নামকরা হলো ‘চ্যাপেল রক’-এর ওপর বেড়ে ওঠা সেই শতবর্ষী পাইন গাছটি। পাথরটির নিজের বয়স অবশ্য ৫ কোটি বছর! এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক নিদর্শনটি এখনকার আমেরিকান সিকি ডলারেও (কোয়ার্টার ডলারে) ব্যবহার করা হয়েছে।

১৭ কিলোমিটার পথ হাঁটা শেষে যখন ফিরলাম, মনটা তখন কেবল আনন্দে ভরা। আমাদের এখনকার গন্তব্য উইসকন্সিন অঙ্গরাজ্যের রাজধানী ম্যাডিসন।

সম্পর্কিত