‘কোথায় আছে, কেমন আছে মা’

প্রিন্স মাহমুদের ব্যক্তিগত শোক যেভাবে জেমসের কণ্ঠে সবার হয়ে উঠল

জেমস ও প্রিন্স মাহমুদ। স্ট্রিম গ্রাফিক

আজ মা দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি একটি বিশেষ তারিখ মাত্র। কিন্তু বাংলা গানের ভুবনে ‘মা’ শব্দটি নিয়ে যখনই কোনো হাহাকার বা আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে, তখনই একটি গানের সুর অজান্তেই কানে বেজে ওঠে। গিটারের সেই চিরচেনা আর্তনাদ আর জেমসের ভরাট কণ্ঠের গান—‘মা’।

প্রিন্স মাহমুদের কথা ও সুরে এই গানটি গত ২৫ বছর ধরে প্রতিটি সন্তানের মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি করেছে। এই গান সৃষ্টির পেছনে রয়েছে গীতিকারের জীবনের বিষাদমাখা গল্প।

গল্পটা শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। প্রিন্স মাহমুদ তখন বেশ তরুণ। সবে কলেজ পাস করেছেন বা পড়ছেন এমন সময়। অ্যালবামের কাজও করতেন। সেই বছর মাকে হারান। মায়ের মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে বাবাও চলে যান। মা-বাবাকে হারিয়ে একদম একা হয়ে পড়েন।

এই একাকিত্ব প্রিন্স মাহমুদকে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। চারপাশ জুড়ে ছিল কেবল শূন্যতা। কারো সান্ত্বনা বা প্রবোধবাণী তাঁর কানে পৌঁছাত না। চাইতেন একদম একা থাকতে। রাত যখন গভীর হতো, তখন বাড়ির ছাদে গিয়ে একা বসে থাকতেন। নুয়ে থাকা গাছের অন্ধকারে আকাশের নক্ষত্রদের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। সেই নক্ষত্ররা তাঁকে যেন কোনো আলো দিত না। বরং একাকিত্বকে আরও বাড়িয়ে দিত।

সেইসব বিষণ্ন রাতের স্তব্ধতা আর মায়ের অভাব থেকেই জন্ম নিয়েছিল এই গানের শুরুর কয়েকটি লাইন। মায়ের প্রতি অনুভবগুলোই তিনি সুরে আর কথায় আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মায়ের জন্য মনে যে হাহাকার ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা তখন সহজ ছিল না। তাই গানটি সে সময় আর শেষ করতে পারেননি।

কনসার্টে 'মা' গাইছেন জেমস। ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি
কনসার্টে 'মা' গাইছেন জেমস। ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি

এর প্রায় তিন বছর পরের কথা। ১৯৯৯ সাল। ‘এখনও দু'চোখে বন্যা’ অ্যালবামের কাজ করার সময় প্রিন্স মাহমুদ আবার গানটি নিয়ে ভাবেন। এক সন্ধ্যায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গানটির বাকি অংশ লেখা শেষ করেন। রেকর্ডিং হয় হাতিরপুলের সাউন্ড গার্ডেন স্টুডিওতে।

মিউজিক নিয়ে প্রিন্স মাহমুদ বরাবরই বেশ খুঁতখুঁতে। ‘মা’ গানের সুর আর রিদম তিন-চারবার পরিবর্তন করেছিলেন। শুরুতে তিনি অন্য একজনকে দিয়ে গাওয়ানোর কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু পরে তাঁর মনে হলো, জেমস এই গান সবচেয়ে ভালো গাইবেন। কারণ, জেমসের কণ্ঠের সেই বিশেষ শৈলী আর হাহাকার এই গানের আবেগের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মানিয়ে যায়। এর কিছুদিন আগেই জেমসের জন্য ‘হতেও পারে এই দেখা শেষ দেখা’ গানটি তিনি করেছিলেন। গানটি শ্রোতাপ্রিয় হয়েছিল। সেই ভরসা থেকেই জেমসকে ‘মা’ গাওয়ার প্রস্তাব দেন।

রেকর্ডিংয়ের দিন জেমস স্টুডিওতে এসে লিরিক দেখে খুব বেশি কথা বলেননি। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে গেয়ে ফেললেন আরও একটি কালজয়ী গান। প্রিন্স মাহমুদ ভাবেননি গানটি এত জনপ্রিয় হবে। তাঁর কাছে গানের কথাগুলো একটু কঠিন মনে হয়েছিল। আশা করেননি যে এই গান সাধারণ মানুষের মনে এত গভীরে জায়গা করে নেবে। কিন্তু প্রকাশের পর সারা দেশের মানুষের যে সাড়া পেলেন, তাতে তিনি অবাক হয়ে যান।

অ্যালবামের প্রচ্ছদ। সংগৃহীত ছবি
অ্যালবামের প্রচ্ছদ। সংগৃহীত ছবি

‘মা’ গান কেবল শ্রোতাদের মনেই নাড়া দেয়নি, নাড়া দিয়েছিল সংগীত জগতেও। প্রকাশের পর তখনকার জনপ্রিয় শিল্পী খালিদ হাসান মিলু ফোন করেছিলেন প্রিন্স মাহমুদকে। ফোন ধরতেই মিলু কাঁদতে শুরু করেন। বলেছিলেন, ‘প্রিন্স, আমি কি এই গানটা গাইতে পারতাম না? তুমি আমাকে দিলে না কেন?’

লিরিকের দিকে দেখি

এই গানের মূল শক্তি এর লিরিক বা শব্দমালার গভীরতা। একজন মা তাঁর সন্তানকে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করা থেকে শুরু করে অবর্ণনীয় কষ্টে বড় করে তোলা পর্যন্ত যে ত্যাগ স্বীকার করেন, গানে সেই শাশ্বত সত্যই উঠে এসেছে। এই ত্যাগের কোনো তুলনা পৃথিবীতে নেই। কিন্তু সেই মা যখন না ফেরার দেশে চলে যান, তখন সেই আজন্মের নাড়ির বন্ধনটি যেন ছিঁড়ে যায়। এই মৃত্যু পরম আশ্রয়ের চিরস্থায়ী সমাপ্তি। লিরিকের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে সন্তানের আকুতি, যে তাঁর জন্মদাত্রীকে হারিয়ে আজ দিশেহারা।

শৈশবে আমাদের শেখানো হয়, মানুষ মারা গেলে আকাশের নক্ষত্র হয়ে যায়। লিরিকে এই লোকজ বিশ্বাসকে দার্শনিক স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মানুষের তৈরি কোনো ভাষা বা মাধ্যম দিয়ে যখন মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না, তখন সে নক্ষত্রদের দূত হিসেবে কল্পনা করে। রাতের তারার কাছে সে মিনতি করে জানতে চায়, মা কেমন আছেন। এই আকুতি উত্তরের প্রত্যাশা নয়। প্রকৃতির কাছে নিজের অসহায়ত্ব সমর্পণ।

প্রিন্স মাহমুদ তাঁর ব্যক্তিগত শোককে এই গানে সর্বজনীন করে তুলেছেন। তাঁর জীবনের সেই নির্জন রাতের হাহাকার আজ জেমসের কণ্ঠ দিয়ে কোটি মানুষের সম্মিলিত দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছে। এই গান শুনতে শুনতে কত সন্তান যে তাঁর মায়ের কথা ভেবে নিভৃতে চোখের জল ফেলে, তার কোনো হিসাব নেই।

প্রিন্স মাহমুদ যখন নুয়ে থাকা গাছের অন্ধকারে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তিনি হয়তো জানতেন না তাঁর সেই ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা একদিন একটি জাতির আবেগের দলিলে পরিণত হবে।

সম্পর্কিত