প্রতিক্রিয়া

গঙ্গা ব্যারাজের বদলে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নাম একটি ভূ-রাজনৈতিক ভুল

শেখ রোকন
শেখ রোকন

প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ১১: ১৬
স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

বাংলাদেশ সরকার রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা নদীর ওপর ৩৩,৪৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়) নির্মাণ প্রকল্প’ অনুমোদন করেছে। ২০৩৩ সালের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে সৃষ্ট শুষ্ক মৌসুমের পানি সংকট মোকাবিলাসহ এই বাঁধের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীপ্রবাহ পুনরুদ্ধার, লবণাক্ততা হ্রাস এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে।

প্রথমত, প্রকল্পটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নীতিগত ধারাবাহিকতা রয়েছে। ১৯৬১ সালে ভারতে ফারাক্কা ব্যারাজের নির্মাণ কাজ শুরুর প্রেক্ষিতে ১৯৬২-৬৩ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রথম জরিপ সম্পন্ন হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালে এর সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ২০১৩ সালে প্রকল্পটি গৃহীত হলেও ২০১৫ সালে ভারতের আনুষ্ঠানিক আপত্তির মুখে পড়ে। এর জেরে ২০১৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘নকশায় ত্রুটি’র কথা উল্লেখ করে প্রকল্পটি নাকচ করে দেন।

দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রকল্পটি নতুন করে গতি পায়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি প্রকল্প মূল্যায়ন সভায় এটিকে 'পদ্মা ব্যারাজ' নামে পুনরায় আলোচনার টেবিলে আনা হয়। যদিও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে একনেকে পাশের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত হয়েছিল।

প্রকল্পটির নাম গঙ্গা ব্যারাজের বদলে পদ্মা ব্যারাজ রাখা ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে ভুল বলে আমি মনে করি। কারণ এর মাধ্যমে গঙ্গা নদীতে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অধিকারকে ছেড়ে দেওয়া হয়, যা ভারতের জন্য সুবিধাজনক।

প্রকল্পটির নাম গঙ্গা ব্যারাজের বদলে পদ্মা ব্যারাজ রাখা ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে ভুল বলে আমি মনে করি। কারণ এর মাধ্যমে গঙ্গা নদীতে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অধিকারকে ছেড়ে দেওয়া হয়, যা ভারতের জন্য সুবিধাজনক। ভৌগোলিকভাবে, গোয়ালন্দে যমুনার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত নদীটি 'গঙ্গা' নামেই পরিচিত। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র (যমুনা) এর মিলিত স্রোত থেকেই 'পদ্মা' নদীর সৃষ্টি।

প্রকল্পটি অনেক ভাটিতে সমতলে নির্মিত হওয়ার কারণে এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পলি বা সিল্টেশন ব্যবস্থাপনা। গঙ্গা বিশ্বের অন্যতম পলিবহুল নদী। খোদ ফারাক্কা ব্যারাজও পলি ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জে জর্জরিত, যার প্রভাবে উজানে বিহার রাজ্যে ব্যাপক নদী ভাঙনের সৃষ্টি হয়। যে কারণে রাজ্যটি ফারাক্কা তুলে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। এর পাশাপাশি, প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করাও আরেকটি চ্যালেঞ্জ হবে।

এ ধরনের বড় স্থাপনা নির্মাণের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো উজানের দেশের সঙ্গে কার্যকর পানি বণ্টন চুক্তি থাকা। এক্ষেত্রে, ভারতের সঙ্গে যদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন করা হয়, তবে এই ব্যারাজ নির্মাণ ও পরিচালনা প্রক্রিয়া অনেক সহজ ও ফলপ্রসূ হবে।

শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক; নাগরিক সংগঠন রিভারাইন পিপলের প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত