আইএমএফের শর্ত আমাদের জন্য ‘সুইটেবল’ নয়: অর্থমন্ত্রী

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ২২: ৪৭
বর্ণিক বার্তা আয়োজিত নীতি আলোচনায় বক্তৃতা করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ঋণচুক্তির আওতায় যেসব শর্ত দিচ্ছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য যথোপযুক্ত (সুইটেবল) নয় বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরকার আইএমএফের সব কথা মানতে পারবে না।

সোমবার (১১ মে) সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বৈশ্বিক অস্থিরতায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে পথরেখা’ শীর্ষক নীতি আলোচনায় এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে বেশির ভাগ উন্নয়ন সহযোগীরা একমত। তারা আমার উন্নয়ন সহযোগী। ওরা যদি আমার সঙ্গে একমত না হয়, আমি তো এগোতে পারব না।

আমির খসরু বলেন, ‘সব জায়গায় আমরা একমত হচ্ছি না। অনেক জায়গায় দ্বিমত হচ্ছে, আইএমএফের সঙ্গে দ্বিমত হচ্ছে। কারণ আইএমএফ যে শর্ত দিচ্ছে, ওটা আমার অর্থনীতির জন্য, জনগণের জন্য সুইটেবল না।’

আইএমএফের শর্তের বিপক্ষে সরকারের অবস্থান জারি রাখার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচিত সরকার। আমাদের জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা আছে। তাদের কথা মতো আমরা তো সব করতে পারব না। তাই কিছু বহুপক্ষীয় সংস্থার সঙ্গে আমাদের মতপার্থক্য রয়েছে। এই মতপার্থক্য চলতে থাকবে। কিন্তু আমি আমার কোর্স কারেকশন করব ততটুকু, যতটুকু আমার ইশতেহারের সঙ্গে থাকবে। এর বাইরে গিয়ে কিছু করা সম্ভব না।’

গত ১৮ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, ঋণ কর্মসূচি চালিয়ে নিতে আইএমএফের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এখনো আলোচনা (অর্থ ছাড়) চলছে। আলোচনার মধ্যে যেগুলো এখনো সমাধান হয়নি, সেসব সমাধান হবে।

কিন্তু আজ অনুষ্ঠানে আইএমএফের শর্ত না মানার দিকে সরাসরি ইঙ্গিত দিলেন অর্থমন্ত্রী। অথচ যুদ্ধপরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবেলায় আগের ঋণের সঙ্গে আরও ২০০ কোটি ডলার চাইছিল বাংলাদেশ। তবে এর জন্য আইএমএফ সেসব শর্ত দিয়েছে, তা চলমান ঋণচুক্তির শর্তের চেয়েও কঠিন বলে খবর এসেছে।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আর্থিক সংকট সামাল দিতে কয়েক দফা আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি করে বাংলাদেশ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের জুনে ঋণের অর্থ ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে নিলে মোট ঋণের আকার ৫৫০ কোটি ডলার হয়।

বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বৈশ্বিক অস্থিরতায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে পথরেখা’ শীর্ষক নীতি আলোচনায় অতিথিরা। ছবি: সংগৃহীত
বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বৈশ্বিক অস্থিরতায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে পথরেখা’ শীর্ষক নীতি আলোচনায় অতিথিরা। ছবি: সংগৃহীত

এর মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। ষষ্ঠ কিস্তি ও অবশিষ্ট অর্থ ছাড়ের সময় ছিল গত বছরের ডিসেম্বর। তখনই আইএমএফ জানায়, ঋণের অবশিষ্ট অর্থ ছাড় করা হবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে। সেই অর্থ ছাড়ের আগে এখন ঋণের শর্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখতে চায় আইএমএফ। তবে রাজস্ব আদায়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন হয়নি।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাড়বে বিনিয়োগ

অনুষ্ঠানে দেশের জনমিতিক (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) সুবিধা কাজে লাগাতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। বলেন, ‘বর্তমানে এই দুই খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না থাকলেও আগামী ৪-৫ বছরের মধ্যে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হবে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী এই বিনিয়োগ ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধিতে ‘স্কিলিং, রিস্কিলিং এবং আপস্কিলিং’-এর ওপর জোর দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে আমাদের কর্মীরা বিদেশে নিম্নমানের কাজ করায় রেমিট্যান্স কম আসছে। দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারলে অর্ধেক জনবল দিয়েই বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ রেমিট্যান্স অর্জন সম্ভব। সরকারের লক্ষ্য আগামী ৫ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় ৪০-৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। এই উদ্দেশে এখন থেকে প্রতিটি কারিগরি শিক্ষা ও ভোকেশনাল প্রজেক্টে আন্তর্জাতিক মানের ‘অ্যাক্রেডিটেশন ও সার্টিফিকেশন’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এক সময় দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ১০-১১ শতাংশ থাকলেও এখন তা কমে ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, এমনকি গোটা বিশ্বেও অন্যতম সর্বনিম্ন। কর-জিডিপি অনুপাতে প্রবৃদ্ধি না থাকলে এবং সম্পদ সীমাবদ্ধ হলে আর্থিক নীতি বাস্তবায়নের জায়গা কমতে থাকে। এর ফলে সরকার উন্নয়নমূলক বা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণে সক্ষমতা হারায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ নাগরিকদের ওপর।

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ‘নীতি’ এবং ‘রাজস্ব’ বিভাগকে আলাদা করার মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার ইঙ্গিত দেন আমির খসুরু। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণে অনিয়ম ও অপচয় রোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ১ হাজার ৩০০টি প্রকল্প পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে অনেক প্রকল্প কেবল দুর্নীতির উদ্দেশ্যে বা রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল, যা দেশের মানুষের কোনো উপকারে আসছে না।

অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দেন, এখন থেকে যেকোনো বিনিয়োগ বা প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে চারটি বিশেষ মানদণ্ড অবশ্যই পূরণ করতে হবে। প্রতিটি বিনিয়োগের বিপরীতে নিশ্চিত আয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবেশ রক্ষা ও সামাজিক প্রভাব থাকতে হবে।

বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় নীতি আলোচনায় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বক্তৃতা করেন।

দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নীতিগত প্রস্তুতি এবং উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সরকারের নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, বিভিন্ন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, করপোরেট প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের পাঁচ শতাধিক অতিথি অংশ নেন।

সম্পর্কিত