‘ইউটোপিয়া’ টার্মটি সাধারণত নেতিবাচক অর্থে কাল্পনিক বা অবাস্তব বা আকাশকুসুম হিসেবে বেশি প্রচলিত। যে কারণে আমরা এর ইতিবাচক অর্থ ‘আনন্দলোক’ ব্যবহার করতে ভুলেই গেছি! জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সর্বার্থে-সর্বান্তকরণে তার সকল সন্তানের জন্যে ইউটোপিয়াই বটে। মেয়েদের জন্য তো আরও বেশি।
শিরোনামহীন ব্যান্ডের ‘ট্রেন’ গানের দ্বিতীয় স্তবকের শুরুটা এমন: ‘করিডোর ধরে হেঁটে যায়/ একা একা স্বপ্ন অচেনা/ জানালার বুকে চোখ জুড়ে/ সুদূরের আনন্দনগর…।’ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ক্যাম্পাসে গানটা ‘আনন্দনগরে’র স্থলে সর্বসময় ‘জাহাঙ্গীরনগর’ হয়ে যায়! আহা, যা আনন্দলোক বা আনন্দনগর, তা-ই তো আমাদের জাহাঙ্গীরনগর!
গানের শেষে বলা হয়েছে ‘ছুঁয়ে দেখা স্মৃতি আর ছুঁয়ে দেখা আঁধার/ ভেবে নেওয়া শহরের ফেলে আসা পথ।’ জাহাঙ্গীরনগরও আমাদের কাছে এমনই। সাধে কেউ এই ক্যাম্পাস ছেড়ে গেলে বারবার ফিরে আসতে চায়!
জাহাঙ্গীরনগর আমাদের কাছে এক স্মৃতির জাদুঘর। এই ক্যাম্পাসের প্রকৃতি অনন্তযৌবনা। অপূর্ব তার জোৎস্নাশোভিত পূর্ণিমা। অদ্ভুত মায়াময় তার রাত। তার বৃষ্টি অপার্থিব, যেনবা পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমরের খেলা দেখার আহ্বান করে প্রতিনিয়ত। তার বুকে হিম এসে রূপ নেয় তারুণ্যের উৎসবে। আর তার রাস্তা? সবুজের বুকে চিড়ে অক্লান্ত চলতে থাকা সবচেয়ে নিরাপদ কৃষ্ণপথ। জাহাঙ্গীরনগরের এই অপার সৌন্দর্যকে সুন্দরতম করেছে তার মেয়েরা। এখানকার মেয়েরা যেন ‘বন্ধনহীন মুক্ত স্বাধীন চিত্তমুক্ত শতদল!’
তারা লেখাপড়া করে, গবেষণাগার কিংবা গ্রন্থাগারে গবেষণা করে। কেউ বিতর্ক করে, কেউ শিল্পচর্চা করে। তারা প্রয়োজনে একেকজন প্রতিবাদের আগুন। লালমাটির বৃষ্টিতে ভিজে নেচে বেড়ানো, শান্ত শীতল পাটি বিছানো এই মেয়েরাই যে কোনো সংকটে ভ্যানগার্ডের মতো দ্রোহের লালফুল ফোঁটায় ক্যাম্পাসে, ‘রক্তকরবী’র নন্দিনীর মতো। শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সকলের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার সাহস রাখে তারা। ক্যাম্পাসের পিচঢালা কৃষ্ণপথকে কী করে রাজপথে রূপান্তর করতে হয়, এই মেয়েরা দল বেঁধে তা দেখিয়ে দিয়েছে যুগ-যুগান্তর।
এই ক্যাম্পাসকে মেয়েরা তাদের অভয়রাণ্য ভাবে। তাই মুক্তমঞ্চের অনুষ্ঠান শেষে হেঁটে হলে ফিরে, কখনও দলে, কখনও একা– কোনো ভয় নেই, শঙ্কা নেই! সেই পথে শীতল মিষ্টি বাতাসের সাথে ফুলেরা দুলে উঠে। সেই দোলায় হৃদ ভেসে যায়! শহীদ মিনারে শিক্ষার্থীরা গান গায়। একদম স্বপ্নের দুনিয়া! জাহাঙ্গীরনগর ব্যতীত পুরো বাংলাদেশের মেয়েরা কল্পনাও করতে পারে না এমন মুক্তধারার কথা! মোদ্দাকথা নারীর নিরাপদ পরিবেশের পাঠ জাহাঙ্গীরনগর দিতে পারে পুরো দেশকেই!
২.
এমন এক দুনিয়ায় গত ১২ মে রাতে ঘটে গেছে এক নিকৃষ্ট ঘটনা। প্রায় হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার ভয়ানক দুর্বিষহ এক ঘটনা থেকে বেঁচে ফিরেছেন একজন শিক্ষার্থী। ঘনিষ্ঠজনদের পাঠানো নিপীড়িত শিক্ষার্থীর লিখিত বক্তব্য পড়ার সুযোগ হয়েছে আমার। ঘটনার যে আদ্যোপান্ত বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, তা একজন নারীর জন্য শিউরে ওঠার মতো! এই জাহাঙ্গীরনগর আমাদের কষ্টকল্পনাতেও নেই।
এই ক্যাম্পাসে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা আগেও ঘটেছে। কিন্তু, সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, সেসব ঘটনার প্রতিরোধও হয়েছে দুর্দমনীয়ভাবে। এই ক্যাম্পাস ১৯৯৮-১৯৯৯ সালের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ ক্যাম্পাস। সেসব গল্প বড়দের কাছে শুনে আমরাও বড় হয়েছি, ছোটদের বলেছি। কিন্তু, সাম্প্রতিক ঘটনাটি যেন জাহাঙ্গীরনগরের অভয়ারণ্যের গরিমায় নতুন এক কালিমা লেপন করে দিয়েছে!
ভুক্তভোগীর বর্ণনা অনুযায়ী, গত ১২ মে আনুমানিক রাত ১১:১৩ মিনিটে পুরাতন ফজিলতুন্নেসা হল ও আল বেরুনী বর্ধিত ভবনের মধ্যবর্তী রাস্তা দিয়ে হেঁটে হলে যাওয়ার সময় তিনি একজন অপরিচিত ব্যক্তির সন্দেহজনক গতিবিধি খেয়াল করেন। লোকটি ভুক্তভোগী মেয়েটিকে অনুসরণ করলে তিনি তার পরিচয় জানতে চান। জাহাঙ্গীরনগরে পরিচয় দেওয়ার নিজস্ব সংস্কৃতি ও প্রথা আছে। সেই ব্যক্তি প্রথমে নিজেকে জাবির শিক্ষার্থী বলে দাবি করলেও, পরিপূর্ণ পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়। পরক্ষণেই আকস্মিকভাবে সেই ব্যক্তি তার হাতে থাকা একটি দড়িসদৃশ বস্তু দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে ভুক্তভোগীকে টেনে হিঁচড়ে রাস্তার পাশের অন্ধকারের দিকে নিয়ে গিয়ে শ্বাসরোধ করে ধর্ষণ ও হত্যার চেষ্টা চালায়। মেয়েটি তার কৌশল, বিচক্ষণতা, শক্তি ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করেন। চিৎকার শুনে কিছু শিক্ষার্থী সেখানে এলে অপরাধী পালিয়ে যায়।
উল্লেখ্য, যে রাস্তায় এই ঘটনাটি ঘটেছে, সেখানে একটি আবাসিক কোয়ার্টারও আছে। যাই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়া শেষে ভুক্তভোগী প্রক্টর অফিসে অপরাধী শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাতে যান। বিস্ময়কর বিষয় হলো, সম্পূর্ণ ঘটনার সিসি-টিভি ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও, নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়েজিতদের চরম ব্যর্থতা এ ঘটনায় ফুটে উঠেছে। ভুক্তভোগী বলেছেন ‘অপরাধী জঙ্গলের ভেতরেই আছে বলার পরও প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তাসহ যারা ছিল, তারা সঠিকভাবে দেখেনি। এক মিনিট খুঁজেই বলে যে– পাইনি।’ ভুক্তভোগী আরও বলেন, ‘রাত এগারোটা তেরো মিনিটের ঘটনা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত গেট বন্ধ করা হয় সাড়ে বারোটা নাগাদ।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বিনোদন পার্ক নয়, একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। যার মূল কাজ শিক্ষা-গবেষণার পাশাপাশি তার শিক্ষার্থীরূপী সম্পদদের সুনাগরিক হিসেবে করে গড়ে তোলার পথ সুগম করা। যেন তারা জনগণের করের টাকায় পড়ালেখা করে দেশের ও জনগণের উন্নতির জন্য কাজ করতে পারে। আদৌ কি বিশ্ববিদ্যালয় তার সম্পদদের জন্য সুস্থ-সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছে?
স্বভাবতই প্রশ্ন এসে যায় কেন এই সময় দেওয়া হল? প্রশাসন কি জবাব দিতে পারবে? এর আগেও কিছু ঘটনা ঘটেছে। সেসবের প্রতিকার না করে বরং ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’ করা হয়েছে। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতই নাজুক যে, বারবার শিক্ষার্থীদের তরফে দাবি করা করা সত্ত্বেও প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তা কেন আলোকিত নয়? কেন বারবার প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও কোনো সুরাহা হয়নি? প্রশাসনের কাছে এই সহজ দুটি প্রশ্নের কোনো জবাব আছে?
৩.
প্রসঙ্গক্রমে এসব ঘটনাকে একেবারে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগও আছে। যখন পুরো দেশে মেয়েদের বন্দি করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে একদল, সেখানে মেয়েদের এমন প্রজাপতি হয়ে উড়ে বেড়ানো কী করে তাদের পছন্দ হতে পারে? ফলে জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েদের ওপর শ্যেনদৃষ্টি তো আরও বেশি, যারা কিনা অতীতে ঝেঁটিয়ে তাড়িয়েছে ধর্ষকদের!
যাদের আন্দোলনের ফলস্বরূপ জাতীয় পর্যায়ে তৈরি হয়েছে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা, তাদের প্রতি ধর্ষক ও ধর্ষকামীদের খেদ থাকবে এটা খুবই স্বাভাবিক। না হলে কেন এই নিরাপদ নগরীতে উপুর্যপরি একটার পর একটা ঘটনা ঘটে চলেছে? এটা কি শুধুই নারীর প্রতি বিকৃত কামচিন্তন ও ধর্ষকামী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশের নাকি এর পেছনে আরও বড় কিছুর ইঙ্গিত আছে? সারাদেশে মহামারীর মতো বেড়ে যাওয়া ক্রমাগত ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টা তথা নারীর প্রতি সহিংসতা কি কোনো মহলের সৃষ্ট পরিকল্পিত এজেন্ডা, যার একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ টার্গেট জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েরা? এই ঘটনাকে তাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ আসলেই কি আছে?
তার ওপরে আছে প্রশাসনের অব্যবস্থাপনার জগদ্দল চিন্তা। দায় অন্যের ওপরে চালিয়ে দিতে পারলেই যেন বাঁচতে পারেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীকে তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভূমি থেকে এক বহিরাগত পিচাশ টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে পারছে, ধর্ষণচেষ্টা করছে, তাহলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা এবং নিরাপত্তা প্রদানকারীদের কর্মতৎপরতা নিয়ে কেন প্রশ্ন তোলা যাবে না? যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব প্রক্টর এবং নিরাপত্তা শাখার ওপর বর্তায়, সেখানে ‘এটা প্রশাসনের দেখার কথা’ উক্তি কীভাবে করতে পারেন প্রক্টর? শিক্ষার্থীরা ‘প্রশাসন কারা’ জিজ্ঞেস করাতে তিনি কি বলতে পারেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব রেজিস্ট্রারের? কেন শিক্ষার্থীরা তাদের এই ‘পাসিং গেমে’র শিকার হবেন? কেন নিরাপত্তা ও ন্যায়-বিচারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’?
প্রশ্ন উঠতেই পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা একদিনে হঠাৎ করে ভেঙে পড়েছে? উত্তর আসবে– অবশ্যই না। বরং দিনের পর দিন বহিরাগত কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হয়রানির মতো ঘটনায় প্রশাসন দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করার উদাসীনতা দেখানোয়, এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেই চলেছে।
৪.
বিগত কয়েক বছর ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে অধিকতর উন্নয়নযজ্ঞ। স্থানে স্থানে নির্মাণকাজ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জীবনযাপন, নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্যসহ মোটামুটি কোনো দিকেই তেমন একটা খেয়াল রাখেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ক্যাম্পাসের সর্বত্র অস্থিরতা, শব্দদূষণ, নিরাপত্তা সংকট। খেয়াল করলে দেখা যায় ক্যাম্পাসে চুরি-ছিনতাই বেড়ে গেছে এই সময়ের পরে। করোনা-পরবর্তী সময়ে মেয়েদের বিভিন্ন হলে চুরির ঘটনা বেড়ে গেছে। নিরাপত্তা দেয়াল পার হয়ে মেয়েদের হলের জানালার বাইরে থেকে চুরির চেষ্টা বৃদ্ধি পেয়েছে। অবাক করা বিষয় হলো, কেবল চুরি বা চুরির চেষ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি বিষয়টি। জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে অশালীন যৌন নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডও করতে দেখা গেছে। কিন্তু এখানে আসে আরেক চমক, মেয়েরা এসব ঘটনা দেখলেও নিরাপত্তারক্ষীরা কাউকেই দেখতে পায় না! নাকি দেখতে চায় না, কে জানে!
সাম্প্রতিক সময়ের আরো কিছু ঘটনার দিকে দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে। গত ১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখের দিন দেখা গেছে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থার নাজুক দশা। বাইরের মানুষের ঢল নেমেছিল সেদিন। নামকাওয়াস্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক বন্ধ রেখে ‘বহিরাগত থামাও’ কর্মসূচি নিতে দেখা যায় প্রশাসনকে। অথচ বাকি সকল ফটক দিয়েই অবাধে প্রবেশ করছে বহিরাগতরা! ‘শতচেষ্টা’ করেও এই জনস্রোত আটকাতে ব্যর্থ হয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা শাখা। এখন প্রশ্ন আসতে পারে বিনোদনের জন্য জনগণ কোথায় যাবে? সেই আলাপ অন্যদিনের জন্য তোলা থাক! সেই জনসমুদ্রে নিরাপত্তা সংকটে পড়ে ক্যাম্পাসের অংশীজনেরা। বহিরাগতদের দ্বারা নানামুখী হয়রানির শিকার হন শিক্ষার্থীরা, বিশেষত নারী শিক্ষার্থীরা। ইভটিজিংয়ের ঘটনাও ঘটে সেদিন।
১৪ এপ্রিল সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবনের পাশে নির্মানাধীন ভবনের একজন শ্রমিককে নারী শিক্ষার্থীদের অননুমোদিত ছবি তুলতে দেখা যায়। একই দিন বটতলায় দেখা যায় একই চিত্র। মেয়েদের ‘আনপ্রপার এঙ্গেল’ থেকে ক্যামেরা বন্দি করে এসব ছবি নানান গ্রুপে শেয়ার করে বিকৃত যৌনানন্দ উপভোগ করে সে। ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের পাশে নির্মানাধীন ভবনের রং মিস্ত্রি বলে তার পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের শাস্তির আপডেট কি জানাতে পারবে প্রশাসন?
কিছুদিন আগে নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে একটি বহিরাগত ছেলে। এপ্রিলের ৩০ তারিখ আনুমানিক সন্ধ্যা ৬ টার দিকে রোকেয়া হলের সামনে একজন বহিরাগত ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যে বসে মেয়েদের প্রতি অশালীন কর্মকাণ্ড করার সময় নারী শিক্ষার্থীদের কাছে ধরা পড়ে। গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে সেই মেয়েদের গাড়ি চাপা দিয়ে হলেও পালানোর চেষ্টা করে সে। শেষ পর্যন্ত আটক করা হলে প্রক্টর ঐ ব্যক্তিকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় বাদী হয়ে মামলা করবে বলে আশ্বাস দেন। যদিও সেই ঘটনার কোনো আপডেট জানা যায়নি। ভাবুন, মাত্র ১৪ দিন আগের ঘটনা!
ভাবা যায়, প্রায় ৭০০ একরের একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়, যার পথচলা ৫৫ বছরে গিয়ে ঠেকেছে, সেখানে প্রশাসনের অবহেলা এবং অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ড তারই শিক্ষার্থীর জীবন বিপন্ন করছে, নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি করছে!
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে নির্বাচিত শিক্ষার্থী সংসদ আছে। শিক্ষার্থীদের দাবি দাওয়া আদায়ে তারা কতটা সচেষ্ট? বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক নারী-বিরোধী ঘটনার পরও তাদের কার্যকরী পদক্ষেপগুলো কী? শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পরও কেন তারা শিক্ষার্থীদের থেকে বিচ্ছিন্ন? প্রশাসন তাদের সহযোগিতা করছে না? তারা যেহেতু শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি, কোনো প্রকার অসহযোগিতার শিকার হলে সেসব সামনে নিয়ে আসুক। এসব ঘটনায় জাকসুর নারী প্রতিনিধিদের চুপ থাকা একদম অন্য বার্তা দেয়।
৫.
মনে রাখতে হবে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বিনোদন পার্ক নয়, একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। যার মূল কাজ শিক্ষা-গবেষণার পাশাপাশি তার শিক্ষার্থীরূপী সম্পদদের সুনাগরিক হিসেবে করে গড়ে তোলার পথ সুগম করা। যেন তারা জনগণের করের টাকায় পড়ালেখা করে দেশের ও জনগণের উন্নতির জন্য কাজ করতে পারে। আদৌ কি বিশ্ববিদ্যালয় তার সম্পদদের জন্য সুস্থ-সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছে? বিশেষ দিনে বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়া তো দূরে থাক, স্বাভাবিক নিরাপত্তাটুকুও নিশ্চিত করতে পারছে না তারা!
যে রাস্তায় সাম্প্রতিক বিভৎসতার জন্ম হয়েছে, সেখানকার দেয়ালে লেখা আছে ‘চিৎকার কর মেয়ে দেখি কতদূর গলা যায়/ আমাদের শুধু মোমবাতি হাতে নীরব থাকার দায়।’ ঠিক এজন্যই লেখার শুরুতে বলেছি, জাহাঙ্গীরনগর মেয়েদের এক ‘ইউটোপিয়া’। কারণ মেয়েরা এই ক্যাম্পাসকে যথার্থই আনন্দলোক, অভয়রাণ্য ও আনন্দনগর ভাবলেও কর্তাদের সদিচ্ছার অভাবে তা এক অবাস্তব বা আকাশকুসুম কল্পনায় রূপ নেয় হরহামেশা। অথচ, কর্তারা নিশ্চিতভাবেই ক্যাম্পাসের অতীত ইতিহাস জানেন।
এই মোমবাতি যেদিন আবারও অগ্নিগর্ভা মশালে রূপ নিয়ে কাঁপিয়ে দেবে প্রবল পরাক্রমশালী পুরুষতন্ত্রের মসনদ, সেদিন আপনারা বুঝবেন, জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েরা কবরের নীরবতা নয়, আলিঙ্গন করতে ভালোবাসে দ্রোহীকণ্ঠ রক্তকরবী।
- অর্থী দাস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জেনারেল এডুকেশনের শিক্ষণ সহকারী