মণকে মণ পেঁয়াজ পানিতে, ভারতীয় বীজে কৃষকের সর্বনাশ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ঝিনাইদহ

প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬, ১২: ৩০
ফেলে দেওয়া হচ্ছে মণকে মণ পেঁয়াজ

ঝিনাইদহে এবছর পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে, কিন্তু তাতেও স্বস্তি নেই কৃষকের ঘরে। বিক্রি করতে না পেরে ‘হাজার হাজার’ মণ পেঁয়াজ ডোবা-নালা ও খালে ফেলছেন প্রান্তিক চাষিরা। অভিযোগ উঠেছে, নিম্নমানের ভারতীয় বীজ থেকে উৎপাদিত পেঁয়াজ দ্রুত পচে যাওয়ায় শত শত কৃষক লোকসানে পড়েছেন। খুলনা বিভাগের সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা ঝিনাইদহে এই পরিস্থিতিতে পথে বসার আশঙ্কায় দিন কাটছে বহু প্রান্তিক চাষির।

কৃষকদের অভিযোগ, বীজ কিনে তাঁরা প্রতারিত হলেও কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে দায়ী চক্রের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

দেখতে অনেকটা আপেলের মতো বড় আকারের উজ্জ্বল লালচে রঙের শত শত মণ পেঁয়াজ কৃষকের বাড়ির আশপাশের ডোবা-নালায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। গৃহবধূরা প্রতিদিনই বস্তা আর ঝুড়ি ভরে ঘরের মাচা থেকে এনে পেঁয়াজ ঢেলে দিচ্ছেন পানিতে। স্বপ্নের ফসলের এমন করুণ পরিণতি চাষিদের হতাশায় ফেলেছে।

কৃষকদের অভিযোগ, মেহেরপুর, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঝিনাইদহের শৈলকুপার অসাধু ব্যবসায়ী ও বীজ প্রতারক চক্র নিম্নমানের ভেজাল বীজ এনে প্রান্তিক চাষিদের কাছে বিক্রি করেছেন। এই অঞ্চলে সাধারণত সুখসাগর, লাল তীর বা দেশীয় ভালো মানের পেঁয়াজ রোপণ করা হয়। তবে এবছর এই চক্রের প্ররোচণায় ভারতীয় নিম্নমানের নাসিক জাতের পেঁয়াজ রোপণ করা হয়েছে বেশি। যা সংরক্ষণযোগ্য নয় এবং দ্রুত পচনশীল। এসব পেঁয়াজে বিঘাপ্রতি দেড়শ মণেরও বেশি ফলন হলেও দাম নেই। প্রতিমণ ১০০ থেকে ২০০ টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে না। ফলে কৃষকেরা উৎপাদিত সব পেঁয়াজ ডোবা-নালা, খাল-বিলে ফেলে দিচ্ছেন।

শৈলকুপার প্রান্তিক চাষি, মনোহরপুর গ্রামের রাজন এবার দুই বিঘা জমিতে পেঁয়াজের চাষ করেছিলেন। তিনি উপজেলার থানা রোডের ‘লাকী বীজ ভান্ডার’ থেকে সুখসাগর বীজ হিসেবে প্রায় ৯ হাজার টাকা কেজি দরে বীজ কিনেছিলেন। তবে পেঁয়াজ তোলার সময় দেখেন, এগুলো আসলে নাসিক জাতের পেঁয়াজ ছিল। যা বড় আকারের, ফলনও ভালো; তবে বাড়িতে রাখার কয়েক দিনের মধ্যেই তাতে পচন ধরে।

ভারতীয় নাসিক জাতের পেয়াজ সংরক্ষণ-অযোগ্য বলছেন কৃষকরা
ভারতীয় নাসিক জাতের পেয়াজ সংরক্ষণ-অযোগ্য বলছেন কৃষকরা

কৃষক রাজনের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, অনেক পেঁয়াজই খালে ফেলে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ২০০ মণের বেশি পেঁয়াজের বেশির ভাগই ফেলে দিতে হয়েছে। আর যা আছে, সেগুলোও পচে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় উঠানে ফেলে রেখেছেন। তাদের একই পরিবারের চার কৃষকের ৬০০ মণেরও বেশি পেঁয়াজ পানিতে ফেলা হয়েছে বলেও দাবি করেন রাজন।

একই এলাকার হাসান, ফরিদ, শহীদসহ অর্ধশত কৃষক এবং উপজেলাজুড়ে কয়েক অসংখ্য কৃষকের হাজার হাজার মণ পেঁয়াজ হয়েছে নাসিক বা ভারতীয় নিম্নমানের জাতের। ফলে সেসব পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি না হওয়ায় ডোবায় ফেলছেন তাঁরা। অনেকের ঘরের মাচায় অতিযত্নে রাখা কিছু পেঁয়াজের খোলসেও পচন ধরছে। বাড়ির গৃহবধূরা বেছে বেছে সেগুলো ফেলে দিচ্ছেন। উপজেলার ধলহরাচন্দ্র গ্রামের এক কৃষক দাবি করেন, তিনি দেড়শো মণ পেঁয়াজ পাশের ডোবায় ফেলে দিয়েছেন।

শৈলকুপা বাজারের ব্যবসায়ী আলমগীর অরণ্য জানান, অনেক প্রান্তিক চাষির সব পেঁয়াজেই এভাবে পচন ধরছে। তাঁরা বাজারে আনলেও ব্যবসায়ী ও পাইকারেরা সেসব পেঁয়াজ কিনছেন না। তিনি বলেন, ‘অনেক কৃষক ক্ষোভে বাজারেই পেঁয়াজ ঢেলে খালি বস্তা হাতে বাড়ি ফিরছেন।’

খুলনা বিভাগের সর্বাধিক পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে খ্যাত ঝিনাইদহের শৈলকুপার চাষিরা এবার সার, বীজ ও কীটনাশকের সংকটে পড়েন চাষের শুরুতেই। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা অভিযোগ করেন, সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজনীয় ডিএপি সার বিসিআইসির ডিলার-সাবডিলারদের মধ্যে লুটপাট হয়, তৈরি করা হয় কৃত্রিম সংকট। ফলে ১ হাজার টাকা বস্তার সার চাষিদের কিনতে হয় ২ হাজার টাকারও বেশি দামে। তবু অনেক কৃষক সার পাননি। সারের জন্য কয়েকটি স্থানে সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। প্রয়োজনীয় সার-ওষুধ না পাওয়ায় বাড়তি দামে উৎপাদন খরচ হয়ে যায় দ্বিগুণ-তিনগুণ।

বাড়ির উঠোনে ফেলে রাখা হয়েছে পেঁয়াজ
বাড়ির উঠোনে ফেলে রাখা হয়েছে পেঁয়াজ

এসবের পরও ঝিনাইদহের শৈলকুপায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেন কৃষকেরা। তাঁরা মোট ১২ হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমিজুড়ে পেঁয়াজের আবাদ করেন। তবে পেঁয়াজ তোলার পর কপালে হাত কৃষকদের। অধিকাংশ প্রান্তিক চাষির এক বিঘা, দুই বিঘা বা পুরো জমির পেঁয়াজই হয়েছে নাসিক জাতের। অনেকে তড়িঘড়ি বাজারে আনলেও এসব পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে না। ফলে সেখানেই ঢেলে ফেলছেন। কয়েক হাজার কৃষকের এমন সর্বনাশ হয়েছে।

ব্যবসায়ী ও পাইকারেরা বলছেন, সুখসাগর, লালতীর কিং বা দেশীয় জাত ছাড়া এই নাসিক জাতের পেঁয়াজ ক্রয়যোগ্য নয়। এগুলো ঘরে রাখার মতো নয়, ফলে কেউ কিনছেনও না। পেঁয়াজ চাষি আরিফ মৃধা জানান, তাঁর লক্ষ্য ছিল এবার পেঁয়াজ বিক্রি করে বাড়িঘরের সংস্কার করবেন। তবে সে আশা পূরণ হয়নি। তিনি জানান, তাঁর তিন-চার বিঘা জমির সব পেঁয়াজই হয়েছে এ নিম্নমানের। অসাধু বীজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বীজ কিনে প্রতারিত হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

শৈলকুপার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কৃষকেরা বীজ কিনে এভাবে প্রতারিত হয়েছেন। তবে বীজ ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, ভেতরে কী বীজ আছে, তা তাঁরাও জানতেন না। কিন্তু কৃষকেরা ব্যবসায়ীদের এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন। তাঁদের অভিযোগ, অধিক লাভের আশায় পরিকল্পিতভাবে নিম্নমানের বীজ বিক্রি করা হয়েছে।

শৈলকুপার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাসিক জাতের পেঁয়াজের বিপরীতে বাজারে সুখসাগর, লাল তীর কিংসহ দেশীয় জাতের পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। কিছুটা দাম পেলেও খুশি নন এই চাষিরাও। উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় বিঘাপ্রতি এবছর ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে বলেও দাবি তাঁদের।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর শৈলকুপায় ১২ হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৮০৫ হেক্টর বেশি। হেক্টরপ্রতি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ২ টন। তবে তা বেড়ে প্রতি হেক্টরে উৎপাদন হয়েছে ২০ দশমিক ৭ টন। এবার মোট উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার টনের বেশি পেঁয়াজ।

এদিকে বীজ প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে দেশীয় বা উন্নত জাতের বদলে কেজিপ্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায় নাসিক জাতের বীজ কিনে প্রান্তিক চাষিরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন—এ কথা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

শৈলকুপা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান খান বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কিছু কৃষকের বীজের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। এভাবে ক্ষতিগ্রস্তরা আবেদন করলে তাঁদের বীজের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা হবে।’

সম্পর্কিত