ইভি শিল্পের বিকাশে সমন্বিত নীতিমালার তাগিদ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৬, ১৮: ০৯
‘বাংলাদেশে ইভি শিল্পের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনার। ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) শিল্পের প্রসারে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নে জোর দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও সরকারি নীতি-নির্ধারকেরা। একইসঙ্গে দুই ও তিন চাকার বাহন স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা।

শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীতে ‘বাংলাদেশে ইভি শিল্পের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা।

তারা বলেন, চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণ, যন্ত্রাংশ ও ব্যাটারির স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী সংস্থা গঠন হলে দেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে ইভি প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ঘটলেও বাংলাদেশ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা মাত্র ৬৬৯ হলেও প্রায় ৬০ লাখ অনিবন্ধিত বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে।

চার্জিং অবকাঠামোর ঘাটতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব ইভি খাতের প্রধান প্রতিবন্ধকতা উল্লেখ করে তাসকিন আহমেদ বলেন, ‘সরাসরি ব্যয়বহুল ফোর-হুইলার ইভির দিকে না গিয়ে আগামী ৫ থেকে ১০ বছর টু-হুইলার ও থ্রি-হুইলারের স্থানীয় উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ফোর-হুইলারের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে হাইব্রিড ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড প্রযুক্তির মাধ্যমে এগোনো হবে বাস্তবসম্মত কৌশল।’ একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) চার্জিং স্টেশন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

আকিজ মোটরসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ আমিনুদ্দিন বলেন, বর্তমানে ইভির পরিচালন ব্যয় প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির তুলনায় অন্তত ৩০ শতাংশ কম। পাশাপাশি আধুনিক লিথিয়াম ব্যাটারির আয়ু প্রায় ১০ বছর হওয়ায় এটি দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক। তবে বিআরটিএতে নিবন্ধন জটিলতা এবং বাস ডিপোর সংকট এখনো বড় বাধা।

ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) ভাইস প্রেসিডেন্ট তানভীর ইবনে বাশার বলেন, ইভি খাত মূলধননির্ভর হওয়ায় তারা উদ্যোক্তাদের জন্য ৪ থেকে ৮ বছর মেয়াদি ঋণ ও গ্রেস পিরিয়ডের সুযোগ বিবেচনা করছেন।

বাংলাদেশ অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বামা) সভাপতি ও রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান বলেন, ইভি প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য সহায়ক শিল্প গড়ে তুলে বিশ্ববাজারে যন্ত্রাংশ রপ্তানির নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ এহসান বলেন, ‘বাংলাদেশের বাস্তবতায় দুই ও তিন চাকার বৈদ্যুতিক যানই সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত। বর্তমানে চলমান প্রায় ৬০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ডিজেল সাশ্রয় করছে।’

বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, পরিবহন খাতে আমদানিকৃত জ্বালানির পেছনে প্রতিবছর প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়, অথচ ইভির পরিচালন ব্যয় কিলোমিটারপ্রতি মাত্র ১ থেকে ২ টাকা।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. মোহাম্মদ মোকসেদ আলী জানান, সরকার ইতিমধ্যে ইভি-ভিত্তিক গণপরিবহন চালু, চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণ, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ফান্ড গঠন এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৪০০ বৈদ্যুতিক বাস পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়েছে। এছাড়া চীনের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে ইভি বাস সংগ্রহের উদ্যোগ হয়েছে।

সেমিনারে বক্তারা ধাপে ধাপে হাইব্রিড থেকে পূর্ণাঙ্গ ইভিতে রূপান্তর, ভারতের আদলে একটি কেন্দ্রীয় নোডাল এজেন্সি গঠন, পুরোনো বাস পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার এবং রেলওয়ের বিদ্যুতায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সেমিনারের শেষে ডিসিসিআই ও বিএসআরইএর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। সমঝোতার আওতায় ইভি শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সবুজ প্রযুক্তি উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করবে সংগঠন দুটি।

সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন শিল্পসচিব মো. আব্দুল নাসের খান, বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের (বিইপিআরসি) চেয়ারম্যান মো. ওয়াহিদ হোসেন, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) পরিচালক মো. আমিনুর রহমান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) প্রধান প্রকৌশলী মো. মফিজুল ইসলাম।

Ad 300x250

সম্পর্কিত