আমদানি জালিয়াতি

‘ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ’ দেশে এসে হচ্ছে আস্ত বিলাসবহুল গাড়ি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ২৩: ১৭
আমদানি ঘোষণায় ছিল ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ। বাস্তবে এসেছে আস্ত গাড়ির খণ্ডিত অংশ। ছবি: সংগৃহীত
আমদানি ঘোষণায় ছিল ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ। বাস্তবে এসেছে আস্ত গাড়ির খণ্ডিত অংশ। ছবি: সংগৃহীত

আমদানি ঘোষণায় ছিল ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’। বাস্তবে আনা হয়েছে চারটি বিলাসবহুল গাড়ি। কিন্তু সম্পূর্ণ প্রস্তুত (সিবিইউ) অবস্থায় নয়, তিন থেকে চারটি বড় অংশে কেটে সেমি-নকড ডাউন (এসকেডি) অবস্থায়। মোংলা বন্দর দিয়ে গাড়ি আমদানির এমন অভিনব কৌশল উদ্ঘাটন করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সাহায্যে এই প্রতারণা ধরা পড়ে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

চারটি গাড়ির ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’গুলো আনা হয়েছে একই চালানে। বিলাসবহুল গাড়িগুলো হলো রেঞ্জ রোভার ভোগ, বিএমডব্লিউ ৬৫০আই, লেক্সাস এলএক্স৫৭০ ও টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট জিআরএস২০৪।

কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্র অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় এবং মোংলা সার্কেল চালানটির খালাস স্থগিত করে। পরে ১৯ জুলাই চালানটির শতভাগ পরীক্ষা করা হয়। বিআরটিএ ও কুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের সহায়তায় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে গাড়ির বিভিন্ন অংশে থাকা স্টিকার, লেবেল, চিহ্ন ও নম্বর বিশ্লেষণ এবং গাড়িগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

পরীক্ষায় দেখা যায়, সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশ হিসেবে আলাদা করার পরিবর্তে গাড়িগুলোকে ওয়্যারিং হারনেস, সেন্সর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সংযুক্ত রেখে ফ্রন্ট কাট, কমপ্লিট রিয়ার বা টেল কাট, বডি কাট ও রুফ কাট প্যানেল হিসেবে তিন থেকে চারটি বড় অংশে কেটে আনা হয়েছে। এসব অংশ পুনরায় সংযোজন করে গাড়িগুলোর মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠন করা সম্ভব।

চালানটিতে ১৬৪টি প্যাকেজে ১৪টি আইটেম ছিল। চালানের ইনভয়েস ভ্যালু দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ ডলার। প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ধরে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয় প্রায় ৯ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৭ টাকা। প্রযোজ্য শুল্ক-কর দেখানো হয়েছিল ৬ লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা। অথচ অনুসন্ধানে গাড়িগুলোর মূল্য পাওয়া যায় সাড়ে চার কোটি থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকার মতো।

কাস্টমসের জিআরআই রুল ২(এ) অনুযায়ী, খণ্ডিত অবস্থায় আমদানিকৃত পণ্যে যদি সম্পূর্ণ পণ্যের এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার বিদ্যমান থাকে, তবে তা পূর্ণাঙ্গ মোটরযান হিসেবেই শুল্কায়নের বিধান রয়েছে। এনবিআরের ১৯৯৭ সালের সংশ্লিষ্ট শর্ত ভঙ্গ হওয়ায় চালানটি এসকেডি মোটরযান হিসেবে শুল্কায়নযোগ্য বলে মতামত দেওয়া হয়েছে। এই হিসেবেই প্রকৃত রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ চূড়ান্তভাবে নিরূপণ করা হবে। পুরো বিষয়ে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি প্রতিবেদন মোংলা কাস্টম হাউস বরাবর পাঠানো হয়েছে।

চট্টগ্রামেও একই কৌশল

মোংলার মতো চট্টগ্রামেও একই প্রতারণা শনাক্ত করেছে সিআইআইডির চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়। সেখানেও যন্ত্রাংশ হিসেবে আমদানির পর স্থানীয় গ্যারেজে জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিলাসবহুল একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি। ২০১৪ মডেলের গাড়িটিতে অন্য একটি পুরোনো বিএমডব্লিউর রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে সড়কে চালানো হচ্ছিল। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সিআইআইডি অভিযান চালিয়ে গাড়িটি জব্দ করেছে।

সূত্র অনুযায়ী, গাড়িটি সিবিইউ অবস্থায় আমদানি না করে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ হিসেবে দুবাই থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হয়। বন্দর থেকে খালাসের পর গাড়ির বিভিন্ন অংশ প্রথমে কাপ্তাই এলাকার একটি স্থানে নিয়ে জোড়া লাগানো হয়। পরে চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুর এলাকায় একটি অটোমোবাইল গ্যারেজে এনে অবশিষ্ট কাজ সম্পন্নের মাধ্যমে এটিকে পূর্ণাঙ্গ বিএমডব্লিউ গাড়িতে রূপান্তর করা হয়।

এই পুরো জালিয়াতির সঙ্গে মোহাম্মদ আইয়ুব নামে এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুবাই থেকে গাড়ির বিভিন্ন খণ্ডাংশ পাঠানো, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস এবং স্থানীয়ভাবে জোড়া লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে রূপান্তরের পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি ও তার সহযোগীরা জড়িত বলে জানা গেছে।

সিআইআইডি বর্তমানে গাড়িটির আমদানি প্রক্রিয়া ও রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি তদন্ত করছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত