ঢাবিতে শিক্ষার্থী ‘খরা’, তবু বিভাগ একীভূত প্রস্তাবে আপত্তি

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

চারটি বিভাগের তিন শিক্ষাবর্ষ পর্যালোচনায় ২৪০ আসন ফাঁকা পাওয়া গেছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। অবাক হলেও এটিই সত্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি বিভাগের তিন শিক্ষাবর্ষ পর্যালোচনায় ২৪০ আসন ফাঁকা পাওয়া গেছে। পরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ডিনস কমিটির সভায় ওঠে। সেখানে ফাঁকা থাকার কারণ পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো পুনর্গঠনে প্রাথমিক আলাপ হয়। যদিও শিক্ষকেরা আট বিভাগকে একীভূতের মাধ্যমে তিনটি করাই আপত্তি জানিয়েছেন।

জানতে চাইলে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষা সংস্কার বিষয়ের বৈঠকে আমরা দেখেছি– কয়েকটি বিভাগে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি কম হচ্ছে। প্রত্যেক শিক্ষাবর্ষে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন ফাঁকা থাকছে। এই বাস্তবতা থেকে বিভাগগুলো একীভূত করার সম্ভাবনা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। আলোচনা প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। আরও আলোচনা করা হবে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য, যেসব বিভাগে নিয়মিত আসন ফাঁকা থাকছে, সেগুলোর জন্য কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ২২ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমিটির সভায় আট বিভাগকে একীভূতের মাধ্যমে তিনটি করার প্রস্তাব তোলা হয়। পরে সভার কার্যবিবরণীতে বিভাগীয় চেয়ারম্যানদের সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ দিতে সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিনদের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

ডিনস কমিটির সভার প্রস্তাব অনুযায়ী, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি এবং মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ নিয়ে একটি বিভাগ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। একইভাবে কলা অনুষদের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ, সংগীত ও নৃত্যকলা বিভাগকে একীভূত করে একটি এবং সংস্কৃত ও পালি অ্যান্ড বৌদ্ধ স্টাডিজ বিভাগকে একীভূত করে আরেকটি বিভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

পুনর্গঠন আলোচনার বিভাগে কী ঘটছে

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, পুনর্গঠনের আলোচনায় থাকা বিভাগগুলোর মধ্যে চারটিতে গত তিন শিক্ষাবর্ষে ২৪০ আসন ফাঁকা। এর মধ্যে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে নৃত্যকলায় ৩০টির মধ্যে ২৩, সংগীতে ৬০টির মধ্যে ৪৪, পালি অ্যান্ড বৌদ্ধ স্টাডিজে ৫০টির মধ্যে ৩৪ এবং সংস্কৃত বিভাগে ৭৫টির মধ্যে ৩০ আসন ফাঁকা থাকে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে নৃত্যকলায় ৩০টির মধ্যে ১২ এবং সংগীতে ৬০টির মধ্যে ৩৬ আসনে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হননি। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে নৃত্যকলা বিভাগে ৩০টির মধ্যে ৯, সংগীতে ৬০টির মধ্যে ১৮, পালি অ্যান্ড বৌদ্ধ স্টাডিজে ৫০টির মধ্যে ১৩ এবং সংস্কৃত বিভাগে ৭৫টির মধ্যে ২১ আসন শূন্য ছিল।

পুনর্গঠনের আলোচনায় থাকা বেশ কয়েকটি বিভাগ মূলত বিদ্যমান বিভাগ থেকে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৯৪ সালে থিয়েটার ও সংগীতের পৃথক কোর্সকে একীভূত করে ‘ডিপার্টমেন্ট অব থিয়েটার অ্যান্ড মিউজিক’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে ২০০৯ সালে সংগীত পৃথক বিভাগ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। একইভাবে ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে পালি ও সংস্কৃত বিভাগ থেকে পৃথক হয়ে ‘পালি অ্যান্ড বৌদ্ধ স্টাডিজ’ চালু হয়। ২০১৪ সালে নতুন নৃত্যকলা বিভাগ চালু হয়।

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি এবং মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ নিয়ে একটি বিভাগ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। একইভাবে কলা অনুষদের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ, সংগীত ও নৃত্যকলা বিভাগকে একীভূত করে একটি এবং সংস্কৃত ও পালি অ্যান্ড বৌদ্ধ স্টাডিজ বিভাগকে একীভূত করে আরেকটি বিভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

২০১২ সালে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের কয়েক শিক্ষকের উদ্যোগে টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০১৫ সালে ওই বিভাগ থেকেই মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ চালু করা হয়। মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগে ২০১৬ সালে চার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে তাঁরা কেউই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ধারাবাহিকভাবে আসন ফাঁকা থাকাকে ‘ভর্তি পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা’ বলেছেন নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারম্যান তামান্না রহমান। তিনি বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীরা সাধারণ মেধাক্রমের ভিত্তিতে বিভাগ বরাদ্দ পাচ্ছে। ফলে নৃত্যকলায় আগ্রহী ও দক্ষ শিক্ষার্থীদের অনেকেই ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এ সমস্যা সমাধানে নৃত্যকলা, সংগীত ও থিয়েটার বিভাগ যৌথভাবে ভর্তি পদ্ধতি সংস্কারের আবেদন প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছে।

বিভাগ পুনর্গঠনে শিক্ষকদের আপত্তি কেন

ডিনস কমিটির সভায় পুনর্গঠন প্রস্তাবের পরে মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ এবং টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগের অ্যাকাডেমিক কমিটির সভা হয়। সেখানে বিভাগগুলোর শিক্ষকরা প্রস্তাব নিয়ে কড়া আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁরা বিভাগগুলোকে স্বতন্ত্র হিসেবে বহালের পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে, কলা অনুষদের একীভূত আলোচনায় থাকা বিভাগের শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, তাঁরা এই ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাননি।

সময়ের চাহিদায় কিছু বিভাগে স্নাতক কার্যক্রম বন্ধ রেখে স্নাতকোত্তর চালুর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ, এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া। আবুল কালাম সরকার, কলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন

নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক তামান্না রহমান বলেন, ‘এখনো আমরা আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব পাইনি। তবে বিভাগগুলো একীভূত করার আলোচনা আমাদের বিস্মিত করেছে। নৃত্য, সংগীত ও থিয়েটার– তিনটি স্বতন্ত্র অ্যাকাডেমিক ডিসিপ্লিন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি শান্তিনিকেতনেও রয়েছে।’

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের দুটি বিভাগ একীভূত করতে সম্মত নন শিক্ষকেরা। মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগের নাম প্রকাশ না করে এক শিক্ষক বলেন, আমাদের অ্যাকাডেমিক কমিটির (এসি) সভায় বিষয়টি ওঠানো হয়। কোনো শিক্ষকই অন্য বিভাগের সঙ্গে একীভূত হতে রাজি নন।

যুক্তি দিয়ে মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান শিল্পী বেগম বলেন, ‘দেশে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রিন্টিং ও প্যাকেজিং শিল্প থাকলেও দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি প্রকট। নিরাপত্তা মুদ্রণ, উন্নত প্যাকেজিং এবং বৃহৎ প্রকাশনা শিল্পের জন্য দক্ষ জনবল তৈরির জন্যই আমাদের বিশেষায়িত বিভাগটি থাকা জরুরি।’

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিভাগ খোলা বা বিদ্যমান বিভাগ একীভূত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই আবেগের ভিত্তিতে নেওয়া ঠিক হবে না। বিষয়টি গবেষণাভিত্তিক, তথ্যনির্ভর ও যৌক্তিক হতে হবে। অতীতে বিভাগ চালুর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সমীক্ষা, গবেষণা কিংবা সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করেনি। ফলে স্নাতক পর্যায়ে বিভাগগুলোর প্রকৃত চাহিদা এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।’

জানতে চাইলে কলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন আবুল কালাম সরকার বলেন, ‘যেসব বিভাগে ধারাবাহিকভাবে আসন ফাঁকা থাকছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সময়ের চাহিদা বিবেচনায় কিছু বিভাগে স্নাতক কার্যক্রম বন্ধ রেখে শুধু স্নাতকোত্তর চালুর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ, হঠাৎ করে কোনো বন্ধ করা যায় না। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া।’

তিনি আরও বলেন, ‘অতীতে কিছু বিভাগ পর্যাপ্ত মূল্যায়ন ছাড়াই রাজনৈতিক বিবেচনায় ভোটের জন্য চালু করা হয়েছিল। কয়েকটি বিভাগে অনেক শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত ন্যূনতম যোগ্যতা পূরণ ছাড়াই চাকরি পেয়েছেন। তদন্তের মাধ্যমে এসব সুরাহা করা দরকার।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত