মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ

প্রশ্ন করার যে উত্তরাধিকার রেখে গেছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। স্ট্রিম গ্রাফিক

মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে (১৮৮৫-১৯৬৯) ছোটোবেলায় জেনেছি জ্ঞানতাপস হিসেবে, রবীন্দ্রনাথের মতো শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখচ্ছবি দেখেছি পাঠ্যবইয়ে। তাঁর বরাতে তখন এটাও জেনেছিলাম যে মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা সকল মানুষের প্রিয়। সেই কথাগুলো মনের ভেতরে গেঁথে আছে এখনো। ‘জ্ঞানতাপস’ শব্দটা নিয়ে আমার মনে খটকা ছিল তখন, কারণ জানতাম প্রাচীন ঋষিরা তপস্যা করেন তপোবনে; কিন্তু জ্ঞান তপস্যা আবার কী? জেনেছিলাম বহু পরে, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তপোবনের ঋষি বটে। এই জ্ঞান-ঋষিত্ব অর্জন করেছিলেন আবার বৈরী পরিবেশে লড়াই করে; আর এটিই এক সময় হয়ে ওঠে জাতির পক্ষে তাঁর প্রতিরোধের অস্ত্র। এই লড়াইয়ের প্রধান কারণ ছিল আত্মপরিচয় নির্মাণ ও বৌদ্ধিক মুক্তি, জিনিসগুলো তাঁর কালে সহজ ছিল না। এমনকি নিজে যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত পড়তে যান, তাতেও বাধাগ্রস্ত হন; পড়তে হয় তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব নিয়ে। আর এটি হয়ে ওঠে তাঁর জ্ঞানচর্চার সাপেবর, কারণ পরবর্তী সময়ে তিনি শুধু বহুভাষাবিদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেননি, ভারতবর্ষের গুরুত্বপূর্ণ ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাধারণ ভাষাবিদ কিংবা ইতিহাসবিদের মতো শুধু ভাষাচর্চা করেননি কিংবা সাহিত্য-ইতিহাস লেখেননি, বরং ভাষাচর্চা ও ভাষা/সাহিত্য গবেষণার মাধ্যমে একটি জাতির আত্মপরিচয়কে তুলে ধরেন। তাই ভাষাতাত্ত্বিক, চর্যা-গবেষক, বাংলা ভাষার উৎপত্তি প্রশ্নে নতুন কুলজী নির্মাতা, সাহিত্যিক, অনুবাদক কিংবা লোকসাহিত্য তাত্ত্বিক হিসেবে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর প্রকৃত বৌদ্ধিক উচ্চতাকে খাটো করা হয়। সবকিছু ছাপিয়ে তাঁকে আমি দেখি জ্ঞানের ভূগোল-পুনর্নির্মাণকারী একজন মনীষী হিসেবে; জ্ঞান-ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে একজন বৌদ্ধিক প্রতিরোধকারী হিসেবে।

বাংলার ইতিহাসটা বড় বিচিত্র ছিল। প্রাচীন ও মধ্যযুগের কিছু সময় বাদ দিলে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এটি ছিল নানা জনজাতির উপনিবেশ। এই উপনিবেশ ছিল কখনো ধর্মীয়, কখনো অর্থনৈতিক, কখনো-বা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক। তাই জনপদের মানুষের মনন নানা বিকৃতির ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠে। বিশেষ করে জ্ঞানতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক উপনিবেশ এখানকার মানুষের মনের কাঠামোকেই বদলে দিয়েছিল। কেননা কোনো উপনিবেশকালেই জ্ঞান নিরপেক্ষ থাকে না। বৃটিশ উপনিবেশে তো নিরপেক্ষ থাকার কারণই ছিল না। বরং জ্ঞান আর সামরিক শক্তি বলে রাষ্ট্রটাকে করায়ত্ত করে নিয়েছিল বিদেশি-বেনিয়ারা। তাই তাদের তৈরি বিদ্যাচর্চা তথা শিক্ষাব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, ইতিহাস, গ্রন্থাগার, অভিধান, ব্যাকরণ; এমনকি মানচিত্রও ছিল ক্ষমতার একেকটা বিন্যাস। ইউরোপের প্রাচ্যবিদ্যাকে সুতরাং কালচারাল/জ্ঞানতাত্ত্বিক হেজিমনি হিসেবে দেখতে অসুবিধা নেই। এই হেজিমনিক প্রাচ্যবিদ্যা ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করলেও, তার ব্যাখ্যার কাঠামো এমনভাবে তৈরি করেছে যাতে স্থানীয় মানুষের কণ্ঠস্বর আসলে অনুপস্থিত। ঔপনিবেশিক এই জ্ঞানতত্ত্বে জ্ঞানকে উপস্থাপন করা হয়েছে কেন্দ্র থেকে প্রান্তের দিকে। এতে উপনিবেশিত মানুষ শুধু ‘প্রান্ত’ কিংবা ‘অপর’ হয়েই ওঠেনি, নিজেকে কীভাবে সে দেখে এই প্রশ্ন উত্থাপনেরও সুযোগ তার থাকে না। এই উপনিবেশিত জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর আবির্ভাব কেবল একজন ভাষাতাত্ত্বিক কিংবা সাহিত্যের ইতিহাস-লেখকের আগমন নয়, বরং তা ছিল এক বৌদ্ধিক অবস্থানের সূচনা।

শহীদুল্লাহর উত্তরাধিকার গ্রন্থতালিকায় সীমাবদ্ধ নয় আর; বরং তা নিহিত রয়েছে প্রশ্ন করার সংস্কৃতিতে, প্রমাণের প্রতি শ্রদ্ধায় এবং ভাষার ভেতর মানুষের ইতিহাস খুঁজে নেওয়ার প্রবণতায়। যতদিন বাংলা ভাষা নতুন প্রজন্মের হাতে নতুন অর্থে পুনর্নির্মিত হবে, ততদিন মুহম্মদ শহীদুল্লাহও নতুনভাবে আবিষ্কৃত হবেন।

শহীদুল্লাহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, ফ্রান্সে গবেষণা করেছেন; উনিশ শতকের প্রথমার্ধের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতিবেশে তাঁর মনন গড়ে উঠেছিল। মুসলমান হয়ে ইসলামের গণ্ডিবদ্ধ জ্ঞানচর্চার কাঠামোর বাইরে এসে, হিন্দু সাম্প্রদায়িক জ্ঞান কাঠামোকে উপেক্ষা করে এবং ইউরোপীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোতে থেকে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে আত্মনির্মাণ করতে পেরেছিলেন। অর্থাৎ, একজন ধার্মিক মুসলমান হয়ে যেমন তিনি প্রচলিত ধর্মীয় জ্ঞানচর্চায় ব্যাপৃত থাকেননি, তেমনি ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী জ্ঞানকেও গ্রহণ করেননি। আবার ইউরোপীয় গবেষণাপদ্ধতি শিখেও, অন্ধভাবে তাদের প্রাচ্যবিদ্যাকে গ্রহণ না করে তর্কে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। নিজের লব্ধজ্ঞান দিয়ে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করে স্রোতের প্রতিকূলে এক একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।

শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষার অতীতকে খুঁজেছেন, কিন্তু সেই অতীতকে কখনো সাম্প্রদায়িক কিংবা ঔপনিবেশিক দৃষ্টির আলোয় দেখেননি। জ্ঞান কেবল তথ্যের সমষ্টি নয়, একটি দৃষ্টিভঙ্গির নির্মাণ; নিজেকে মিথ্যার বিপরীতে দাঁড় করানোর শক্তি হচ্ছে প্রজ্ঞা; তিনি তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন। শহীদুল্লাহ দেখেছিলেন বাঙালি জাতি নিজের ভাষার ইতিহাস অন্যের চোখে দেখতে অভ্যস্ত, নিজের ইতিহাসও অন্যের ভাষায় বলে ও লেখে। আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি সেই প্রচলিত ধারাকে ভেঙেছিলেন। বাংলা ভাষাকে তাই শুধু গবেষণার বিষয় করেননি; তিনি একে গবেষণার ভাষাও করে তুলতে চেয়েছিলেন। শহীদুল্লাহকে বহুভাষাবিদ হিসেবে অনেকে সবিস্ময় শ্রদ্ধা করেন। আরবি, ফারসি, সংস্কৃত, পালি, উর্দু, ইংরেজি, ফরাসিসহ বহু ভাষায় তিনি দক্ষ ছিলেন। এমন সব ভাষাকে তিনি অলংকার হিসেবে ব্যবহার না করে সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানের দরজা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি ভাষাস্রোতে তলিয়ে যাননি কিংবা নিজের ভাষা থেকেও বিচ্যুত হননি। জ্ঞানের শক্তি অর্জনের জন্য, মাতৃভাষাকে বলিষ্ঠ করার জন্য এগুলো ছিল তাঁর কাছে হাতিয়ারস্বরূপ| বর্তমান দুনিয়ায় আমরা বিশ্বায়নকে প্রায়ই প্রযুক্তি, অর্থনীতি বা যোগাযোগের প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করি। কিন্তু শহীদুল্লাহর জীবন আমাদের জ্ঞানের বিশ্বায়নকে মনে করিয়ে দেয়। তিনি জ্ঞানের সাম্রাজ্যে বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠেছিলেন এবং প্রমাণ করেছিলেন বিশ্বমানের গবেষণা করতে হলে মাতৃভাষা ত্যাগ করতে হয় না; বরং নিজের ভাষাকে বিশ্বমানের গবেষণার উপযোগী করে তুলতে হয়। আমার মনে হয় মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই।

গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে আমরা একটা কথা বলে আসছি: ‘বঙ্গবিদ্যার বিশ্বায়ন’। অনেকে মনে করেন এ বুঝি বহির্বিশ্বে বাংলা ভাষার পরিচিতি ও বিস্তার। অথচ বিষয়টি এমন নয়; বরং এতে বোঝায় বাংলা ভাষায় এমন গবেষণা, এমন বৌদ্ধিক শৃঙ্খলা এবং এমন সব চিন্তার বিকাশ, যা বিশ্বের যেকোনো বিদ্যাচর্চার সঙ্গে সমান মর্যাদায় আসীন হতে পারে। শহীদুল্লাহ এই স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন উপনিবেশিত মানুষের জ্ঞানকে অনেকে পশ্চাৎ সারির বলে মনে করত। উপনিবেশিতের ভাষার বেলায় তো কথাই নেই। আমাদের দুর্ভাগ্য সেই ঋগবেদের কালে, বৈদিক ঋষিরা সমুদ্রতীরবর্তী বঙ্গীয় বদ্বীপের জনজাতিকে যেমন মানুষ মনে করেননি, তেমনি তাদের ভাষাকেও দেখেছেন ‘পাখির কিচিরমিচির’ হিসেবে। উপনিবেশকরাও যে খুব সম্মান করত এমন নয়, তাই জ্ঞানকে প্রকাশ করতে হলে আমাদের উপনিবেশকদের ভাষার দ্বারস্থ হতে হতো। শহীদুল্লাহ এমন একজন জনজাতীয় মানুষ; এবং পশ্চিমা জ্ঞান আত্মস্থ করে পশ্চিমকে যেমন অস্বীকার করেননি, আবার একে একমাত্র সত্য বলেও স্বীকার করেননি। তাঁর এই অবস্থানকে এখনকার ‘ডিকলোনিয়াল’ বা জ্ঞান-ঔপনিবেশিকতার পুনর্বিবেচনামূলক চিন্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত বলেই মনে করি। যদিও তাঁর কালে এমন পরিভাষার ব্যবহার ছিল না, তা হলেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও গবেষণাপদ্ধতি আমাদের সেই দিকেই নিয়ে যায়। নিজের গবেষণায় শহীদুল্লাহ দেখিয়েছেন যে নিজস্ব ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, লোকঐতিহ্য, ভাষাগত বিবর্তন ও আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ধারাকে গুরুত্ব না দিলে কোনো ভাষার ইতিহাস পূর্ণ হয় না। উপভাষা প্রশ্নে ম্যাক্স মুলারের দৃষ্টিভঙ্গিকে কাজে লাগালেও সত্য-অন্বেষণে তিনি ছিলেন নিজ আদর্শের অনুসারী। বাংলা ভাষায় আঞ্চলিক অভিধান রচনা করে তিনি প্রমাণ করেছেন বাংলা ভাষার প্রধান শক্তি বাংলার উপভাষাতেই এবং বাংলা ভাষা পৃথিবীর যে কোনো শক্তিশালী ভাষার মতোই বলবান।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে স্মরণ করার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে তাঁর প্রশ্নগুলোকে সমুন্নত রাখা; বাংলাকে এমন এক গবেষণার ভাষায় পরিণত করা, যেখানে স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক তত্ত্ব পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহযাত্রী হবে।

নতুন শতকে ও বিশ্বায়নের যুগে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কাছে শরণ হওয়ার বড় কারণ তথ্যগত নয়, তাঁর পদ্ধতির জন্য। বাঙালি গবেষকদের তিনি শিখিয়েছেন গবেষণার কাজ উদ্ধৃতি সংগ্রহ করা নয়; বরং এমন প্রশ্ন করা, যা প্রতিষ্ঠিত সত্যকেও নতুন আলোয় দেখতে বাধ্য করে। তাঁর উত্তরাধিকারের মূল্যবান অংশ এখানেই। বাংলা ভাষার ইতিহাস কেবল বাংলায় লেখা হয়নি। এর একটি বড়ো অংশ রচিত হয়েছে লন্ডন, প্যারিস, বার্লিন, লিসবন, লাইডেন কিংবা কলকাতার প্রাচ্যবিদ্যা-চর্চার কক্ষে। ইউরোপীয় ও ভারতীয় বহু গবেষক মিলে অভিধান, ব্যাকরণ, পুঁথি-তালিকা, ভাষাতাত্ত্বিক জরিপ, পাণ্ডুলিপির বিবরণ প্রভৃতি জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু সেই জ্ঞানভাণ্ডারে ছিল নানা অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য। বাংলা ভাষা যেখানে গবেষণার বিষয়, সেখানে বাঙালি খুব কমই ছিলেন গবেষণার কেন্দ্রীয় ব্যাখ্যাকারী। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এমনসব বৈপরীত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তাঁর গবেষণা ছিল ব্যাখ্যার অধিকার পুনরুদ্ধারের এক বৌদ্ধিক অভিযান।

শহীদুল্লাহর যুগে বড় বড় গবেষকের আবির্ভাব হয়েছিল বাংলাদেশে, তাঁদের অনেকেই ইউরোপে লেখাপড়া করা মানুষ। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীরা সকলে ছিলেন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। বাংলা ভাষার জন্মপ্রশ্নে এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসপ্রশ্নে, এমনকি চর্যাপদের ভাষাপ্রসঙ্গে উল্লিখিত মনীষী ছাড়াও অপরাপর মনীষী যে মত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, শহীদুল্লাহ ছিলেন তাঁদের বিপরীত পথের যাত্রী। বাংলা ভাষার জন্ম নিয়ে প্রায় স্থির সিদ্ধান্ত যেখানে ছিল যে ‘বাংলা সংস্কৃতের দুহিতা’, সেখানে শহীদুল্লাহ তাঁর গবেষণায় প্রমাণ করলেন ঐতিহাসিকভাবে তা সত্য নয়। ভাষাপুর্নর্গঠন তত্ত্ব দিয়ে দেখালেন সংস্কৃত একটি কৃত্রিম বা সাহিত্যিক ভাষা, সেটি কোনো ভাষার জন্ম দিতে পারেনি, বাংলা তো নয়ই। বাংলার জন্ম দেখালেন তিনি অন্য উৎস থেকে। একইভাবে সুনীতিকুমার প্রমুখ বাংলার জন্মপ্রসঙ্গে যে মাগধী প্রাকৃতের কথা বলে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, শহীদুল্লাহ তাও খারিজ করে দেন। তিনি প্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন, বাংলার উৎস মাগধী প্রাকৃত নয়, গৌড়ীয় অপভ্রংশ। সমানভাবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে পণ্ডিতেরা যেখানে স্থির করে নিয়েছিলেন সাহিত্যটির সূত্রপাত অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতক, শহীদুল্লাহ প্রমাণ করেন তা সপ্তম শতকের মাঝামাঝি। বাংলা সাহিত্যের ‘অন্ধকার যুগ’ প্রশ্নে যেখানে মুসলমান শাসকদের দায়ী করা হতো সেখানে তিনি অন্ধকার যুগকে শুধু খারিজই করেননি, বরং মুসলমান শাসনকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখেছেন। এরকম আরও অনেক জ্ঞান-বিষয়ে শহীদুল্লাহ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিলেন, যার বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত ছিল ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাঠামো দ্বারা নির্মিত। তিনি কোনো সিদ্ধান্তকে কেবল এই কারণে গ্রহণ করেননি যে, সেটি ইউরোপীয়; আবার কেবল দেশীয় বলেই কোনো মতকে সত্যও বলে মেনে নেননি। তাঁর কাছে সত্যের মানদণ্ড ছিল ঐতিহাসিক উপাদান, যুক্তি, ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ এবং বিশ্লেষণ। এই বৈজ্ঞানিক নিরপেক্ষতাই তাঁকে একদিকে বিশ্বমানের গবেষক, অন্যদিকে গভীরভাবে দেশসচেতন বুদ্ধিজীবীতে পরিণত করে তোলে।

ঔপনিবেশিক জ্ঞানব্যবস্থার সূক্ষ্ম কৌশলের একটি হচ্ছে, উপনিবেশিত সমাজকে তার নিজের অতীত সম্পর্কে এমন এক বয়ান নির্মাণ, যা ধীরে ধীরে সেই সমাজের আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। ইতিহাস তখন কেবল অতীতের বিবরণ থাকে না, তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার ভাষা| ভাষাবিজ্ঞান ও সাহিত্যের ইতিহাসও এর বাইরে ছিল না। কোনো ভাষাকে ‘উন্নত’, কোনো ভাষাকে ‘উপভাষা’, কোনো সাহিত্যকে ‘উচ্চ’, কোনো সাহিত্যকে ‘লোকায়ত’ প্রভৃতি শ্রেণিবিভাগ প্রায়ই নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি ছিল ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার প্রকাশ। শহীদুল্লাহ এই শ্রেণিবিভাগের দিকে তাকিয়েছিলেন অনুসন্ধিৎসু গবেষকের চোখে। তিনি জানতেন, ভাষার ইতিহাস কেবল রাজদরবারে রচিত হয় না; তা গড়ে ওঠে মঠে, মন্দিরে, মসজিদে, গ্রামীণ জনপদে, লোকগানে, সাধককবির কণ্ঠে এবং লোকসমাজের কথ্যভাষায়। তাই তাঁর অনুসন্ধান ছিল কেন্দ্র থেকে প্রান্তে নয়; বরং প্রান্ত থেকে কেন্দ্রের দিকে।

এই কারণেই চর্যাপদ নিয়ে শহীদুল্লাহর আগ্রহ কেবল সাহিত্যিক ছিল না; তা ছিল সাংস্কৃতিকও। তিনি বুঝেছিলেন, ভাষার প্রাচীন নিদর্শন খুঁজে পাওয়া মানে কেবল পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করা নয়; বরং একটি জাতির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে পুনরায় দৃশ্যমান করে তোলা। অতীতকে উদ্ধার করা মানে অতীতের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এক্ষেত্রে তর্কবিতর্ক ও প্রমাণাদি ছিল তাঁর একমাত্র অবলম্বন। আজকের দিনে শহীদুল্লাহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে জ্ঞান এগিয়ে যায় বিতর্কের মাধ্যমে, কিন্তু সেই বিতর্কের ভিত্তি হতে হয় তথ্য, সততা ও প্রমাণ। তাঁর বহুভাষিকতা এখানেও নতুন অর্থ লাভ করে। বহু ভাষা জানার অর্থ এই নয় যে বহু ভাষায় কথা বলা; বরং তা বহু সভ্যতার যুক্তি বোঝা। তিনি জানতেন, ভাষা পরিবর্তিত হয়, সংস্কৃতি বিনিময় ঘটে, শব্দ ভ্রমণ করে, ধারণা সীমান্ত অতিক্রম করে। তাই তিনি ভাষার ইতিহাসকে কখনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের ইতিহাস হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন সংযোগ, বিনিময় ও অভিযোজনের ইতিহাস হিসেবে। এমন মানসিকতা তাঁকে প্রকৃত অর্থে বিশ্বমানের পণ্ডিতে পরিণত করে। কারণ বিশ্বজনীনতা তাঁর কাছে নিজের শিকড় ভুলে যাওয়ার নাম নয়; বরং নিজের শিকড়কে এমনভাবে বোঝা, যাতে তা বিশ্বের সঙ্গে সমমর্যাদায় কথা বলতে পারে। তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘মিলাবে আর মিলিবে’ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। এই দ্বিমুখী যাত্রা তাঁর পাণ্ডিত্যের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল।

শহীদুল্লাহ দেখেছিলেন বাঙালি জাতি নিজের ভাষার ইতিহাস অন্যের চোখে দেখতে অভ্যস্ত, নিজের ইতিহাসও অন্যের ভাষায় বলে ও লেখে। আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি সেই প্রচলিত ধারাকে ভেঙেছিলেন। বাংলা ভাষাকে তাই শুধু গবেষণার বিষয় করেননি; তিনি একে গবেষণার ভাষাও করে তুলতে চেয়েছিলেন।

ভাষার জন্ম কোথা থেকে, কোন কারণে হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা মানে কেবল ভাষাতাত্ত্বিক অনুসন্ধান নয়; একে বলা যেতে পারে জাতিবিশেষের আত্মপরিচয়ের সন্ধান। কারণ ভাষার উৎস নিয়ে যে বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করে একটি জনগোষ্ঠী নিজের ইতিহাসকে কীভাবে কল্পনা করবে। শহীদুল্লাহ এই সত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই বাংলা ভাষার উৎপত্তি নিয়ে তাঁর অনুসন্ধান ছিল নিছক ভাষাবিজ্ঞান চর্চা নয়; ছিল ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সমন্বিত পাঠ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্তের সূচনা করেছিলেন যদিও ‘ভাষা ও জাতি এক নয়’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে। তাঁর কথা ছিল যে, আদিম ভাষা ক্রমশ পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে আধুনিক বাংলায় রূপ লাভ করেছে সেই আদিম ভাষাভাষী জাতি আর বাঙালি এক নয়। এই জাতিগত পার্থক্য সত্ত্বেও এক মূলভাষা বহু যুগের বহু স্থানে বহু মানুষের মুখে মুখে ধারাবাহিক পরিবর্তনের ফলে বাংলায় এসেছে। অথচ তাঁর আগে বাংলা ভাষাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে অনেক সময় এমন প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, যেখানে ভাষাকে কেবল সংস্কৃতের একটি অবনমিত বা প্রান্তিক রূপ হিসেবে দেখা হতো। শহীদুল্লাহ এই সরলীকরণে সন্তুষ্ট হননি। তিনি বাংলা ভাষার বিবর্তনকে দেখেছেন বহুমুখী জীবনধারার মিলন হিসেবে; আদিম প্রাকৃত, প্রাকৃত, অপভ্রংশ, আঞ্চলিক কথ্যরীতি, লোকভাষা এবং দীর্ঘ সামাজিক বিনিময়ের একটি জটিল প্রক্রিয়া হিসেবে। তাঁর কাছে বাংলা কোনো একক উৎসের ভাষা নয়; বরং তা বহু শতকের সাংস্কৃতিক মিশ্রণের ফল। সমকালীন ভাষাবিজ্ঞানও ভাষাকে একটি গতিশীল সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করে। ভাষা কখনো বিশুদ্ধ নয়; তা সর্বদাই সংমিশ্রণ, অভিযোজন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকে। শহীদুল্লাহ এই সত্য উপলব্ধি করেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন ভাষার বিশুদ্ধতা নিয়ে আবেগপ্রবণ বিতর্ক ছিল প্রবল।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহর গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল লোকঐতিহ্যের প্রতি গভীর আস্থা। তিনি জানতেন, ভাষার ইতিহাস কেবল রাজসভায় লেখা হয় না; তা লুকিয়ে থাকে গ্রামবাংলার গান, সাধকদের পদ, প্রবাদ, লোকবিশ্বাস ও দৈনন্দিন কথোপকথনের মধ্যে। তাই তিনি পুঁথি যেমন পড়েছেন, তেমনি লোকভাষাকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। এই পদ্ধতি ছিল এক অর্থে জ্ঞানের গণতন্ত্রীকরণ। গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন ভাষার প্রকৃত ইতিহাস জানতে হলে কেবল অভিজাত সাহিত্য নয়, সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাও সমান মনোযোগের দাবি রাখে। এখানেই তাঁর চিন্তার সঙ্গে সমকালীন ‘ডিকলোনিয়াল’ বা উপনিবেশ-উত্তর জ্ঞানতত্ত্বের একটি নীরব সংযোগ তৈরি হয়। শহীদুল্লাহ সেই কাজটিই করেছিলেন; দেখিয়েছিলেন যে, কোনো জনগোষ্ঠীর জ্ঞানকে বুঝতে হলে তাদের ভাষা, লোকসংস্কৃতি, ধর্মীয় বহুত্ব এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে দেখতে হয়।

বাংলা ভাষাকে অন্য অনেকের মতো শহীদুল্লাহ একক কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যেও আবদ্ধ করেননি। তাঁর কাছে বাংলা ছিল এমন একটি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র; যেখানে বৌদ্ধ সহজিয়া, নাথ সাধক, বৈষ্ণব কবি, সুফি সাধক, শাক্ত কবি মুসলিম পুঁথিকার প্রমুখ সকলেই সমান অবদান রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলা সংস্কৃতির বহুত্ববাদী চরিত্রকে নতুন মর্যাদা দেয়। তাঁর গবেষণা প্রমাণ করে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রকৃত শক্তি তার বৈচিত্র্যে, তার সহাবস্থানে, তার ধারাবাহিক ঘাত-প্রতিঘাতে। এই কারণে শহীদুল্লাহর গবেষণা কেবল অতীতের টিকা-টিপ্পন্নি হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে ভবিষ্যতের পদ্ধতিগত শিক্ষাপ্রণালি। যখন পরিচয়ের রাজনীতি ভাষাকে বিভক্ত করার চেষ্টা করে, যখন সংস্কৃতিকে একমাত্রিক বয়ানে আবদ্ধ করার প্রবণতা দেখা যায়, তখন তাঁর গবেষণা মনে করিয়ে দেয় ভাষা কোনো বিভেদের প্রাচীর নয়; এ হচ্ছে মিলনের সেতু। এসব কারণে মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে কেবল ভাষাবিজ্ঞানী বা সাহিত্যগবেষক হিসেবে না দেখে দেখতে হবে বৌদ্ধিক স্থপতি হিসেবে; যিনি বাংলা ভাষাকে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করার আগে নিজের কাছে নতুনভাবে উন্মোচন করেছিলেন। তাঁর গবেষণা ছিল একদিকে বিশ্বমানের, অন্যদিকে গভীরভাবে দেশজ; একদিকে কঠোর বৈজ্ঞানিক, অন্যদিকে মানবিক সংবেদনশীলতায় উজ্জ্বল।

বিশ্বায়ন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির নতুন বাস্তবতায় বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি এখন নতুন এক জগতে প্রবেশ করছে। যেখানে করপাস নির্মাণ, ভাষা-প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অভিধান, ই-বুক প্রভৃতি ডিজিটাল ফর্মে বিশ্বব্যাপী বাংলা গবেষণার প্রসার ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে, এমনকি আমরা যখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছি, তখন শহীদুল্লাহকে কেবল অতীতের স্মারক হিসেবে নয়, ভবিষ্যতেরও এক সহযাত্রী হিসেবে দেখতে পাই। তাঁর প্রজ্ঞা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতিরোধ থেকে আমরা বুঝতে শিখেছি প্রযুক্তি কিংবা ঔপনিবেশিক আগ্রাসন যতই অগ্রসর হোক না কেন ভাষা ও সাহিত্যের আত্মা খুঁজে পেতে হলে মানুষের ইতিহাস, স্মৃতি ও সংস্কৃতিকে ভুলে গেলে চলবে না। তাঁর কর্মযজ্ঞ থেকে আমরা আরও ধারণা পেতে পারি যে, যে-ভাষা নিজের ইতিহাস জানে, সে ভাষা নিজের সংস্কৃতিকেও রক্ষা করতে পারে; নয়া উপনিবেশিকতার বিরুদ্ধেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এমনকি আগ্রাসী জ্ঞানতত্ত্বকেও মোকাবিলা করতে পারে।

জ্ঞান কখনো পূর্ণ নয়; প্রতিটি প্রজন্ম জ্ঞানকে নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাতে পারে। এই অর্থে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অধ্যায় শেষ হয়ে যায়নি, বরং তিনি একটি চলমান বৌদ্ধিক ব্যবস্থা। তাঁর মনীষা, দৃষ্টিভঙ্গি, রচনা, গবেষণা ও পদ্ধতি আমাদের কাছে যতটা মূল্যবান, তার চেয়েও বেশি মূল্যবান তাঁর প্রশ্ন করার সাহস। শহীদুল্লাহর কাছে গবেষকের প্রথম দায়িত্ব উত্তর দেওয়া মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল প্রশ্নটি উত্থাপন করা। বর্তমান বিশেষ জ্ঞান আর কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। ডিজিটাল ব্যবস্থা জ্ঞানচর্চার প্রকৃতি আমূল বদলে দিয়েছে। লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠা এখন একটি পর্দায় উপস্থিত, হাজার বছরের পাণ্ডুলিপি মুহূর্তে বিশ্বের যেকোনো গবেষকের নাগালে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন এখনও অপরিবর্তিত রয়ে গেছে: এসব বিপুল তথ্যের ব্যাখ্যা কে করবে? তথ্যের মালিক হওয়া এক আর জ্ঞানের নির্মাতা হওয়া যে অন্য!

এখানেই মুহম্মদ শহীদুল্লাহর উত্তরাধিকার নতুনভাবে ধরা পড়ে। তাঁর কাছে জ্ঞান কেবল সংগ্রহের বিষয় নয়; জ্ঞান হলো ব্যাখ্যার নৈতিকতা। একটি পুঁথি উদ্ধার করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সেই পুঁথিকে এমনভাবে পাঠ করা, যাতে তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা মানুষ, সমাজ, ভাষা ও ইতিহাসের বহুস্তরীয় কণ্ঠ শোনা যায়। তিনি তথ্যকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন ব্যাখ্যার মাধ্যমে; এই কারণে তাঁর গবেষণা আজও প্রাসঙ্গিক। বাংলা বিদ্যাচর্চার বিশ্বায়ন নিয়ে আগেও বলেছি। শহীদুল্লাহর দৃষ্টিতে এই বিশ্বায়ন ছিল আরও গভীর একটি প্রকল্প। তাঁর কাছে বিশ্বায়ন মানে ছিল বাংলা ভাষার গবেষণার পরিসর এমনভাবে বিস্তৃত করা, যা অক্সফোর্ড, প্যারিস, টোকিও বা হার্ভার্ডের গবেষকের সঙ্গে সমমর্যাদায় অবতীর্ণ হতে পারে। আবার একই সঙ্গে গ্রামের পাঠাগারের পাঠকও যার মধ্যে নিজের ইতিহাসের প্রতিধ্বনি খুঁজে পায়। এই দ্বিমুখী সংযোগই প্রকৃত বিশ্বায়ন, যেখানে বিশ্বকে গ্রহণ করা হয়; কিন্তু আত্মপরিচয় বিসর্জন দিয়ে নয়। এই ভাবনা এখন আমাদের বেলায় আরও জরুরি। কারণ বিশ্বায়নের পাশাপাশি আমরা এক নতুন ধরনের জ্ঞান-উপনিবেশবাদের মুখোমুখি। অ্যালগরিদম নির্ধারণ করে দিচ্ছে কোন ভাষা দৃশ্যমান হবে, কোন সাহিত্য বেশি উদ্ধৃত হবে আর কোন গবেষণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে। ডিজিটাল পরিকাঠামোও কখনো কখনো সাংস্কৃতিক বৈষম্য পুনরুৎপাদন করে। এই বাস্তবতায় শহীদুল্লাহ যেন নীরবে আমাদের নির্দেশনা দেন যে; বাংলা ভাষার জন্য প্রযুক্তি আজ যুগের দাবি, কিন্তু প্রযুক্তির কাছে ভাষার আত্মা সমর্পণ করা যাবে না; বিশ্বকে গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু নিজের ব্যাখ্যার অধিকার হারিয়ে নয়। এটাও তাঁর এক ধরনের উত্তরাধিকার।

সুতরাং শহীদুল্লাহর উত্তরাধিকার গ্রন্থতালিকায় সীমাবদ্ধ নয় আর; বরং তা নিহিত রয়েছে প্রশ্ন করার সংস্কৃতিতে, প্রমাণের প্রতি শ্রদ্ধায় এবং ভাষার ভেতর মানুষের ইতিহাস খুঁজে নেওয়ার প্রবণতায়। যতদিন বাংলা ভাষা নতুন প্রজন্মের হাতে নতুন অর্থে পুনর্নির্মিত হবে, ততদিন মুহম্মদ শহীদুল্লাহও নতুনভাবে আবিষ্কৃত হবেন। হয়তো কোনো ভবিষ্যৎ গবেষক, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বসে, একটি ডিজিটাল পাণ্ডুলিপি খুলে বাংলা ভাষার কোনো প্রাচীন শব্দের ব্যুৎপত্তি অনুসন্ধান করবেন। তার ব্যবহৃত প্রযুক্তি হবে সম্পূর্ণ নতুন, গবেষণার উপকরণ হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর, আর তথ্যের পরিমাণ হবে অকল্পনীয়। কিন্তু যদি তিনি সত্যিকার অর্থে সেই শব্দের ইতিহাস বুঝতে চান, তবে তাকে ফিরে আসতে হবে সেই নীতিতে, যেখানে ভাষাকে তার মানুষ, সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের মধ্যে থাকতে হবে। তাই মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে স্মরণ করার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে তাঁর প্রশ্নগুলোকে সমুন্নত রাখা; বাংলাকে এমন এক গবেষণার ভাষায় পরিণত করা, যেখানে স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক তত্ত্ব পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহযাত্রী হবে। আর যেখানে গ্রামবাংলার লোককথা ও ভাষাবিজ্ঞানের আধুনিক তত্ত্ব একই আলোচনায় মিলিত হতে পারে। আর যেখানে জ্ঞান ক্ষমতার ভাষা না হয়ে মানবমুক্তির সহায় হয়ে উঠতে পারে।

  • জফির সেতু: কবি ও গবেষক; অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
Ad 300x250

সম্পর্কিত