ad

হামজা-জামালদের হাত ধরে ফুটবলের জাগরণ

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৬, ২২: ৫৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

কয়েক বছর আগেও হারের বৃত্ত আর শূন্য গ্যালারি ছিল বাংলাদেশ ফুটবল দলের বাস্তবতা। তবে গত দেড়-দুই বছরে এই দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বেড়ে উঠলেও শিকড়ের টানে লাল-সবুজের জার্সি গায়ে জড়াতে বাংলাদেশে আসছেন প্রবাসী ফুটবলাররা। হামজা চৌধুরী ও জামাল ভূঁইয়াদের মতো তারকাদের হাত ধরে নতুন পথ দেখছে দেশের ফুটবল।

হামজা-জামালদের পাশাপাশি এই পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছেন তারিক কাজী, শমিত সোম, ফাহামেদুল ইসলাম এবং জায়ান আহমেদের মতো একঝাঁক প্রবাসী ফুটবলার। এই তালিকায় আরও যুক্ত হয়েছেন ট্রেভর ইসলাম, রোনান সুলিভান, ডেক্লেন সুলিভান, ফরহান আলী ওয়াহিদ, রায়ান আলী ওয়াহিদ, ইব্রাহিম নেওয়াজ, অ্যাডাম আব্বাস, জিদান ইউসুফ ও নেহান হাসানের মতো তরুণ খেলোয়াড়রা।

বিদেশে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি ফুটবলারদের দেশে ফেরার এই গল্পটা শুরু ২০১৩ সালে ডেনমার্কে বেড়ে ওঠা জামাল ভূঁইয়ার ফিরে আসা দিয়ে। এরপর ফিনল্যান্ডে বেড়ে ওঠা তারিক কাজী সেই পথ আরও বিস্তৃত করেন। তবে আলোড়ন সৃষ্টি হয় যখন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল লেস্টার সিটিতে খেলা হামজা চৌধুরী বাংলাদেশের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন।

২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর বাংলাদেশের হয়ে খেলার পর হামজা চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারাটা আমার জন্য গর্বের।’

হামজার পরে কানাডার জাতীয় দলের হয়ে দুই ম্যাচ খেলা শমিত সোম বাংলাদেশের জার্সি গায়ে জড়ান। ২০২৫ সালের ৩ জুন বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা আমি সত্যিই অনুভব করেছি। এই ভালোবাসাই বাংলাদেশে আসার সিদ্ধান্তের বড় কারণ।’

এরপর আমেরিকান বংশোদ্ভূত ও আরব আমিরাতের দ্বিতীয় বিভাগে খেলা জায়ান আহমেদ এবং ইতালির চতুর্থ বিভাগ থেকে ফাহামেদুল ইসলাম জাতীয় দলে যোগ দেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের একাডেমিতে বেড়ে ওঠা রোনান সুলিভান ইতিমধ্যে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলে নিজের ছাপ রেখেছেন। তাঁর যমজ ভাই ডেক্লেন সুলিভানও একই পথের যাত্রী।

ভবিষ্যতে জাতীয় দল বা বয়সভিত্তিক দলে যোগ দেওয়ার তালিকায় থাকা খেলোয়াড়দের প্রোফাইলও বেশ সমৃদ্ধ। ইংল্যান্ডের ফুলহ্যামের বয়সভিত্তিক দলের উইঙ্গার ফরহান আলী ওয়াহিদ বাংলাদেশের হয়ে খেলবেন। অন্যদিকে প্রোপার নম্বর নাইন হিসেবে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে খেলছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক খেলোয়াড় ট্রেভর ইসলাম। এছাড়া নেহান হাসান খেলছেন পেন স্টেট নিটানি লায়ন্সে। বার্নলির অনূর্ধ্ব-১৮ ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ইয়ুথ একাডেমি থেকে উঠে আসা অ্যাডাম আব্বাস রাইট উইঙ্গার পজিশনে খেলেন এবং বর্তমানে তিনি বয়সভিত্তিক দলের বিবেচনায় আছেন। ১৮ বছর বয়সী জিদান ইউসুফ সেন্টার-ব্যাক হিসেবে খেলছেন ওয়াল্টন অ্যান্ড হের্শাম এফসির মূল দলে।

নতুন এই দৃশ্যপটে বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক কোচ মারুফুল হক বলেন, ‘জাতীয় দলে প্রবাসী ও স্থানীয় খেলোয়াড়দের সমন্বয় ঠিকমতো হলে আমরা দ্রুত সাফল্য পাব।’

চলতি বছরের ২৫ মে দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব পান মার্কিন বংশোদ্ভূত জার্মান টমাস ডুলি। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ‘বিদেশভিত্তিক খেলোয়াড়দের মান ও অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো স্থানীয় ও প্রবাসীদের সমন্বয়ে দল গড়ে তোলা।’

ইউরোপের সুযোগ-সুবিধা ছেড়ে প্রবাসী খেলোয়াড়রা কেন বাংলাদেশে আসছেন এমন প্রশ্নের জবাবে মারুফুল হক বলেন, ‘আসার পেছনে অনেক কারণ থাকে, তবে আমার মনে হয় দেশের জন্য খেলতেই এসেছেন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক দলের এক কোচ স্ট্রিমকে বলেন, ‘ঈদের সময় শিকড়ের টানে আমরা যেভাবে বাড়ি ফিরি, একইভাবে প্রবাসী খেলোয়াড়েরা রক্ত ও পরিবারের টানে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে আসছেন।’

প্রথমদিকে আসা প্রবাসীরা স্থানীয় খেলোয়াড়দের অবহেলা পেয়েছিলেন কি না—এমন প্রশ্নে মারুফুল হক বলেন, ‘আমি ৩-৪টি দলের সঙ্গে ছিলাম, সেখানে এমন কিছু দেখিনি। জামাল আসার পর তাঁকে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবে নিয়ে গিয়েছিলাম। ওই সময়ে তেমন কিছু দেখিনি। এরপর যখন নবাব এল, তখন তাঁর সঙ্গে লোকাল খেলোয়াড়েরা বেশ কো-অপারেটিভ ছিল। অনূর্ধ্ব-২০ দলে যখন জুলকার নাইন এল, তখনো তাঁর সঙ্গে সবাই খুব কো-অপারেটিভ ছিল।’

প্রবাসী খেলোয়াড়দের ইউরোপীয় ক্লাবের মতো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া প্রসঙ্গে মারুফুল হক বলেন, ‘যতটুকু সামর্থ্য আছে, আমরা ততটুকুই দিচ্ছি।’

লাল-সবুজের পতাকা হাতে প্রবাসী ফুটবলারদের এই আগমন তাৎক্ষণিক সমাধান না হলেও নতুন যুগের সূচনা করেছে বলেই মনে করেন বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তরা।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত