বাসের ভাড়া কার নিয়ন্ত্রণে, বৃদ্ধি করে কে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০: ০০
স্ট্রিম গ্রাফিক

সম্প্রতি প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাস ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে এবং আন্তঃজেলা রুটে বাসযাত্রীদের জন্য নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

বাস ভাড়া বাড়লেই অনেককে বলতে শোনা যায়, আসলে এটা বাস মালিকদের কথামতো বাড়ে। আসলে কি তাই? চলুন জানা যাক, বাংলাদেশে কারা বাস ভাড়া নির্ধারণ করেন এবং কী হিসেবে ভাড়া বাড়ে।

ভাড়া নির্ধারণের আইনি ভিত্তি ও বিধিমালা

বাংলাদেশে গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণের কাজটি আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। দীর্ঘকাল ধরে এই খাত মোটর ভেহিকেলস অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩-র আওতায় পরিচালিত হতো। আধুনিক সড়ক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনে ২০১৮ সালে নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করা হয়। এর ৩৪ ধারা অনুযায়ী সরকার গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষমতা রাখে। সে অনুযায়ী সরকার জনস্বার্থে যেকোনো সময় গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যাত্রী পরিবহনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করতে পারে।

আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে ২০২২ সালে সড়ক পরিবহন বিধিমালা প্রণীত হয়। এর বিধি ৬০(ক) অনুযায়ী ভাড়ার বিষয় দেখভালের জন্য সুনির্দিষ্ট কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি মহানগরী, বিভাগ ও জেলার জন্য ‘যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট এলাকার সড়কের ধারণক্ষমতা ও পরিবহনের চাহিদা বিশ্লেষণ করে। এরপর তারা রুট পারমিট ও ভাড়ার বিষয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেয়।

ভাড়া নির্ধারণ কমিটির গঠন ও নিয়ন্ত্রণ

বাসের ভাড়া নির্ধারণে বিআরটিএ সরাসরি কাজ করে। এজন্য বিআরটিএ চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকেন। সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের তিনজন কর্মকর্তা কমিটিতে থাকেন। কারিগরি তথ্য প্রদানের জন্য ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এছাড়া মালিক সমিতির পক্ষ থেকে তিন থেকে চারজন; শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকেও এক বা দুইজন প্রতিনিধি কমিটিতে থাকেন। সাধারণ যাত্রীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কমিটিতে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)-এর একজন প্রতিনিধি থাকেন।

কাঠামোগত দিক থেকে কমিটিতে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রভাব বেশি। যাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব সেখানে কম। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মালিক পক্ষের দাবিগুলোই প্রাধান্য পায়।

ব্যয় বিশ্লেষণের পদ্ধতি ও বিবেচ্য বিষয়

বিআরটিএ যখন ভাড়া নির্ধারণ করে, তখন তারা ব্যয় বিশ্লেষণের ফর্মুলা ব্যবহার করে। ভাড়া নির্ধারণে প্রধানত ১২টি মৌলিক বিষয়কে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। প্রথমে বাসের ক্রয়মূল্য ও অর্থনৈতিক সচলতা বিবেচনা করা হয়। বিনিয়োগের বিপরীতে ব্যাংকের বাৎসরিক সুদের হারও ব্যয়ের খাতায় যুক্ত করা হয়। বাস বছরে কত কিলোমিটার চলে, তার গড় হিসাব বের করা হয়। বাসের আসন সংখ্যার ভিত্তিতে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় নির্ধারিত হয়।

যান্ত্রিক কাজের খরচ হিসেবে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ধরা হয়। চাকার ক্ষয়ের জন্য টায়ার ও টিউব ব্যয় হিসাব করা হয়। ইঞ্জিনের জন্য লুব্রিকেন্ট, মবিলের খরচও তালিকায় থাকে। বার্ষিক ট্যাক্স টোকেন, ইনস্যুরেন্স খরচকে বীমা ও কর হিসেবে যুক্ত করা হয়। চালক ও সহকারীদের বেতন, গ্যারেজ ফি এবং সবচেয়ে পরিবর্তনশীল উপাদান হিসেবে জ্বালানি ব্যয় বিবেচনা করা হয়। এর বাইরেও উৎসব বোনাস, আপ্যায়ন খরচের মতো প্রায় ২০টি ক্ষুদ্র ব্যয় উপাদান হিসাবের মধ্যে রাখা হয়।

কাল্পনিক ব্যয়ের প্রভাব ও বিতর্ক

বাস ভাড়া নির্ধারণ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে সমালোচিত দিক হলো কাল্পনিক ব্যয়ের অন্তর্ভুক্তি। বিআরটিএ ভাড়ার হিসাব করার সময় বাসের আয়ু ১০ বছর ধরে নেয়। এর অর্থ, ১০ বছরের মধ্যে মালিককে বিনিয়োগের পুরো টাকা তুলে নিতে হবে। ঢাকায় একটি বাস ২০ বছর পর্যন্ত চলার আইনি বৈধতা রাখে। ১০ বছর পর বাসের বিনিয়োগ উঠে গেলেও মালিকরা নতুন বাসের সমান ভাড়াই যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করতে থাকেন।

ব্যয় বিশ্লেষণে বাসের নিয়মিত বড় ধরনের যান্ত্রিক পরীক্ষা ও মেরামতের জন্য বিশাল অংক বরাদ্দ থাকে। রাস্তার লক্কর-ঝক্কর বাসগুলো দেখলে বোঝা যায়, এত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাস্তবে করা হয় না।

চালক ও সহকারীদের জন্য বছরে দুটি উৎসব বোনাস এবং নির্দিষ্ট মাসিক বেতনের কথা বলা হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা অনুযায়ী, পরিবহন খাতের ৮২ শতাংশ কর্মীর নিয়োগপত্র নেই। ৬৯ শতাংশ কর্মী দৈনিক চুক্তিতে কাজ করেন। কাগজে-কলমে বেতন-বোনাস দেখিয়ে ভাড়া বাড়ানো হলেও সেই টাকা শ্রমিকরা পান না। গ্যারেজ ভাড়া হিসেবে বার্ষিক বড় অংকের টাকা হিসাব করা হলেও ঢাকার বেশিরভাগ বাস রাস্তার ওপর অবৈধভাবে পার্ক করা থাকে।

ভাড়া বৃদ্ধির চূড়ান্ত ধাপ

জ্বালানির (ডিজেল, সিএনজি) দাম বাড়লে বাস মালিকরা দ্রুতই ভাড়া বাড়ানোর দাবি তোলেন। মালিকরা কিলোমিটারপ্রতি নতুন ভাড়ার প্রস্তাব সরকারের কাছে জমা দেন। এরপর বিআরটিএ সদর দপ্তরে বাস মালিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক হয়।

এরপর সরকার নতুন ভাড়ার হার চূড়ান্ত করে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন ভাড়ার ঘোষণা দেয়। ঘোষণায় একে ভাড়া বৃদ্ধি না বলে ভাড়া সমন্বয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এরপর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে কিলোমিটারপ্রতি নতুন ভাড়া ও সর্বনিম্ন ভাড়া কার্যকর করা হয়।

সম্পর্কিত