ইরান প্রশ্নে মুখে কুলুপ পশ্চিমা যুদ্ধবিরোধীদের, কেন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর যুদ্ধ প্রায় সাত সপ্তাহ ধরে বিশ্বকে অস্থির করে রেখেছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

বিশ্বজুড়ে বিরোধিতা থাকলেও, গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধের তুলনায় ইরান ইস্যুতে প্রতিবাদ অনেকটাই যেন কম। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কাজ করছে ক্লান্তি, ভয় ও হতাশা।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ প্রায় সাত সপ্তাহ ধরে বিশ্বকে অস্থির করে রেখেছে। পুরো বিশ্বেই কম-বেশি এর প্রভাব পড়ছে। গত ১০ দিন ধরে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি থাকলেও পরিস্থিতি এখনও টানটান।

৯ কোটি জনসংখ্যার ইরানে এরমধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, বিশেষ করে পারমাণবিক স্থাপনার আশপাশের এলাকার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তাঁর দাবি না মানলে ইরানের ‘পুরো সভ্যতাই ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’

প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলসহ আশপাশের দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি এখন হুমকির মুখে, কারণ লেবাননে ইসরায়েলের বিমান হামলায় ১ হাজার ৩’শর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান চালানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের জনমত জরিপে দেখা গেছে, বেশিরভাগই চায় না এই যুদ্ধ হোক। তবুও গাজায় ইসরায়েলের বা ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার সময় যে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল, ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে তা দেখা যাচ্ছে না।

ইরান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে, সার সংকট দেখা দিয়েছে, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সব সংকটই আগের ইসরায়েল-গাজা বা অন্য সংঘাতের তুলনায় দ্রুত সামনে এসেছে। তাহলে কেন প্রতিবাদ কম? এর স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েকটি কারণ এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।

সংখ্যার দিকে তাকালে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা বলছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরুর পর প্রথম মাসে ইরান যুদ্ধকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ হাজার ২০০টি বিক্ষোভ হয়েছে। তবে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রথম মাসে প্রায় ৩ হাজার ৭০০টি এবং গাজা যুদ্ধের প্রথম মাসে প্রায় ৬ হাজার ১০০টি বিক্ষোভ হয়েছিল।

মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শিবলি তেলহামি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন না হওয়াটা কিছুটা বিস্ময়কর, বিশেষ করে যখন যুদ্ধ শুরুর আগেই মাত্র ২১ শতাংশ মানুষ এর পক্ষে ছিল।’ এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান এখনও এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছে। তবুও আগের যুদ্ধগুলোর মতো ‘র‍্যালি রাউন্ড দ্য ফ্লাগের’ প্রভাব এখানে দেখা যায়নি।

এই যুদ্ধ একটি নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটও তৈরি করেছে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, শুধুমাত্র কিছু চুক্তিবদ্ধ দেশের জাহাজ ছাড়া। পরে যুক্তরাষ্ট্র ওই পথে ইরানের সাথে সম্পর্কিত জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ শুরু করে, ফলে বৈশ্বিক তেল-গ্যাস পরিবহন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথটি জটিল হয়ে উঠে।

তবে এখন পর্যন্ত যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর সরাসরি খুব বেশি পড়েনি। এখন পর্যন্ত ১৪ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। ইরান বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পারসি বলেন, ‘এখনো ব্যাপক স্থল অভিযান বা উচ্চ ঝুঁকির পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’ তার মতে, ট্রাম্প এমনভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন যাতে মার্কিন হতাহতের সংখ্যা কম থাকে।

সমাজবিজ্ঞানী জেরেমি ভারন বলেন, ‘মানুষ সাধারণত তখনই রাস্তায় নামে, যখন তাদের বিবেক গভীরভাবে নাড়া খায় বা তারা বড় কোনো অন্যায় অনুভব করে।’

ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে তিনি একে ‘ভিডিও গেম’ যুদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দূর থেকে হামলা, যেখানে মানবিক ক্ষয়ক্ষতি চোখে পড়ে না। ফলে যুদ্ধের ভয়াবহতা অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়।

অন্যদিকে গাজায় ইসরায়েলের হামলার সময় ব্যাপক ধ্বংস, হতাহত ও দুর্ভিক্ষের দৃশ্য মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, যা দীর্ঘমেয়াদি বিক্ষোভের জন্ম দেয়। কিন্তু সেই আন্দোলন থামাতে না পারার কারণে অনেক কর্মী এখন হতাশ ও ক্লান্ত। ফলে অনেকটা হাল ছেড়ে দেওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষক সালার মোহানদেসি বলেন, ‘অনেকে হতাশ, অনেকে ক্লান্ত।’ তার মতে, ট্রাম্প অভিবাসন, শুল্কসহ নানা ইস্যু সামনে এনে বিরোধিতাকেও ভাগ করে ফেলেছেন। মানুষের সময় ও মনোযোগ সীমিত। তাই তারা কোন ইস্যুতে সক্রিয় হবে, সেটাও বেছে নিচ্ছে।

এছাড়া একটি বড় কারণ ইরানের বৈশ্বিক ইমেজ। গাজার ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিদের একটি দখলকৃত জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু ইরান একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র, যা নিজের জনগণকেও দমন করেছে— এই ধারণা পশ্চিমে অনেকের মধ্যে রয়েছে। মাশা আমিনিসহ এমন বিষয়ে ইরান প্রায়ই সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। ফলে যুদ্ধবিরোধিতা করতে গিয়ে ইরান সরকারের অন্যায়কে সমর্থন করছে এমন ধারণা থেকেও প্রতিবাদ কমে গিয়েছে।

এছাড়াও, বিদেশে থাকা ইরানিদের মধ্যেও বিভাজন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অনেক ইরানি-আমেরিকান এই যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যদিও বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমর্থন কমছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম। গাজা ইস্যুতে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের পর প্রশাসনিক দমন, বহিষ্কার, ভিসা বাতিলসহ নানা পদক্ষেপ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় তৈরি করেছে। ফলে আগের মতো সংগঠিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কিছুটা উত্তেজনা কমিয়েছে, ফলে রাস্তায় প্রতিবাদের তাগিদও কমেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি যদি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠে বা যুদ্ধের যদি খরচ সরাসরি মানুষের জীবনে প্রভাব ফে– যেমন অর্থনৈতিকভাবে, তাহলে জনগণের প্রতিবাদ দ্রুত বাড়তে পারে।

ইরান বিশ্লেষক ত্রিতা পারসি বলেন, ‘যদি জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি সরাসরি মানুষের জীবনে আঘাত হানে, তখন এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে আর কেউ চুপ থাকবে না।’

আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত

সম্পর্কিত