ইরানি রিয়ালের মানপতন ও অর্থনৈতিক সংকটের অসন্তোষ থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে রাস্তায় নামেন। প্রথমে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট থাকলেও ধীরে ধীরে এই বিক্ষোভে নানান শ্রেণি-পেশার ইরানিরা যোগ দেন।
বিক্ষোভ শুরুর আঠারো দিন পরে ১৫ জানুয়ারি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে ১৩ জানুয়ারি সরকারের পক্ষে হাজার হাজার ইরানি রাস্তায় নামার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়ে গেছে।
বিবিসি দাবি করছে, সরকারের পক্ষে রাজপথে নামা জনস্রোত মূলত গ্রাম ও মফস্বলের রক্ষণশীল এবং রাষ্ট্রীয় ভাতার ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী। শহুরে আধুনিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তাদের কাছে খামেনির সরকার কেবল শাসনযন্ত্র নয়, বরং শিয়া মতাদর্শ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধের শেষ দুর্গ।
যদিও এখনো তেহরানের কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে। তবে তা ততটা জোরালো নয়। সরকারও বলছে, পরিস্থিতি এখনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে এত ত্যাগ এবং আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও কেন নড়ল না খামেনির গদি? তবে কি ইরানের এই শাসনব্যবস্থা অপরাজেয়? এর পেছনে কারণ কী?
নেতৃত্বের অভাব ও বিকল্পের অনুপস্থিতি
কোনো বিপ্লব বা অভ্যুত্থান সফল হতে হলে দরকার যোগ্য নেতা বা বিকল্প সরকার কাঠামো। কিন্তু ইরানের এই বিক্ষোভে তার অভাব ছিল প্রকট। আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত কিন্তু বিচ্ছিন্ন। বিদেশে বসে যারা নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাদের মধ্যে কোনো ঐক্য নেই। রাজা পাহলভির ছেলে রেজা পাহলভি বা মুজাহিদিন-ই-খালক বা এমইকের মতো গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সবার সমর্থন নেই। শাহ-পুত্র রেজা পাহলভিকে অনেকে মনে করেন দেশের বাস্তব সমস্যা থেকে বিচ্ছিন্ন ‘বিলাসী রাজপুত্র’, আর এমইকে-কে দেখা হয় সাদ্দাম হোসেনের সহযোগী ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে। অন্যদিকে নার্গিস মোহাম্মদীর মতো গ্রহণযোগ্য মানবাধিকার কর্মীরা জেলে থাকায় মাঠ পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কেউ নেই। ফলে আন্দোলন যতোই জোরালো হোক না কেন শেষ পর্যন্ত তা পথ হারিয়ে ফেলে।
গত ১৯ জানুয়ারি তেহরানের রাস্তায় এক ইরানি নারী। ছবি: সংগৃহীততাছাড়া ‘সিরিয়া বা লিবিয়া হওয়ার ভয়’ মানুষের মনে কাজ করছে। সরকার কৌশলে এই ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে যে তাদের পতন হলে দেশে গৃহযুদ্ধ লেগে যাবে। ইরান টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষ সরকারকে ঘৃণা করলেও তারা দেশের ধ্বংস চায় না। এই ‘অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়’ অনেক মধ্যবিত্ত ও সচেতন মানুষকে রাস্তায় নামা থেকে বিরত রেখেছে।
প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ ও ডিজিটাল পর্দা
ডিসেম্বরের বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী যে নৃশংসতা দেখিয়েছে তা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। পেলেট গান বা ছররা গুলি দিয়ে মানুষ তাড়ানোর দিন শেষ। এখন তারা ব্যবহার করছে ‘যুদ্ধ বুলেট’ বা ওয়ার বুলেটস। সোজা কথায় তারা হত্যার উদ্দেশ্যেই গুলি চালায়। ডাক্তারদের বরাতে জানা গেছে হাসপাতালে আসা আহতদের অধিকাংশেরই বুক বা পেটে গুলির আঘাত ছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে বলছে নজিরবিহীন বেআইনি হত্যাকাণ্ড। নিহতের সংখ্যা তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে তাদের ধারণা। এই নৃশংসতার কারণেই জনগণ ভীত হয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে।
এর সাথে যোগ হয়েছে তথ্যের অন্ধকার। ইন্টারনেট বা ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। একে বলা হচ্ছে ‘ডিজিটাল আইরন কার্টেন’। ইন্টারনেট বন্ধ থাকার ফলে বিক্ষোভকারীরা একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। এক শহরের মানুষ জানছে না পাশের শহরে কী ঘটছে। বিশ্ববাসীও তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারছে না হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতা। তথ্যের এই শূন্যতা সরকারকে যা খুশি তাই করার সুযোগ দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সমীকরণ
ইরানের পতনে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে এই ভয়ে সৌদি আরব, কাতার বা ওমানের মতো প্রতিবেশীরাও চুপ থাকছে। তারা কোনো নির্দিষ্ট বিকল্পকে সমর্থন দিচ্ছে না। তাদের এই নীরবতা সরকারকে সাহস যুগিয়েছে। আর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা বা চাপের মুখে ইরান আরও রক্ষণশীল হয়ে উঠছে। সরকার বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দিতে পারছে। ট্রাম্প বা ইসরায়েলের হুমকির কারণে জাতীয়তাবাদী অনেক মানুষও সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা মনে করছে এই মুহূর্তে সরকারকে দুর্বল করা মানে দেশের নিরাপত্তাকেই হুমকিতে ফেলা।
রিভোলিউশনারি গার্ড কঠিন সুরক্ষা
ইরানের সরকারের টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার হলো ইসলামি রিভোলিউশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি। ১৯৭৯ সালে জন্ম নেওয়া এই বাহিনীর মূল কাজ হলো বিপ্লব রক্ষা। এরা কোনো সাধারণ সেনাবাহিনী নয়। এদের কাজই হলো সুপ্রিম লিডারকে যে কোনো মূল্যে রক্ষা করা। সামরিক বাহিনীর বাইরেও এদের রয়েছে বিশাল নেটওয়ার্ক। বাসিজ মিলিশিয়া হলো এদের এক অঙ্গ সংগঠন। প্রতিটি মহল্লায় বাসিজের কর্মীরা থাকে। স্কুল-কলেজ বা কর্মক্ষেত্রেও এদের নজরদারি চলে। ফলে কে কোথায় কী বলছে তা সরকারের কানে পৌঁছে যায়।
ইরানে আন্দোলন চলাকালীন একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীততবে আইআরজিসির ক্ষমতা কেবল বন্দুকের নলে সীমাবদ্ধ নয়। এরা পরিণত হয়েছে এক বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যে। দেশের নির্মাণ খাত থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের দখলে। তেল বা গ্যাস ক্ষেত্রগুলোতেও তাদের অংশীদারিত্ব আছে। অর্থাৎ তাদের নিজেদের স্বার্থেই তারা এই শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চায়। সরকারের পতন হলে তাদের এই অর্থনৈতিক সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তারা কোনোভাবেই সরকারবিরোধী আন্দোলনের সফল হতে দেবে না।
সন্দেহ ও অবিশ্বাসের চক্রব্যূহ
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই বিক্ষোভকে ‘২০২৫-২৬ অভ্যুত্থান’ বা বিপ্লবের চেষ্টা হিসেবেও দেখছেন। তবে এতো মৃত্যুর পরেও সরকারের গদিতে চিড় ধরেনি। কারণ দেশটির ক্ষমতার কাঠামো এমনভাবে গড়া হয়েছে যা সহজে টলে যাওয়ার মতো নয়। শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার মূলমন্ত্রই হলো ‘আনুগত্য’ ও ‘ভীতি’। ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি তৈরি হয়েছে সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ঘিরে। এর বাইরের সবকিছু কেবল তার সুরক্ষা দেয়াল।
ইরানের ক্ষমতা চলে সমকেন্দ্রিক বা কনসেন্ট্রিক চক্রাকারে। কেন্দ্রে থাকেন খামেনি ও তার পরিবার। এর বাইরে তার অনুগতদের বিভিন্ন স্তরের বলয়। এখানে ক্ষমতা কোনো আনুষ্ঠানিক বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে না। ক্ষমতা থাকে তার হাতে যে সর্বোচ্চ নেতার যত বেশি কাছাকাছি।
সর্বোচ্চ নেতা বা সুপ্রিম লিডারের দপ্তরকে বলা হয় ‘বেইত-ই রাহবরি’। এই অফিস হলো ইরানি ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু। খামেনির ক্ষমতা কেবল নামেমাত্র নয়, এই দপ্তরই মূলত দেশ চালায়। বেইতের হাজারো কর্মী সারা দেশে ছড়িয়ে আছে। সেনাবাহিনী থেকে বিচার ব্যবস্থা পর্যন্ত সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এদের মাধ্যমেই নেওয়া হয়। এরা এমনভাবে সাজানো যে জনগণের ক্ষোভ বা চাপ খামেনি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। সব ধাক্কা সামলায় এই দপ্তর। এটাই খামেনির পরিবার এবং বিশেষ করে তাঁর ছেলেদের প্রভাব বিস্তারের মূল চ্যানেল। ফলে বাইরে যতোই ঝড় উঠুক না কেন ভেতরের স্তম্ভ নড়ে না।
ধর্মীয় বৈধতা ও অনুগত আলেম সমাজ
খামেনির শাসনের অন্যতম বড় শক্তি হলো এর ধর্মীয় আচ্ছাদন। খামেনি ইরানের জনগণের কাছে যত না রাজনৈতিক নেতা তার চেয়েও বেশি ধর্মীয় নেতা। ফলে তার বিরোধিতা করা মানে ধর্মের বিরোধিতা করা। এই বয়ান প্রচারের জন্য সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার শুক্রবারের নামাজ বা জুমার নামাজের খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষকদের। অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত খামেনির শাসনকে ধর্মীয় বৈধতা দিয়ে যায়।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। ছবি: বিবিসিএমনকি নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরেও এই ধর্মীয় আদর্শ গেঁথে দেওয়া হয়েছে। বাহিনীর আদর্শিক শাখার প্রধান হোজাতোলেসলাম আলী সাঈদি বলেছিলেন—ইসলামি সরকারকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনে হাজারো মানুষের মৃত্যুও জায়েজ। অর্থাৎ প্রতিবাদকারীদের হত্যা করাকে তারা অপরাধ হিসেবে দেখে না বরং একে তারা দেখে ‘ইসলাম রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব’ হিসেবে। প্রতিবাদকারীদের ‘মুহারেবি’ বা আল্লাহর শত্রু হিসেবে ট্যাগ দিয়ে তাদের ওপর সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নৈতিক বৈধতা তারা পেয়ে যায়।
ইরানের সরকার বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
এই আন্দোলন শুরুতে প্রথমে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট থাকলেও ধীরে ধীরে এই বিক্ষোভে নানান শ্রেণি-পেশার ইরানিরা যোগ দেন। ইরানি অর্থনীতির এই ভয়াবহ ধসের পেছনে পশ্চিমাদের দীর্ঘদিনের কঠোর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার দায় কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়—যা দেশটির অর্থনীতির মেরুদণ্ড কার্যত ভেঙে দিয়েছে। তবে এই বহিঃশক্তির চাপের পাশাপাশি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি। সাধারণ মানুষের ক্ষোভের জায়গা হলো, নিষেধাজ্ঞার দোহাই দিয়ে আইআরজিসি ও সরকারি কর্মকর্তারা যে সীমাহীন লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা চালিয়েছে, তা-ই মূলত সংকটকে সাধারণের সহ্যের বাইরে নিয়ে গেছে।
তবে এবারের বিক্ষোভে কেবল শহুরে মধ্যবিত্ত নয়, বরং যুক্ত হয়েছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও শ্রমিক শ্রেণিও। এক সময় তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়ে তীব্র আকার ধারণ করে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং মোবাইল ও ল্যান্ডফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর ছোড়া ‘যুদ্ধ বুলেট’ বা ওয়ার বুলেটের আঘাতে নিহতের সংখ্যা তিন থেকে পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দিনশেষে ইরানের সরকার ব্যবস্থা টিকে আছে কারণ এটি টিকে থাকার জন্যই নকশা করা হয়েছে। খামেনি বা আইআরজিসির কাছে ইরানের টিকে থাকা কোনো রাজনীতি নয় বরং অস্তিত্বের লড়াই। তাই বিক্ষোভ যতই হোক না কেন ভেতরের কাঠামো না ভাঙলে বা নিরাপত্তা বাহিনী দলবদল না করলে বড় কোনো পরিবর্তনের আশা সুদূরপরাহত।
তথ্যসূত্র: জ্যাকোবিন, পলিটিকো, দ্য গার্ডিয়ান, মিডিল ইস্ট আই, ইউরেশিয়া রিভিউ এবং আল-জাজিরা।