বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নয়নশীল বিশ্বের নির্বাচন নিয়ে আমেরিকা মুখে তারা গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালেও মহৎ উদ্দেশে হস্তক্ষেপ করে না। মূলত তারা নির্বাচনকে জাতীয় স্বার্থ হাসিলের মোক্ষম হাতিয়ার করে।
স্ট্রিম ডেস্ক

বাংলাদেশে চলছে নির্বাচনী ডামাডোল। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে জল্পনা-কল্পনার ডানা মেলছে। কানে ভেসে আসছে কূটনীতিক পাড়ার ফিসফিসানি। গত ২৫ জানুয়ারি বরগুনা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. সুলতান আহমেদ জনসভায় দাবি করেন, বাংলাদেশে দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ কায়েম করতে জামায়াতে ইসলামীর ওপর নির্ভর করেই অগ্রসর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
এর চার দিন আগে ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ এক প্রতিবেদনে দাবি করে, এক সময়ের নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ করতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
এরপর থেকে নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। এতে যুক্ত হয়েছে নির্বাচনে জামায়াতের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিও। দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ড. সাইমুম পারভেজের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্কের গুঞ্জন আসলে অনানুষ্ঠানিক এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ের আলাপমাত্র। কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার জামায়াত-যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্পর্ককে ‘ভয়ংকর অশনিসংকেত’ অভিহিত করেছেন।
এখন প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথা
কেন? তারা আদৌ কি এসব নির্বাচনে প্রভাব রাখে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নয়নশীল বিশ্বের নির্বাচন নিয়ে আমেরিকার মাথাব্যথার আসল মন্ত্র কৌশলগত বিন্যাস। মুখে তারা গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডভ লেভিন বা থমাস ক্যারোদার্সের মতো গবেষকরা প্রমাণ করেছেন, কোনো মহৎ উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে না। মূলত তারা নির্বাচনকে জাতীয় স্বার্থ হাসিলের মোক্ষম হাতিয়ার করে।
তিন স্তম্ভে স্বার্থের সমীকরণ
নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। প্রথমত, বহু মেরুর পৃথিবীতে নির্বাচনকে আমেরিকা দেখে চীন বা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘জিরো-সাম গেম’ হিসেবে। যদি কোনো দেশে পশ্চিমাপন্থী নেতার বদলে এমন কেউ ক্ষমতায় আসেন, যিনি বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের দিকে ঝুঁকতে চান, তবে ওয়াশিংটন সেখানে প্রভাব ও সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় পায়। দক্ষিণ এশিয়া বা আফ্রিকার নির্বাচনে তাদের আগ্রহ বাড়ার পেছনে প্রার্থীর সামরিক বা অর্থনৈতিক নির্ভরতা বদলের ইঙ্গিতই অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করে।
দ্বিতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশগুলোই লিথিয়াম বা কোবাল্টের মতো খনিজ ও জ্বালানির মূল উৎস। সেখানে কোনো জাতীয়তাবাদী সরকার ক্ষমতায় এসে যদি সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। তাই ‘স্থিতিশীলতার’ দোহাই দিয়ে তারা এমন সব ‘বাজারবান্ধব’ প্রার্থীকে সমর্থন দেয়, যারা স্থানীয় বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেশনগুলোর অবাধ প্রবেশাধিকার ও সম্পদের জোগান নিশ্চিত রাখবে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সব সময় নিশ্চিত স্থিতিশীলতা পছন্দ করে। কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন বা কট্টর সংস্কারক নেতা ক্ষমতায় এলে হঠাৎ অস্থিরতা, অভিবাসন সংকট বা সন্ত্রাসবিরোধী চুক্তিতে ছেদ পড়ার আশঙ্কা থাকে। জার্নাল অব কনফ্লিক্ট রেজল্যুশনের গবেষণা বলছে, যখনই কোনো শাসকের পররাষ্ট্রনীতি ওয়াশিংটনের পছন্দের বাইরে যায়, তখনই নির্বাচনী হস্তক্ষেপে তাদের আগ্রহ বেড়ে যায়।
গণতন্ত্র নাকি ইঞ্জিনিয়ারিং
কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির গবেষক ডভ লেভিনের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৪৬ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৮১ বার বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে। দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষায় তারা একটি কৌশল (টুলবক্স) ব্যবহার করে। এর প্রধান হাতিয়ারের মধ্যে রয়েছে সিআইএ বা ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির (এনইডি) মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অর্থায়ন এবং ভীতিমূলক প্রচারের মাধ্যমে জনমত পরিবর্তন করা। চিলির নির্বাচনে ভীতি ছড়ানো থেকে শুরু করে নিকারাগুয়ায় বিরোধীদের অর্থায়ন– নথিপত্রে এর প্রমাণ মেলে।
মার্কিনবিরোধী প্রার্থী বিজয়ী হলে বিদেশি সাহায্য বা আইএমএফ ঋণ বাতিলের হুমকি দিয়ে ভোটারদের মধ্যে অর্থনৈতিক উদ্বেগ তৈরি করা তাদের নিয়মিত কৌশল। এছাড়া রয়েছে খণ্ড-বিখণ্ড বিরোধী দলগুলোকে একীভূত করে সরকারবিরোধী ভোট একত্রীকরণ, যা সার্বিয়াসহ বিভিন্ন ‘কালার রেভ্যুলেশনে’ দেখা গেছে। পাশাপাশি স্থানীয় এনজিওর মাধ্যমে ‘প্যারালাল ভোট ট্যাবুলেশন’ করিয়ে নির্বাচনের সরকারি ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করার যান্ত্রিকতা তৈরি করা হয়।
বাংলাদেশে নির্বাচনী সমীকরণে নতুন কী
প্রশ্ন হলো– এই ঐতিহাসিক ছক কি বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে? যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব খাটানোর তিনটি প্রধান হাতিয়ার রয়েছে। প্রকাশ্য সাহায্য, আধা-প্রকাশ্য কূটনীতি এবং গোপন তৎপরতা।
প্রকাশ্য সাহায্য আসে ইউএসএইড বা স্টেট ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে। তারা নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা বাড়াতে বা ভোটার সচেতনতা তৈরিতে অর্থ দেয়। বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে এটি একটি নিষ্কলুষ প্রক্রিয়া। এর লক্ষ্য কেবল সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। তবে সমালোচকরা বলেন, এর মাধ্যমে তারা মাঠের পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে আনতে চায়।
অন্যদিকে, ‘আধা-প্রকাশ্য’ কাজটি করে এনইডির মতো সংস্থাগুলো। এরা বিভিন্ন এনজিও বা গণমাধ্যমকে তহবিল যোগান দেয়। রাশিয়া বা চীন সব সময় অভিযোগ করে আসছে, এসব তহবিলের মাধ্যমে আসলে পশ্চিমাপন্থী দলকে শক্তিশালী করা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে মার্কিন কূটনীতিকদের তৎপরতা এবং এনজিওগুলোর ওপর তাদের প্রভাব এই সন্দেহের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো– গোপন তৎপরতা। অতীতে সিআইএ টাকার বস্তা বা ‘স্যুটকেস মানি’ বিলি করে প্রার্থী কিনেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম ব্যবহার করে গুজব ছড়িয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে বিদেশি অর্থের প্রভাবে আন্দোলন বা নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার অভিযোগ পুরোনো। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগেও কি তেমন কোনো গোপন খেলা চলছে– এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কূটনৈতিক পাড়ায়।
প্রভাবের ধরন, মুদ্রার উল্টো পিঠ
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল বদলেছে। এখন আর আগের মতো সরাসরি টাকা নিয়ে ঘোরে না। এখন ব্যবহৃত হয় কৌশলের বাক্স। এর মধ্যে আছে কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি এবং সমান্তরাল ভোট গণনার মতো পদ্ধতি। বাংলাদেশে ভিসানীতি বা শ্রমিক অধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থানকে অনেকেই এই কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করছেন, এর মাধ্যমে সরকার বা বিরোধী দলের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। মার্কিন হস্তক্ষেপ সব সময় সুফল বয়ে আনে না। অনেক ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। স্থানীয় জনগণ যখন মনে করে তাদের নেতা ওয়াশিংটনের পছন্দে নির্বাচিত হয়েছেন, তখন সেই নেতার বৈধতা বা গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। সৃষ্টি হয় এক ধরনের জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া। বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই বাইরের খবরদারি পছন্দ করে না। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত– বাঙালি সব সময় নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখতে চেয়েছে।

বাংলাদেশে চলছে নির্বাচনী ডামাডোল। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে জল্পনা-কল্পনার ডানা মেলছে। কানে ভেসে আসছে কূটনীতিক পাড়ার ফিসফিসানি। গত ২৫ জানুয়ারি বরগুনা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. সুলতান আহমেদ জনসভায় দাবি করেন, বাংলাদেশে দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ কায়েম করতে জামায়াতে ইসলামীর ওপর নির্ভর করেই অগ্রসর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
এর চার দিন আগে ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ এক প্রতিবেদনে দাবি করে, এক সময়ের নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ করতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
এরপর থেকে নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। এতে যুক্ত হয়েছে নির্বাচনে জামায়াতের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিও। দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ড. সাইমুম পারভেজের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্কের গুঞ্জন আসলে অনানুষ্ঠানিক এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ের আলাপমাত্র। কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার জামায়াত-যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্পর্ককে ‘ভয়ংকর অশনিসংকেত’ অভিহিত করেছেন।
এখন প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথা
কেন? তারা আদৌ কি এসব নির্বাচনে প্রভাব রাখে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নয়নশীল বিশ্বের নির্বাচন নিয়ে আমেরিকার মাথাব্যথার আসল মন্ত্র কৌশলগত বিন্যাস। মুখে তারা গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডভ লেভিন বা থমাস ক্যারোদার্সের মতো গবেষকরা প্রমাণ করেছেন, কোনো মহৎ উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে না। মূলত তারা নির্বাচনকে জাতীয় স্বার্থ হাসিলের মোক্ষম হাতিয়ার করে।
তিন স্তম্ভে স্বার্থের সমীকরণ
নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। প্রথমত, বহু মেরুর পৃথিবীতে নির্বাচনকে আমেরিকা দেখে চীন বা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘জিরো-সাম গেম’ হিসেবে। যদি কোনো দেশে পশ্চিমাপন্থী নেতার বদলে এমন কেউ ক্ষমতায় আসেন, যিনি বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের দিকে ঝুঁকতে চান, তবে ওয়াশিংটন সেখানে প্রভাব ও সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় পায়। দক্ষিণ এশিয়া বা আফ্রিকার নির্বাচনে তাদের আগ্রহ বাড়ার পেছনে প্রার্থীর সামরিক বা অর্থনৈতিক নির্ভরতা বদলের ইঙ্গিতই অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করে।
দ্বিতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশগুলোই লিথিয়াম বা কোবাল্টের মতো খনিজ ও জ্বালানির মূল উৎস। সেখানে কোনো জাতীয়তাবাদী সরকার ক্ষমতায় এসে যদি সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। তাই ‘স্থিতিশীলতার’ দোহাই দিয়ে তারা এমন সব ‘বাজারবান্ধব’ প্রার্থীকে সমর্থন দেয়, যারা স্থানীয় বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেশনগুলোর অবাধ প্রবেশাধিকার ও সম্পদের জোগান নিশ্চিত রাখবে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সব সময় নিশ্চিত স্থিতিশীলতা পছন্দ করে। কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন বা কট্টর সংস্কারক নেতা ক্ষমতায় এলে হঠাৎ অস্থিরতা, অভিবাসন সংকট বা সন্ত্রাসবিরোধী চুক্তিতে ছেদ পড়ার আশঙ্কা থাকে। জার্নাল অব কনফ্লিক্ট রেজল্যুশনের গবেষণা বলছে, যখনই কোনো শাসকের পররাষ্ট্রনীতি ওয়াশিংটনের পছন্দের বাইরে যায়, তখনই নির্বাচনী হস্তক্ষেপে তাদের আগ্রহ বেড়ে যায়।
গণতন্ত্র নাকি ইঞ্জিনিয়ারিং
কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির গবেষক ডভ লেভিনের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৪৬ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৮১ বার বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে। দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষায় তারা একটি কৌশল (টুলবক্স) ব্যবহার করে। এর প্রধান হাতিয়ারের মধ্যে রয়েছে সিআইএ বা ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির (এনইডি) মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অর্থায়ন এবং ভীতিমূলক প্রচারের মাধ্যমে জনমত পরিবর্তন করা। চিলির নির্বাচনে ভীতি ছড়ানো থেকে শুরু করে নিকারাগুয়ায় বিরোধীদের অর্থায়ন– নথিপত্রে এর প্রমাণ মেলে।
মার্কিনবিরোধী প্রার্থী বিজয়ী হলে বিদেশি সাহায্য বা আইএমএফ ঋণ বাতিলের হুমকি দিয়ে ভোটারদের মধ্যে অর্থনৈতিক উদ্বেগ তৈরি করা তাদের নিয়মিত কৌশল। এছাড়া রয়েছে খণ্ড-বিখণ্ড বিরোধী দলগুলোকে একীভূত করে সরকারবিরোধী ভোট একত্রীকরণ, যা সার্বিয়াসহ বিভিন্ন ‘কালার রেভ্যুলেশনে’ দেখা গেছে। পাশাপাশি স্থানীয় এনজিওর মাধ্যমে ‘প্যারালাল ভোট ট্যাবুলেশন’ করিয়ে নির্বাচনের সরকারি ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করার যান্ত্রিকতা তৈরি করা হয়।
বাংলাদেশে নির্বাচনী সমীকরণে নতুন কী
প্রশ্ন হলো– এই ঐতিহাসিক ছক কি বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে? যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব খাটানোর তিনটি প্রধান হাতিয়ার রয়েছে। প্রকাশ্য সাহায্য, আধা-প্রকাশ্য কূটনীতি এবং গোপন তৎপরতা।
প্রকাশ্য সাহায্য আসে ইউএসএইড বা স্টেট ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে। তারা নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা বাড়াতে বা ভোটার সচেতনতা তৈরিতে অর্থ দেয়। বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে এটি একটি নিষ্কলুষ প্রক্রিয়া। এর লক্ষ্য কেবল সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। তবে সমালোচকরা বলেন, এর মাধ্যমে তারা মাঠের পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে আনতে চায়।
অন্যদিকে, ‘আধা-প্রকাশ্য’ কাজটি করে এনইডির মতো সংস্থাগুলো। এরা বিভিন্ন এনজিও বা গণমাধ্যমকে তহবিল যোগান দেয়। রাশিয়া বা চীন সব সময় অভিযোগ করে আসছে, এসব তহবিলের মাধ্যমে আসলে পশ্চিমাপন্থী দলকে শক্তিশালী করা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে মার্কিন কূটনীতিকদের তৎপরতা এবং এনজিওগুলোর ওপর তাদের প্রভাব এই সন্দেহের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো– গোপন তৎপরতা। অতীতে সিআইএ টাকার বস্তা বা ‘স্যুটকেস মানি’ বিলি করে প্রার্থী কিনেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম ব্যবহার করে গুজব ছড়িয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে বিদেশি অর্থের প্রভাবে আন্দোলন বা নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার অভিযোগ পুরোনো। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগেও কি তেমন কোনো গোপন খেলা চলছে– এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কূটনৈতিক পাড়ায়।
প্রভাবের ধরন, মুদ্রার উল্টো পিঠ
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল বদলেছে। এখন আর আগের মতো সরাসরি টাকা নিয়ে ঘোরে না। এখন ব্যবহৃত হয় কৌশলের বাক্স। এর মধ্যে আছে কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি এবং সমান্তরাল ভোট গণনার মতো পদ্ধতি। বাংলাদেশে ভিসানীতি বা শ্রমিক অধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থানকে অনেকেই এই কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করছেন, এর মাধ্যমে সরকার বা বিরোধী দলের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। মার্কিন হস্তক্ষেপ সব সময় সুফল বয়ে আনে না। অনেক ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। স্থানীয় জনগণ যখন মনে করে তাদের নেতা ওয়াশিংটনের পছন্দে নির্বাচিত হয়েছেন, তখন সেই নেতার বৈধতা বা গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। সৃষ্টি হয় এক ধরনের জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া। বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই বাইরের খবরদারি পছন্দ করে না। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত– বাঙালি সব সময় নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখতে চেয়েছে।

দুবাইয়ের জেবেল আলির আদলে বাংলাদেশেও গড়ে উঠছে প্রথম ‘ফ্রি ট্রেড জোন’। বিশ্বজুড়ে এর সফলতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত থাকলেও আমাদের দেশে এর স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই জোনের প্রকৃত সুবিধা এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো ঠিক কী?
১৮ ঘণ্টা আগে
ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন ব্যাপক ত্যাগ ও আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত স্তিমিত হয়ে এসেছে। নেতৃত্বের অভাব, নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়ন এবং শাসনব্যবস্থার সুরক্ষিত কাঠামোর কারণে ইরানের সরকার আবারও টিকে গেল। প্রশ্ন উঠছে, কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলন?
২ দিন আগে
বাগেরহাটের কারাফটকে মর্মান্তিক এক ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে সবাইকে। প্রশ্ন উঠছে, কেন প্যারোল নিয়ে এতো জটিলতা? প্যারোল আসলে কী? অধিকার নাকি প্রিভিলেজ? এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চলুন জেনে নিই প্যারোলের আদ্যোপান্ত।
৩ দিন আগে
তিন মোড়লের যুগ শেষ, বিশ্ব ক্রিকেট এখন চলছে ভারতের একক কর্তৃত্বে। বিসিসিআই কেবল বোর্ড নয়, পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক ক্রীড়া রাজনীতির শক্তিকেন্দ্রে। আইপিএল ও করপোরেট শক্তির দাপটে অন্য দেশগুলো এখন বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহসও হারিয়ে ফেলেছে।
৩ দিন আগে