বাংলাদেশে আসছে বহু কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন। জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশে এক দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটেছে। এক শ্বাসরুদ্ধকর অধ্যায় শেষে জাতি এখন একটি ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ নির্বাচনের অপেক্ষায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশের রাজপথ, অফিস-আদালত কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি শব্দ প্রবলভাবে উচ্চারিত হচ্ছে, ‘মব’। কোথাও মাজার ভাঙা হচ্ছে, কোথাও শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো হচ্ছে, আবার কোথাও সংবাদপত্রের অফিসে হামলা চালানো হচ্ছে। এই ঘটনাগুলোকে একপক্ষ বলছে ‘বিপ্লবী ন্যায়বিচার’ বা ‘জনরোষ’, অন্যপক্ষ বলছে ‘মব জাস্টিস’ বা মবতন্ত্র। যদি একাডেমিক লেন্সে এই বিষয়গুলো দেখার চেষ্টা করা হয়, তবে তা কেমন হতে পারে।
‘ডেমোস’ বনাম ‘অক্লোস’
খুব সম্ভবত গ্রিক দার্শনিকদের হাত ধরেই এই দুই ধারণার জন্ম হয়।
গণতন্ত্র শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ Demos (জনগণ) এবং Kratos (ক্ষমতা) থেকে। আব্রাহাম লিংকন সহজ করে বলেছিলেন, এটি জনগণের শাসন। একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট দেওয়া নয়। এর মূল ভিত্তি হলো 'রুল অফ ল' বা আইনের শাসন, জনগণের নিরাপত্তা এবং একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা। গণতন্ত্রে ক্ষমতা হস্তান্তর হয় ব্যালটে। বুলেটে বা লাঠির বাড়িতে নয়।
অন্যদিকে মবতন্ত্র শব্দটি এসেছে Ochlos (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) থেকে। প্লেটো তাঁর রিপাবলিক গ্রন্থে গণতন্ত্রের এক বিকৃত রূপ হিসেবে মবতন্ত্রকে দেখিয়েছেন। যখন আইনের শাসনের বদলে আবেগের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন বিচারকের হাতুড়ির বদলে জনতার হাতের লাঠি রায় ঘোষণা করে, তখনই তা মবতন্ত্র। কেমব্রিজ ডিকশনারি অনুযায়ী, মবতন্ত্র হলো এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থাকে একদল উত্তেজিত জনতার হাতে, যারা যুক্তির চেয়ে আবেগের দ্বারা বেশি চালিত। সহজ বাংলায়—‘জোর যার মুলুক তার’। কিন্তু এবার তা ‘জনতার’ ছদ্মবেশে।
বিপ্লবী জোশ নাকি বিশৃঙ্খলার রোষ
জুলাই বিপ্লব ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। ছাত্র-জনতা বুক পেতে দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে আমরা এক অদ্ভুত ‘গ্রে-এরিয়া’ বা ধূসর অঞ্চলে প্রবেশ করেছি।
রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা যখন ভেঙে পড়ে, যখন পুলিশ পালিয়ে যায়, তখন জনতা নিজের হাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে নেবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যখন ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে। আমরা দেখেছি বিভিন্ন স্থানে মন্দির-মাজার ভাঙচুর
হয়েছে বছরজুড়ে, আবার শহীদ হাদির হত্যাকাণ্ডের পর উত্তেজিত জনতা
ডেইলি স্টার ও
প্রথম আলো অফিসের সামনে যে বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের চেষ্টা করেছে, এই নজিরবিহীন ঘটনা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ।
অন্যদিকে, মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। এই ‘মব’ বা সংগঠিত জনতাই কিন্তু আগস্টের পরে একাধিকবার প্রতিবিপ্লবের ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছে। আমরা দেখেছি যখন কথিত ‘জুডিশিয়াল ক্যু’ করার পাঁয়তারা হয়েছে, তখন এই জনতাই সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও করে ফ্যাসিবাদকে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ দেয়নি। সুতরাং, সব জমায়েতকে ঢালাওভাবে ‘মব’ বলাটা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েও অনেকে তুলেছেন প্রশ্ন।
রাষ্ট্র কী ভাবছে: ‘মব’ নাকি ‘প্রেসার গ্রুপ’
অন্তর্বর্তী সরকার এবং সংশ্লিষ্টরা এই পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গত বছরের ২৬ জুন এক সেমিনারে মব কালচার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একে বলেছিলেন ‘প্রেসার গ্রুপ’। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, 'বলা হচ্ছে মব তৈরি হচ্ছে, আমি এটাকে মব বলছি না, বলছি প্রেসার গ্রুপ। সেটা তৈরি হচ্ছে আগের সাংবাদিকতার ব্যর্থতার কারণে। ...সেটি তৈরি হওয়ার গ্রাউন্ড কেন হচ্ছে! কেননা, সে তো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত ১৫ বছরে তো তার (প্রেসার গ্রুপ) মিনিমাম সিভিল লিবার্টি রাখা হয়নি।’
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের একটি মন্তব্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তার মতে, ‘মব’ শব্দটি বলার পেছনে বিপ্লবকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটা মানসিকতা কাজ করে।
গণতন্ত্র বনাম মবতন্ত্র
এই মুহূর্তে বাংলাদেশে দুটি শক্তিশালী ন্যারেটিভ বা বয়ান চলছে।
যারা মব জাস্টিসকে সমর্থন করছেন, তাদের প্রধান যুক্তি হলো—গত ১৭ বছরে পুলিশ, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসনকে দলীয় ক্যাডারে পরিণত করা হয়েছে। যেই পুলিশ এতদিন গুলি চালিয়ে মানুষ মেরেছে, যেই বিচারক মিথ্যা রায় দিয়ে ফাঁসি দিয়েছে, তাদের কাছে বিচার চাওয়া আর অরণ্যে রোদন একই কথা।
আবার অনেকে যুক্তি উৎপাদন করছেন, প্রচলিত আইনে বিচার পেতে বছরের পর বছর লেগে যায়। বিপ্লবের পর অপরাধীরা যাতে পালিয়ে যেতে না পারে বা তথ্য- প্রমাণ নষ্ট করতে না পারে, সেজন্য জনতাই একমাত্র পাহারাদার। একে ‘মব’ না বলে ‘সিটিজেন পুলিশিং’ বলা উচিত। সিস্টেম ঠিক হওয়ার আগ পর্যন্ত জনতাই সর্বোচ্চ ক্ষমতার উৎস।
অন্যদিকে গণতন্ত্রপন্থীরা বলছেন, অন্যায়ের জবাব যদি অন্য এক অন্যায় দিয়ে দেওয়া হয়, তবে বিপ্লবের নৈতিক ভিত্তি থাকে না। আজ আপনি যাকে ‘বিপ্লবী’ বলে বিচার করার ক্ষমতা দিচ্ছেন, কাল সে আপনার ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে আপনার ওপর হামলা করবে না, তার গ্যারান্টি কী? রাস্তায় বিচার করার এই সংস্কৃতি একদিন ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব হয়ে সবাইকেই গ্রাস করবে। একটি মব যখন বিচারকের চেয়ার দখল করে রায় দেয়, তখন বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের অবশিষ্ট শ্রদ্ধাটুকুও নষ্ট হয়ে যায়। ১৭ বছরের স্বৈরতন্ত্রের জবাব যদি ১৭ দিনের নৈরাজ্য হয়, তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে কবে? মবতন্ত্র আসলে পরবর্তী স্বৈরতন্ত্রের রাস্তা প্রস্তুত করে দেয়। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে আরব বসন্ত যেখানেই বিপ্লবের পর মব বা জনতা লাগামহীন হয়েছে, সেখানেই পরবর্তীতে কঠোর একনায়কতন্ত্র ফিরে এসেছে ‘শৃঙ্খলার’ দোহাই দিয়ে।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর ন্যায়বিচারের জন্য। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা উত্তেজিত জনতার নিজস্ব আদালত বসানোর জন্য নয়। নির্বাচন আসছে। নির্বাচনের আগে এই ‘মব’ সংস্কৃতি কি আমাদের সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেবে, নাকি ভয়ের রাজত্ব কায়েম রাখবে—সেটা এক বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।
আজ আপনারা যাকে ‘বিপ্লবী জোশ’ বা ‘জনরোষ’ বলে তালি দিচ্ছেন, কাল যদি সেই একই জোশ বা ক্ষোভ আপনার বাড়ির গেট ভেঙে আপনাকে টেনে বের করে— তখনও কি একে ‘গণতন্ত্র’ বলবেন, নাকি তখন মনে হবে এটা ‘মবতন্ত্র’?
কিপ কোয়েশ্চেনিং!