এক্সপ্লেইনার

দেশে কি বিবাহবিচ্ছেদ বাড়ছে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৬, ১৩: ৩৭
বিবাহবিচ্ছেদের প্রতীকী ছবি

ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ৩৬টি বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে—অর্থাৎ প্রতি ৪০ মিনিটে একটি দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে পড়ছে। একসময়ের ‘অমর সঙ্গী’ টার্মটি এখন মরে যেতে বসেছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তবে চিত্রটি একমাত্রিক নয়। বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতাটি স্পষ্ট—বিচ্ছেদ বাড়ছে।

কী বলছে পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস’ জরিপ এই পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ছবি তুলে ধরে। ২০০৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিচ্ছেদের হার মোট জনসংখ্যার অনুপাতে শূন্য দশমিক ৬ থেকে ১ দশমিক ১ শতাংশের মধ্যে ছিল। তারপর হঠাৎ পরিবর্তন আসে।

২০২২ সালে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তালাকের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ২০২১ সালে যেখানে তালাকের হার ছিল প্রতি হাজারে শূন্য দশমিক ৭, সেটি ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৪-এ।

তবে পরের বছর কিছুটা স্বস্তির খবর আসে। ২০২৩ সালে তালাকের হার কমে ১ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসে, যা ২০২২ সালের ১ দশমিক ৪ শতাংশের তুলনায় কম।

২০২৪ ও ২০২৫ সালের পূর্ণ পরিসংখ্যান এখনো বিবিএসের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে নেই। তবে শহর পর্যায়ের তথ্য বলছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২০২০ সালে ১২ হাজার ৫১৩টি, ২০২১ সালে ১৪ হাজার ৬৬৯টি এবং ২০২২ সালে ১৩ হাজার ২৮৮টি বিচ্ছেদ ঘটেছে।

শহর না গ্রাম, শিক্ষিত না অশিক্ষিত: কোথায় বেশি

প্রচলিত ধারণা হলো, শহরে বিচ্ছেদ বেশি হয়। কিন্তু তথ্য বলছে উল্টো। বিবিএসের হিসাবে, গ্রামাঞ্চলে প্রতি হাজারে ১ দশমিক ৫টি বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে। আর শহরে সেই হার মাত্র ১। বিভাগওয়ারি হিসেবে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ২, খুলনায় ২ দশমিক শূন্য, আর সবচেয়ে কম চট্টগ্রামে মাত্র শূন্য দশমিক ৮।

তবে গ্রামে বিবাহবিচ্ছেদ বেশি হওয়ার কারণটি সরল নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এ এস এম আমানউল্লাহ গণমাধ্যমে বলেন, আগে গ্রামে বিচ্ছেদের হার কম ছিল কারণ সামাজিক কলঙ্কের ভয় ছিল। সেই বাধা এখন কমে আসছে।

বিবিএসের আরেকটি প্রতিবেদন বলছে, উচ্চমাধ্যমিক পাস করা ব্যক্তিদের মধ্যে বিচ্ছেদের আবেদন হাজারে ১ দশমিক ৭, আর অশিক্ষিতদের মধ্যে এই হার মাত্র শূন্য দশমিক ৫। অর্থাৎ শিক্ষিতদের মধ্যে বিচ্ছেদের প্রবণতা বেশি।

এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা। তিনি গণমাধ্যমে বলেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকায় একজন নারী এখন তার পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করতে পারছে। ফলে অনেক নারী পারিবারিক বন্ধনের চেয়ে নিজের পেশাজীবনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ কারণেও বিচ্ছেদ হচ্ছে।

তালাকের আবেদন করছেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীরা

বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হচ্ছে, নারীরাই বেশি তালাকের আবেদন করছেন। আগে তালাক মানে সাধারণত স্বামীর দেওয়া তালাক বোঝাত। এখন সেই চিত্র বদলাচ্ছে।

বিবিএসের ২০২৪ সালে প্রকাশিত জরিপ বলছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২০২২ সালে মোট বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে ৭ হাজার ৬৯৮টি। এর মধ্যে স্ত্রীরা আবেদন করেছিলেন ৫ হাজার ৩৮৩টি, যা মোট আবেদনের ৭০ শতাংশ। অন্যদিকে ঢাকা উত্তরে এই হার ৬৫ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষিত এবং চাকরিজীবী নারীরা পরিবারে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য আর মেনে নিতে চান না, এটিই বিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক মনিরুল ইসলাম ও জয়নাল আবেদীন তাঁদের কমপারেটিভ স্টাডি অব ডিভোর্স লেভেলস অ্যান্ড প্যাটার্নস শীর্ষক গবেষণায় দেখিয়েছেন, বিচ্ছেদ শুধু কোনো একটি পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শ্রমিক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী এবং সমাজের উচ্চ শ্রেণি—সব ধরনের পেশার মানুষকে প্রভাবিত করছে।

তবে ঢাকায় কর্মজীবী নারীদের মধ্যে বিচ্ছেদের হার বেশি। কারণ শিল্পায়ন ও নারী ক্ষমতায়ন তাদের আরও স্বনির্ভর করে তুলেছে এবং অসুখী বিবাহ সহ্য করার মানসিকতা কমিয়ে দিয়েছে।

বিচ্ছেদ বাড়ছে কেন

ডিজিটাল দূরত্ব এবং সোশ্যাল মিডিয়া ও মোবাইলের মাধ্যমে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এখন বিচ্ছেদের একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ওই গবেষণায় ফেসবুকসহ অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা বাড়ানোর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিস্তার পাচ্ছে, যা সম্পর্কের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করছে।

বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, দেশে বিবাহবিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় কারণ হলো বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, বিশেষ করে ঢাকা বিভাগে এই কারণে বিচ্ছেদ সবচেয়ে বেশি।

রাইজ অব ডিভোর্স রেট ইন বাংলাদেশ শীর্ষক গবেষণায় সিলমা সোবহান চৌধুরী বলেছেন, নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বেড়েছে, যা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, কর্তৃত্বমূলক মনোভাব এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করছে। এ কারণে এখন অনেক নারী বিচ্ছেদের পথ বেছে নিচ্ছেন।

আবার যৌতুকের কারণেও অনেক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী বিচ্ছেদের পথে হাঁটছেন। দেশে যৌতুক আইনত নিষিদ্ধ হলেও এটি এখনো একটি সামাজিক অভিশাপ। এদেশে বিপুল সংখ্যক নারী দীর্ঘদিন যৌতুকের চাপ সহ্য করে সংসার করেন এবং একটা সময়ে গিয়ে বিবাহবিচ্ছেদ করতে বাধ্য হন।

এছাড়া কোনো কোনো গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের বাল্যবিবাহ হয়েছিল, তাদের মধ্যেও বিচ্ছেদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাহির ফয়সাল তাঁর কজ অব ইনক্রিজিং ডিভোর্স ডেট গবেষণায় দেখতে পেয়েছেন, দম্পতিদের মধ্যে আবেগীয় দূরত্ব, অপূর্ণ প্রত্যাশা, আর্থিক সংঘাত এবং দুর্বল যোগাযোগই বিচ্ছেদের প্রধান কারণ।

সংক্ষেপে বলা যায়, বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদের চিত্র জটিল। সংখ্যায় বছর বছর ওঠানামা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী। এই পরিবর্তনের পেছনে আছে নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটাল জীবনের প্রভাব, বাল্যবিবাহ এবং পারিবারিক সহিষ্ণুতার ক্রমহ্রাস। এটি কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয় — এটি একটি সামাজিক রূপান্তরের লক্ষণ।

এ থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক আমানউল্লাহ গণমাধ্যমে বলেন, বিচ্ছেদ কমাতে সামাজিক বন্ধন পুনরুদ্ধারের জন্য সামাজিক প্রকৌশলের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এটি অবশ্য সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত