এনডিটিভির বিশ্লেষণ

ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের উপস্থিতি কেন গুরুত্বপূর্ণ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ২০
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

চতুর্থবারের মতো ব্রিকসের সভাপতিত্ব করছে ভারত। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। এবার সম্মেলনের পাশাপাশি আয়োজিত আউটরিচ সেশনগুলোও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখনো তাঁর সফর নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে কী কারণে তাঁর অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত আটকে আছে, তা নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে।

সোমবার (১০ আগস্ট) ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময় দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি।’

খলিলুর রহমান আরও বলেন, ‘প্রথমত, আমি ভবিষ্যৎ বলতে পারি না। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকসের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তাঁকে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই পার্থক্যটা বোঝার চেষ্টা করা উচিত।’

তিনি জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এর আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যা নতুন সরকার গঠনের দিন তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। ‘একটি আমন্ত্রণ রয়েছে,’ বলেন তিনি।

অর্থাৎ তারেক রহমানের কাছে এখন দুটি আমন্ত্রণ রয়েছে। সফর হলে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক এজেন্ডার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এর আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ‘ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ দায়িত্ব গ্রহণের সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ব্রিকস সম্মেলনের ক্ষেত্রে ভারত আলাদাভাবে তাঁকে বর্তমান বিমসটেক চেয়ার হিসেবে সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে এই সেশন। ব্রিকসের আউটরিচ সেশনের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এই আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে অন্যান্য আঞ্চলিক জোটের প্রধানদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।’

কেন আটকে আছে সফরের সিদ্ধান্ত

দুটি আমন্ত্রণ পাওয়ার পরও তারেক রহমান কেন ভারত সফরের বিষয়ে নিশ্চিত করছেন না, এর সম্ভাব্য দুটি কারণ রয়েছে।

প্রথম কারণ হতে পারে দেশের ভেতরের চাপ। ভারতবিরোধী গোষ্ঠীগুলো এই সফরকে কাজে লাগিয়ে সরকারকে দেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীল ও আক্রমণের মুখে ফেলতে পারে। বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চাওয়ার কথা জানিয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, আগামী মাসে ভারতে যাওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করার আগে তারেক রহমান সফরের সম্ভাব্য ফলাফল এবং এর মাধ্যমে কী বার্তা যাবে, তা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করছেন।

দ্বিতীয় কারণ হতে পারে কোন আমন্ত্রণটি গ্রহণ করা হবে, সেটি নিয়ে কূটনৈতিক হিসাব। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্ম ব্রিকসের চেয়ে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে বেশি গুরুত্ব দিয়ে যোগাযোগ করতে আগ্রহী। সূত্রগুলো এনডিটিভিকে জানিয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলোর আলোকে দেখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম সরকারি বিদেশ সফরে তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়ার পর নয়াদিল্লিতে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। সীমান্তটি পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্যের মধ্য দিয়ে গেছে।

সেই সফরের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে যেসব ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোও ভারতের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে তিস্তা পরিকল্পনা এবং মোংলা বন্দর নিয়ে ঘোষণাগুলো ভারতকে আরও চিন্তিত করেছে। অবশ্য ধারণা করা হয়েছিল, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তারেক রহমানের ভারত সফরের মাধ্যমে সেটি এগিয়ে যাবে। আর এ কারণেই তাঁর সফরের সিদ্ধান্তে বিলম্বের কারণ নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে।

দিল্লি সফরের বাধা সরাতে ধারাবাহিক বৈঠক

গত কয়েক দিনে তারেক রহমানের দিল্লি সফরের পথে থাকা বাধাগুলো দূর করতে বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আগে দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকটিকে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী হিসেবে বর্ণনা করেন।

তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর ত্রিবেদী বলেন, ‘আমাদের ভালো আলোচনা হয়েছে। আমাদের কিছু সমস্যা আছে, বাংলাদেশেরও আছে। কিন্তু মানুষের জন্য একটাই বিষয়—ভালো সম্পর্ক। এমন কোনো বিষয় নেই, যা নিয়ে আমরা বসে সমাধান খুঁজে বের করতে পারি না।’

তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ত্রিবেদী বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

ভারতকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কতটা

বর্তমান পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের পক্ষে ব্রিকস সম্মেলনে যেতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করা কঠিন হবে। শেখ হাসিনাকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এবং দিল্লিতে তাঁর ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন নিয়ে অবশ্য বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তবে ভারত দ্রুতই একটি বিষয় স্পষ্ট করে—কোনো ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে প্রকাশ করা মতামতকে সরকারি নীতি এবং দুই সরকারের পারস্পরিক সম্পর্ক থেকে আলাদা করে দেখতে হবে। ফলে দুই পক্ষের জন্যই কূটনৈতিক সমঝোতার কিছু জায়গা তৈরি হয়েছে।

এর পাশাপাশি ডিসেম্বর মাসে গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। ফলে দুই দেশকেই একটি সমাধানে পৌঁছাতে হবে। ভারতের সঙ্গে আলোচনা অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে যেতে পারে না। কারণ তিস্তা ও গঙ্গা—দুই নদীর ক্ষেত্রেই ভারত ভাটির দেশ বাংলাদেশের তুলনায় উজানে অবস্থিত।

শেষ পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী। প্রতিবেশী বদলে ফেলা যায় না, তাদের সঙ্গে কথা বলাও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আর গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্বটি যিনি সামলাচ্ছেন, তিনি বিষয়টিকে ঠিক এভাবেই তুলে ধরেছেন।

একাধিক বৈঠকের পর নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘আমাদের ইতিহাসে যা কিছু আছে, তা বদলানো যাবে না। আমাদের প্রতিবেশী বদলানো সম্ভব নয়। আমি সব সময় বলি, আমরা শুধু সীমান্ত ভাগাভাগি করি না, আমরা স্বপ্নও ভাগাভাগি করি।’

(এনডিটিভি থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত