দ্য দেশভক্ত আকাশ ব্যানার্জির বিশ্লেষণ
স্ট্রিম ডেস্ক

ভারতে ছাত্রদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ আপাতত থেমেছে। শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। দিল্লির যন্তর মন্তর পরিষ্কার করা হয়েছে। দেয়ালের গ্রাফিতি মুছে ফেলা হয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ও যেন আপাতত নিজেদের পর্ব শেষ করেছে। অন্যদিকে বিজেপি আবার সংসদে নিজেদের বিল পাস করানোর কাজে ফিরেছে।
সরকারও বলতে চায় যে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা এত সহজ নয়। গত সপ্তাহে ককরোচ জনতা পার্টি ও জেন-জির হাতে মোদি সরকার ধাক্কা খেয়েছে। তার অভিঘাত এখনো স্পষ্ট। গত ১২ বছরে প্রথমবারের মতো সরকার, সরকারপন্থী গণমাধ্যম এবং তাদের ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্সাররা নিজেদের তৈরি করা বয়ান দিয়ে ঘটনাটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
আর সেই কারণেই সরকারের পাল্টা ব্যবস্থা শুরু হয়েছে—এফআইআর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট সরানোর নির্দেশ, শিক্ষার্থীদের বাড়ি ও হোস্টেলে পুলিশের অভিযান এবং গ্রেপ্তার বা আটক।
ধর্মেন্দ্র প্রধানকে যত খুশি সমালোচনা করা যেতেই পারে, কিন্তু শিক্ষার্থীরা সীমা অতিক্রম করেছে—মোটামুটি এটাই সরকারের বর্তমান অবস্থান। দিল্লি পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে আপত্তিকর ভাষা ও গালিগালাজপূর্ণ পোস্ট সরিয়ে ফেলতে। কয়েকটি রাজ্যে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের বাড়ি ও হোস্টেলে পুলিশ গেছে। ‘অরাজকতা উসকে দেওয়ার’ অভিযোগে তাদের আটক করা হয়েছে।
অথচ গত ২৫ জুলাই সরকার আন্দোলনকারীদের আশ্বাস দিয়েছিল যে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা এফআইআর প্রত্যাহার করা হবে। নতুন করে কোনো পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। মাঠের বাস্তবতা এখন সেই আশ্বাসের সঙ্গে মেলে না।
প্রশ্ন হচ্ছে, আন্দোলনের সময় দিল্লিতে পুলিশের সঙ্গে থাকা সাদা পোশাকের ব্যক্তিরা কারা ছিলেন? শিক্ষার্থীদের ওপর এত নির্মমভাবে হামলা কেন হয়েছিল? দিল্লির কেন্দ্রস্থলে পেলেট গান ব্যবহারের নির্দেশ কোথা থেকে এসেছিল? এসব প্রশ্ন এখন আর সরকারের অগ্রাধিকার নয়। অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে মোদিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্টগুলো কীভাবে দ্রুত ইন্টারনেট থেকে সরানো যায়।
কিন্তু যন্তর মন্তরে যারা ছিলেন তারা জানেন যে আন্দোলনের শুরুটা ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ঘিরে হলেও খুব দ্রুত সেখানে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়। কেউ যদি সবকিছুর কৃতিত্ব নিতে চান, তাহলে ব্যর্থতার দায়ও তাঁকেই নিতে হবে। মোদির জনপ্রিয়তা যে বিশাল তাতে সন্দেহ নেই। তাঁর ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে বছরের পর বছর ধরে একটি বিশাল প্রচারযন্ত্র কাজ করেছে। রাস্তার পোস্টার থেকে রেশনের বস্তা, আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র থেকে আন্তর্জাতিক র্যাংকিং—সবখানেই ‘মোদি’ ব্র্যান্ডের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে তাঁর উপস্থিতিই অনেক সময় ফল বদলে দিতে পারে—এমন ধারণাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তাহলে জেন-জির গালিগালাজ নিয়ে এত ভয় কেন?
মোদি নিজেই বহুবার বলেছেন, প্রতিদিন তাঁকে বিপুল পরিমাণ গালাগালি শুনতে হয়। সেটাই নাকি তাঁর সুস্থ থাকার রহস্য। কিন্তু গালাগালির সঙ্গে ব্যাঙ্গের পার্থক্য আছে। গালাগালি মানুষকে আহত করতে পারে। কিন্তু কাউকে হাসির পাত্রে পরিণত করা তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তির জন্য আরও গভীর আঘাত তৈরি করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী মোদি সমালোচনা ও গালাগালিতে তিনি এত দিন বিশেষ বিচলিত হননি। কারণ প্রতিবারই তাঁর মূল সমর্থকগোষ্ঠী আরও দৃঢ়ভাবে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু জেন-জি শুধু মোদিকে গালাগাল করছে না। তারা তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে নির্মাণ করা প্রায় ‘জাতির পিতৃসুলভ’ ভাবমূর্তি তারা ভেঙে দিচ্ছে।
রাস্তায় পোস্টার, স্লোগান, ইনস্টাগ্রাম রিল, মিম—সবখানেই মোদিকে নিয়ে ব্যঙ্গ। এমন সব কথা বলা হচ্ছে, এমন সব ঠাট্টা করা হচ্ছে, যা বুমার বা মিলেনিয়াল প্রজন্মের মানুষ কল্পনাও করতে পারতেন না।
‘ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ হয়েছে, কিন্তু পেট্রলের দাম এত বেশি কেন?’—এমন ব্যঙ্গ থেকে শুরু করে মোদির ত্বকের যত্নের রুটিন জানতে চাওয়া, তাঁকে ক্যামেরা কীভাবে ধরতে হয় তা শেখানো, তাঁর রিলের ফ্রেমিং ও অডিওর মান নিয়ে পরামর্শ দেওয়া—সবই এখন মিমের উপকরণ।
এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ভারতে নতুন নয়। একসময় মনমোহন সিং ও রাহুল গান্ধীকে এভাবেই হাসির পাত্রে পরিণত করা হয়েছিল। তবে পার্থক্য হলো যে তখন এর পেছনে ছিল বিজেপির আইটি সেল, সংগঠিত প্রচারযন্ত্র ও বিপুল অর্থ। এখন জেন-জি সেই কাজটি করছে প্রায় বিনা খরচে আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে।

কয়েক কোটি টাকার প্রিন্ট ও টেলিভিশন প্রচারযন্ত্রও যখন তরুণদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না, তখন প্রধানমন্ত্রীকেই ইনস্টাগ্রাম রিল বানিয়ে জেন-জির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে হচ্ছে।
জেন-জি কি মোদিকে মিমে পরিণত করেছে? এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, ইন্টারনেটে মোদিকে ঘিরে এত দিন ধরে টিকে থাকা সমীহ আর ভয় কি ভেঙে যাচ্ছে? আর এই প্রবণতা থামানো না গেলে, সেটিই কি ভবিষ্যতে নরেন্দ্র মোদির জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হুমকি হয়ে উঠবে?
যন্তর মন্তর, দিল্লি, মুম্বাইসহ বিভিন্ন শহরে মোদিকে নিয়ে যে অশালীন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে অনেকেই আহত হয়েছেন। অভিনেতা অনুপম খেরও এ নিয়ে সরব হয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা—মোদিকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা মানে প্রধানমন্ত্রীর পদ এবং দেশের মর্যাদাকে আক্রমণ করা। যুক্তিটা শুনলে প্রথমে মনে হতে পারে, কথাটির মধ্যে সত্যতা আছে। আবার ভাবলে দেখবেন তিনি মোদি মানেই ভারত—এমন ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
এখানেই অতীত ফিরে আসে।
আজ মোদি যে আগুন, গালাগালি ও অপমানের মুখোমুখি, সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি কে শুরু করেছিল? প্রকাশ্যে মনমোহন সিংকে অপমান করা, তাঁকে নিয়ে রাস্তায় ঠাট্টা করা, তাঁর বিরুদ্ধে কৌতুক ছড়ানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে বিদ্রূপ চালানো—এসবই তো ২০১৪ সালের আগে ও পরে বিজেপির রাজনৈতিক প্রচারের অংশ হয়ে উঠেছিল।
‘মৌনমোহন সিং’ থেকে শুরু করে তাঁকে ‘প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য অস্কার পাওয়া অভিনেতা’ বলা, তাঁকে ‘রিমোট কন্ট্রোলের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উপস্থাপন করা—সবই ছিল সেই প্রচারের অংশ। তাঁকে ‘অক্ষম’ বা ‘ইমপোটেন্ট’ বলেও আক্রমণ করা হয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক মর্যাদা ধ্বংস করার একটি দীর্ঘ প্রচারণা চালানো হয়েছিল।
২০১৪ সালের পর একই কৌশল প্রয়োগ করা হয় রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে। তাঁকে ‘পাপ্পু’ নাম দিয়ে তামাশা করা হয়। বিজেপির নেতাকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মীরা তাঁকে নিয়ে নিয়মিত ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে। গান্ধী ও নেহরুর মতো ঐতিহাসিক নেতারাও সেই ঠাট্টা-তামাশার বাইরে ছিলেন না। নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘদিন এমন অনেক ট্রলকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসরণ করেছেন। পরে তাঁদের কেউ কেউ রাজনৈতিক পুরস্কারও পেয়েছেন।
এখন সেই একই আগুন মোদির দিকেই ফিরছে। তবে পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবার কোনো আইটি সেল নেই। কোনো সংগঠিত অর্থায়ন নেই। এসব কাজ জেন-জি নিজেরাই করছে। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিম বানাচ্ছে, বিদ্রূপ করছে, পোস্ট করছে। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র দিয়ে এই বয়ান নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন।
মোদি জানেন যে এভাবে দীর্ঘদিন কাউকে হাসির পাত্রে পরিণত করার ফল কী হতে পারে। তিনি হয়তো আরেকজন মনমোহন সিং হয়ে যেতে পারেন। অনেক ইস্যুতে ইতিমধ্যে তাঁকে ‘সাইলেন্ট মোদি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর যদি তিনি সত্যিই মিমে পরিণত হন, তাহলে হাজার কোটি রুপির জনসংযোগ ব্যবস্থাও হয়তো তাঁকে রক্ষা করতে পারবে না।
এত দিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক সংগঠন এবং আক্রমণাত্মক ভাষার সাহায্যে বিজেপির প্রচারযন্ত্র বিরোধীদের চুপ করিয়ে রাখতে পেরেছে। উদারপন্থী ও প্রগতিশীলদের বড় একটি অংশ আবার গালাগালির পাল্টা গালি দিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না। ফলে বিজেপির আইটি সেল সহজেই ডিজিটাল আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। তাদের তৈরি বয়ানই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাধান্য পেয়েছে। একপর্যায়ে মানুষ প্রশ্ন করতেও যেন ভয় পেতে শুরু করেছিল।
জেন-জি ভয়কে পাত্তা দিচ্ছে না। জেন-জি ভাষায় কোনো ফিল্টার নেই। অশালীনতা, গালাগালি—কোনোটিই তাদের থামাচ্ছে না। কাউকে ট্রল করতে গেলে তারা এমন মাত্রায় যাচ্ছে যা আগের প্রজন্মের কাছে অকল্পনীয়। তাদের অনেকের হারানোর মতো খুব বেশি কিছু নেই। চাকরি সহজে মিলছে না। তাই হাতে সময় আছে। আর তারা যে বাস্তবতা দেখছে, সেটিকে আড়াল করার কোনো কারণও তাদের নেই।
এই কারণেই জেন-জির প্রতিবাদে প্রচলিত প্রতিবাদের ধরনও বদলে গেছে।
প্রতিবাদ মানেই সাদা পাঞ্জাবি, কাঁধে ঝোলা, ক্ষুধার্ত মুখ, গম্ভীর স্লোগান—এমন একটি পুরোনো ‘ম্যানুয়াল’ ভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল। জেন-জি দেখিয়ে দিয়েছে, প্রতিবাদ একই সঙ্গে চিল মুডের পার্টিও হতে পারে।
যখন মানুষ একটি ভয়ংকর প্রতিবাদকেও উৎসব বা আনন্দের ঘটনায় পরিণত করে ফেলে তখন সরকার ভয় পায়। কারণ তখন ভয় দেখিয়ে মানুষকে ঘরে ফেরানো কঠিন হয়ে যায়। বিজেপি সেটি বুঝতে পারছে।
জুলাইয়ের ২০ তারিখে পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে, পেলেট গান ব্যবহার করেছে, বিক্ষোভকারীদের নির্মমভাবে পিটিয়েছে। সরকারের হয়তো ধারণা ছিল যে এতে তরুণরা ভয় পেয়ে বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু ঘটেছে উল্টো।
প্রতিবাদকারীরা মার খাওয়াকে লজ্জার বিষয় বানায়নি। দিল্লির বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা প্রতিবাদ করেছে, আবার যন্তর মন্তরে ফিরে গেছে। কেউ পুলিশি অভিযানের মাঝেও ছুটতে ছুটতে ঠাট্টা করেছে। কেউ পুলিশের সামনে ‘ফিট চেক’ ভিডিও বানিয়েছে। ক্যাপশনে লিখেছে—‘পুলিশের হাতে মার খেতে যাচ্ছি, বন্ধুরা।’
কেউ টিয়ার গ্যাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে রিভিউ দিয়েছে—‘বেশ কড়া জিনিস।’ কেউ দিল্লি পুলিশকে নিজের ‘পার্টনার’ বানিয়ে কাপল-স্টাইল রিল করেছে। টিয়ার গ্যাসকে ব্যঙ্গ করে বলা হয়েছে ‘জিরো পার্সেন্ট ইথানল’—সরকারের ইথানল মিশ্রণ নীতির প্রতি কটাক্ষ করে।

অনেকে স্ট্রাভা অ্যাপের স্ক্রিনশট পোস্ট করেছে। লাঠিচার্জ থেকে পালানোর সময় কত কিলোমিটার দৌড়েছে, সেটিকেই তারা ফিটনেস অর্জন হিসেবে দেখিয়েছে। একজন এটিকে তুলনা করেছে জনপ্রিয় মোবাইল গেম ‘সাবওয়ে সার্ফার্স’-এর সঙ্গে—যেখানে বাধা এড়িয়ে দৌড়াতে হয়।
ইন্টারনেটে লাঠিচার্জের মিম এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে দিল্লির বাইরে থাকা মানুষও যেন ‘ফোমো’তে ভুগতে শুরু করে—কেন তারা সেখানে গিয়ে পুলিশের লাঠি খাওয়ার সুযোগ পেল না!
পরদিন যন্তর মন্তরে ভিড় আরও বেড়ে যায়। একপর্যায়ে জায়গাটির পরিবেশ প্রতিবাদস্থলের চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে কার্নিভালের মতো।
কস্টিউম নিয়েও শুরু হয় খেলা। কেউ স্পাইডারম্যানের মুখোশ পরে আসে, কেউ ব্যাটম্যান। কেউ ভালুক, কেউ ডাইনোসর সেজে আসে। এমনকি পাওয়ার রেঞ্জার্স দলের মতো পুরো সাজেও কাউকে কাউকে দেখা যায়। পোস্টার তো ছিলই।
এই তরুণরা কোথা থেকে এল—সরকারের কাছে হয়তো প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ।
তারা সেই জগত থেকেই এসেছে, যাকে এত দিন প্রশ্ন না করতে বলা হয়েছিল। ‘ভালো দিন’ আসবে—এই প্রতিশ্রুতি শুনে বড় হয়েছে তারা। এত দিন যা হাসির বিষয় বলে মনে হতে পারে, আজ সেটিই সরকারের কাছে জরুরি পরিস্থিতিতে পরিণত হয়েছে।
এর কারণ শুধু ব্যঙ্গ নয়। কারণ ব্যঙ্গের রাজনৈতিক শক্তি।
রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে গবেষণায় বহুবার দেখা গেছে। সরাসরি রাজনৈতিক সমালোচনার তুলনায় ব্যঙ্গ, হাস্যরস ও মিম অনেক সময় কোনো নেতার ভাবমূর্তির ওপর বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। সরাসরি সমালোচনা মানুষকে রাজনৈতিক বক্তব্য শোনায়। কিন্তু ব্যঙ্গ সেই বক্তব্যকে হাসি বা মিম হিসেবে স্থায়ী করে দেয়।
আর একবার কোনো রাজনৈতিক নেতার একটি নির্দিষ্ট হাস্যকর ছবি মানুষের মনে বসে গেলে সেটি মুছে ফেলা অত্যন্ত কঠিন।
‘ব্র্যান্ড মোদি’ গত ১২ থেকে ১৫ বছরে শক্তিশালী নেতৃত্ব, উন্নয়ন, হিন্দুত্ব ও জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তির ওপর দাঁড় করানো হয়েছে। এটি পরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়েছে। এই ব্র্যান্ড এত দিন শক্তিশালী ছিল কারণ এর কেন্দ্রে ছিলেন এক নেতা—যাঁকে ব্যঙ্গের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছিল।
মোদিকে অন্য নেতাদের চেয়ে ওপরে, সমালোচনার ঊর্ধ্বে এবং ব্যঙ্গের নাগালের বাইরে রাখা হয়েছে। সংসদে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁকে ব্যস্ত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেখানো হয়েছে। দেশ গড়া, পুনর্গঠন করা, ভারতকে ‘বিশ্বগুরু’ বানানো, দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজ করা—এসবের মধ্যেই যেন তাঁর সময় শেষ।
কিন্তু এখন মিম নির্মাতারাও দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজ করছে—আর বিপুল ভিউ পাচ্ছে। অ্যালগরিদমও জনপ্রিয় মিমকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। যেন দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মানুষের ক্ষোভ একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়েছে।
মোদি সরকার অতীতে অন্যদের সঙ্গে একই কাজ করেছে। ফলে মিমের শক্তি তারা ভালো করেই জানে। একটি ছবি বারবার মানুষের ফিডে এলে সেটি ধীরে ধীরে মানুষের মনে গেঁথে যায়। এরপর সেটিকে সেখান থেকে সরানো কঠিন।

ইতিহাস তাই যেন পুনরাবৃত্তি করছে। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়। বিজেপি নিজের আইটি সেল থেকে মনমোহন সিং ও রাহুল গান্ধীর ক্ষেত্রে ব্যঙ-বিদ্রুপ করেছে। এখন মোদিকে নিয়ে মিম ছড়াচ্ছে নিচ থেকে ওপরের দিকে। জেন-জি নিজেরাই তৈরি করছে, নিজেরাই ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই ‘বটম-আপ’ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন।
এ কারণেই বিজেপি এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে এই বয়ানের মোকাবিলা করতে চাইছে। পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজছে। ভবিষ্যতে হয়তো এর সঙ্গে পাকিস্তানি যোগাযোগের অভিযোগও সামনে আসতে পারে। বিহারেও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এফআইআর, আটক ও ভয় দেখানোর খবর এসেছে।
কিন্তু এখানেই সরকারের জন্য বিপদ। কারণ রাষ্ট্রীয় চাপ যত বাড়বে, জেন-জির প্রতিক্রিয়াও তত তীব্র হতে পারে। তাদের কিছু করতে নিষেধ করা হলে তারা সেটা আরও বেশি করে। মোদিকে নিয়ে আরও মিম, আরও বেশি ব্যঙ্গ ছড়াতে পারে।
প্রশ্ন তাই—জেন-জির হাত ধরে কি কোনো নতুন রাজনৈতিক বিস্ফোরণের সূচনা হচ্ছে? এত বছর ধরে বিজেপি যে বয়ানগত নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, তা কি ভেঙে যাচ্ছে?
একটি অনলাইন জরিপেও এই প্রশ্নের প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রায় ৩০ হাজার ভোটের মধ্যে ৬৭ শতাংশ মনে করেছে, সরকারের বয়ানগত নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়ে গেছে। ৩৩ শতাংশের মনে করেন যে মোদি আবার সেটি ফিরিয়ে আনতে পারবেন। মোদি ইতিমধ্যে ইনস্টাগ্রাম লাইভে একাধিকবার এসেছেন, তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। অর্থাৎ সরকার নিজেও সমস্যাটির গুরুত্ব বুঝতে পারছে।
বিজেপির অন্য নেতারাও এখন একই ঝুঁকি দেখছেন। নিতিন গড়করিও মিম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যঙ্গ নিয়ে আইনি পদক্ষেপের চেষ্টা করছেন। মেটা, এক্স ও গুগলের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু মিমের বিরুদ্ধে মামলা করে কি মিম থামানো যায়?
আরেকটি বিষয়ও সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর পদ ও রাষ্ট্রের মর্যাদা নিয়ে অশালীন ভাষা ব্যবহারের নৈতিকতা। এখানে ভারতের ডানপন্থী রাজনৈতিক পরিসরের কিছু বক্তব্যও মনে রাখা জরুরি।
আরএসএস-ঘনিষ্ঠ মতাদর্শিক পরিসরের জনপ্রিয় ইউটিউবার টিজি মোহানদাস যন্তর মন্তরের নারী বিক্ষোভকারীদের নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। তিনি এমনকি বলেছেন, সেখানে নারীরা যৌন নিপীড়নের শিকার হলেও অভিযোগ করবেন না। তাঁদের নাকি সেটি পছন্দ। পরিস্থিতি তাঁর হাতে থাকলে তিনি যন্তর মন্তরে কারফিউ জারি করে কয়েকবার ঘোষণা দিতেন। এরপর গুলি চালাতেন। চার ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে মৃতদেহগুলো হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতেন—এমন বক্তব্যও তিনি দিয়েছেন।
এমন বক্তব্যের মধ্যে ভারতের ডানপন্থী রাজনীতির একটি পুরোনো প্রবণতা স্পষ্ট হয়—প্রতিবাদ দমন করতে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ।
কিন্তু জেন-জির ক্ষেত্রে এই ভাষা কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন প্রশ্ন। আজ ভারতের সামনে এক ধরনের ডিজিটাল মহাভারতের যুদ্ধ। একদিকে জেন-জি, অন্যদিকে মোদি সরকারের বিশাল রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও প্রচারযন্ত্র। জেন-জি কি এই ডিজিটাল মহাভারতে টিকে থাকতে পারবে?
সরকারের হাতে অবশ্য একটি সুবিধা আছে। জেন-জির মনোযোগের স্থায়িত্ব খুব কম। আজ যে বিষয় নিয়ে তারা উত্তাল, কাল তারা অন্য কোনো বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে যেতে পারে। সরকারও তখন অপেক্ষা করে নতুন কোনো বয়ান সামনে আনতে পারে।
তবে এই জায়গায় বিরোধী রাজনীতির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
রাহুল গান্ধীও আক্রমণাত্মকভাবে প্রশ্ন করছেন অমিত শাহকে। দিল্লির মাঝখানে পেলেট গান ব্যবহারের ঘটনাটিকে তিনি সামনে আনছেন। এমন আক্রমণাত্মক, প্রশ্নমুখর ও আত্মবিশ্বাসী নাগরিক সমাজই গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রয়োজন একটি আক্রমণাত্মক কিন্তু শৃঙ্খলাবদ্ধ বিরোধী দল।
শুধু তরুণদের ক্ষোভ দিয়ে গণতন্ত্র রক্ষা হয় না। একটি ক্ষুব্ধ প্রজন্মকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে সংগঠন, নেতৃত্ব, ধারাবাহিকতা এবং বিকল্প বয়ান প্রয়োজন।
এত দিন সরকার ধরে নিয়েছিল যে, যা খুশি করা যায়। তাতে কিছুই হবে না। জেন-জি সেই আত্মতুষ্টিতে আঘাত করেছে। তারা প্রশ্ন করতে শিখেছে, ভয়কে উপহাস করতে শিখেছে, পুলিশের লাঠিচার্জকেও মিমে পরিণত করেছে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—একজন শক্তিশালী নেতাকে হাসির পাত্রে পরিণত করার ভয় কাটিয়ে উঠেছে।
এটাই হয়তো এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য।
তবে এখানেই শেষ নয়। গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের লড়াই যদি এগিয়ে নিতে হয়, তাহলে শুধু জেন-জির ওপর নির্ভর করলে হবে না। নাগরিক সমাজ, বিরোধী দল এবং সাধারণ মানুষ—সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
কারণ কোনো সরকারের ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার পুলিশ, প্রশাসন, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা প্রচারযন্ত্র নয়। তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের ভয়।
আর কোনো এক প্রজন্ম যখন সেই ভয়কে ভয় না পেয়ে হাসতে শুরু করে, তখন ক্ষমতার সবচেয়ে যত্নে নির্মিত ভাবমূর্তিতেও ফাটল দেখা দিতে পারে।
(দ্য দেশভক্তের ইউটিউব কন্টেন্টের লিখিত অনুবাদ)

ভারতে ছাত্রদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ আপাতত থেমেছে। শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। দিল্লির যন্তর মন্তর পরিষ্কার করা হয়েছে। দেয়ালের গ্রাফিতি মুছে ফেলা হয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ও যেন আপাতত নিজেদের পর্ব শেষ করেছে। অন্যদিকে বিজেপি আবার সংসদে নিজেদের বিল পাস করানোর কাজে ফিরেছে।
সরকারও বলতে চায় যে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা এত সহজ নয়। গত সপ্তাহে ককরোচ জনতা পার্টি ও জেন-জির হাতে মোদি সরকার ধাক্কা খেয়েছে। তার অভিঘাত এখনো স্পষ্ট। গত ১২ বছরে প্রথমবারের মতো সরকার, সরকারপন্থী গণমাধ্যম এবং তাদের ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্সাররা নিজেদের তৈরি করা বয়ান দিয়ে ঘটনাটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
আর সেই কারণেই সরকারের পাল্টা ব্যবস্থা শুরু হয়েছে—এফআইআর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট সরানোর নির্দেশ, শিক্ষার্থীদের বাড়ি ও হোস্টেলে পুলিশের অভিযান এবং গ্রেপ্তার বা আটক।
ধর্মেন্দ্র প্রধানকে যত খুশি সমালোচনা করা যেতেই পারে, কিন্তু শিক্ষার্থীরা সীমা অতিক্রম করেছে—মোটামুটি এটাই সরকারের বর্তমান অবস্থান। দিল্লি পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে আপত্তিকর ভাষা ও গালিগালাজপূর্ণ পোস্ট সরিয়ে ফেলতে। কয়েকটি রাজ্যে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের বাড়ি ও হোস্টেলে পুলিশ গেছে। ‘অরাজকতা উসকে দেওয়ার’ অভিযোগে তাদের আটক করা হয়েছে।
অথচ গত ২৫ জুলাই সরকার আন্দোলনকারীদের আশ্বাস দিয়েছিল যে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা এফআইআর প্রত্যাহার করা হবে। নতুন করে কোনো পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। মাঠের বাস্তবতা এখন সেই আশ্বাসের সঙ্গে মেলে না।
প্রশ্ন হচ্ছে, আন্দোলনের সময় দিল্লিতে পুলিশের সঙ্গে থাকা সাদা পোশাকের ব্যক্তিরা কারা ছিলেন? শিক্ষার্থীদের ওপর এত নির্মমভাবে হামলা কেন হয়েছিল? দিল্লির কেন্দ্রস্থলে পেলেট গান ব্যবহারের নির্দেশ কোথা থেকে এসেছিল? এসব প্রশ্ন এখন আর সরকারের অগ্রাধিকার নয়। অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে মোদিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্টগুলো কীভাবে দ্রুত ইন্টারনেট থেকে সরানো যায়।
কিন্তু যন্তর মন্তরে যারা ছিলেন তারা জানেন যে আন্দোলনের শুরুটা ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ঘিরে হলেও খুব দ্রুত সেখানে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়। কেউ যদি সবকিছুর কৃতিত্ব নিতে চান, তাহলে ব্যর্থতার দায়ও তাঁকেই নিতে হবে। মোদির জনপ্রিয়তা যে বিশাল তাতে সন্দেহ নেই। তাঁর ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে বছরের পর বছর ধরে একটি বিশাল প্রচারযন্ত্র কাজ করেছে। রাস্তার পোস্টার থেকে রেশনের বস্তা, আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র থেকে আন্তর্জাতিক র্যাংকিং—সবখানেই ‘মোদি’ ব্র্যান্ডের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে তাঁর উপস্থিতিই অনেক সময় ফল বদলে দিতে পারে—এমন ধারণাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তাহলে জেন-জির গালিগালাজ নিয়ে এত ভয় কেন?
মোদি নিজেই বহুবার বলেছেন, প্রতিদিন তাঁকে বিপুল পরিমাণ গালাগালি শুনতে হয়। সেটাই নাকি তাঁর সুস্থ থাকার রহস্য। কিন্তু গালাগালির সঙ্গে ব্যাঙ্গের পার্থক্য আছে। গালাগালি মানুষকে আহত করতে পারে। কিন্তু কাউকে হাসির পাত্রে পরিণত করা তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তির জন্য আরও গভীর আঘাত তৈরি করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী মোদি সমালোচনা ও গালাগালিতে তিনি এত দিন বিশেষ বিচলিত হননি। কারণ প্রতিবারই তাঁর মূল সমর্থকগোষ্ঠী আরও দৃঢ়ভাবে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু জেন-জি শুধু মোদিকে গালাগাল করছে না। তারা তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে নির্মাণ করা প্রায় ‘জাতির পিতৃসুলভ’ ভাবমূর্তি তারা ভেঙে দিচ্ছে।
রাস্তায় পোস্টার, স্লোগান, ইনস্টাগ্রাম রিল, মিম—সবখানেই মোদিকে নিয়ে ব্যঙ্গ। এমন সব কথা বলা হচ্ছে, এমন সব ঠাট্টা করা হচ্ছে, যা বুমার বা মিলেনিয়াল প্রজন্মের মানুষ কল্পনাও করতে পারতেন না।
‘ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ হয়েছে, কিন্তু পেট্রলের দাম এত বেশি কেন?’—এমন ব্যঙ্গ থেকে শুরু করে মোদির ত্বকের যত্নের রুটিন জানতে চাওয়া, তাঁকে ক্যামেরা কীভাবে ধরতে হয় তা শেখানো, তাঁর রিলের ফ্রেমিং ও অডিওর মান নিয়ে পরামর্শ দেওয়া—সবই এখন মিমের উপকরণ।
এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ভারতে নতুন নয়। একসময় মনমোহন সিং ও রাহুল গান্ধীকে এভাবেই হাসির পাত্রে পরিণত করা হয়েছিল। তবে পার্থক্য হলো যে তখন এর পেছনে ছিল বিজেপির আইটি সেল, সংগঠিত প্রচারযন্ত্র ও বিপুল অর্থ। এখন জেন-জি সেই কাজটি করছে প্রায় বিনা খরচে আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে।

কয়েক কোটি টাকার প্রিন্ট ও টেলিভিশন প্রচারযন্ত্রও যখন তরুণদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না, তখন প্রধানমন্ত্রীকেই ইনস্টাগ্রাম রিল বানিয়ে জেন-জির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে হচ্ছে।
জেন-জি কি মোদিকে মিমে পরিণত করেছে? এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, ইন্টারনেটে মোদিকে ঘিরে এত দিন ধরে টিকে থাকা সমীহ আর ভয় কি ভেঙে যাচ্ছে? আর এই প্রবণতা থামানো না গেলে, সেটিই কি ভবিষ্যতে নরেন্দ্র মোদির জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হুমকি হয়ে উঠবে?
যন্তর মন্তর, দিল্লি, মুম্বাইসহ বিভিন্ন শহরে মোদিকে নিয়ে যে অশালীন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে অনেকেই আহত হয়েছেন। অভিনেতা অনুপম খেরও এ নিয়ে সরব হয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা—মোদিকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা মানে প্রধানমন্ত্রীর পদ এবং দেশের মর্যাদাকে আক্রমণ করা। যুক্তিটা শুনলে প্রথমে মনে হতে পারে, কথাটির মধ্যে সত্যতা আছে। আবার ভাবলে দেখবেন তিনি মোদি মানেই ভারত—এমন ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
এখানেই অতীত ফিরে আসে।
আজ মোদি যে আগুন, গালাগালি ও অপমানের মুখোমুখি, সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি কে শুরু করেছিল? প্রকাশ্যে মনমোহন সিংকে অপমান করা, তাঁকে নিয়ে রাস্তায় ঠাট্টা করা, তাঁর বিরুদ্ধে কৌতুক ছড়ানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে বিদ্রূপ চালানো—এসবই তো ২০১৪ সালের আগে ও পরে বিজেপির রাজনৈতিক প্রচারের অংশ হয়ে উঠেছিল।
‘মৌনমোহন সিং’ থেকে শুরু করে তাঁকে ‘প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য অস্কার পাওয়া অভিনেতা’ বলা, তাঁকে ‘রিমোট কন্ট্রোলের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উপস্থাপন করা—সবই ছিল সেই প্রচারের অংশ। তাঁকে ‘অক্ষম’ বা ‘ইমপোটেন্ট’ বলেও আক্রমণ করা হয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক মর্যাদা ধ্বংস করার একটি দীর্ঘ প্রচারণা চালানো হয়েছিল।
২০১৪ সালের পর একই কৌশল প্রয়োগ করা হয় রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে। তাঁকে ‘পাপ্পু’ নাম দিয়ে তামাশা করা হয়। বিজেপির নেতাকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মীরা তাঁকে নিয়ে নিয়মিত ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে। গান্ধী ও নেহরুর মতো ঐতিহাসিক নেতারাও সেই ঠাট্টা-তামাশার বাইরে ছিলেন না। নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘদিন এমন অনেক ট্রলকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসরণ করেছেন। পরে তাঁদের কেউ কেউ রাজনৈতিক পুরস্কারও পেয়েছেন।
এখন সেই একই আগুন মোদির দিকেই ফিরছে। তবে পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবার কোনো আইটি সেল নেই। কোনো সংগঠিত অর্থায়ন নেই। এসব কাজ জেন-জি নিজেরাই করছে। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিম বানাচ্ছে, বিদ্রূপ করছে, পোস্ট করছে। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র দিয়ে এই বয়ান নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন।
মোদি জানেন যে এভাবে দীর্ঘদিন কাউকে হাসির পাত্রে পরিণত করার ফল কী হতে পারে। তিনি হয়তো আরেকজন মনমোহন সিং হয়ে যেতে পারেন। অনেক ইস্যুতে ইতিমধ্যে তাঁকে ‘সাইলেন্ট মোদি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর যদি তিনি সত্যিই মিমে পরিণত হন, তাহলে হাজার কোটি রুপির জনসংযোগ ব্যবস্থাও হয়তো তাঁকে রক্ষা করতে পারবে না।
এত দিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক সংগঠন এবং আক্রমণাত্মক ভাষার সাহায্যে বিজেপির প্রচারযন্ত্র বিরোধীদের চুপ করিয়ে রাখতে পেরেছে। উদারপন্থী ও প্রগতিশীলদের বড় একটি অংশ আবার গালাগালির পাল্টা গালি দিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না। ফলে বিজেপির আইটি সেল সহজেই ডিজিটাল আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। তাদের তৈরি বয়ানই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাধান্য পেয়েছে। একপর্যায়ে মানুষ প্রশ্ন করতেও যেন ভয় পেতে শুরু করেছিল।
জেন-জি ভয়কে পাত্তা দিচ্ছে না। জেন-জি ভাষায় কোনো ফিল্টার নেই। অশালীনতা, গালাগালি—কোনোটিই তাদের থামাচ্ছে না। কাউকে ট্রল করতে গেলে তারা এমন মাত্রায় যাচ্ছে যা আগের প্রজন্মের কাছে অকল্পনীয়। তাদের অনেকের হারানোর মতো খুব বেশি কিছু নেই। চাকরি সহজে মিলছে না। তাই হাতে সময় আছে। আর তারা যে বাস্তবতা দেখছে, সেটিকে আড়াল করার কোনো কারণও তাদের নেই।
এই কারণেই জেন-জির প্রতিবাদে প্রচলিত প্রতিবাদের ধরনও বদলে গেছে।
প্রতিবাদ মানেই সাদা পাঞ্জাবি, কাঁধে ঝোলা, ক্ষুধার্ত মুখ, গম্ভীর স্লোগান—এমন একটি পুরোনো ‘ম্যানুয়াল’ ভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল। জেন-জি দেখিয়ে দিয়েছে, প্রতিবাদ একই সঙ্গে চিল মুডের পার্টিও হতে পারে।
যখন মানুষ একটি ভয়ংকর প্রতিবাদকেও উৎসব বা আনন্দের ঘটনায় পরিণত করে ফেলে তখন সরকার ভয় পায়। কারণ তখন ভয় দেখিয়ে মানুষকে ঘরে ফেরানো কঠিন হয়ে যায়। বিজেপি সেটি বুঝতে পারছে।
জুলাইয়ের ২০ তারিখে পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে, পেলেট গান ব্যবহার করেছে, বিক্ষোভকারীদের নির্মমভাবে পিটিয়েছে। সরকারের হয়তো ধারণা ছিল যে এতে তরুণরা ভয় পেয়ে বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু ঘটেছে উল্টো।
প্রতিবাদকারীরা মার খাওয়াকে লজ্জার বিষয় বানায়নি। দিল্লির বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা প্রতিবাদ করেছে, আবার যন্তর মন্তরে ফিরে গেছে। কেউ পুলিশি অভিযানের মাঝেও ছুটতে ছুটতে ঠাট্টা করেছে। কেউ পুলিশের সামনে ‘ফিট চেক’ ভিডিও বানিয়েছে। ক্যাপশনে লিখেছে—‘পুলিশের হাতে মার খেতে যাচ্ছি, বন্ধুরা।’
কেউ টিয়ার গ্যাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে রিভিউ দিয়েছে—‘বেশ কড়া জিনিস।’ কেউ দিল্লি পুলিশকে নিজের ‘পার্টনার’ বানিয়ে কাপল-স্টাইল রিল করেছে। টিয়ার গ্যাসকে ব্যঙ্গ করে বলা হয়েছে ‘জিরো পার্সেন্ট ইথানল’—সরকারের ইথানল মিশ্রণ নীতির প্রতি কটাক্ষ করে।

অনেকে স্ট্রাভা অ্যাপের স্ক্রিনশট পোস্ট করেছে। লাঠিচার্জ থেকে পালানোর সময় কত কিলোমিটার দৌড়েছে, সেটিকেই তারা ফিটনেস অর্জন হিসেবে দেখিয়েছে। একজন এটিকে তুলনা করেছে জনপ্রিয় মোবাইল গেম ‘সাবওয়ে সার্ফার্স’-এর সঙ্গে—যেখানে বাধা এড়িয়ে দৌড়াতে হয়।
ইন্টারনেটে লাঠিচার্জের মিম এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে দিল্লির বাইরে থাকা মানুষও যেন ‘ফোমো’তে ভুগতে শুরু করে—কেন তারা সেখানে গিয়ে পুলিশের লাঠি খাওয়ার সুযোগ পেল না!
পরদিন যন্তর মন্তরে ভিড় আরও বেড়ে যায়। একপর্যায়ে জায়গাটির পরিবেশ প্রতিবাদস্থলের চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে কার্নিভালের মতো।
কস্টিউম নিয়েও শুরু হয় খেলা। কেউ স্পাইডারম্যানের মুখোশ পরে আসে, কেউ ব্যাটম্যান। কেউ ভালুক, কেউ ডাইনোসর সেজে আসে। এমনকি পাওয়ার রেঞ্জার্স দলের মতো পুরো সাজেও কাউকে কাউকে দেখা যায়। পোস্টার তো ছিলই।
এই তরুণরা কোথা থেকে এল—সরকারের কাছে হয়তো প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ।
তারা সেই জগত থেকেই এসেছে, যাকে এত দিন প্রশ্ন না করতে বলা হয়েছিল। ‘ভালো দিন’ আসবে—এই প্রতিশ্রুতি শুনে বড় হয়েছে তারা। এত দিন যা হাসির বিষয় বলে মনে হতে পারে, আজ সেটিই সরকারের কাছে জরুরি পরিস্থিতিতে পরিণত হয়েছে।
এর কারণ শুধু ব্যঙ্গ নয়। কারণ ব্যঙ্গের রাজনৈতিক শক্তি।
রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে গবেষণায় বহুবার দেখা গেছে। সরাসরি রাজনৈতিক সমালোচনার তুলনায় ব্যঙ্গ, হাস্যরস ও মিম অনেক সময় কোনো নেতার ভাবমূর্তির ওপর বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। সরাসরি সমালোচনা মানুষকে রাজনৈতিক বক্তব্য শোনায়। কিন্তু ব্যঙ্গ সেই বক্তব্যকে হাসি বা মিম হিসেবে স্থায়ী করে দেয়।
আর একবার কোনো রাজনৈতিক নেতার একটি নির্দিষ্ট হাস্যকর ছবি মানুষের মনে বসে গেলে সেটি মুছে ফেলা অত্যন্ত কঠিন।
‘ব্র্যান্ড মোদি’ গত ১২ থেকে ১৫ বছরে শক্তিশালী নেতৃত্ব, উন্নয়ন, হিন্দুত্ব ও জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তির ওপর দাঁড় করানো হয়েছে। এটি পরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়েছে। এই ব্র্যান্ড এত দিন শক্তিশালী ছিল কারণ এর কেন্দ্রে ছিলেন এক নেতা—যাঁকে ব্যঙ্গের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছিল।
মোদিকে অন্য নেতাদের চেয়ে ওপরে, সমালোচনার ঊর্ধ্বে এবং ব্যঙ্গের নাগালের বাইরে রাখা হয়েছে। সংসদে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁকে ব্যস্ত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেখানো হয়েছে। দেশ গড়া, পুনর্গঠন করা, ভারতকে ‘বিশ্বগুরু’ বানানো, দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজ করা—এসবের মধ্যেই যেন তাঁর সময় শেষ।
কিন্তু এখন মিম নির্মাতারাও দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজ করছে—আর বিপুল ভিউ পাচ্ছে। অ্যালগরিদমও জনপ্রিয় মিমকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। যেন দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মানুষের ক্ষোভ একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়েছে।
মোদি সরকার অতীতে অন্যদের সঙ্গে একই কাজ করেছে। ফলে মিমের শক্তি তারা ভালো করেই জানে। একটি ছবি বারবার মানুষের ফিডে এলে সেটি ধীরে ধীরে মানুষের মনে গেঁথে যায়। এরপর সেটিকে সেখান থেকে সরানো কঠিন।

ইতিহাস তাই যেন পুনরাবৃত্তি করছে। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়। বিজেপি নিজের আইটি সেল থেকে মনমোহন সিং ও রাহুল গান্ধীর ক্ষেত্রে ব্যঙ-বিদ্রুপ করেছে। এখন মোদিকে নিয়ে মিম ছড়াচ্ছে নিচ থেকে ওপরের দিকে। জেন-জি নিজেরাই তৈরি করছে, নিজেরাই ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই ‘বটম-আপ’ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন।
এ কারণেই বিজেপি এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে এই বয়ানের মোকাবিলা করতে চাইছে। পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজছে। ভবিষ্যতে হয়তো এর সঙ্গে পাকিস্তানি যোগাযোগের অভিযোগও সামনে আসতে পারে। বিহারেও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এফআইআর, আটক ও ভয় দেখানোর খবর এসেছে।
কিন্তু এখানেই সরকারের জন্য বিপদ। কারণ রাষ্ট্রীয় চাপ যত বাড়বে, জেন-জির প্রতিক্রিয়াও তত তীব্র হতে পারে। তাদের কিছু করতে নিষেধ করা হলে তারা সেটা আরও বেশি করে। মোদিকে নিয়ে আরও মিম, আরও বেশি ব্যঙ্গ ছড়াতে পারে।
প্রশ্ন তাই—জেন-জির হাত ধরে কি কোনো নতুন রাজনৈতিক বিস্ফোরণের সূচনা হচ্ছে? এত বছর ধরে বিজেপি যে বয়ানগত নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, তা কি ভেঙে যাচ্ছে?
একটি অনলাইন জরিপেও এই প্রশ্নের প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রায় ৩০ হাজার ভোটের মধ্যে ৬৭ শতাংশ মনে করেছে, সরকারের বয়ানগত নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়ে গেছে। ৩৩ শতাংশের মনে করেন যে মোদি আবার সেটি ফিরিয়ে আনতে পারবেন। মোদি ইতিমধ্যে ইনস্টাগ্রাম লাইভে একাধিকবার এসেছেন, তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। অর্থাৎ সরকার নিজেও সমস্যাটির গুরুত্ব বুঝতে পারছে।
বিজেপির অন্য নেতারাও এখন একই ঝুঁকি দেখছেন। নিতিন গড়করিও মিম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যঙ্গ নিয়ে আইনি পদক্ষেপের চেষ্টা করছেন। মেটা, এক্স ও গুগলের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু মিমের বিরুদ্ধে মামলা করে কি মিম থামানো যায়?
আরেকটি বিষয়ও সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর পদ ও রাষ্ট্রের মর্যাদা নিয়ে অশালীন ভাষা ব্যবহারের নৈতিকতা। এখানে ভারতের ডানপন্থী রাজনৈতিক পরিসরের কিছু বক্তব্যও মনে রাখা জরুরি।
আরএসএস-ঘনিষ্ঠ মতাদর্শিক পরিসরের জনপ্রিয় ইউটিউবার টিজি মোহানদাস যন্তর মন্তরের নারী বিক্ষোভকারীদের নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। তিনি এমনকি বলেছেন, সেখানে নারীরা যৌন নিপীড়নের শিকার হলেও অভিযোগ করবেন না। তাঁদের নাকি সেটি পছন্দ। পরিস্থিতি তাঁর হাতে থাকলে তিনি যন্তর মন্তরে কারফিউ জারি করে কয়েকবার ঘোষণা দিতেন। এরপর গুলি চালাতেন। চার ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে মৃতদেহগুলো হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতেন—এমন বক্তব্যও তিনি দিয়েছেন।
এমন বক্তব্যের মধ্যে ভারতের ডানপন্থী রাজনীতির একটি পুরোনো প্রবণতা স্পষ্ট হয়—প্রতিবাদ দমন করতে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ।
কিন্তু জেন-জির ক্ষেত্রে এই ভাষা কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন প্রশ্ন। আজ ভারতের সামনে এক ধরনের ডিজিটাল মহাভারতের যুদ্ধ। একদিকে জেন-জি, অন্যদিকে মোদি সরকারের বিশাল রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও প্রচারযন্ত্র। জেন-জি কি এই ডিজিটাল মহাভারতে টিকে থাকতে পারবে?
সরকারের হাতে অবশ্য একটি সুবিধা আছে। জেন-জির মনোযোগের স্থায়িত্ব খুব কম। আজ যে বিষয় নিয়ে তারা উত্তাল, কাল তারা অন্য কোনো বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে যেতে পারে। সরকারও তখন অপেক্ষা করে নতুন কোনো বয়ান সামনে আনতে পারে।
তবে এই জায়গায় বিরোধী রাজনীতির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
রাহুল গান্ধীও আক্রমণাত্মকভাবে প্রশ্ন করছেন অমিত শাহকে। দিল্লির মাঝখানে পেলেট গান ব্যবহারের ঘটনাটিকে তিনি সামনে আনছেন। এমন আক্রমণাত্মক, প্রশ্নমুখর ও আত্মবিশ্বাসী নাগরিক সমাজই গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রয়োজন একটি আক্রমণাত্মক কিন্তু শৃঙ্খলাবদ্ধ বিরোধী দল।
শুধু তরুণদের ক্ষোভ দিয়ে গণতন্ত্র রক্ষা হয় না। একটি ক্ষুব্ধ প্রজন্মকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে সংগঠন, নেতৃত্ব, ধারাবাহিকতা এবং বিকল্প বয়ান প্রয়োজন।
এত দিন সরকার ধরে নিয়েছিল যে, যা খুশি করা যায়। তাতে কিছুই হবে না। জেন-জি সেই আত্মতুষ্টিতে আঘাত করেছে। তারা প্রশ্ন করতে শিখেছে, ভয়কে উপহাস করতে শিখেছে, পুলিশের লাঠিচার্জকেও মিমে পরিণত করেছে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—একজন শক্তিশালী নেতাকে হাসির পাত্রে পরিণত করার ভয় কাটিয়ে উঠেছে।
এটাই হয়তো এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য।
তবে এখানেই শেষ নয়। গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের লড়াই যদি এগিয়ে নিতে হয়, তাহলে শুধু জেন-জির ওপর নির্ভর করলে হবে না। নাগরিক সমাজ, বিরোধী দল এবং সাধারণ মানুষ—সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
কারণ কোনো সরকারের ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার পুলিশ, প্রশাসন, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা প্রচারযন্ত্র নয়। তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের ভয়।
আর কোনো এক প্রজন্ম যখন সেই ভয়কে ভয় না পেয়ে হাসতে শুরু করে, তখন ক্ষমতার সবচেয়ে যত্নে নির্মিত ভাবমূর্তিতেও ফাটল দেখা দিতে পারে।
(দ্য দেশভক্তের ইউটিউব কন্টেন্টের লিখিত অনুবাদ)
.png)

চতুর্থবারের মতো ব্রিকসের সভাপতিত্ব করছে ভারত। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। এবার সম্মেলনের পাশাপাশি আয়োজিত আউটরিচ সেশনগুলোও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
৩ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি ঢাকা সফর করে গেছেন ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন। ডিজিএফআইয়ের আমন্ত্রণে আসা এই সফরে তিনি সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. একেএম শামসুল ইসলামের সঙ্গে।
১ দিন আগে
গত আট বছরে তিনবার বদলেছে বাংলাদেশের ডিজিটাল আইন। ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা আইন। প্রতিবারই সরকার বলেছে, নতুন আইন আগের আইনের বিতর্কিত দিকগুলো সংশোধন করবে, অযথা হয়রানির সুযোগ কমাবে এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল সাইবার অপরাধ মোকাবিলায়
১১ আগস্ট ২০২৬
বরাবরের মতো এবারও এসএসসির ফলে চমক দেখিয়েছে মেয়েরা। এবার ছাত্রীদের পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, আর ছাত্রদের ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ ছাত্রীরা ছাত্রদের চেয়ে প্রায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে। জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের হিসাবেও একই চিত্র। ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনের মধ্যে ৬৩ হাজার ৮৯৬ জনই ছাত্রী।
১০ আগস্ট ২০২৬