আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনার

মার্কিন নৌ-অবরোধে ক্ষতি, ইরানের সামনে বিকল্প কী

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ কার্যকর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে ইরান তাদের শর্ত মেনে নিয়ে যুদ্ধ শেষ করুক। শর্ত মানতে ইরানকে বাধ্য করতেই দেশটির অর্থনীতিকে শ্বাসরোধ করার এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা থেকে এই অবরোধ কার্যকর হয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এই পদক্ষেপকে ‘বেআইনি’ আখ্যা দিয়ে বলছে, এই অবরোধ ‘জলদস্যুতা’র শামিল।

দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মানিয়ে চলতে চলতে ইরান অভ্যস্ত হয়ে গেছে। যুদ্ধের মধ্যেও তাদের অর্থনীতি সচল রয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে বড় রকমের ধাক্কা দিতে পারে।

তেল থেকে আয়ে কতটা প্রভাব পড়বে?

ইরান মূলত সমুদ্রবন্দর দিয়েই তেল ও গ্যাস রপ্তানি করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর যুদ্ধ শুরু করার পরপরই তেহরান হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেয়। উপসাগর থেকে বের হওয়ার এই একমাত্র জলপথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। তখন থেকেই ইরান প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে। কেবল যেসব দেশ তেহরানের সঙ্গে আলাদা চুক্তি করেছে, তাদের জাহাজকেই ওই পথে চলতে দেওয়া হচ্ছিল। তবে এই পুরোটা সময় ইরান নিজেদের জ্বালানি পণ্য ঠিকই রপ্তানি করে গেছে।

ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই যায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। বাণিজ্য পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যমতে, মার্চ মাসে ইরান প্রতিদিন ১৮ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে। এপ্রিলের এই সময় পর্যন্ত তারা প্রতিদিন ১৭ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল তেল পাঠিয়েছে। ২০২৫ সালে তাদের গড় রপ্তানি ছিল প্রতিদিন ১৬ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল। অর্থাৎ, মার্চ এবং এপ্রিলের শুরুতে প্রণালি দিয়ে ইরানের রপ্তানি অন্য সময়ের চেয়ে বেড়েছে।

১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ইরান ৫ কোটি ৫২ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। এই এক মাসে ইরানের তিন ধরনের প্রধান তেলের (ইরানিয়ান লাইট, ইরানিয়ান হেভি এবং ফরোজান ব্লেন্ড) দাম কখনোই ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নামেনি। অনেক দিনই দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যদি খুব হিসাবি হিসাবও ধরা হয়, অর্থাৎ ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার, তাহলেও গত এক মাসে তেল বেচে ইরান প্রায় ৪৯৭ কোটি ডলার আয় করেছে।

অন্যদিকে, যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইরান তেল রপ্তানি করে দিনে আয় করত প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সেই হিসেবে মাসে তাদের আয় ছিল ৩৪৫ কোটি ডলার। সোজা কথায়, যুদ্ধের আগের তুলনায় গত এক মাসে তেল বিক্রি করে ইরান ৪০ শতাংশ বেশি টাকা কামিয়েছে।

কিন্তু এখন মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বন্দর ও হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ বসিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে তেহরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ক্ষমতা সরাসরি এবং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মানচিত্রে হরমুজ প্রণালি।
মানচিত্রে হরমুজ প্রণালি।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইরান আর আগের মতো তেল রপ্তানি করতে পারবে না। প্রণালি দিয়ে যাওয়া বিদেশি জাহাজগুলো থেকে ইরান যে টোল আদায় করছিল, সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে।’

মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার আল জাজিরাকে জানান, গত ছয় সপ্তাহ ইরানের তেল আয়ের জন্য এক ধরনের আশীর্বাদ ছিল। কিন্তু মার্কিন অবরোধের কারণে সেই পরিস্থিতি বদলে যাবে। স্নাইডার বলেন, ‘ইরানের কাছে কিছু জমা তেল রয়েছে। তাদের সমুদ্রে ভাসমান বা পার্ক করে রাখা ট্যাংকারগুলোতে প্রচুর তেল আছে। ফেব্রুয়ারির হিসাবে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, অবরোধ তাদের কোনো ক্ষতি করবে না।’

সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত সমুদ্রে ভাসমান ইরানের মোট তেলের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫ কোটি ৭৭ লাখ ব্যারেল। এর মধ্যে ৯৭.৬ শতাংশ তেলই যাচ্ছিল চীনে। উইন্ডওয়ার্ড সতর্ক করে বলেছে, মার্কিন অবরোধের কারণে এই সব তেলই আটকা পড়তে পারে।

অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্যে কী প্রভাব পড়বে?

তেল ছাড়াও মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইরানের বন্দর দিয়ে যাওয়া প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে পেট্রোকেমিক্যাল, প্লাস্টিক ও কৃষিজাত পণ্য। এগুলো মূলত চীন ও ভারতে যায়। অন্যদিকে, প্রধান আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে আছে শিল্প যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস ও খাদ্যদ্রব্য। এগুলো মূলত চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্ক থেকে আসে।

ইরানের কাস্টমস বিভাগের তথ্যের বরাতে তেহরান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১ মার্চ ২০২৫ থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের মোট তেলবহির্ভূত বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৯৪ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ে রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি হওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান অবরোধ ইরানের সার্বিক বাণিজ্যকে ব্যাহত করবে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। স্নাইডার জানান, জ্বালানিবহির্ভূত বাণিজ্য ব্যাহত হলে শুধু আয়েই টান পড়বে না, সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটবে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে ঘাটতি দেখা দেবে। যুদ্ধ শুরুর আগের নিষেধাজ্ঞাগুলোর কারণেই ইরানের অর্থনীতি এমনিতেই অনেক চাপে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এখন দেখার বিষয় হলো, এই বাড়তি কষ্ট কি ইরানকে হার মানতে বাধ্য করবে, নাকি তারা আরও কঠোর হয়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটাবে? তবে আমি সন্দিহান, এই অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর হবে বা খুব বেশি দিন টিকবে।’

ইরানের কি পালানোর কোনো বিকল্প পথ আছে?

হ্যাঁ, আছে। হরমুজ প্রণালি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইরান ও চীন মিলে একটি রেলপথ তৈরি করেছে। কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মতো মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর ওপর দিয়ে যাওয়া এই রেলপথ ব্যবহার করে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম একটি বাণিজ্যিক ট্রেন চীন থেকে ইরানে পৌঁছায়। এরপর মে মাসে চীনের জিয়ান থেকে প্রথম মালবাহী ট্রেন ইরানের আপ্রিন ড্রাই পোর্টে এসে পৌঁছায়। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির মতে, এর মধ্য দিয়ে ইরান ও চীনের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

মানচিত্রে ইরান-চীনের রেলপথ।
মানচিত্রে ইরান-চীনের রেলপথ।

ভূ-রাজনৈতিক পরামর্শক সংস্থা স্পেশালইউরেশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন-ইরান রেলপথ পশ্চিমা নৌ-অবরোধের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে তেহরানের ‘ঘোস্ট শিপ’ বা ভুতুড়ে জাহাজগুলোর মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে যে বাধা আসে, তা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এই ‘ডার্ক শিপ’ বা ‘ঘোস্ট শিপ’গুলো নিজেদের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রেখে চলাচল করে। এভাবে তারা রাডার ফাঁকি দিয়ে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যায়। ইরানের ওপর যুদ্ধ চলাকালেও শিপিং ডেটায় তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনকারী এমন জাহাজের উপস্থিতি ধরা পড়েছে।

তবে স্পেশালইউরেশিয়ার প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, ‘রেলপথে হাইড্রোকার্বন বা জ্বালানি পরিবহন লজিস্টিক্যাল দিক থেকে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।’ এখন পর্যন্ত রেলপথে ইরান থেকে চীনে তেল পাঠানোর কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

স্নাইডার বলেন, অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা নিশ্চিতভাবেই ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে। তবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে এই অচলাবস্থা কত দিন চলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এই অবরোধ নিয়ে কতটা সিরিয়াস, তা কত দিন চলবে, কীভাবে শেষ হবে এবং এরপর কী ঘটবে, তা বলা খুব কঠিন।’

এখানে আরেকটি বড় নিয়ামক বা ফ্যাক্টর হলো চীন। স্নাইডারের মতে, ‘ইরানের বেশিরভাগ ট্যাংকার চীনের দিকে যাচ্ছে। চীন এই অবরোধ মেনে নেবে না। দ্বিতীয়ত, মার্কিন নৌবাহিনী এই জাহাজগুলো আটক করবে বা ডুবিয়ে দেবে বলেও আমার মনে হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি যেকোনো সময় যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে। হয়তো দ্রুত যুদ্ধবিরতি বা উত্তেজনা কমার দিকে যেতে পারে। আবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে এবং বোমাবর্ষণ ও মিসাইল হামলা আবারও শুরু হতে পারে।’

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত