leadT1ad

অত্যাবশকীয় ওষুধ কোনগুলো, সরকার কেন মূল্য নির্ধারণ করে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭: ০৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ জনস্বাস্থ্যের একটি মৌলিক ধারণা। সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ যেন সবার জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হয়—এটাই এই ধারণার মূল লক্ষ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে, যা জনগণের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যচাহিদা পূরণ করে।

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ নির্বাচনের সময় কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রথমত, কোনো রোগ জনসংখ্যার মধ্যে কতটা বিস্তৃত তা দেখা হয়। দ্বিতীয়ত, ওষুধটির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কি না তা যাচাই করা হয়। তৃতীয়ত, অন্যান্য বিকল্পের তুলনায় এর খরচ কতটা যৌক্তিক তা বিচার করা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি দুই বছর অন্তর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের একটি আদর্শ তালিকা হালনাগাদ করে। এই তালিকা বিভিন্ন দেশের জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। এর ভিত্তিতেই দেশগুলো নিজেদের জাতীয় তালিকা তৈরি করে।

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ সাধারণত সাধারণ ও গুরুতর উভয় ধরনের রোগকে অন্তর্ভুক্ত করে। এর মধ্যে সংক্রমণজনিত রোগের চিকিৎসা রয়েছে। তালিকায় ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধও থাকে। ব্যথানাশক এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও এতে রাখা হয়।

এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো নিরাপদ, কার্যকর ও সাশ্রয়ী ওষুধ দিয়ে অধিকাংশ মানুষের চাহিদা পূরণ করা। সাধারণভাবে বলা হয়, এতে চিকিৎসাযোগ্য রোগের প্রায় ৮০ শতাংশের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।

সরকার কেন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নির্ধারণ করে

ওষুধ সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়। অনেক ওষুধ জীবন রক্ষাকারী। এই ধরনের ওষুধের চাহিদা দামের ওপর খুব কম নির্ভরশীল। দাম যাই হোক, মানুষ এসব ওষুধ কিনতে বাধ্য হয়। এই পরিস্থিতিতে ওষুধ কোম্পানিগুলো বেশি দাম নির্ধারণের সুযোগ পায়। বিশেষ করে যেখানে বাজারে প্রতিযোগিতা কম থাকে।

বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে স্বাস্থ্যব্যয়ের বড় অংশ মানুষকে নিজে বহন করতে হয়। বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই খরচ হয় ওষুধ কিনতে। এতে সাধারণ পরিবারের ওপর বড় আর্থিক চাপ পড়ে।

এই আর্থিক চাপ কমাতে সরকার ওষুধের দামে হস্তক্ষেপ করে। এর একটি লক্ষ্য হলো ওষুধের দাম যেন চিকিৎসার পথে বাধা না হয়। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের আরেকটি লক্ষ্য হলো অগ্রাধিকারভিত্তিক ওষুধের উৎপাদন ও ব্যবহার উৎসাহিত করা। এতে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা কমে। এছাড়া জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা সরকারের একটি প্রধান দায়িত্ব। সরকার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে অতিরিক্ত মুনাফা রোধ করতে চায়।

বিশ্বের অনেক দেশেই ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যেসব দেশে বেসরকারি খাত ওষুধ বিক্রিতে প্রাধান্য পায়, সেখানে নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক কঠোর হয়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত: তালিকা সম্প্রসারণ ও নির্ধারিত মূল্য

২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করে। এই তালিকায় আগে প্রায় ১৬০টি ওষুধ ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে আরও ১৩৫টি ওষুধ যোগ করা হয়। ফলে মোট ওষুধের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৫টিতে।

নতুন যুক্ত ওষুধের মধ্যে ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও সংক্রামক রোগের ওষুধ রয়েছে। এখন এসব ওষুধ সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে হবে। ওষুধ প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট সূত্র অনুযায়ী এসব ওষুধের দাম ঠিক করবে।

নীতির আরেকটি দিক হলো দাম সমন্বয়। যেসব কোম্পানি বর্তমানে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কমে ওষুধ বিক্রি করছে, তারা ধীরে ধীরে দাম বাড়াতে পারবে। আবার যারা বেশি দামে বিক্রি করছে, তাদের দাম কমাতে হবে। এই পরিবর্তনের জন্য চার বছর সময় দেওয়া হয়েছে।

অত্যাবশ্যকীয় নয় এমন প্রায় ১ হাজার ১০০টি ওষুধের ক্ষেত্রেও সরকার দামের দিকনির্দেশনা দেবে। কোম্পানিগুলো নির্ধারিত দামের চেয়ে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ কম বা বেশি দাম রাখতে পারবে।

উৎপাদনের ক্ষেত্রেও নতুন বাধ্যবাধকতা আনা হয়েছে। প্রতিটি ওষুধ কোম্পানিকে তাদের মোট উৎপাদনের অন্তত ২৫ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনে বরাদ্দ করতে হবে।

সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই হালনাগাদ তালিকা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে। এতে জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হবে। চিকিৎসাযোগ্য রোগের প্রায় ৮০ শতাংশই এই তালিকার আওতায় আসবে।

এই নীতির মূল লক্ষ্য মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমানো। নীতিটি তৈরির আগে বিশেষজ্ঞ, শিল্পখাতের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। তবে শিল্পখাতের কিছু নেতা মনে করেন আলোচনার সুযোগ আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল।

রোগী ও শিল্পখাতে প্রভাব

এই সিদ্ধান্তের ফলে রোগীরা বিশেষভাবে উপকৃত হবেন। গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ কম দামে পাওয়া সহজ হবে। এতে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক চাপ কমবে।

অন্যদিকে ওষুধ শিল্পের ওপর সরকারি তদারকি বাড়বে। তবে ধাপে ধাপে পরিবর্তনের সুযোগ রাখায় শিল্পের টিকে থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

নীতিটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তা একটি ভারসাম্যপূর্ণ উদাহরণ হবে। এতে জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও শিল্পের স্থায়িত্ব—দুটিই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে কঠোর বাস্তবায়ন, নিয়মিত নজরদারি এবং অংশীজনদের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপের ওপর।

এই সিদ্ধান্ত সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে যে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বাংলাদেশের সব মানুষের নাগালের মধ্যেই থাকবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত