১৯৫২ এর ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনে শুরু হওয়া, চব্বিশের বর্ষা বিপ্লবের হাত ধরে সফলভাবে এগিয়ে গিয়ে ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারিতে পৌঁছে যাওয়া, চুয়াত্তর বছরের বাংলা ভাষার এই অভিযাত্রা এবং প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন। আমাদের বুঝতে হবে, এখনকার সময়ের যুদ্ধ আর এককভাবে বন্দুক – কামান- বোমার নয়, বরং তা হলো বয়ান তৈরির, নিজ সংস্কৃতির প্রসারের ও তথ্যপ্রবাহের। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভাষা পরাজিত হলে জাতির পরিচয় দুর্বল হয়, অপরিচিত বা অন্য সংস্কৃতির চিন্তা ধার করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হয়। ফলে, সংস্কৃতি হয়ে পড়ে আমদানিনির্ভর। হালের এই সময়ে জেন জি দের সামনে বাংলা ভাষা নিয়ে যে মূল দুটি চ্যালেঞ্জ আছে তা হলো:
তারা কি বাংলা ভাষায় চিন্তা করবে, নাকি শুধু অনুবাদ করা চিন্তা গ্রহণ করবে?
তারা কি নিজস্ব সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস বজায় রাখবে, নাকি কৃত্রিম বিশ্বসংস্কৃতির ভোক্তা হবে?
ভাষা হারিয়ে গেলেও রাষ্ট্র হয়ত মানচিত্রে টিকে থাকতে পারবে, কিন্তু তার ভেতরের শক্তি ক্ষয়ে যায়,যাবে। জনগণের মানসিক ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়বে, আত্মপরিচয় বিভ্রান্ত হবে, এবং সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে যাবে। তাই ভাষা রক্ষা মানে শুধু ঐতিহ্য সংরক্ষণ নয়, তা আসলে সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব (cultural sovereignty) রক্ষা করা।
কয়েকটি কারণে এই সত্য নতুন প্রজন্মকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে:
ভাষা হলো identity shield: এটি জাতির স্বতন্ত্র পরিচয়কে রক্ষা করে।
ভাষা হলো cognitive independence: মানুষকে নিজস্ব চিন্তা, বোধ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে স্বাধীন রাখে।
ভাষা হলো national resilience: সংকট, আগ্রাসন বা চ্যালেঞ্জের মুখেও জাতিকে মানসিকভাবে দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ রাখে।
অতএব, ভাষার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা, সচেতনতা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে জাতির আত্মিক শক্তি সুরক্ষিত করে দেওয়া।
নতুন প্রজন্মের জন্য ভাষার চিরন্তন চেতনা
বাংলা ভাষার ইতিহাস কেবল শব্দের ইতিহাস নয়। একটি জাতির আত্মজাগরণ, আত্মত্যাগ এবং আত্মপরিচয়ের ইতিহাস। চর্যাপদের আধ্যাত্মিক গীতিকা থেকে নজরুলের বিদ্রোহী উচ্চারণ, বাহান্নর রক্তাক্ত ফেব্রুয়ারি থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, সাম্প্রতিক সময়ের- চব্বিশের বর্ষা বিপ্লব তথা প্রতিটি যুগ সাক্ষ্য দেয়, ভাষা আমাদের কাছে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না; তা ছিল জাতির আত্মা, সাংস্কৃতিক শক্তি এবং স্বাধীনতার চেতনার ধারক।
নতুন প্রজন্মের জানতে হবে, চর্যাপদের যুগেই বাংলা ভাষা সাধনা ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির বাহন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তা মানুষের অন্তর্জগত, বিশ্বাসের সাথে প্রকৃতি ও জীবনবোধের ভাষা হিসাবেও রূপ লাভ করে। অর্থাৎ, ভাষার সূচনাতেই আমরা দেখি, এটি কেবল ব্যবহারিক নয়, অস্তিত্বমূলক। ভাষা মানুষকে তার সত্তা চিনতে সাহায্য করে। বাংলা ভাষার ভিত্তি তাই কেবল ধ্বনি বা ব্যাকরণে নয়; এর ভিত গড়ে উঠেছে আধ্যাত্মিকতা, সংস্কৃতি ও চিন্তার ওপর।
তাদের এটাও বুঝতে হবে, মধ্যযুগে এসে বাংলা ভাষা সাহিত্য, কাব্য, সংগীত ও লোকধারার মাধ্যমে জনমানসে গভীরভাবে প্রবেশ করে। আলাওল, মুকুন্দরাম, বৈষ্ণব পদাবলি, সব মিলিয়ে ভাষা হয়ে ওঠে জনগণের অনুভূতি, বিশ্বাস ও স্বপ্নের বাহন। মানুষ একই ভাষায় কাঁদে, গান গায়, প্রার্থনা করে। এতে জন্ম নেয় আন্তরিকতা, সৌহার্দ এবং মানসিক ঐক্য। এই মানসিক ঐক্যই পরবর্তীতে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি স্থাপন করে।
উনিশ ও বিশ শতকে বাংলা ভাষা নতুন জাগরণের শক্তি পায়। রবীন্দ্রনাথ ভাষাকে বিশ্বমানবতার উচ্চতায় তুলে ধরেন, নজরুল ভাষাকে বিদ্রোহ ও মুক্তির অস্ত্রে পরিণত করেন, শরৎচন্দ্র ভাষাকে সাধারণ মানুষের বেদনার কণ্ঠস্বর করেন। আল মাহমুদ বাংলাভাষাকে মাটি ও মানুষের একেবারে কাছে নিয়ে যান। ফররুখ আহমেদ, সৈয়দ আলী আহসান তাদের লেখনীতে পূর্ব বাংলার মুসলিম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, তাহযীব ও তমদ্দুন তুলে ধরেন। ভাষা এখানে কেবল সাহিত্যিক সৌন্দর্যের মাধ্যম না হয়ে মানুষের আত্মমর্যাদা ও মানসিক স্বাধীনতার উৎসে পরিণত হয়।
এই ধারার ঐতিহাসিক চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে ১৯৫২ সালে। ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করে, ভাষা মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে এত গভীরভাবে প্রোথিত যে এর জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া যায়। শহীদদের রক্ত ভাষাকে সাংস্কৃতিক শক্তি থেকে জাতীয় শক্তিতে রূপান্তরিত করে। ভাষা তখন কবিতা সাহিত্যের সীমা ছাড়িয়ে, সাদাকালো বইয়ের পাতা থেকে রক্তলাল রাজনৈতিক চেতনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। চব্বিশের বর্ষা বিপ্লবের নতুন প্রজন্মের জন্য এটি এক অমোঘ শিক্ষাঃ ভাষা মানে আত্মপরিচয়। ভাষা মানে সম্মান, ভাষা হল মর্যাদা। আর সম্মান মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে কোন আপস নেই। “আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে”। হাঁ, এই আত্মমর্যাদার চেতনালব্ধ লড়াইয়ে শাণিত ও জনপ্রিয়ভাবে ব্যবহৃত বিদ্রোহী বাংলা শ্লোগানে ২০২৪ সালের বর্ষা বিপ্লব পূর্ণতা পায়।
সমাপনী ভাবনা
১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলা ভাষা ছিল গান, কবিতা, স্লোগান ও ভাষণের প্রাণ। ভাষাভিত্তিক জাতীয় চেতনা মানুষকে একত্র করেছে, সাহস জুগিয়েছে, আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছে। এখানে ভাষা সরাসরি স্বাধীনতার শক্তিতে রূপ নেয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দেখায়, সুসংগঠিত আত্মসম্মান ও মর্যাদাবোধ ইতিহাস বদলাতে পারে, আর ভাষাই হলো সেই চেতনাকে সংগঠিত করার প্রধান মাধ্যম।
আজকের প্রজন্ম উত্তরাধুনিক ডিজিটাল যুগে বাস করে। তথ্যপ্রযুক্তি তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট, ভাষা কেবল ব্যবহারের বিষয় নয়, অস্তিত্বের ভিত্তি। যদি নতুন প্রজন্ম ভাষার প্রতি সচেতন না থাকে, তবে তারা ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তথ্য প্রযুক্তিগত অগ্রগতি থাকলেও জাতির মানসিক ভিত দুর্বল হয়ে যাবে।
ডিজিটাল মাধ্যম বাংলা ভাষার জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সাহিত্য, ডিজিটাল গান ও গল্প, সবখানেই মাতৃভাষার ব্যবহার ভাষাকে জীবন্ত রাখে। প্রযুক্তি যেন ভাষার বিকল্প না হয়ে ভাষার বাহন হয়, এটাই নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব।
শহীদদের স্মৃতি নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত রাখে। ২১ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়, বরং ভাষার মর্যাদা রক্ষার চিরন্তন প্রতীক। ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা মানে জাতীয় চেতনা সংরক্ষণ, আর সাহিত্য ও সৃজনশীলতা জাতিকে সাংস্কৃতিক শক্তিতে সমৃদ্ধ করে।
নতুন প্রজন্মের জন্য ভাষা তাই কেবল কবিতা বা গল্প নয়; তা প্রাচীন ঐতিহ্যের সাথে নতুনের সেতুবন্ধন, সংস্কৃতির ধারক, জাতীয় শক্তির ভিত্তি এবং ভবিষ্যতের সার্বভৌমত্বের বলিষ্ঠ দিকনির্দেশনা। ভাষা হারালে হারায় স্মৃতি, ঐতিহ্য, পরিচয় ও আত্মবিশ্বাস। ভাষা রক্ষা মানে কেবল অতীতের সম্মান নয়; ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এপিসোড সমূহের সমাপ্তিতে সুস্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, চর্যাপদের আধ্যাত্মিক উচ্চারণ থেকে আধুনিক কবিতার স্পন্দন; বাহান্ন, একাত্তর ও চব্বিশের আত্মত্যাগ থেকে আজকের ডিজিটাল যুগের ভাষাচর্চা, এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, বাংলা ভাষা কখনও স্থবির ছিল না। ক্রমাগত রূপান্তরিত হয়েছে জাতির অস্তিত্ব রক্ষার শক্তিতে। যে জাতি তার ভাষাকে রক্ষা করে, সে জাতি তার স্বাধীনতাকেও রক্ষা করতে পারে। ভাষা কেবল স্মৃতি নয়; প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার শক্তিশালী কৌশল।
নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় হওয়া প্রয়োজন যে, ভাষা আমাদের জাতির চির উন্নত মর্যাদা, চিরন্তন চেতনা ও সৌম্য শক্তির উৎস। বাংলার ভাষা সৈনিক, ভাষা শহীদ, কথাসাহিত্যিক, বিদ্রোহী, পল্লী, মরমী, রেনেসাঁ, আধ্যাত্মিক কবি, তাদের সকলের বাংলা ভাষার সুরক্ষায়, বিকাশে, সমৃদ্ধকরণে, এবং প্রসারে যে অবদান রয়েছে তা যেন এই নতুন প্রজন্মকে জাতীয় চেতনার সাথে সম্পৃক্ত-সংযুক্ত রাখে। তাই, আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনার নাড়ির টান বজায় রাখা, বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য। ভাষা হারালে জাতি পথ হারাবে, দুর্বল হবে। ভাষার সুরক্ষা মানে জাতির অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিরক্ষা। বাংলা ভাষা যেন নতুন প্রজন্মের কাছে কেবল মুখে উচ্চারিত কোন ‘কথা’ না হয়ে, তাদের আত্মপরিচয়, শক্তি এবং চিরন্তন চেতনার প্রতীক হিসেবে সমুন্নত রয় এই সবিনয় নিবেদনে।
লেখক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)