জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

দুই যুদ্ধের গেরিলা আজম খান ও বাংলা ‘ঝাঁকি’

আজ আজম খানের জন্মদিন। ইতিহাসে তাঁকে যথাযথভাবে দেখা যায় ‘দুই যুদ্ধের মানুষ’ হিসেবে। প্রথম যুদ্ধ অস্ত্র হাতে ১৯৭১ সালে। দ্বিতীয় যুদ্ধ স্বাধীনতার পর নতুন ধারার গানের জোয়ার তৈরি করা। এই দ্বিতীয় যুদ্ধের নামই ছিল ‘ঝাঁকি’। আর সেই ঝাঁকিতেই বাংলা রক পেয়েছে নিজস্ব সাউন্ডেস্কেপ।

আজম খান। সংগৃহীত ছবি

একসময় বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতকে ‘অপসংস্কৃতি’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার সামাজিক প্রবণতা ছিল। বিশেষ করে তথাকথিত ‘স্ট্যাবলিশমেন্ট’ ও প্রজন্মগত কর্তৃত্বের চোখে রক ছিল ‘রকারদের’ উচ্ছৃঙ্খলতার নাম। সেই পরিস্থতিতে আজম খানের ঐতিহাসিক ভূমিকা এককথায় ব্যান্ড কালচারকে নতুন দিনের বাংলা গানের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

আর এই দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে শক্ত রূপক হলো ‘ঝাঁকি’। তিনি বলতেন, ‘ঝাঁকি দিতে হইব!’ আজম খানদের ঝাঁকিতেই জন্ম নিয়েছিল বাংলা রকের নিজস্ব সাউন্ডস্কেপ। তাই ‘বাংলা রক’ মানে ‘বাংলা ঝাঁকি’।

আজম খান বাংলাদেশের মিউজিকে অপেক্ষাকৃত নতুন এই জনরার শুরুর দিকের চেহারাটা গড়ে দিয়েছিলেন। তখন বাংলা গানে এমন শব্দ আর পরিবেশনার ভঙ্গি দেখা যেত না। পশ্চিমা যন্ত্রের সঙ্গে মিশিয়েছিলেন বাংলার কথামালা, তৈরি করেছিলেন খাঁটি ‘বাংলা রক’।

১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জন্ম আজম খানের। বেড়ে ওঠা ঢাকার আজিমপুর, কমলাপুর, খিলগাঁওয়ের অলিগলিতে। পরিবারে গানের চল ছিল। ছোটবেলায় গাইতেন হেমন্ত, শ্যামল, আবদুল আলিমের গান, তাঁদের মতো করেই। গানের প্রশিক্ষণ ছিল না, কিন্তু হৃদয়ে ছিল সুর। সেখান থেকেই গানের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়।

আজম খানের ব্যান্ড 'উচ্চারণ'। সংগৃহীত ছবি
আজম খানের ব্যান্ড 'উচ্চারণ'। সংগৃহীত ছবি

ষাটের দশকে আজম খান বুঝে গিয়েছিলেন, পাকিস্তানি শাসকরা আমাদের ঠকাচ্ছে। সেই উপলব্ধি তাঁকে নিয়ে যায় ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’-তে। গাইতে শুরু করেন গণসংগীত। তারপর আসে সাল ১৯৭১, আজম খান পরিণত হন গেরিলা যোদ্ধায়। সেকশন কমান্ডার হিসেবে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। আবার ক্যাম্পে ক্যাম্পে গানও গেয়েছেন, উজ্জীবিত করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের।

আজম খান কেন ‘গানের লাইনে’ এলেন

যুদ্ধশেষে ঢাকায় ফিরে আজম খান দেখলেন, তরুণদের চোখে-মুখে ক্লান্তি আর হতাশা। তরুণ সমাজ ‘বিপথে’ চলে যাচ্ছে। ভাবলেন, গান যদি তাঁদের জাগিয়ে তুলতে পারে! এই ভাবনা থেকেই আবার গান ধরলেন। তবে এবার আর গণসংগীত নয়। শুরু করলেন বাংলা পপ আর বাংলা রক।

এখানে আসতে পারে, আজম খান কেন পপ ও রক বেছে নিলেন? প্রথমত, তখন সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও তরুণদের এক অংশের মধ্যে ‘বিটলস-ঝড়’ বয়ে যাচ্ছিল। এর বাইরে রোলিং স্টোনস, শ্যাডোস ব্যান্ডও জনপ্রিয় হচ্ছিল। অন্যদিকে সারাবিশ্বে তখন পপের হাওয়াও বইতে শুরু করেছে। আজম খান ভাবতেন, ‘বিটলস’-এর মতো একটা ব্যান্ড যদি বাংলাদেশে তৈরি করা যেত! মূলত তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন বিটলসের জর্জ হ্যারিসনকে দেখে। হ্যারিসনের গাওয়া ‘বাংলাদেশ’ গানটি সবসময় গাইতেন। তাঁকে দেখেই চুল বড় রাখাও শুরু করেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতার আগে থেকেই ঢাকায় পপ সংগীতের চর্চা ছিল। ষাটের দশকে ঢাকায় ৯টি ব্যান্ড সক্রিয় ছিল। কিন্তু তারা বাংলা ভাষায় গান গাইত না। শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষার জনপ্রিয় গানগুলি কভার করত। তাঁদের গান আজম খান শুনেছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের চাম্বেলি রুমে। তখন যারা ব্যান্ডে বাজাতেন, আজম খান তাঁদের সবাইকে চিনতেন। ফলে তিনি সহজেই ব্যান্ড তৈরি করতে পেরেছিলেন।

আজম খানে। সংগৃহীত ছবি
আজম খানে। সংগৃহীত ছবি

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আজম খানের কৌশল ছিল খুব মৌলিক। তিনি পশ্চিমা যন্ত্রের সঙ্গে দেশজ বিষয় ও বাংলার কথামালা মিলিয়ে দিলেন। ফলে ‘বিদেশি ফর্ম’দিয়ে ‘স্থানীয় বাস্তবতার’ কথা বলা সম্ভব হলো। এই মিশ্রণকেই ‘বাংলা পপ’ বা ‘বাংলা রক’-এর বীজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

গানের ভেতরের ‘ঝাঁকি’

আজম খানের সবচেয়ে মৌলিক অবদান সম্ভবত বাংলা গানে নতুন ‘ভাষা-রীতি’ আনা। আধুনিক বাংলা গানের এক দীর্ঘ পর্বে গীতিকথা ছিল সাহিত্যনির্ভর। আজম খান সেখানে ঢাকার আটপৌরে কথ্যতা, পুরান ঢাকার চিত্র, বস্তির হাহাকার, সমাজের ভণ্ডামি—এসবকে সরাসরি গান বানালেন।

এটাই বাংলা ঝাঁকির প্রথম স্তর। মানে লিরিকের ঝাঁকি। ‘আলাল ও দুলাল’ গানে পুরান ঢাকার লোকচিত্র, ব্যঙ্গ-রস, পাড়ার কথকতা সব একসঙ্গে দেখা যায়। আবার এক অদ্ভুত প্রতিচ্ছবি উঠে আসে ‘হাইকোর্টের মাজারে’র মতো গানে, যেখানে আধ্যাত্মিকতা ও সমাজ-সমালোচনা এক ফ্রেমে থাকে।

এর বাইরে আছে সুর ও কাঠামোর ঝাঁকি। তাঁর গানে গিটারের জ্যামিং, ড্রামসের বিট, কণ্ঠের উচ্চতা মিলিয়ে একধরনের ‘ধাক্কা’ তৈরি হয়। এরপর হলো বিষয়বস্তুর ঝাঁকি। এখানে পৌঁছলেই আজম খানের ‘সিরিয়াস ব্যাপার’ সবচেয়ে তীব্রভাবে ধরা পড়ে। যেমন তাঁর রেল লাইনের ওই বস্তিতে ১৯৭০-এর দশকের দুর্ভিক্ষ, নগরের প্রান্তিক মানুষের মৃত্যুবোধ এবং স্বাধীন দেশের স্বপ্নভঙ্গের এক সংগীত-দলিল।

টেলিভিশনে লাইভ পারফরম্যান্সে আজম খান নাকি বলেছিলেন, ‘যারা ইতিমধ্যে মৃত বা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, এই গান তাদের জন্য’। এই গান-অভিজ্ঞতার পেছনে বাস্তব শহরও আছে। আছে কমলাপুর স্টেশন, এলাকার ক্ষুধার্ত মানুষের ঢল, রাস্তায় মৃত্যুর দৃশ্য, গ্রাম থেকে খাবারের খোঁজে ঢাকায় আসা মানুষের কালো মাথার ভিড়। এসব পর্যবেক্ষণ তাঁর ভেতর থেকে ‘কইলজা ফেটে’ গান বের হয়ে আসে।

আজম খানকে তাই ইতিহাসে যথাযথভাবে দেখা যায় ‘দুই যুদ্ধের মানুষ’ হিসেবে। প্রথম যুদ্ধ অস্ত্র হাতে ১৯৭১ সালে। দ্বিতীয় যুদ্ধ স্বাধীনতার পর নতুন ধারার গানের জোয়ার তৈরি করা। এই দ্বিতীয় যুদ্ধের নামই ছিল ‘ঝাঁকি’। আর সেই ঝাঁকিতেই বাংলা রক পেয়েছে নিজস্ব সাউন্ডেস্কেপ।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত