ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটে সরকার 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। এতে নির্বাচনে 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' থাকছে কিনা এই প্রশ্ন উঠছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্কার। এ লক্ষ্যে ৬টি কমিশন গঠন করা হয়। এসব কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, নির্বাচনব্যবস্থার পুনর্গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার, দুর্নীতি দমন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ প্রণয়ন করে। এই সনদ বাস্তবায়নের জন্যই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে।
সংস্কার কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আসন্ন গণভোটের ফলাফলের ওপর। ‘না’ ভোট জয়ী হলে সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দল জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনার পর এবং ৬টি সংস্কার কমিশনের ৮৪টি প্রস্তাবের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়।
সংস্কারের কয়েকটি প্রস্তাবে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের ভিন্নমত থাকলেও, সামগ্রিক ঐকমত্যের স্বার্থে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল গত বছর ১৭ অক্টোবর সনদে স্বাক্ষর করে। এই বাস্তবতায় গণভোটের রায়ই সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
তাই বলে অন্তর্বর্তী সরকার যদি পক্ষ নেয় বা একপাক্ষিক প্রচারণায় যুক্ত হয়, তাহলে গণভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। গণতান্ত্রিক মানদণ্ড অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা তো রেফারি—খেলোয়াড় নয়। ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কী পাওয়া যাবে, আর ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাওয়া যাবে না—এই ধরনের প্রচারণা সরকারের পক্ষ থেকে করা হলে তা কার্যত ভোটারদের প্রভাবিত করার শামিল। এটি ভোটারদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকে না।
১৯৭৭ সালের গণভোটে জিয়াউর রহমানের সরকার সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে। সরকারি প্রচার, প্রশাসন, গণমাধ্যম—সবই একপক্ষে ব্যবহৃত হয়। ফলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কার্যত অনুপস্থিত ছিল।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে অন্তর্বর্তী সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও বার্তা এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমে প্রচারণা করছে। প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘গণভোটে হ্যাঁ-তে সিল দিন’ শিরোনামে একাধিক ফটোকার্ড ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মরণে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মিত একটি ভিডিওতে গণঅভ্যুত্থান ও তার প্রভাবের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনকারী, নিহতদের পরিবারের সদস্য এবং গুম কমিশনের সদস্যদের বক্তব্যের মাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেছেন, আবারও গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও আয়নাঘরের দিনগুলোতে ফিরে যেতে না চাইলে গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে, ’হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচারণায় কোনো বাধা দেখছেন না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে রিটার্নিং কর্মকর্তারা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে কোনো ধরনের প্রচারণা চালাতে পারবেন না বলে তিনি জানিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, 'নির্বাচনে হ্যাঁ ভোট যদি জয়যুক্ত হয় তখন কেউ তো আদালতে যেতেও পারে। গিয়ে বলতে পারে নির্বাচনের এই অংশে সুষ্ঠু ভোট হয় নাই। কারণ সরকার এর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। গণভোটে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিল না। নৈতিকভাবে সরকারের এর থেকে বিরত থাকাই উচিত।'
এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গণভোটের প্রচারণা চালানো তাদের দায়িত্ব নয়। জনগণই ঠিক করবে তারা ‘হ্যাঁ’ না ‘না’ ভোট দেবে।
জামায়াতে ইসলামী ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র ও তরুণদের রাজনৈতিক দল এনসিপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করলেও গণভোটে প্রতিটি আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গড়ে তুলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের অবস্থানের ভিত্তিতে নয়, বরং নির্বাচনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই গণভোটের নিরপেক্ষতা বিচার করা উচিত। যদি রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখে এবং ভোট গ্রহণ ও গণনা প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়; তবে সেই গণভোটকে নিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য বলা যায়।
প্রশাসনিকভাবে সরকার গণভোটের জন্য সংস্কার প্রস্তাবগুলো খসড়া আকারে উপস্থাপন করতে পারে। কিন্তু তা বর্ণনামূলক ও তথ্যভিত্তিক হতে হবে; প্রচারণামূলক নয়। অর্থাৎ সরকার বলতে পারে, এই সংস্কার হলে কী পরিবর্তন আসবে; এবং না হলে বর্তমান ব্যবস্থা কীভাবে বহাল থাকবে। কিন্তু বলতে পারে না কোনটি ভালো বা মন্দ অথবা জনগণের কী করা উচিত। গণভোটের বৈধতা আসে সরকারের সংযম ও নিরপেক্ষতা থেকে, কোনো ফলাফল আদায়ের চেষ্টা থেকে নয়।
এর আগের গণভোটগুলোর ক্ষেত্রেও সরকার নিরপেক্ষ থাকেনি; আমাদের দেশের গণভোটের অভিজ্ঞতা মূলত ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গেই জড়িত—স্বাধীন ও মুক্ত জনমতের প্রতিফলন হিসেবে নয়।
১৯৭৭ সালের গণভোটে জিয়াউর রহমানের সরকার সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে। সরকারি প্রচার, প্রশাসন, গণমাধ্যম—সবই একপক্ষে ব্যবহৃত হয়। ফলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কার্যত অনুপস্থিত ছিল।
১৯৮৫ সালের গণভোটে এরশাদ সরকারও একই পথ অনুসরণ করে। বহুদলীয় রাজনীতি পুনরায় চালুর নামে আয়োজিত সেই গণভোটে সরকার প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেয়। তখন সরকারি প্রচারণা, বাধ্যতামূলক উপস্থিতি, প্রশাসনিক চাপ ও বিরোধী কণ্ঠ দমনের অভিযোগ ছিল। বিরোধী দলগুলো একে প্রহসন বলে বর্জন করে।
সারা বিশ্বেই দেখা যায়, ক্ষমতাসীন সরকার তাদের নীতিগত স্বার্থ বা রাজনৈতিক লক্ষ্য অনুযায়ী ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেয়। তুরস্কে ২০১৭ সালের সাংবিধানিক গণভোট, রাশিয়ায় ২০২০ সালের সংবিধান সংশোধনী, কলম্বিয়ায় ২০১৬ সালে শান্তি চুক্তি কিংবা আয়ারল্যান্ডে ২০১৫ সালের সমকামী বিবাহ;—এসব গনভোটে সরকার প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হয়েছে ভোট গ্রহণ ও গণনার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছিল কিনা, এবং জনগণ ভয়মুক্ত ও সমান সুযোগে মত প্রকাশ করতে পেরেছিল কিনা;—এই মানদণ্ডে।
এছাড়া, ২০১৬ সালে ব্রিটেনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার প্রশ্নে (ব্রেক্সিট) একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন প্রকাশ্যে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালান; যুক্তরাজ্য যেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে থেকে যায়। সরকারের উদ্যোগে প্রায় ৯৩ লাখ পরিবারের কাছে লিফলেট ও বুকলেট বিতরণ করে ‘না’ ভোটের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়। সরকারি প্রচারণা নিয়ে সে সময় ব্যাপক সমালোচনা হয়, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে সরকার পক্ষ নেওয়ায় গণভোটের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের অবস্থানের ভিত্তিতে নয়, বরং নির্বাচনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই গণভোটের নিরপেক্ষতা বিচার করা উচিত। যদি রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখে এবং ভোট গ্রহণ ও গণনা প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়; তবে সেই গণভোটকে নিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য বলা যায়।
গণভোট, আসলে যেকোনো নির্বাচনের বৈধতা, গ্রহণযোগ্যতা ও গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা নির্ধারিত হয় ভোটাররা স্বাধীনভাবে ও ভয়ভীতি বা চাপমুক্ত পরিবেশে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পেল কিনা তার ওপর। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বা সামাজিক চাপ যদি ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করে, তবে সেই নির্বাচন প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক হলেও তার সারবত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।