যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। দীর্ঘ ৩৬ বছর দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ও প্রভাবশালী নেতার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। আধুনিক ইরানের ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় ছিলেন।
১৯৭৯ সালে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মতোই অত্যন্ত ক্ষমতাধর ছিলেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
যদিও অনেকে মনে করেন, বিপ্লব এনেছিলেন খোমেনি, কিন্তু আধুনিক ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা ছিলেন খামেনি নিজেই। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের সর্বচ্চ নেতার আসনে থাকার পরেও তাঁর বিদায়বেলা হয়তো তাঁর পূর্বসূরিদের মতো সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হবে না। এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত প্রবন্ধে এমন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছেন লেখক। কারণ তাঁর মতে, খামেনির শাসনামলে ইরান সব দিক থেকেই চরম দুর্বলতার মুখে পড়েছে। এ কারণে সাধারণ ইরানিদের কাছে হয়তো এটাই হয়ে থাকবে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানকে শাসন করা খামেনির মূল পরিচয়।
সেই প্রবন্ধ অনুসারে আমরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে দেখব ভিন্ন চোখে।
খামেনির জন্ম ও রাজনীতিতে প্রবেশ
খামেনির জন্ম ১৯৩৯ সালে, উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে। ছোটবেলা থেকেই তিনি নাজাফ এবং কোমের মতো বড় বড় ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। মূলত সেখান থেকেই বিকাশিত হয়েছে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ধর্মীয় চিন্তাভাবনা।
মাত্র ১৩ বছর বয়সেই তিনি বিপ্লবী ইসলামের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। সে সময় ধর্মীয় নেতা নওয়াব সাফাভি তৎকালীন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রায়ই রাজনৈতিক বিক্ষোভের ডাক দিতেন। তাঁর শিক্ষাও খামেনিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল।
১৯৮৬ সালে একটি অনুষ্ঠানে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: রয়টার্স১৯৫৮ সালে খোমেনির সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি দ্রুত তাঁর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দর্শনে দীক্ষিত হন। এই দর্শন পরবর্তীতে ‘খোমেনিবাদ’ নামে পরিচিতি পায়। এই মতবাদের মূল কথা হলো—শুধু মানুষের তৈরি আইন দিয়ে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়া সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে তার বৈধতা পেতে হবে সরাসরি সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে। এর কেন্দ্রে রয়েছে ‘ভেলায়েত-ই ফকিহ’ বা ইসলামী আইনবিদের শাসন। অর্থাৎ, ইসলামের শিয়া মতাদর্শের অনুসারী একজন পণ্ডিতের হাতেই দেশের শাসনভার থাকবে। তিনি ইসলাম ধর্মের নবী বা খলিফাদের মতো দেশটির সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হবেন। এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই খোমেনি এবং খামেনি ইরানে তাঁদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
সংগ্রাম থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে
১৯৬২ সাল থেকে খামেনি ততকালীন স্বৈরশাসক শাহ পাহলভির বিরুদ্ধে টানা দুই দশক বিপ্লবী কার্যক্রম চালিয়ে যান। ১৯৬৪ সালে খোমেনিকে নির্বাসনে পাঠানো হলে, খামেনি তাঁর হয়ে কাজ করতে থাকেন। ১৯৭১ সালে পাহলভির গোপন পুলিশ বাহিনী খামেনিকে গ্রেপ্তার করে তাঁর ওপর চরম নির্যাতন চালায়।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবে শাহ পালভির পতন হয়। খোমেনি নির্বাসন থেকে ফিরে এলে খামেনিকে বিপ্লবী কাউন্সিলে জায়গা দেওয়া হয়। এরপর তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ বা আইআরজিসি গঠনে বড় ভূমিকা রাখেন। শুরুতে বিপ্লব রক্ষার জন্য এই বাহিনী তৈরি হলেও, পরে এটিই ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়।
১৯৮১ সালে এক ভয়ংকর বোমা হামলা থেকে খামেনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। কিন্তু তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ১৯৮২ ও ১৯৮৫ সালে দুই মেয়াদে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন খামেনি। তখন চলছিল ভয়াবহ ইরান-ইরাক যুদ্ধ। সেসময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার অধীনস্থ হয়ে কাজ করলেও খামেনি ছিলেন বেশ প্রতাপশালী। এর পাশাপাশি ইরানের সামরিক শক্তি আইআরজিসি-এর সঙ্গেও তাঁর খুব ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা তাঁর জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত অটুট ছিল বলে আমরা জানি।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন
১৯৮৯ সালে খোমেনি মারা যাওয়ার পর তাঁর উত্তরসূরি কে হবে এ নিয়ে বড় সংকট তৈরি হয়। খোমেনি প্রথমে হোসেইন-আলী মনতাজেরি-কে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু মনতাজেরি মানবাধিকার লঙ্ঘনের কট্টর সমালোচক হয়ে ওঠায় তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়।
পরবর্তীতে ইসলামী আলেমদের নিয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। তবে এই সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। কারণ, সংবিধান অনুযায়ী এই পদের জন্য ‘গ্র্যান্ড আয়াতুল্লা’ পদমর্যাদা থাকা দরকার, যা খামেনির ছিল না। অনেকেই মনে করতেন, এমন সাধারণ একজন মানুষের কথায় জনগণ শ্রদ্ধা দেখাবে না। যার ফলে ১৯৮৯ সালের জুলাই মাসে সংবিধান সংশোধন করে তাঁকে এই পদে স্থায়ী করা হয়।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: রয়টার্সকাগজে-কলমে তাঁর অবস্থান শক্ত হলেও, সাধারণ মানুষের কাছে তিনি কখনোই খোমেনির মতো স্বতঃস্ফূর্ত জনপ্রিয়তা পাননি। তবে সংবিধান সংশোধনের ফলে তিনি খোমেনির চেয়েও বহুগুণ বেশি ক্ষমতার অধিকারী হন। এই ক্ষমতা দিয়ে তিনি খুব সহজেই যেকোনো ভিন্নমত দমন করতে পারতেন।
কঠোর হাতে ভিন্নমত দমন
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নজিরবিহীন ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। তিনি প্রেসিডেন্ট হাশেমি রাফসানজানির অর্থনৈতিক কাজকে সমর্থন করলেও, খাতামি ও রুহানির মতো সংস্কারমুখী প্রেসিডেন্টদের পথে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
তাঁর কঠোর হস্তক্ষেপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত নির্বাচনের পর। ফলাফল নিয়ে হাজার হাজার ইরানি যখন রাস্তায় নামে, খামেনির নির্দেশে তা কঠোর হাতে দমন করা হয়। এতে অসংখ্য মানুষ নিহত হন এবং হাজার হাজার আন্দোলনকারীকে নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হয়।
এমনকি ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট রাইসির মৃত্যুর পর সংস্কারপন্থী মাসুদ পেজেশকিয়ান ক্ষমতায় এলেও খামেনি তাঁর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন। তিনি পেজেশকিয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের কোনো সুযোগ দেননি বলে মনে করেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
এছাড়া, গত বছরের শেষের দিকে ইরানে যখন আবারও গণ-অভ্যুত্থান ছড়িয়ে পড়ে, তখনো খামেনি তা কঠোরভাবে দমন করার নির্দেশ দেন। এতে প্রাণ হারান আরও অনেক মানুষ।
ব্যর্থ পররাষ্ট্রনীতি ও বিতর্কিত বিদায়
সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতার বলে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও খামেনির অভাবনীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল। তিনি ছিলেন ইরানের ‘প্রক্সি কৌশল’-এর মূল রূপকার। হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুথির মতো গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে তিনি পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় প্রবল প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছেন।
মাঝে মাঝে পশ্চিমাদের সাথে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে কিছুটা নমনীয় হলেও, ট্রাম্পের প্রথম শাসনামলে সেই চুক্তি বাতিল হয়ে যায় এবং তিনি আবারও কট্টর পশ্চিমাবিরোধী অবস্থানে ফিরে যান। কিন্তু ২০২৫ সালে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর ইরান আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধ ইরানে খামেনির শাসনব্যবস্থার বৈধতা একেবারে শেষ করে দেয়।
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনি মারা যাওয়ার পর তাঁর জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে। তাঁর জনপ্রিয়তা এত বেশি ছিল যে মানুষ একবার তাঁর কফিন ছুঁয়ে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছিল। কিন্তু খামেনির ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন হবে বলে মনে করছেন অনেকেই। দীর্ঘ ৩৬ বছর নিজের শাসন টিকিয়ে রাখতে গিয়ে তিনি নিজ দেশের মানুষের ওপর যে নির্মমতা চালিয়েছেন, তাতে মানুষ তাঁর প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেছে। ২০২৫-২৬ সালের বিক্ষোভে অনেকেই প্রকাশ্যে তাঁর মৃত্যু কামনা করেছিল। তাই খামেনির বিদায়বেলায় পূর্বসূরির মতো হয়তো কোনো শোকাবহ পরিবেশ দেখা যাবে না। বরং ইরানের ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এমন একজন শাসক হিসেবে, যাঁর দীর্ঘ শাসনামলে দেশটি সব দিক থেকেই খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছিল।