তুফায়েল আহমদ

দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। কে জিতবে কে হারবে, প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, এসব নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে। এর মধ্যেই বেশ কিছু সংস্থা জনমত জরিপের ভিত্তিতে কোন দল এগিয়ে আছে, কারা পিছিয়ে আছে—এমন তথ্য প্রকাশ করেছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে গেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের আওয়ামী শাসনামলের অবসান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা জরিপ পরিচালনা করছে।
তবে প্রকাশিত এসব জরিপের ফলাফল নিয়ে জনমনে এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কোনো জরিপে দেখা যাচ্ছে বিএনপির জয়জয়কার, কোনোটিতে জামায়াতে ইসলামীর অভাবনীয় উত্থান, আবার কোনোটিতে উঠে আসছে তরুণদের নতুন রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাবনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই জরিপগুলো আসলে কতটা বিজ্ঞানসম্মত? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী জরিপ আদৌ বিশ্বাসযোগ্য?
নির্বাচনকে সামনে রেখে গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সংস্থাভেদে তথ্যের ব্যাপক ফারাক রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন কনসাল্টিং দুই ধাপে জরিপ পরিচালনা করেছে। তাদের সর্বশেষ (সেপ্টেম্বর ২০২৫) তথ্যে দেখা যায়, ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে চান। জামায়াতে ইসলামীর জনসমর্থন উঠে এসেছে ৩০ দশমিক ৩ শতাংশে। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলেছেন ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা। আর জুলাই অভ্যুত্থানের তরুণদের দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ বা এনসিপির সমর্থন দেখানো হয়েছে ৪ দশমিক ১০ শতাংশ। তাদের জরিপে আরও দেখা যায়, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ওপর মানুষের অসন্তুষ্টি সবচেয়ে বেশি, আর সন্তুষ্টির মাত্রায় এগিয়ে আছে জামায়াতে ইসলামী।
অন্যদিকে গত ১-২০ জুলাই পর্যন্ত পরিচালিত ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) জরিপের ফলাফল ইনোভিশনের ঠিক উল্টো। তাদের জরিপে দেখা গেছে, বিএনপিকে ভোট দিতে চান মাত্র ১৬ শতাংশ (পরে ১২ শতাংশ) মানুষ। জামায়াতের সমর্থন দেখানো হয়েছে ১০-১১ শতাংশের কোঠায়। তবে এই জরিপের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ‘সিদ্ধান্তহীন’ বা ‘ভোট দেবেন না’ এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ, বিআইজিডির মতে, প্রায় অর্ধেক ভোটার এখনো মনস্থির করেননি বা তারা প্রকাশ করতে চাইছেন না।
সংবাদপত্র প্রথম আলো এবং কিমেকারস কনসাল্টিংয়ের জরিপটি ছিল কিছুটা ভিন্ন ধাঁচের। তারা সরাসরি ‘কাকে ভোট দেবেন’ প্রশ্ন না করে জানতে চেয়েছিল ‘কে বেশি আসনে জিতবে বলে মনে করেন’। ফলাফলে দেখা গেছে, ৬৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন বিএনপি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। ২৬ শতাংশ মনে করেন জামায়াতে ইসলামী বেশি আসন পাবে। ৫৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের জন্য ভালো হবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) তাদের জরিপে রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রিয়তার ওপর বেশি জোর দিয়েছে। তাদের তথ্যে, ৬৯ শতাংশ মানুষের আস্থা রয়েছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর। ৮০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে।
গতবছরে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের যৌথভাবে পরিচালিত 'ইউথ ইন ট্রানজিশন' শীর্ষক জরিপে দেখা গেছে, তরুণদের মধ্যে বিএনপির সমর্থন প্রায় ৩৯ শতাংশ, জামায়াতের ২১ শতাংশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থন প্রায় ১৬ শতাংশ।
নির্বাচনী জরিপের সংস্কৃতি পশ্চিমা বিশ্বে বহুদিনের। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নির্বাচনের আগে ‘ওপিনিয়ন পোল’ বা ‘এক্সিট পোল’ ভোটের উত্তাপ বাড়ানোর পাশাপাশি জনমতের একটি বৈজ্ঞানিক আভাস দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, উন্নত প্রযুক্তি, দীর্ঘদিনের ডেটা আর অবাধ তথ্যপ্রবাহের সেই দেশগুলোতেও কি জরিপ সবসময় সঠিক হয়? ইতিহাস বলছে—না, বরং বড় বড় নির্বাচনে জরিপ সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস ডাহা ফেল করার নজির ভুরি ভুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের নির্বাচনের কথাই ধরা যাক। নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে শুরু করে সিএনএন—প্রায় সব বড় মিডিয়া ও নামকরা জরিপ সংস্থা হিলারি ক্লিনটনের জয়ের ব্যাপারে একপ্রকার নিশ্চিত ছিল। তাদের পরিসংখ্যানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের সম্ভাবনা ছিল খুবই ক্ষীণ। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেল ট্রাম্পের অবিশ্বাস্য বিজয়। বিশ্লেষকরা পরে জানিয়েছিলেন, জরিপ সংস্থাগুলো ‘সাইলেন্ট ভোটার’ বা যারা জনসম্মক্ষে নিজের মত প্রকাশে অনিচ্ছুক, তাদের মনস্তত্ত্ব ধরতে ব্যর্থ হয়েছিল। এ
পাশের দেশ ভারতের চিত্র আরও বিচিত্র। সেখানে নির্বাচন নিয়ে বিশাল বাজেটের কমার্শিয়াল জরিপ হয়। অথচ ২০২৪ সালের সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে ভারতের প্রায় সব কয়টি ‘এক্সিট পোল’ বা বুথ ফেরত জরিপ একযোগে দাবি করেছিল, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ৪০০-এর বেশি আসন পাবে। কিন্তু বাস্তবে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাই পায়নি। এই ভুল পূর্বাভাসের কারণে ভারতের শেয়ার বাজারে ধস নামে এবং প্রদীপ গুপ্তর মতো বিখ্যাত পোলস্টার বা জরিপকারীকে টেলিভিশনের পর্দায় লাইভ অনুষ্ঠানে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ক্ষমা চাইতে দেখা যায়।
যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট ইস্যুতেও অধিকাংশ জরিপ বলেছিল মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে রায় দেবে, কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল উল্টো। ২০১৫ সালের ব্রিটিশ নির্বাচনেও জরিপগুলো ঝুলন্ত পার্লামেন্টের আভাস দিলেও ডেভিড ক্যামেরন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন।
উন্নত বিশ্বের এই ভুলগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, জরিপ কেবল একটি ‘সম্ভাবনা’ হতে পারে, কোনো ‘শেষ কথা’ নয়।
জরিপগুলোর ফলাফলের এই বিশাল ব্যবধান সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা এসব জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। কেন এই জরিপগুলো পুরোপুরি আস্থাশীল হতে পারছে না, তার পেছনে বেশ কিছু কারণ ও সমালোচনা রয়েছে।
প্রথম আলোর জরিপ নিয়ে বিশ্লেষক মোহাম্মদ নকিবুর রহমান বিডি-টুডেতে তাঁর এক লেখায় বলেছেন, জরিপের মৌলিক প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল ‘আপনি কাকে ভোট দেবেন?’ কিন্তু সেখানে জানতে চাওয়া হয়েছে ‘কে জিতবে বলে আপনি মনে করেন?’ এটি আসলে জনমত যাচাই নয়, বরং মানুষের ‘অনুমান’ যাচাই। যার কাছে রাজনৈতিক তথ্যের অভাব রয়েছে, তাকে দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করানো বিজ্ঞানসম্মত নয়। এছাড়া ১৭ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১,৩৪২ জনের নমুনা এবং মাত্র ৫টি শহর ও ৫টি গ্রাম থেকে তথ্য সংগ্রহ করাকে তিনি ‘পুরো আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে ৫টি থানার তাপমাত্রা মাপা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
রাজনৈতিক ম্যাগাজিন ‘জনতার চোখে’ প্রকাশিত মতামতে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট সোহরাব হাসান আইআরআই-এর জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, এই একই সংস্থা ২০২৩ সালের আগস্টে জানিয়েছিল, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর ৭০ শতাংশ মানুষের সমর্থন রয়েছে। অথচ তার এক বছরের মাথায় গণঅভ্যুত্থানে তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হলো। সোহরাব হাসানের মতে, বিদেশি অনেক সংস্থা ক্ষমতাসীনদের তুষ্ট করতে বা ‘ডিপ স্টেটের’ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে জরিপ পরিচালনা করে। যে সংস্থা স্বৈরাচারী সরকারের পতনের ঠিক আগে তাদের জনপ্রিয়তার তুঙ্গে দেখায়, তাদের বর্তমান জরিপ কতটুকু নিরপেক্ষ, তা নিয়ে সংশয় থাকাটাই স্বাভাবিক।
ইনোভিশন দাবি করেছে তাদের জরিপ ‘ফেস-টু-ফেস’ বা সরাসরি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এবং ১০ হাজারের বেশি নমুনা নিয়ে করা। অন্যদিকে বিআইজিডি করেছে ফোন কলের মাধ্যমে। প্রথম আলোতে এক লেখায় ইনোভিশনের সিইও রুবাইয়াৎ সরওয়ারের মতে, ফোনে মানুষ ভয়ে সত্য কথা নাও বলতে পারে, তাই সেখানে ‘সিদ্ধান্তহীন’ ভোটারের সংখ্যা বেশি (৪৮%)। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারুফ মল্লিক তাঁর এক লেখায় দাবি করেছেন, ইনোভিশনের জরিপে জামায়াতের ৩১ শতাংশ ভোট পাওয়া অস্বাভাবিক। তার মতে, জামায়াত একটি ক্যাডারভিত্তিক দল, হঠাৎ করে তাদের জনসমর্থন দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, নির্দিষ্ট কোনো এলাকা বা গোষ্ঠী থেকে নমুনা সংগ্রহ করার ফলে ফলাফলে এমন বায়াস বা পক্ষপাত তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে গত ১৫ বছরে মানুষ মন খুলে কথা বলার অভ্যাস হারিয়েছে। ভিউজ বাংলাদেশে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে, সাংবাদিক আমীন আল রশীদ বিআইজিডির জরিপের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ৪৮ শতাংশ মানুষ যে মতামত দেননি, এর পেছনে ‘ভয়’ একটি বড় কারণ হতে পারে। কিংবা তারা হয়তো বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা পাচ্ছেন না। এই বিপুল সংখ্যক ‘নীরব ভোটার’ নির্বাচনের দিন যে কোনো জরিপের ফলাফল উল্টে দিতে পারে। জরিপকারীরা এই নীরব অংশকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হলে পুরো ফলাফলই ভুল প্রমাণিত হবে।
মারুফ মল্লিক ও আমীন আল রশীদ উভয়েই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, অনেক সময় জনমতকে প্রভাবিত করার জন্য ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ জরিপ প্রকাশ করা হয়। যেমন—বিএনপির জনসমর্থন মাত্র ১২ শতাংশ (বিআইজিডি) দেখানোটা হয়তো দলটিকে চাপে ফেলার কৌশল হতে পারে। আবার জামায়াতের জনসমর্থন অনেক বেশি দেখিয়ে ইসলামপন্থী ভোটের একটি কৃত্রিম ঢেউ তৈরি করার চেষ্টা হতে পারে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে সব জরিপে আওয়ামী লীগের জয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে বিএনপি ভূমিধস জয় পায়। হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনের উদাহরণ টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, মিডিয়া বা এজেন্সির জরিপ অনেক সময় মাঠের বাস্তবতাকে ধরতে পারে না।
বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও এর রাজনৈতিক জনমিতি (ডেমোগ্রাফি) অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। সিলেটের ভোটের রাজনীতির সঙ্গে উত্তরবঙ্গের বা চট্টগ্রামের রাজনীতির মিল নেই। মাত্র ৫-১০টি স্পট থেকে স্যাম্পল নিয়ে সারা দেশের চিত্র আঁকা পরিসংখ্যানগতভাবে দুর্বল। গ্রাম ও শহরের ভোটারের মানসিকতায় আকাশ-পাতাল তফাত থাকে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বা পত্রিকার পাঠকদের ওপর করা জরিপ (যেমন প্রথম আলো করেছে) কখনোই প্রান্তিক কৃষকের বা শ্রমিকের মতামত প্রতিফলিত করে না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো জরিপই শতভাগ নির্ভুল হওয়ার দাবি করতে পারে না। জাহেদ উর রহমান মনে করেন, যদিও প্রথম আলোর জরিপ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন আছে, তবুও ফলাফল তার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মেলে। তিনি মনে করেন, তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতি বিএনপির জন্য বড় ফ্যাক্টর। তবে জামায়াতের ভোট এবং ইসলামি দলগুলোর প্রভাব বাড়লেও তা ক্ষমতায় যাওয়ার মতো ৩০-৩৫ শতাংশে পৌঁছানোর বিষয়টি নিয়ে তিনি সন্দিহান।
সমাজকালে প্রকাশিত এক লেখায় গবেষক নাদিম মাহমুদ আরও কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘বাংলাদেশের জরিপ কখনোই কাজে লাগে না।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, মাঠের রাজনীতি আর জরিপের কাগজের হিসাব এক নয়।
তবে ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের রুবাইয়াৎ সরওয়ার দাবি করেছেন, তাদের জরিপ বিজ্ঞানসম্মত এবং পদ্ধতিগতভাবে অন্যান্যের চেয়ে উন্নত। তিনি অভিযোগ করেন, বিশ্লেষকরা নিজেদের ধারণার সঙ্গে মিলছে না বলেই জরিপকে ‘পক্ষপাতমূলক’ বলছেন। তিনি মনে করেন, স্বাধীন জরিপের সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে ওঠা জরুরি।
বাংলাদেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক জরিপগুলো এখনো শৈশব পর্যায়ে রয়েছে। উন্নত বিশ্বে যেখানে কয়েক দশক ধরে নির্বাচনী ডেটা বা তথ্য-উপাত্তের ভাণ্ডার রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে গত তিনটি নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪) সুষ্ঠু না হওয়ায় ভোটারের আচরণের কোনো বিশ্বাসযোগ্য বেঞ্চমার্ক বা মানদণ্ড নেই। ফলে গবেষকরা কিসের সঙ্গে তুলনা করবেন, তা নিয়ে অন্ধকারে থাকেন।
বর্তমান জরিপগুলোতে যে অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে—কখনো বিএনপি শীর্ষে, কখনো জামায়াত ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে, আবার কখনো অর্ধেক মানুষই সিদ্ধান্তহীন—তা আসলে বাংলাদেশের অস্থির রাজনীতিরই প্রতিচ্ছবি। একদিকে ইনোভিশনের জরিপে জামায়াতের অভাবনীয় উত্থান যেমন প্রশ্নের জন্ম দেয়, তেমনি বিআইজিডির জরিপে বিএনপির মাত্র ১২ শতাংশ সমর্থনও বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হয়। আবার আইআরআই-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার অতীত রেকর্ড তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, জরিপের সংখ্যা তত বাড়বে। তবে এই সংখ্যাতত্ত্বের খেলায় আসল সত্যটি লুকিয়ে আছে দেশের সাধারণ মানুষের মনে, যারা হয়তো জরিপকারীদের সামনে মুখ খুলতে ভয় পান অথবা সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অপেক্ষায় আছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, ‘সাইলেন্ট রেভোল্যুশন’ বা ব্যালট বিপ্লব সব জরিপকে ভুল প্রমাণ করে দেয়। তাই এই জরিপগুলোকে ‘ধ্রুব সত্য’ হিসেবে না দেখে বরং সময়ের ‘রাজনৈতিক পালস’ বা বাতাসের গতিপ্রকৃতি বোঝার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখাই শ্রেয়। দিনশেষে, ব্যালট বাক্সই হবে জনমতের একমাত্র ও চূড়ান্ত জরিপ।

দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। কে জিতবে কে হারবে, প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, এসব নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে। এর মধ্যেই বেশ কিছু সংস্থা জনমত জরিপের ভিত্তিতে কোন দল এগিয়ে আছে, কারা পিছিয়ে আছে—এমন তথ্য প্রকাশ করেছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে গেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের আওয়ামী শাসনামলের অবসান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা জরিপ পরিচালনা করছে।
তবে প্রকাশিত এসব জরিপের ফলাফল নিয়ে জনমনে এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কোনো জরিপে দেখা যাচ্ছে বিএনপির জয়জয়কার, কোনোটিতে জামায়াতে ইসলামীর অভাবনীয় উত্থান, আবার কোনোটিতে উঠে আসছে তরুণদের নতুন রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাবনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই জরিপগুলো আসলে কতটা বিজ্ঞানসম্মত? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী জরিপ আদৌ বিশ্বাসযোগ্য?
নির্বাচনকে সামনে রেখে গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সংস্থাভেদে তথ্যের ব্যাপক ফারাক রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন কনসাল্টিং দুই ধাপে জরিপ পরিচালনা করেছে। তাদের সর্বশেষ (সেপ্টেম্বর ২০২৫) তথ্যে দেখা যায়, ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে চান। জামায়াতে ইসলামীর জনসমর্থন উঠে এসেছে ৩০ দশমিক ৩ শতাংশে। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলেছেন ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা। আর জুলাই অভ্যুত্থানের তরুণদের দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ বা এনসিপির সমর্থন দেখানো হয়েছে ৪ দশমিক ১০ শতাংশ। তাদের জরিপে আরও দেখা যায়, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ওপর মানুষের অসন্তুষ্টি সবচেয়ে বেশি, আর সন্তুষ্টির মাত্রায় এগিয়ে আছে জামায়াতে ইসলামী।
অন্যদিকে গত ১-২০ জুলাই পর্যন্ত পরিচালিত ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) জরিপের ফলাফল ইনোভিশনের ঠিক উল্টো। তাদের জরিপে দেখা গেছে, বিএনপিকে ভোট দিতে চান মাত্র ১৬ শতাংশ (পরে ১২ শতাংশ) মানুষ। জামায়াতের সমর্থন দেখানো হয়েছে ১০-১১ শতাংশের কোঠায়। তবে এই জরিপের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ‘সিদ্ধান্তহীন’ বা ‘ভোট দেবেন না’ এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ, বিআইজিডির মতে, প্রায় অর্ধেক ভোটার এখনো মনস্থির করেননি বা তারা প্রকাশ করতে চাইছেন না।
সংবাদপত্র প্রথম আলো এবং কিমেকারস কনসাল্টিংয়ের জরিপটি ছিল কিছুটা ভিন্ন ধাঁচের। তারা সরাসরি ‘কাকে ভোট দেবেন’ প্রশ্ন না করে জানতে চেয়েছিল ‘কে বেশি আসনে জিতবে বলে মনে করেন’। ফলাফলে দেখা গেছে, ৬৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন বিএনপি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। ২৬ শতাংশ মনে করেন জামায়াতে ইসলামী বেশি আসন পাবে। ৫৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের জন্য ভালো হবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) তাদের জরিপে রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রিয়তার ওপর বেশি জোর দিয়েছে। তাদের তথ্যে, ৬৯ শতাংশ মানুষের আস্থা রয়েছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর। ৮০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে।
গতবছরে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের যৌথভাবে পরিচালিত 'ইউথ ইন ট্রানজিশন' শীর্ষক জরিপে দেখা গেছে, তরুণদের মধ্যে বিএনপির সমর্থন প্রায় ৩৯ শতাংশ, জামায়াতের ২১ শতাংশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থন প্রায় ১৬ শতাংশ।
নির্বাচনী জরিপের সংস্কৃতি পশ্চিমা বিশ্বে বহুদিনের। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নির্বাচনের আগে ‘ওপিনিয়ন পোল’ বা ‘এক্সিট পোল’ ভোটের উত্তাপ বাড়ানোর পাশাপাশি জনমতের একটি বৈজ্ঞানিক আভাস দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, উন্নত প্রযুক্তি, দীর্ঘদিনের ডেটা আর অবাধ তথ্যপ্রবাহের সেই দেশগুলোতেও কি জরিপ সবসময় সঠিক হয়? ইতিহাস বলছে—না, বরং বড় বড় নির্বাচনে জরিপ সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস ডাহা ফেল করার নজির ভুরি ভুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের নির্বাচনের কথাই ধরা যাক। নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে শুরু করে সিএনএন—প্রায় সব বড় মিডিয়া ও নামকরা জরিপ সংস্থা হিলারি ক্লিনটনের জয়ের ব্যাপারে একপ্রকার নিশ্চিত ছিল। তাদের পরিসংখ্যানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের সম্ভাবনা ছিল খুবই ক্ষীণ। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেল ট্রাম্পের অবিশ্বাস্য বিজয়। বিশ্লেষকরা পরে জানিয়েছিলেন, জরিপ সংস্থাগুলো ‘সাইলেন্ট ভোটার’ বা যারা জনসম্মক্ষে নিজের মত প্রকাশে অনিচ্ছুক, তাদের মনস্তত্ত্ব ধরতে ব্যর্থ হয়েছিল। এ
পাশের দেশ ভারতের চিত্র আরও বিচিত্র। সেখানে নির্বাচন নিয়ে বিশাল বাজেটের কমার্শিয়াল জরিপ হয়। অথচ ২০২৪ সালের সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে ভারতের প্রায় সব কয়টি ‘এক্সিট পোল’ বা বুথ ফেরত জরিপ একযোগে দাবি করেছিল, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ৪০০-এর বেশি আসন পাবে। কিন্তু বাস্তবে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাই পায়নি। এই ভুল পূর্বাভাসের কারণে ভারতের শেয়ার বাজারে ধস নামে এবং প্রদীপ গুপ্তর মতো বিখ্যাত পোলস্টার বা জরিপকারীকে টেলিভিশনের পর্দায় লাইভ অনুষ্ঠানে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ক্ষমা চাইতে দেখা যায়।
যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট ইস্যুতেও অধিকাংশ জরিপ বলেছিল মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে রায় দেবে, কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল উল্টো। ২০১৫ সালের ব্রিটিশ নির্বাচনেও জরিপগুলো ঝুলন্ত পার্লামেন্টের আভাস দিলেও ডেভিড ক্যামেরন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন।
উন্নত বিশ্বের এই ভুলগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, জরিপ কেবল একটি ‘সম্ভাবনা’ হতে পারে, কোনো ‘শেষ কথা’ নয়।
জরিপগুলোর ফলাফলের এই বিশাল ব্যবধান সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা এসব জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। কেন এই জরিপগুলো পুরোপুরি আস্থাশীল হতে পারছে না, তার পেছনে বেশ কিছু কারণ ও সমালোচনা রয়েছে।
প্রথম আলোর জরিপ নিয়ে বিশ্লেষক মোহাম্মদ নকিবুর রহমান বিডি-টুডেতে তাঁর এক লেখায় বলেছেন, জরিপের মৌলিক প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল ‘আপনি কাকে ভোট দেবেন?’ কিন্তু সেখানে জানতে চাওয়া হয়েছে ‘কে জিতবে বলে আপনি মনে করেন?’ এটি আসলে জনমত যাচাই নয়, বরং মানুষের ‘অনুমান’ যাচাই। যার কাছে রাজনৈতিক তথ্যের অভাব রয়েছে, তাকে দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করানো বিজ্ঞানসম্মত নয়। এছাড়া ১৭ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১,৩৪২ জনের নমুনা এবং মাত্র ৫টি শহর ও ৫টি গ্রাম থেকে তথ্য সংগ্রহ করাকে তিনি ‘পুরো আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে ৫টি থানার তাপমাত্রা মাপা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
রাজনৈতিক ম্যাগাজিন ‘জনতার চোখে’ প্রকাশিত মতামতে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট সোহরাব হাসান আইআরআই-এর জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, এই একই সংস্থা ২০২৩ সালের আগস্টে জানিয়েছিল, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর ৭০ শতাংশ মানুষের সমর্থন রয়েছে। অথচ তার এক বছরের মাথায় গণঅভ্যুত্থানে তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হলো। সোহরাব হাসানের মতে, বিদেশি অনেক সংস্থা ক্ষমতাসীনদের তুষ্ট করতে বা ‘ডিপ স্টেটের’ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে জরিপ পরিচালনা করে। যে সংস্থা স্বৈরাচারী সরকারের পতনের ঠিক আগে তাদের জনপ্রিয়তার তুঙ্গে দেখায়, তাদের বর্তমান জরিপ কতটুকু নিরপেক্ষ, তা নিয়ে সংশয় থাকাটাই স্বাভাবিক।
ইনোভিশন দাবি করেছে তাদের জরিপ ‘ফেস-টু-ফেস’ বা সরাসরি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এবং ১০ হাজারের বেশি নমুনা নিয়ে করা। অন্যদিকে বিআইজিডি করেছে ফোন কলের মাধ্যমে। প্রথম আলোতে এক লেখায় ইনোভিশনের সিইও রুবাইয়াৎ সরওয়ারের মতে, ফোনে মানুষ ভয়ে সত্য কথা নাও বলতে পারে, তাই সেখানে ‘সিদ্ধান্তহীন’ ভোটারের সংখ্যা বেশি (৪৮%)। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারুফ মল্লিক তাঁর এক লেখায় দাবি করেছেন, ইনোভিশনের জরিপে জামায়াতের ৩১ শতাংশ ভোট পাওয়া অস্বাভাবিক। তার মতে, জামায়াত একটি ক্যাডারভিত্তিক দল, হঠাৎ করে তাদের জনসমর্থন দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, নির্দিষ্ট কোনো এলাকা বা গোষ্ঠী থেকে নমুনা সংগ্রহ করার ফলে ফলাফলে এমন বায়াস বা পক্ষপাত তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে গত ১৫ বছরে মানুষ মন খুলে কথা বলার অভ্যাস হারিয়েছে। ভিউজ বাংলাদেশে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে, সাংবাদিক আমীন আল রশীদ বিআইজিডির জরিপের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ৪৮ শতাংশ মানুষ যে মতামত দেননি, এর পেছনে ‘ভয়’ একটি বড় কারণ হতে পারে। কিংবা তারা হয়তো বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা পাচ্ছেন না। এই বিপুল সংখ্যক ‘নীরব ভোটার’ নির্বাচনের দিন যে কোনো জরিপের ফলাফল উল্টে দিতে পারে। জরিপকারীরা এই নীরব অংশকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হলে পুরো ফলাফলই ভুল প্রমাণিত হবে।
মারুফ মল্লিক ও আমীন আল রশীদ উভয়েই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, অনেক সময় জনমতকে প্রভাবিত করার জন্য ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ জরিপ প্রকাশ করা হয়। যেমন—বিএনপির জনসমর্থন মাত্র ১২ শতাংশ (বিআইজিডি) দেখানোটা হয়তো দলটিকে চাপে ফেলার কৌশল হতে পারে। আবার জামায়াতের জনসমর্থন অনেক বেশি দেখিয়ে ইসলামপন্থী ভোটের একটি কৃত্রিম ঢেউ তৈরি করার চেষ্টা হতে পারে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে সব জরিপে আওয়ামী লীগের জয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে বিএনপি ভূমিধস জয় পায়। হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনের উদাহরণ টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, মিডিয়া বা এজেন্সির জরিপ অনেক সময় মাঠের বাস্তবতাকে ধরতে পারে না।
বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও এর রাজনৈতিক জনমিতি (ডেমোগ্রাফি) অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। সিলেটের ভোটের রাজনীতির সঙ্গে উত্তরবঙ্গের বা চট্টগ্রামের রাজনীতির মিল নেই। মাত্র ৫-১০টি স্পট থেকে স্যাম্পল নিয়ে সারা দেশের চিত্র আঁকা পরিসংখ্যানগতভাবে দুর্বল। গ্রাম ও শহরের ভোটারের মানসিকতায় আকাশ-পাতাল তফাত থাকে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বা পত্রিকার পাঠকদের ওপর করা জরিপ (যেমন প্রথম আলো করেছে) কখনোই প্রান্তিক কৃষকের বা শ্রমিকের মতামত প্রতিফলিত করে না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো জরিপই শতভাগ নির্ভুল হওয়ার দাবি করতে পারে না। জাহেদ উর রহমান মনে করেন, যদিও প্রথম আলোর জরিপ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন আছে, তবুও ফলাফল তার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মেলে। তিনি মনে করেন, তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতি বিএনপির জন্য বড় ফ্যাক্টর। তবে জামায়াতের ভোট এবং ইসলামি দলগুলোর প্রভাব বাড়লেও তা ক্ষমতায় যাওয়ার মতো ৩০-৩৫ শতাংশে পৌঁছানোর বিষয়টি নিয়ে তিনি সন্দিহান।
সমাজকালে প্রকাশিত এক লেখায় গবেষক নাদিম মাহমুদ আরও কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘বাংলাদেশের জরিপ কখনোই কাজে লাগে না।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, মাঠের রাজনীতি আর জরিপের কাগজের হিসাব এক নয়।
তবে ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের রুবাইয়াৎ সরওয়ার দাবি করেছেন, তাদের জরিপ বিজ্ঞানসম্মত এবং পদ্ধতিগতভাবে অন্যান্যের চেয়ে উন্নত। তিনি অভিযোগ করেন, বিশ্লেষকরা নিজেদের ধারণার সঙ্গে মিলছে না বলেই জরিপকে ‘পক্ষপাতমূলক’ বলছেন। তিনি মনে করেন, স্বাধীন জরিপের সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে ওঠা জরুরি।
বাংলাদেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক জরিপগুলো এখনো শৈশব পর্যায়ে রয়েছে। উন্নত বিশ্বে যেখানে কয়েক দশক ধরে নির্বাচনী ডেটা বা তথ্য-উপাত্তের ভাণ্ডার রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে গত তিনটি নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪) সুষ্ঠু না হওয়ায় ভোটারের আচরণের কোনো বিশ্বাসযোগ্য বেঞ্চমার্ক বা মানদণ্ড নেই। ফলে গবেষকরা কিসের সঙ্গে তুলনা করবেন, তা নিয়ে অন্ধকারে থাকেন।
বর্তমান জরিপগুলোতে যে অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে—কখনো বিএনপি শীর্ষে, কখনো জামায়াত ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে, আবার কখনো অর্ধেক মানুষই সিদ্ধান্তহীন—তা আসলে বাংলাদেশের অস্থির রাজনীতিরই প্রতিচ্ছবি। একদিকে ইনোভিশনের জরিপে জামায়াতের অভাবনীয় উত্থান যেমন প্রশ্নের জন্ম দেয়, তেমনি বিআইজিডির জরিপে বিএনপির মাত্র ১২ শতাংশ সমর্থনও বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হয়। আবার আইআরআই-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার অতীত রেকর্ড তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, জরিপের সংখ্যা তত বাড়বে। তবে এই সংখ্যাতত্ত্বের খেলায় আসল সত্যটি লুকিয়ে আছে দেশের সাধারণ মানুষের মনে, যারা হয়তো জরিপকারীদের সামনে মুখ খুলতে ভয় পান অথবা সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অপেক্ষায় আছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, ‘সাইলেন্ট রেভোল্যুশন’ বা ব্যালট বিপ্লব সব জরিপকে ভুল প্রমাণ করে দেয়। তাই এই জরিপগুলোকে ‘ধ্রুব সত্য’ হিসেবে না দেখে বরং সময়ের ‘রাজনৈতিক পালস’ বা বাতাসের গতিপ্রকৃতি বোঝার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখাই শ্রেয়। দিনশেষে, ব্যালট বাক্সই হবে জনমতের একমাত্র ও চূড়ান্ত জরিপ।

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং তিস্তা ও পদ্মাসহ অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের অঙ্গীকার ভারতকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে একে কূটনৈতিক চাপের কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২ দিন আগে
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত- ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য বাস্তবতায় নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। একদিকে এটি ভারতকে ইউরোপের বিশাল বাজারে আরও শক্ত অবস্থান করে দিবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশের জন্য বাড়াবে অনিশ্চয়তা।
২ দিন আগে
ত্রিপোলি সরকার ও খলিফা হাফতারের চিরচেনা সংঘাতের বাইরে সাইফ গাদ্দাফি ছিলেন লিবিয়ার রাজনীতির এক বিকল্প কণ্ঠ। সম্প্রতি তাঁর আকস্মিক মৃত্যু সেই তৃতীয় পক্ষের সম্ভাবনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল।
৩ দিন আগে
রাজধানীর উত্তরায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) বাসা থেকে নির্যাতনের শিকার ১১ বছর বয়সী শিশু গৃহকর্মী উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
৫ দিন আগে