জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

যে রাতে যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে ‘বিটলম্যানিয়া’, ৪০ শতাংশ মানুষ টিভিতে দেখেছিল ‘বিটলস’

১৯৬৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এড সলিভান টিভি শোতে বিটলসের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নজির গড়ে। সেদিন প্রায় ৪০ শতাংশ আমেরিকান একসঙ্গে টিভির পর্দায় দেখেছিল চার তরুণকে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় ‘বিটলম্যানিয়া’।

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১: ৫৬
যে রাতে যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে ‘বিটলম্যানিয়া’, ৪০ শতাংশ মানুষ টিভিতে দেখেছিল ‘বিটলস’। সংগৃহীত ছবি

নভেম্বর ১৯৬৩। লন্ডনের রেডিওতে ঘুরে-ফিরে বাজছে বিটলসের ‘শি লাভস ইউ’। গানটি কয়েক সপ্তাহ ধরেই যুক্তরাজ্যের চার্টের শীর্ষে। দোকানের জানালায় বিটলসের পোস্টার ঝুলছে, কফিশপে আলো-আঁধারিতে বসে তরুণরা গান গুনগুন করছে, কলেজ থেকে ফেরার ভিড়েও শোনা যাচ্ছে সেই সুর।

তবে এই উন্মাদনা তখনও সীমাবদ্ধ ছিল যুক্তরাজ্যেই। লিভারপুল থেকে লন্ডন—সবখানেই বিটলস আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে? সেখানে তখনও বিটলস পৌঁছায়নি। মানে, বিটলম্যানিয়া শুরু হয়নি।

ষাটের দশকে বিটলসকে ঘিরে ভক্তদের যে তীব্র উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, সেটাই পরে পরিচিত হয় ‘বিটলম্যানিয়া’ নামে।

বিটলসের প্রথম দিককার সিঙ্গেল ‘লাভ মি ডু’, ‘প্লিজ প্লিজ মি’, ‘ফ্রম মি টু ইউ’ তখন যুক্তরাজ্যে একের পর এক সাফল্য পাচ্ছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এসব গান হয় ঠিকভাবে প্রকাশই পায়নি অথবা পেলেও তেমন কোনো সাড়া জাগাতে পারেনি। কারণটা খুব স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের বড় রেকর্ড লেবেলগুলো বিশ্বাসই করত না যে ব্রিটিশ ব্যান্ড সেখানে চলতে পারে। ক্যাপিটল রেকর্ডস তো সরাসরি বলে দিয়েছিল, ‘বিটলসের গান এখানে কেউ শুনবে না।’

রেকর্ড লেবেলগুলোর এসব যুক্তি মূলত সেই সময়ের বাস্তবতা। তখন যুক্তরাষ্ট্রের মিউজিকের বাজার ছিল এলভিস প্রিসলি, দ্য বিচ বয়েজের মতো ব্যান্ডের দখলে। সেই ভিড়ে চারজন ব্রিটিশ ছেলের গান কতটা জায়গা করে নিতে পারবে! সন্দেহটা অমূলক ছিল না।

১৯৬৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এড সলিভান টিভি শোতে বিটলসের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নজির গড়ে। বিটলসের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া ছবি
১৯৬৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এড সলিভান টিভি শোতে বিটলসের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নজির গড়ে। বিটলসের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া ছবি

কিন্তু নাটকের মোড় ঘুরে গেল ১৯৬৩ সালের ২৯ নভেম্বর। সেদিন যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত হলো বিটলসের নতুন গান ‘আই ওয়ান্ট টু হোল্ড ইউর হ্যান্ড’। রিলিজের সঙ্গে সঙ্গেই আবার নতুন ঢেউ। যুক্তরাজ্যে শুরু হলো বিটলম্যানিয়ার নতুন আরেকদফা উন্মাদনা। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটা ঘটে যুক্তরাষ্ট্রে।

ওয়াশিংটন ডিসির ডিজে ক্যারল জেমস গানটি রেডিওতে বাজান। সেদিনই রেডিও স্টেশনের ফোন লাইনে যেন আগুন লেগে যায়। শ্রোতারা ফোন করে বলতে থাকে ‘আবার বাজান’, ‘এই ব্যান্ড কারা?’, ‘এমন গান আগে শুনিনি!’

এই অপ্রত্যাশিত সাড়া দেখেই ক্যাপিটল রেকর্ডস বাধ্য হয় সিদ্ধান্ত বদলাতে। ১৯৬৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর গানটি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পায়। শোনা যায়, প্রথম তিন দিনেই নাকি প্রায় আড়াই লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল। আর মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই গানটি ঢুকে পড়ে বিলবোর্ড হট হান্ড্রেড-এর শীর্ষে। তখন আর সন্দেহ রইল না, বিটলস খুব শীঘ্রই যুক্তরাষ্ট্রে শো করতে আসবে।

বিটলস যখন যুক্তরাষ্ট্রে

এরপর সবকিছু যেন খুব দ্রুত ঘটতে থাকে। ১৯৬৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি, দুপুর ১টা ২০ মিনিটে বিটলসের বিমান নামল নিউইয়র্কের জেএফকে এয়ারপোর্টে। অপেক্ষায় ছিল প্রায় হাজার পাঁচেক ভক্ত। কারো হাতে পোস্টার, কারো হাতে ফুল, কেউ চিৎকার করছে, কেউ আনন্দে কাঁদছে। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ব্যান্ডের জন্য এমন দৃশ্য আগে কেউ দেখেনি।

নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পরের দুই দিন বিটলস ‘দ্য প্লাজা’ হোটেলেই কাটিয়েছিল। এই সময় ভক্তরা প্রিয় ব্যান্ডের একটু কাছাকাছি যাওয়ার জন্য যা করার, সবই করেছিল। অনেক ভক্ত হোটেলের বাইরে তাঁবু গেড়ে বসে পড়ে। কেউ কেউ আবার বিটলসকে একনজর দেখার আশায় হোটেলে রুম বুকিং করেছিল।

এদিকে ৯ ফেব্রুয়ারি বিটলসের ‘এড সলিভান শো’ সরাসরি টিভি স্টুডিও সেটে বসে দেখার জন্য আবেদন জমা পড়তে থাকে। আবেদনসংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ৫০ হাজারে। অথচ সিবিএসের স্টুডিওতে এই শোতে দর্শক বসানোর ব্যবস্থা ছিল মাত্র ৭২৮ জনের।

টিভির পর্দার সামনে বসেছিল যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ

অবশেষে আসে ৯ ফেব্রুয়ারি। সেই দিন আমেরিকার মানুষ প্রথমবারের মতো টেলিভিশনের পর্দায় বিটলসকে দেখল, গান শুনল। এড সলিভান শো-এর সেই সম্প্রচার গড়ে তোলে এক ঐতিহাসিক রেকর্ড। টেলিভিশন রেটিং দাঁড়ায় ৪৫ দশমিক ৩। এর মানে হলো, যেসব আমেরিকান পরিবারের ঘরে টেলিভিশন ছিল, তার ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ তখন এই অনুষ্ঠানটাই দেখছিল। সংখ্যায় ধরলে প্রায় ২ কোটি ৩২ লাখ ৪০ হাজার পরিবার।

ক্যামেরা একবার বিটলসের দিকে, একবার দর্শকদের দিকে। বিটলসের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া
ক্যামেরা একবার বিটলসের দিকে, একবার দর্শকদের দিকে। বিটলসের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

আরও সহজ করে বললে, ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রে যত টেলিভিশন সেট চালু ছিল, তার প্রায় ৬০ শতাংশেই চলছিল এড সলিভান শো।

সব মিলিয়ে সেই রাতে টিভির পর্দার সামনে বসেছিল প্রায় ৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষ। যা তখনকার যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। এমন দৃশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি।

শো-এর শুরুতেই দেখা যায় চারজন তরুণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে—জন লেনন, পল ম্যাককার্টনি, জর্জ হ্যারিসন আর রিঙ্গো স্টার। প্রথমেই বিটলস গাইল ‘অল মাই লাভিং’। গান শুরু হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্টুডিও ভরে গেল দর্শকদের চিৎকারে। এত জোরে হাততালিতে গান ঠিকভাবে শোনাই যাচ্ছিল না। এই চিৎকার আর হাততালিই যেন বিটলম্যানিয়ার ভাষা।

ক্যামেরা একবার বিটলসের দিকে, একবার দর্শকদের দিকে। সামনে বসা ভক্তরা চিৎকার করছে, কেউ মাথা নাড়াছে আবার কেউ কেউ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আনন্দের কান্নাও দেখা যাচ্ছে দর্শকসারিতে। এমন দৃশ্য টিভিতে আগে কেউ দেখেনি।

এরপর বিটলস গাইল ‘টিল দেয়ার ওয়াজ ইউ’। এখানে ক্যামেরা আলাদা করে ধরল জর্জ হ্যারিসনের গিটার বাজানোতে। এরপরই শুরু হয় ‘শি লাভস ইউ’। গান শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই স্টুডিও আবার ভরে যায় দর্শকদের ‘Yeah, yeah, yeah!’ চিৎকারে।

আজ ভাবতেই অবাক লাগে, এক রাতেই যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়ে গেল বিটলম্যানিয়া। আর এর ঠিক দুই দিন পর ওয়াশিংটনে বিটলস যখন লাইভ কনসার্ট করল, তখন কনসার্টের সব টিকিট মুহুর্তেই সোল্ড আউট। উন্মাদনা তখন আর টেলিভিশনের পর্দায় আটকে নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো দেশে।

শো’র দ্বিতীয় অংশে বিটলস আবার মঞ্চে ফিরে আসে। তারা গাইল ‘আই সো হার স্ট্যান্ডিং দেয়ার’। আর সবশেষে গাইল ‘আই ওয়ান্ট টু হোল্ড ইউর হ্যান্ড’। এই গানটি তখন ইতিমধ্যেই চার্টের শীর্ষে উঠে গেছে। ক্যামেরা ক্লোজআপে ধরছিল জন লেনন আর পল ম্যাককার্টনির মুখ।

পুরো অনুষ্ঠানে বিটলসের পারফরম্যান্স ছিল মোটামুটি ১৫–১৬ মিনিট। সময়ের হিসেবে খুব বেশি নয়। কিন্তু এইটুকু সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের পপ কালচারের গতিপথে নতুন ঢেউ এনেছিল। কারণ, দর্শক শুধু গান শোনেনি। তাঁরা দেখেছে চারজন তরুণের চুলের নতুন ছাঁট, পরিপাটি কালো স্যুট, মঞ্চে দাঁড়ানোর ভঙ্গি, একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হেসে নেওয়া—সবকিছু মিলিয়ে একেবারে ভিন্ন উপস্থিতি। তখনকার তরুণদের কাছে এই ভিন্নতাই ছিল সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

এই নতুনত্ব খুব দ্রুত তরুণ প্রজন্মের মনে জায়গা করে নেয়। স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীরা বিটলসের মতো চুল কাটাতে শুরু করে। রেডিওতে ঘুরে ফিরে বাজতে থাকে তাদের গান। শহরের দোকানগুলোতে বিক্রি হতে থাকে পোস্টার, রেকর্ড, ব্যাজ। বিটলসকে ঘিরে এক নতুন বাজার গড়ে ওঠে। তবে সবাই যে এই উন্মাদনাকে স্বাগত জানিয়েছিল, তা নয়। অনেক অভিভাবকের চোখে বিষয়টা ছিল বাড়াবাড়ি, অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা। কিন্তু তরুণদের কাছে বিটলস মানে ছিল সময়ের ‘ক্রেজ’।

আজ ভাবতেই অবাক লাগে, এক রাতেই যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়ে গেল বিটলম্যানিয়া। আর এর ঠিক দুই দিন পর ওয়াশিংটনে বিটলস যখন লাইভ কনসার্ট করল, তখন কনসার্টের সব টিকিট মুহুর্তেই সোল্ড আউট। উন্মাদনা তখন আর টেলিভিশনের পর্দায় আটকে নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো দেশে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত