লিবিয়ার আকাশে ফের কালো মেঘ জমেছে। গত মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি নিহত হন। পশ্চিম লিবিয়ার জিন্তান শহরের এক বাড়িতে চারজন মুখোশধারী ৫৩ বছর বয়সী সাইফ গাদ্দাফিকে হত্যা করে। তাঁর মৃত্যু লিবিয়ার দীর্ঘ ও জটিল রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অনেকের কাছে তিনি ছিলেন আশা, আবার অনেকের কাছে ঘৃণিত শাসকের প্রতীক। কিন্তু সবকিছুর পরেও সাইফ ছিলেন বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার এক বিকল্প শক্তি।
ত্রিপোলির জাতিসংঘ স্বীকৃত সরকার ও পূর্বে খলিফা হাফতারের তথাকথিত লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি—এই দুই পক্ষের লড়াইয়ে সাইফ ছিলেন তৃতীয় এক কণ্ঠ। তাঁর মৃত্যু সেই সম্ভাবনা শেষ করে দিল।
ইতালীয় ইতিহাসবিদ লুইজি ভিলারি ১৯১১ সালে লিবিয়া নিয়ে লিখেছিলেন, এই ভূমি কাউকে ক্ষমতা দেয় না; কেবল ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের বিভ্রম তৈরি করে।
সাইফ হত্যার সময়টিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। মাত্র এক সপ্তাহ আগে প্যারিসের এলিসি প্রাসাদে লিবিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছিল। সেখানে খলিফা হাফতারের ছেলে সাদ্দাম হাফতার এবং ত্রিপোলি সরকারের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা একত্র হয়েছিলেন। এরপর রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারের কর্মকর্তারা আবার বৈঠক করেন। লক্ষ্য ছিল জাতীয় ঐক্যের পথ খুঁজে বের করা। এর ঠিক পরেই এমন ঘটনা দেশটির নিরাপত্তাহীনতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
উত্তরাধিকার নাকি বিতর্কিত নেতা?
সাইফ আল-ইসলামের অধীনে বড় কোনো সেনাবাহিনী ছিল না। কোনো নির্দিষ্ট এলাকার নিয়ন্ত্রণও তাঁর হাতে ছিল না। তবু তাঁর প্রভাব ছিল। এক সময় তিনি ছিলেন মুয়াম্মার গাদ্দাফির সংস্কারপন্থী এবং পশ্চিমঘেঁষা মুখ। কিন্তু ২০১১ সালের বিপ্লবে সব পাল্টে যায়। তখন সাইফ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি রক্তবন্যা বইয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। সেই ভাষণ সংস্কারপন্থী সাইফকে মুছে ফেলে তাঁকে বাবার নিষ্ঠুর শাসনের প্রতীক বানিয়েছিল। লিবিয়ান থিংক ট্যাংক সাদিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক আনাস এল গোমাটির মতে, সেই দিন থেকেই সংস্কারক সাইফের মৃত্যু হয়েছিল। জন্ম হয়েছিল স্বৈরশাসকের ছেলের।
বিদ্রোহীরা তাঁকে আটক করার পর ছয় বছর সাইফ গাদ্দাফি জিন্তানে বন্দি ছিলেন। ২০১৭ সালে মুক্তি পেলেও লিবিয়ার রাজনৈতিক দৃশ্যপটের আড়ালে চলে যান সাইফ। তখন অনেকে ভেবেছিল তিনি হয়তো মারা গেছেন। কিন্তু ২০২১ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে এক সাক্ষাৎকারে তিনি রাজনীতিতে ফিরে আসার ইঙ্গিত দেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ার ঘোষণাও দেন। যদিও যুদ্ধাপরাধের দায়ে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। তবে গাদ্দাফি আমলের স্থিতিশীলতার জন্য যারা এখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল। সাইফের মৃত্যু কেবল রাজনীতিবিদের মৃত্যু নয়, বরং গাদ্দাফি পরিবারের দীর্ঘ ছায়ার অবসান।
সাইফ আল-ইসলাম। সংগৃহীত ছবিমুয়াম্মার গাদ্দাফি ১৯৬৯ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তাঁর শাসন ছিল স্বৈরতান্ত্রিক। কিন্তু সেই সময়ে লিবিয়ায় তেলের টাকায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কালো ইতিহাসও ছিল। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ক্লাউদিয়া গাজিনির মতে, যারা পুরোনো দিনের স্থিতিশীলতা খুঁজছিল তাদের কাছে সাইফ ছিলেন আশা। তিনি বাস্তবিক ক্ষমতার চেয়ে প্রতীকী ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।
লিবিয়ার সমীকরণে কী বদল আসবে?
সাইফ আল-ইসলামের মৃত্যুতে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে পূর্ব লিবিয়ায়। কারণ সেখানকার ক্ষমতাধর খলিফা হাফতারের সমর্থক আর গাদ্দাফির সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের মিল আছে। তবে তাদের মধ্যে বিশ্বাস ছিল না। হাফতার একসময় গাদ্দাফিকে সহায়তা করলেও পরে বিদ্রোহ করেছিলেন। ২০২১ সালে নির্বাচনের সময় হাফতার বাহিনী সাইফের প্রার্থিতার বিরুদ্ধে বাধা দিয়েছিল। গাদ্দাফি পরিবার হাফতারকে বিশ্বাসঘাতক মনে করত। অন্যদিকে হাফতার ভয় পেতেন সাইফের জনপ্রিয়তাকে।
বিশ্লেষকদের মতে এই মৃত্যুর ফলে হাফতার লাভবান হবেন। কারণ তাঁর কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিকল্প ছিলেন সাইফ। এখন সেই বিকল্প আর রইল না। তবে সাইফের মৃত্যু লিবিয়ার সামগ্রিক রাজনীতিতে খুব বড় ঝড় তুলবে না। ২০১১ সালের পর গাদ্দাফির সমর্থকরাও বিভক্ত হয়ে গেছে। অনেকে পূর্ব বা পশ্চিমের ক্ষমতার বৃত্তে ঢুকে পড়েছে। এল গোমাটির মতে, সাইফ ছিলেন লিবিয়ার বিভক্ত রাজনীতির শেষ ‘স্পয়লার’ বা সমীকরণ নষ্টকারী। তাঁর মৃত্যুতে ক্ষমতার এই ভাগাভাগি ব্যবস্থা থেকে বের হওয়ার শেষ পথটিও বন্ধ হয়ে গেল।
কেন সাইফের বেঁচে থাকাই ছিল বিস্ময়?
মিডল ইস্ট মনিটরের করম নামার মতে, সাইফের মৃত্যুতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আসল বিস্ময় ছিল এতদিন তাঁর বেঁচে থাকা। বাবা ও ভাইয়ের মৃত্যুর পরেও তিনি কীভাবে এতদিন টিকে ছিলেন সেটাই ছিল আশ্চর্যের বিষয়।
দার্শনিক এমিল সিওরানের উক্তি টেনে করম নামার বলেন, যে জাতি ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে না তারা শাস্তি হিসেবে অতীতকে বারবার পুনরাবৃত্তি করে।
২০১১ সালের পর লিবিয়াকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা হয়েছিল। সাইফ বেঁচে ছিলেন ক্ষমতার ভারসাম্যের এক ‘কার্ড’ হিসেবে। যখনই কোনো পক্ষের দরকষাকষি বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের প্রয়োজন হতো তাঁকে ব্যবহার করা হতো। লিবিয়ায় কেউ প্রেসিডেন্ট চায়নি। সবাই চেয়েছিল বিশৃঙ্খল খেলার নতুন নতুন গুটি। গুটির কাজ শেষ হলে তাকে সরিয়ে দেওয়াই এই খেলার নিয়ম।
গাদ্দাফি শাসন কোনো সমাধান ছিল না। মিলিশিয়াদের লুটপাটও সমাধান নয়। লিবিয়ার জাতিসত্তার চেয়ে আঞ্চলিক ও গোত্রীয় স্বার্থ সব সময় বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। দার্শনিক এমিল সিওরানের উক্তি টেনে করম নামার বলেন, যে জাতি ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে না তারা শাস্তি হিসেবে অতীতকে বারবার পুনরাবৃত্তি করে।
সাইফের হাতে সেই সরঞ্জাম বা জনসমর্থন ছিল না যা দিয়ে পুরো দেশকে এক করা যায়। ইতিহাস তাঁর বিপক্ষে ছিল, ভূগোল তাঁর সহায় ছিল না। বিশ্বও তাঁকে মেনে নেয়নি। যে বিশ্ব অনেক বিতর্কিত নেতাকে পুনর্বাসন করেছে তারাও সাইফকে জায়গা দেয়নি।
ইতালীয় ইতিহাসবিদ লুইজি ভিলারি ১৯১১ সালে লিবিয়া নিয়ে লিখেছিলেন, এই ভূমি কাউকে ক্ষমতা দেয় না; কেবল ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের বিভ্রম তৈরি করে। সেই বিভ্রম এখনো আছে। সাইফ আল-ইসলাম সামাধান ছিলেন না, ঠিক যেমন হাফতার বা দিবেবাহ সমাধান নন। তবে সাইফের মৃত্যু জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যদি নির্বাচনের আয়োজনই না করা যায় তবে ফলাফল মানার প্রশ্নই আসে না। লিবিয়ার মানুষের এক হওয়ার স্বপ্ন কাল কঠিন ছিল, আজ কঠিন আছে, আগামীকাল তা আরও কঠিন হবে।
আল-জাজিরা ও মিডিল ইস্ট মনিটর অবলম্বনে।