সিনেমার আলাপ
তারেক অণু

একজন তরুণ ডাক্তার, যিনি বেছে নিয়েছিলেন মানুষের মুক্তির পথ। প্রথাগত পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার বদলে তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। আর তা দেশ, কাল আর সীমানার গণ্ডি ছাড়িয়ে। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া, কিউবা বিপ্লবের অন্যতম মহানায়ক, আর কঙ্গো ও বলিভিয়ায় বিপ্লবের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দেওয়া এই সূর্যসন্তানের নাম আর্নেস্তো গুয়েভারা দে লা সেরনা। সারা বিশ্বে তিনি এক নামে পরিচিত—‘চে’।
আর্জেন্টিনার এক স্বচ্ছল পরিবারের মেডিকেল পড়ুয়া তেইশ বছরের তরুণ আর্নেস্তো, বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোর সঙ্গে একটি জরাজীর্ণ মোটরসাইকেলে চেপে বেরিয়ে পড়েছিলেন সাড়ে বারো হাজার কিলোমিটারের এক ঐতিহাসিক ভ্রমণে। সেই ভ্রমণই বদলে দিয়েছিল তাঁর জীবন, দর্শন আর লক্ষ্য। সেই সঙ্গে বদলে দিয়েছিল বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের বাঁচার স্বপ্নকেও। সেই রোমাঞ্চকর ও জীবন বদলে দেওয়া যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত লিপিবদ্ধ ছিল আর্নেস্তো ও গ্রানাদোর রোজনামচায়।
এ নিয়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য গবেষণামূলক বই, প্রবন্ধ, অভিসন্দর্ভ। অবশেষে এমন ঘটনাবহুল দীর্ঘ কাহিনি দুই ঘণ্টারও কম সময়ে রূপোলী ফিতেয় ফ্রেমবন্দী করার দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করার মহাপরিকল্পনা হাতে নেন বিশ্বখ্যাত ব্রাজিলীয় চলচ্চিত্র পরিচালক ওয়াল্টার সারেস। রচিত হয় এক মহান সৃষ্টি, নতুন করে উম্মোচিত হয় এক মহাজীবনালেখ্য।
‘দ্য মোটরসাইকেল ডায়েরিজ’-এর শুরুর দৃশ্যেই কানে আসে সদা হাস্যময় জীবরসায়নবিদ আলবার্তোর উদাত্ত কণ্ঠের গান। দৃশ্যপটে আবির্ভাব হয় দুই বন্ধুর অগোছালভাবে যাত্রার সরঞ্জাম গোছানোর দৃশ্য। আলবার্তোর ৩০তম জন্মদিন উপলক্ষে বহু বছরের লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তারা আক্ষরিক অর্থেই রাস্তায় নামেন। সঙ্গী হয় আলবার্তোর সেই জং ধরা, কিন্তু বহু প্রতীক্ষিত নর্টন ৫০০ মোটরসাইকেল, যার আদরের নাম ল্য পোদেরসা। পরিকল্পনা ছিল দুই বন্ধু চার মাসে আট হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আর্জেন্টিনা, চিলি ও পেরু পেরিয়ে পৌঁছাবেন ভেনিজুয়েলার কারাকাসে। তারা তখনো ঘুণাক্ষরেও জানতেন না যে, এই যাত্রা তাদের বুনোতম কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যেতে চলেছে।

১৯৫২ সালের ৪ জানুয়ারি। বাক্সপেঁটরা গুছিয়ে মোটরসাইকেলের গায়ে কোনোমতে বেঁধে নেন তারা। আর্নেস্তোর পরিবারের সদস্যদের অশ্রুসজল বিদায় জানিয়ে শুরু হয় শহুরে জীবন ছেড়ে আদিগন্ত বিস্তৃত পাম্পাসের উদ্দেশ্যে তাদের যাত্রা। কদিন পরপরই মায়ের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চিঠি লেখেন আর্নেস্তো; সরল ভাষায় তুলে ধরেন যাত্রাপথের সব অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। তাদের এই দীর্ঘ যাত্রার পথে কিছু সময় অতিবাহিত হয় আর্নেস্তোর প্রেমিকা চিচিনার সেই অতি ধনী পরিবারের খামারবাড়িতে। প্রেমিকার কাছে আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নতুন এক রোমাঞ্চকর ভবিষ্যতের পথে বেরিয়ে পড়েন এই দুই বন্ধু।
তাদের সামনে তখন কঠিন আর কঠোর পথ। ঝোড়ো বাতাসে বারবার উড়ে যায় তাদের তাবু। বৃষ্টিসিক্ত রাস্তায়, তুষারাবৃত পথে, খানাখন্দে, জলায়, রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গরুর পালের ধাক্কা খেয়ে বারংবার থেমে যায় পুরোনো মোটরসাইকেল। কিন্তু থামেনা দুই তরুণের স্বপ্নযাত্রা। হিম শীতল পাহাড়ি আবহাওয়ায় হাঁপানির রোগী আর্নেস্তো বারবার অসুস্থ হয়ে পড়েন, আন্দেজ পর্বতের ক্ষুরধার ঠান্ডা বাতাস যেন তার দুর্বল ফুসফুসকে পরাভূত করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।
অবশেষে বিশাল আর্জেন্টিনা পাড়ি দিয়ে ছোট স্টিমারে করে তারা প্রথম পা রাখেন ভিনদেশের মাটিতে। সামনে দেখা দেয় চিলির তুষারশুভ্র পর্বতশৃঙ্গ। সেই দুর্গম বরফঢাকা পথ পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছান ছোট শহর তেমুকোতে। সেখানে স্থানীয় খবরের কাগজে ছবিসহ তাদের ভ্রমণকাহিনী ছাপা হয়, যা পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে আশীর্বাদস্বরূপ। চিলির লস এঞ্জেলস শহরেও তারা স্থানীয় দমকলবাহিনী প্রধান ও তার দুই কন্যার কাছ থেকে পেয়ে যান এমন এক আন্তরিক আতিথেয়তা। তবে সেই শহরেই এক অত্যন্ত অসুস্থ ও দরিদ্র নারীকে চিকিৎসা করতে গিয়ে আর্নেস্তোর ভেতরে এক গভীর পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। সেই নারীর হতদরিদ্র জীবনের বাস্তব রূপ তাকে দাঁড় করায় সম্পূর্ণ অন্য এক ভুবনের বাস্তবতার সামনে।
এই শহরেই তাদের প্রিয় মোটরসাইকেল ল্য পোদেরসাকে বিদায় দিতে হয়। আয়ু সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষিত হয়েছিল এমন বন্ধুর পথে যাত্রার ধকলে। এই প্রথম সদা হাস্যরত প্রেমিক আলবার্তোর চোখে দেখা যায় বন্ধু বিসর্জনের অশ্রু।
আমাদের গ্রহের সবচেয়ে শুষ্কতম স্থান চিলির আটকামা মরুভূমি পদব্রজে পাড়ি দেবার সময় এক অত্যাচারিত ভূমিহীন বামপন্থী দম্পতির সঙ্গে দেখা হয় তাদের। আর্নেস্তো তার রোজনামচায় লেখেন, ‘আজ জীবনের শীতলতম রাত কাটালাম এই খোলা প্রান্তরে, সামান্য নিভু নিভু আগুনের উত্তাপ অবলম্বন করে আর অসহায় সেই আদর্শবাদী দম্পতির কাহিনী শুনে।’ শাসকশ্রেণির এই ঘৃণ্য অত্যাচার তাদের দুজনকে গভীরভাবে বিষিয়ে তোলে। পরের দিন ভোরে খনিতে কাজের জন্য আসা দরিদ্র কর্মীদের প্রতি বহুজাতিক কোম্পানির অমানবিক আচরণ দেখে আর্নেস্তো প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন। পুলিশের ভয় বা হুমকির তোয়াক্কা না করেই তিনি সেই কোম্পানির গাড়িতে পাথর ছুড়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

আন্দেজের সবুজ উর্বর উপত্যকা পেরিয়ে তাদের যাত্রা চলতে থাকে। পরিচালক পথের এবড়োথেবড়ো অবস্থা বোঝাতে এমন কিছু বাস্তবসম্মত দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছেন, যা দর্শকদেরও পথ চলার সেই ঝাঁকুনি অনুভব করায়। অবশেষে তারা ল্যাটিন আমেরিকার প্রাণকেন্দ্র প্রাচীন ইনকা রাজধানী কুজকো শহরে এসে পৌঁছান। পাহাড়চূড়ায় ইনকাদের সুমহান সৃষ্টি ‘মাচুপিচু’ দেখে তারা বিস্মিত হন, আর সেই সঙ্গে ইনকা সভ্যতা ধ্বংসকারী স্প্যানিশ অনুপ্রবেশকারীদের রক্তাক্ত ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ওঠেন। পাহাড়ের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে তাদের দেখা হতে থাকে বঞ্চিত রেড ইন্ডিয়ান কৃষকদের সঙ্গে; যাদের ন্যায্য জমি কেড়ে নিয়েছে ভূমিদস্যুরা, আর পুলিশ লুট করেছে তাদের সামান্য সম্বল।
যাত্রার এক পর্যায়ে তারা আমাজনের প্রান্তসীমায় কুষ্ঠ রোগীদের এক আশ্রমে বেশ কিছুদিন কাটান। সমাজ থেকে বিতাড়িত মানুষগুলোর পরম বন্ধু হয়ে ওঠেন তারা। সেই রোগীরা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে, এমন মানুষও আছে যারা তাদের ছুঁতে দ্বিধা করে না! একসাথে খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে ফুটবল খেলা—সবই চলতে থাকে। এমনকি নিজের জন্মদিনের রাতে আবেগপ্রবণ হয়ে আর্নেস্তো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই খরস্রোতা আমাজন নদী সাঁতরে পাড়ি দেন, শুধুমাত্র কুষ্ঠ রোগীদের আশ্রমে গিয়ে তাদের জানাতে যে, তিনি তাদের ভালোবাসেন।
১২,৪২৫ কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে ভেনিজুয়েলার কারাকাসে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয় দুই বন্ধুর এই ভ্রমণ। সেখান থেকে বিমানে চেপে চিকিৎসাশাস্ত্রের বাকি পড়াশোনা শেষ করতে আর্নেস্তো ফিরে আসেন আর্জেন্টিনায়। এরপরের ইতিহাস তো আমাদের সবারই জানা। কীভাবে সেই তরুণ চিকিৎসক হয়ে উঠলেন এক কালজয়ী বিপ্লবী।
‘দ্য মোটরসাইকেল ডায়েরিজ’ চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় শক্তি হলো এর ল্যাটিন আমেরিকার অবারিত প্রাকৃতিক দৃশ্য আর স্থানীয় মানুষের জীবন্ত মুখচ্ছবি। সেই সাথে আর্নেস্তো গুয়েভারার চরিত্রে গায়েল গার্সিয়া বার্নেল এবং আলবার্তো গ্রানাদোর ভূমিকায় রদ্রিগো দে লা সেরনার অনবদ্য অভিনয় সিনেমাটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশেষ করে চের চরিত্রে বার্নেলের এটি ছিল দ্বিতীয় অভিনয়, যা তাকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল।
আর সেই সঙ্গে এক অনন্য আবহ সঙ্গীত, গিটারের ছয় তারের চলমান ধ্বনি যেন ঘাই মারে হৃদয়ের গভীরে, মস্তিষ্কের কোষে কোষে। যেমন আনন্দে চেতনাকে কাঁপানো হয় তির তির আনন্দে, তেমনি রোমাঞ্চিত করে নবভ্রমণের আশায়, সবার শেষে এক অদ্ভুত ঘিরে আসা বিষণ্ণতায় ভরে দেয় আমাদের চেনা পৃথিবীটাকে। ২০০৫ সালে এই অসাধারণ সৃষ্টিটি সংগীতে অস্কার জয় করে। অস্কারের সেই মঞ্চে সুরের জাদুকর কার্লোস সান্তানার গিটারের মূর্ছনায় গানটি গেয়েছিলেন অ্যান্তোনিও ব্যান্ডেরাস, যা আজও শ্রোতাদের শিহরিত করে।
সিনেমার শেষ পর্যায়ে যখন নাম দেখানো হয়, তখন আর্নেস্তো ও আলবার্তোর জীবনের কিছু দুর্লভ সাদা-কালো ছবি ভেসে ওঠে। সেখানে কয়েক মুহূর্তের জন্য আশি বছর বয়সী বৃদ্ধ আলবার্তো গ্রানাদোকে বড় পর্দায় দেখা যায়। কিউবায় বন্ধু আর্নেস্তোর আমন্ত্রণে গিয়েই তিনি সান্তিয়াগো স্কুল অফ মেডিসিন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং পরম নিষ্ঠায় তা পরিচালনা করেছিলেন।
স্প্যানিশ ভাষায় নির্মিত এই সেলুলয়েড মহাকাব্যের শেষ দৃশ্যে উড়ন্ত বিমানের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ আলবার্তো নিশ্চয়ই তার চিরতরুণ বন্ধু চে আর্নেস্তো গুয়েভারার কথা ভাবছিলেন। যিনি ৪৪ বছর আগেই এক পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, আর ফেরেননি। কিন্তু আজ তার স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা আর দর্শনের কথা ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। আলবার্তো গ্রানাদো ৮৮ বছরের এক পরিপূর্ণ ও সার্থক জীবন কাটিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তের পথে।
আমার এই লেখাটি সেই মহান মানুষটির পুণ্যস্মৃতি, মানবতার প্রতি তার দৃঢ় বিশ্বাস এবং তার সেই তীব্র ভ্রমণপিপাসার প্রতি এক অতি ক্ষুদ্র সম্মান জানানোর প্রয়াস মাত্র।

একজন তরুণ ডাক্তার, যিনি বেছে নিয়েছিলেন মানুষের মুক্তির পথ। প্রথাগত পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার বদলে তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। আর তা দেশ, কাল আর সীমানার গণ্ডি ছাড়িয়ে। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া, কিউবা বিপ্লবের অন্যতম মহানায়ক, আর কঙ্গো ও বলিভিয়ায় বিপ্লবের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দেওয়া এই সূর্যসন্তানের নাম আর্নেস্তো গুয়েভারা দে লা সেরনা। সারা বিশ্বে তিনি এক নামে পরিচিত—‘চে’।
আর্জেন্টিনার এক স্বচ্ছল পরিবারের মেডিকেল পড়ুয়া তেইশ বছরের তরুণ আর্নেস্তো, বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোর সঙ্গে একটি জরাজীর্ণ মোটরসাইকেলে চেপে বেরিয়ে পড়েছিলেন সাড়ে বারো হাজার কিলোমিটারের এক ঐতিহাসিক ভ্রমণে। সেই ভ্রমণই বদলে দিয়েছিল তাঁর জীবন, দর্শন আর লক্ষ্য। সেই সঙ্গে বদলে দিয়েছিল বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের বাঁচার স্বপ্নকেও। সেই রোমাঞ্চকর ও জীবন বদলে দেওয়া যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত লিপিবদ্ধ ছিল আর্নেস্তো ও গ্রানাদোর রোজনামচায়।
এ নিয়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য গবেষণামূলক বই, প্রবন্ধ, অভিসন্দর্ভ। অবশেষে এমন ঘটনাবহুল দীর্ঘ কাহিনি দুই ঘণ্টারও কম সময়ে রূপোলী ফিতেয় ফ্রেমবন্দী করার দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করার মহাপরিকল্পনা হাতে নেন বিশ্বখ্যাত ব্রাজিলীয় চলচ্চিত্র পরিচালক ওয়াল্টার সারেস। রচিত হয় এক মহান সৃষ্টি, নতুন করে উম্মোচিত হয় এক মহাজীবনালেখ্য।
‘দ্য মোটরসাইকেল ডায়েরিজ’-এর শুরুর দৃশ্যেই কানে আসে সদা হাস্যময় জীবরসায়নবিদ আলবার্তোর উদাত্ত কণ্ঠের গান। দৃশ্যপটে আবির্ভাব হয় দুই বন্ধুর অগোছালভাবে যাত্রার সরঞ্জাম গোছানোর দৃশ্য। আলবার্তোর ৩০তম জন্মদিন উপলক্ষে বহু বছরের লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তারা আক্ষরিক অর্থেই রাস্তায় নামেন। সঙ্গী হয় আলবার্তোর সেই জং ধরা, কিন্তু বহু প্রতীক্ষিত নর্টন ৫০০ মোটরসাইকেল, যার আদরের নাম ল্য পোদেরসা। পরিকল্পনা ছিল দুই বন্ধু চার মাসে আট হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আর্জেন্টিনা, চিলি ও পেরু পেরিয়ে পৌঁছাবেন ভেনিজুয়েলার কারাকাসে। তারা তখনো ঘুণাক্ষরেও জানতেন না যে, এই যাত্রা তাদের বুনোতম কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যেতে চলেছে।

১৯৫২ সালের ৪ জানুয়ারি। বাক্সপেঁটরা গুছিয়ে মোটরসাইকেলের গায়ে কোনোমতে বেঁধে নেন তারা। আর্নেস্তোর পরিবারের সদস্যদের অশ্রুসজল বিদায় জানিয়ে শুরু হয় শহুরে জীবন ছেড়ে আদিগন্ত বিস্তৃত পাম্পাসের উদ্দেশ্যে তাদের যাত্রা। কদিন পরপরই মায়ের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চিঠি লেখেন আর্নেস্তো; সরল ভাষায় তুলে ধরেন যাত্রাপথের সব অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। তাদের এই দীর্ঘ যাত্রার পথে কিছু সময় অতিবাহিত হয় আর্নেস্তোর প্রেমিকা চিচিনার সেই অতি ধনী পরিবারের খামারবাড়িতে। প্রেমিকার কাছে আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নতুন এক রোমাঞ্চকর ভবিষ্যতের পথে বেরিয়ে পড়েন এই দুই বন্ধু।
তাদের সামনে তখন কঠিন আর কঠোর পথ। ঝোড়ো বাতাসে বারবার উড়ে যায় তাদের তাবু। বৃষ্টিসিক্ত রাস্তায়, তুষারাবৃত পথে, খানাখন্দে, জলায়, রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গরুর পালের ধাক্কা খেয়ে বারংবার থেমে যায় পুরোনো মোটরসাইকেল। কিন্তু থামেনা দুই তরুণের স্বপ্নযাত্রা। হিম শীতল পাহাড়ি আবহাওয়ায় হাঁপানির রোগী আর্নেস্তো বারবার অসুস্থ হয়ে পড়েন, আন্দেজ পর্বতের ক্ষুরধার ঠান্ডা বাতাস যেন তার দুর্বল ফুসফুসকে পরাভূত করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।
অবশেষে বিশাল আর্জেন্টিনা পাড়ি দিয়ে ছোট স্টিমারে করে তারা প্রথম পা রাখেন ভিনদেশের মাটিতে। সামনে দেখা দেয় চিলির তুষারশুভ্র পর্বতশৃঙ্গ। সেই দুর্গম বরফঢাকা পথ পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছান ছোট শহর তেমুকোতে। সেখানে স্থানীয় খবরের কাগজে ছবিসহ তাদের ভ্রমণকাহিনী ছাপা হয়, যা পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে আশীর্বাদস্বরূপ। চিলির লস এঞ্জেলস শহরেও তারা স্থানীয় দমকলবাহিনী প্রধান ও তার দুই কন্যার কাছ থেকে পেয়ে যান এমন এক আন্তরিক আতিথেয়তা। তবে সেই শহরেই এক অত্যন্ত অসুস্থ ও দরিদ্র নারীকে চিকিৎসা করতে গিয়ে আর্নেস্তোর ভেতরে এক গভীর পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। সেই নারীর হতদরিদ্র জীবনের বাস্তব রূপ তাকে দাঁড় করায় সম্পূর্ণ অন্য এক ভুবনের বাস্তবতার সামনে।
এই শহরেই তাদের প্রিয় মোটরসাইকেল ল্য পোদেরসাকে বিদায় দিতে হয়। আয়ু সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষিত হয়েছিল এমন বন্ধুর পথে যাত্রার ধকলে। এই প্রথম সদা হাস্যরত প্রেমিক আলবার্তোর চোখে দেখা যায় বন্ধু বিসর্জনের অশ্রু।
আমাদের গ্রহের সবচেয়ে শুষ্কতম স্থান চিলির আটকামা মরুভূমি পদব্রজে পাড়ি দেবার সময় এক অত্যাচারিত ভূমিহীন বামপন্থী দম্পতির সঙ্গে দেখা হয় তাদের। আর্নেস্তো তার রোজনামচায় লেখেন, ‘আজ জীবনের শীতলতম রাত কাটালাম এই খোলা প্রান্তরে, সামান্য নিভু নিভু আগুনের উত্তাপ অবলম্বন করে আর অসহায় সেই আদর্শবাদী দম্পতির কাহিনী শুনে।’ শাসকশ্রেণির এই ঘৃণ্য অত্যাচার তাদের দুজনকে গভীরভাবে বিষিয়ে তোলে। পরের দিন ভোরে খনিতে কাজের জন্য আসা দরিদ্র কর্মীদের প্রতি বহুজাতিক কোম্পানির অমানবিক আচরণ দেখে আর্নেস্তো প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন। পুলিশের ভয় বা হুমকির তোয়াক্কা না করেই তিনি সেই কোম্পানির গাড়িতে পাথর ছুড়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

আন্দেজের সবুজ উর্বর উপত্যকা পেরিয়ে তাদের যাত্রা চলতে থাকে। পরিচালক পথের এবড়োথেবড়ো অবস্থা বোঝাতে এমন কিছু বাস্তবসম্মত দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছেন, যা দর্শকদেরও পথ চলার সেই ঝাঁকুনি অনুভব করায়। অবশেষে তারা ল্যাটিন আমেরিকার প্রাণকেন্দ্র প্রাচীন ইনকা রাজধানী কুজকো শহরে এসে পৌঁছান। পাহাড়চূড়ায় ইনকাদের সুমহান সৃষ্টি ‘মাচুপিচু’ দেখে তারা বিস্মিত হন, আর সেই সঙ্গে ইনকা সভ্যতা ধ্বংসকারী স্প্যানিশ অনুপ্রবেশকারীদের রক্তাক্ত ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ওঠেন। পাহাড়ের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে তাদের দেখা হতে থাকে বঞ্চিত রেড ইন্ডিয়ান কৃষকদের সঙ্গে; যাদের ন্যায্য জমি কেড়ে নিয়েছে ভূমিদস্যুরা, আর পুলিশ লুট করেছে তাদের সামান্য সম্বল।
যাত্রার এক পর্যায়ে তারা আমাজনের প্রান্তসীমায় কুষ্ঠ রোগীদের এক আশ্রমে বেশ কিছুদিন কাটান। সমাজ থেকে বিতাড়িত মানুষগুলোর পরম বন্ধু হয়ে ওঠেন তারা। সেই রোগীরা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে, এমন মানুষও আছে যারা তাদের ছুঁতে দ্বিধা করে না! একসাথে খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে ফুটবল খেলা—সবই চলতে থাকে। এমনকি নিজের জন্মদিনের রাতে আবেগপ্রবণ হয়ে আর্নেস্তো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই খরস্রোতা আমাজন নদী সাঁতরে পাড়ি দেন, শুধুমাত্র কুষ্ঠ রোগীদের আশ্রমে গিয়ে তাদের জানাতে যে, তিনি তাদের ভালোবাসেন।
১২,৪২৫ কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে ভেনিজুয়েলার কারাকাসে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয় দুই বন্ধুর এই ভ্রমণ। সেখান থেকে বিমানে চেপে চিকিৎসাশাস্ত্রের বাকি পড়াশোনা শেষ করতে আর্নেস্তো ফিরে আসেন আর্জেন্টিনায়। এরপরের ইতিহাস তো আমাদের সবারই জানা। কীভাবে সেই তরুণ চিকিৎসক হয়ে উঠলেন এক কালজয়ী বিপ্লবী।
‘দ্য মোটরসাইকেল ডায়েরিজ’ চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় শক্তি হলো এর ল্যাটিন আমেরিকার অবারিত প্রাকৃতিক দৃশ্য আর স্থানীয় মানুষের জীবন্ত মুখচ্ছবি। সেই সাথে আর্নেস্তো গুয়েভারার চরিত্রে গায়েল গার্সিয়া বার্নেল এবং আলবার্তো গ্রানাদোর ভূমিকায় রদ্রিগো দে লা সেরনার অনবদ্য অভিনয় সিনেমাটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশেষ করে চের চরিত্রে বার্নেলের এটি ছিল দ্বিতীয় অভিনয়, যা তাকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল।
আর সেই সঙ্গে এক অনন্য আবহ সঙ্গীত, গিটারের ছয় তারের চলমান ধ্বনি যেন ঘাই মারে হৃদয়ের গভীরে, মস্তিষ্কের কোষে কোষে। যেমন আনন্দে চেতনাকে কাঁপানো হয় তির তির আনন্দে, তেমনি রোমাঞ্চিত করে নবভ্রমণের আশায়, সবার শেষে এক অদ্ভুত ঘিরে আসা বিষণ্ণতায় ভরে দেয় আমাদের চেনা পৃথিবীটাকে। ২০০৫ সালে এই অসাধারণ সৃষ্টিটি সংগীতে অস্কার জয় করে। অস্কারের সেই মঞ্চে সুরের জাদুকর কার্লোস সান্তানার গিটারের মূর্ছনায় গানটি গেয়েছিলেন অ্যান্তোনিও ব্যান্ডেরাস, যা আজও শ্রোতাদের শিহরিত করে।
সিনেমার শেষ পর্যায়ে যখন নাম দেখানো হয়, তখন আর্নেস্তো ও আলবার্তোর জীবনের কিছু দুর্লভ সাদা-কালো ছবি ভেসে ওঠে। সেখানে কয়েক মুহূর্তের জন্য আশি বছর বয়সী বৃদ্ধ আলবার্তো গ্রানাদোকে বড় পর্দায় দেখা যায়। কিউবায় বন্ধু আর্নেস্তোর আমন্ত্রণে গিয়েই তিনি সান্তিয়াগো স্কুল অফ মেডিসিন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং পরম নিষ্ঠায় তা পরিচালনা করেছিলেন।
স্প্যানিশ ভাষায় নির্মিত এই সেলুলয়েড মহাকাব্যের শেষ দৃশ্যে উড়ন্ত বিমানের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ আলবার্তো নিশ্চয়ই তার চিরতরুণ বন্ধু চে আর্নেস্তো গুয়েভারার কথা ভাবছিলেন। যিনি ৪৪ বছর আগেই এক পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, আর ফেরেননি। কিন্তু আজ তার স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা আর দর্শনের কথা ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। আলবার্তো গ্রানাদো ৮৮ বছরের এক পরিপূর্ণ ও সার্থক জীবন কাটিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তের পথে।
আমার এই লেখাটি সেই মহান মানুষটির পুণ্যস্মৃতি, মানবতার প্রতি তার দৃঢ় বিশ্বাস এবং তার সেই তীব্র ভ্রমণপিপাসার প্রতি এক অতি ক্ষুদ্র সম্মান জানানোর প্রয়াস মাত্র।
.png)

বাংলা ভাষায় এমন নাম খুব কমই আছে যেগুলো নিজেই একেকটি বিশেষণে পরিণত হয়েছে। আমরা যখন কাউকে ব্যতিক্রমী মেধাবী বলতে চাই, তখন তাকে ‘আইনস্টাইন’ বলি। কেউ যখন প্রেমে মগ্ন থাকে, তাকে ‘রোমিও’ বলি। কিন্তু মীর জাফরের চেয়ে বড় উদাহরণ আর কেউ হতে পারে না, যার নাম ভারতীয় উপমহাদেশে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়ে
৬ মিনিট আগে
নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা রক্ষা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিরোধের মহাকাব্য। বর্তমান বাংলাদেশের সঙ্গে সিরাজউদ্দৌলার সম্পর্ক অতি গভীর এবং অবিচ্ছেদ্য।
১ ঘণ্টা আগে
বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু যুদ্ধ রয়েছে, যেগুলো শুধু একটি যুদ্ধ বা একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এর ফলে একটি জাতির ভাগ্য বদলে গেছে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সংঘটিত পলাশীর যুদ্ধ ঠিক তেমনই একটি ঘটনা।
২ ঘণ্টা আগে
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার পলাশীর আমবাগানে কয়েক ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে পরাজিত হন স্বাধীন বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা। এই পরাজয় বদলে দিয়েছিল উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস। পলাশীর যুদ্ধে হারের কারণেই ভারতবর্ষ ইংরেজদের হাতে চলে যায়।
৩ ঘণ্টা আগে