সুমন সাজ্জাদ

কম করে হলেও এক হাজার বছর ধরে কবিতা লিখছে বাংলাভাষী মানুষ; এ অঞ্চলে জন্মেছেন অগণিত ভাবমূর্তিসম্পন্ন কবি। উপাধিপ্রবণ বাঙালি কবিসমাজ তৈরি করে নিয়েছে নানা ধরনের উপাধি—‘কবিকঙ্কন’, ‘বিশ্বকবি’, ‘বিদ্রোহী কবি’, ‘পল্লীকবি’, ‘রূপসী বাংলার কবি’। তবে ‘কিশোর-কবি’ অভিধা পেয়েছেন মূলত একজনই—সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭)। অথচ সুকান্ত তখন পেরিয়ে গেছেন কৈশোরের সীমা। তাঁর কবিতা মোটেই কিশোরশোভন চপলতায় আচ্ছন্ন নয়। বাঙালি তবু তাঁকে কিশোরের দোরগোড়ায়ই আটকে রেখেছে।
এ ধরনের সাংস্কৃতিক উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন সুকান্তের একটি ভাবপ্রতিমা গড়ে দিয়েছে; সেখানে দেখা যাবে, এক তরুণের গালে হাত দেওয়া ছবি, ক্ষয়রোগের মর্মান্তিকতা, ক্লান্তিহীন দারিদ্র্য, স্বপ্নময় তারুণ্য ইত্যাদি। বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে সুকান্ত এভাবেই ঘুরে ফিরে হাজির হন। অনেকেরই হয়তো মনে পড়বে, বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকেও ‘সংস্কৃতিমনা’ বাঙালি পরিবারের বসার ঘরে রবীন্দ্র-নজরুলের পাশে শোভা পেত সুকান্তের ছবি।
এই দৃশ্যকল্পের ভেতর ঘটে যায় সুকান্তের জনপ্রিয় উপস্থাপন। এমনকি বিদ্যায়তনিক গবেষকেরাও পরিচিত দৃশ্যকল্পের অনুশাসনে সুকান্তের মূল্যায়ন করেন। তখন মনে হয়, সুকান্ত ছিলেন এক সম্ভাবনাময় কবি, কিন্তু কবি হিসেবে প্রাপ্তমনস্ক কবিতা উপহার দিতে পারেননি। পার্সি বিশি শেলি, জন কিটস, কিংবা আর্তুর র্যাঁবোর বেলায় এরকম কি ভাবি আমরা? উনিশ বছর বয়সী র্যাঁবোর লেখা কবিতা নিয়ে কম উন্মাদনা করি আমরা? মূল কথাটা হলো একজন কবিকে বয়সের সীমানায় আটকে রেখে মূল্যায়ন করলে কবি ও কবিতার প্রতি সুবিচার হয় না। কবি মূল্যায়িত হতে পারেন তাঁর সৃষ্টিসম্ভারের পরিপ্রেক্ষিতেই। আর তাই, সুকান্ত ভট্টাচার্যকে আমরা দেখতে চাই আধুনিক বাংলা কবিতার পটভূমি ছুঁয়ে।
আমাদের মনে পড়বে, সুকান্তের আয়ুষ্কালের ভেতর বিস্তারিত হয়েছে বাংলা সাহিত্যের গনগনে সূর্য—রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ, জসীম উদ্দীন। বাংলা কবিতার মানচিত্রই তাঁরা বদলে ফেলেছেন। তাঁদের চেয়ে যাঁরা তরুণ—সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সমর সেন—তাঁরাও সাহিত্যিক সিদ্ধিতে উজ্জ্বল। তাঁরা খুঁজে পেয়েছিলেন শিল্পের নিজস্ব ভাষা। সে সময় কবিতার জন্য কেউ ছিলেন শুদ্ধতম শিল্পের অভিমুখী, কেউ কেউ মেনে নিয়েছিলেন সামাজিক দায়বদ্ধতা।
‘শিল্পের জন্য শিল্প’ বনাম ‘মানুষের জন্য শিল্প’—এরকম একটি লড়াইয়ের তোপধ্বনি শোনা গিয়েছিল। উভয় শিবিরের লক্ষ্য স্বতন্ত্র হলেও এক বিষয়ে তাঁরা অভিন্নহৃদয়; আর তা হলো রবীন্দ্রনাথকে যে করে হোক পেরিয়ে যেতেই হবে। রবীন্দ্র-সাহিত্যের বাতাবরণ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার গূঢ়তর সংকল্প জয়ী হয়েছিল। সুকান্ত সেই কালের তরুণতম এক কবি। তিনি বিচরণ করতে পারতেন শিল্পত্বের স্বপ্নভারাতুর অববাহিকায়। কিন্তু না, বিকল্প পথটিকেই তিনি বেছে নিলেন—‘মানুষের জন্য শিল্প’। আবার, রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর কোনো বিরাগ নেই, বরং শ্রদ্ধামিশ্রিত প্রণতি আছে; লিখেছেন ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, ‘পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশে’ শীর্ষক কবিতা।
ততো দিনে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে এসে গেছে নতুন ভাবাদর্শ মার্কসবাদ। ১৯১৭-তে সম্পন্ন রুশ বিপ্লবের খবরাখবর বঙ্গদেশের কবিরা যথাসময়েই পেয়েছেন। মার্কসের চিন্তার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। সাহিত্য ও মাকর্সবাদের সম্পর্ক মজবুত হয়েছে চল্লিশের দশকে। তত্ত্ব ও অনুশীলনে সুকান্ত তাঁর জীবন ও শিল্পের জন্য এই বিশ্ববীক্ষাকে করেছেন জীবনের ধ্রুবতারা। যদিও জাতীয়তাবাদ তখন ভীষণ শক্তিশালী। হিন্দু ও মুসলমান পরিচয়ের রাজনীতি তখন তুঙ্গস্পর্শী। সাহিত্যের মাধ্যমে উজাড় হাতে অনেকেই বিলিয়েছেন জাতীয়তার জয়গান।
সুকান্তের ঝোঁক সেদিকে নয়। ভাবাদর্শিকভাবে তিনি হয়ে উঠলেন ‘আন্তর্জাতিক’— মার্কসাবাদীরা যেমন ভাবেন; অঞ্চলকে ছাড়িয়ে তারা হতে চান বিশ্বব্যাপী সবার, নিপীড়িত জনতার। সুকান্তের কবিতায় তাই চিত্রিত হয় কাশ্মীর, স্তালিনগ্রাদ, প্যারিসের সংগ্রামী ছবি। লেনিন হয়ে ওঠেন তাঁর ভাবাদর্শিক নেতা। লেনিনকে নিয়ে লেখা কবিতায় সুকান্ত অনেকটা রাজনৈতিক সন্দর্ভের মতো করে লিখেছেন :
বিদ্যুৎ-ইশারা চোখে, আজকেও অযুত লেনিন
ক্রমশ সংক্ষিপ্ত করে বিশ্বব্যাপী প্রতীক্ষিত দিন,—
বিপর্যস্ত ধনতন্ত্র, কণ্ঠরুদ্ধ, বুকে আর্তনাদ;
— আসে শত্রুজয়ের সংবাদ। (‘লেনিন’)
তাই বলে নিজের অঞ্চলের কথা বিস্তৃত হলেন, তাও নয়। কেননা মার্কসবাদ সবসময়ই বিশেষ স্তর পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন করে। তাই সুকান্তকে লিখতে হয় ভারতীয় উপমহাদেশের উপনিবেশিত অভিজ্ঞতার বিবরণ। মূলত ঔপনিবেশিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে মার্কসবাদ সুকান্তকে সহায়তা করেছে। তাঁর কবিতায় আমরা পেলাম ‘উপনিবেশ’ কিংবা ‘বিদেশী শাসনে’র সুস্পষ্ট উল্লেখ। ‘চিল’ শীর্ষক কবিতায় উড়ন্ত চিলের চোখে গোটা পৃথিবীকে দেখা গেলো ‘লুণ্ঠনের অবাধ উপনিবেশ’ হিসেবে। ‘বিবৃতি’ কবিতায় সুকান্ত লিখেছেন, ‘নিয়ত অন্যায় হানে জরাগ্রস্ত বিদেশী শাসন।’ ঔপনিবেশিক শাসনের সমালোচনা আর ভারতীয় অঞ্চলের জাতীয় আন্দোলন ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হয়েছে তাঁর কবিতায়। ইউরোপের অপরীকরণের অভিজ্ঞতা থেকে সুকান্ত লিখেছেন:
অনেক খাটুনি, অনেক লড়াই করার শেষে
চারিদিকে ক্রমে ফুলের বাগান তোমাদের দেশে;
এদেশে যুদ্ধ মহামারী, ভুখা জ্বলে হাড়ে হাড়ে—
অগ্নিবর্ষী গ্রীষ্মের মাঠে তাই ঘুম কাড়ে। (‘ইউরোপের উদ্দেশে’)
হিন্দু-মুসলমান বাইনারির বাইরে গিয়ে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাঠ করার মতো অগ্রসর মন ছিল সুকান্তের। এ কারণে কাশ্মীর ভূখণ্ডের মুক্তির স্পৃহাকে কাব্যরূপ দিতে তাঁর মনে কোনো সংশয়ের পাঁক পেঁচিয়ে ওঠে নি। সুকান্ত লিখেছেন:
কাশ্মীর আজ আর জমাট-বাঁধা বরফ নয় :
সূর্য-করোত্তাপে জাগা কঠোর গ্রীষ্মে
হাজার হাজার চঞ্চল স্রোত।
তাই আজ কাল- বৈশাখীর পতাকা উড়ছে
ক্ষুব্ধ কাশ্মীরের উদ্দাম হাওয়ায় হাওয়ায়;
দুলে দুলে উঠছে
লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ঘুমন্ত, নিস্তব্ধ
বিরাট হিমালয়ের বুক। (‘কাশ্মীর’)
সুকান্ত তাঁর পাঠককে দাঁড় করান লড়াইয়ের ময়দানে। কেননা সবাই কোনো-না-কোনো পরিপ্রেক্ষিতে সংগ্রামরত। কিন্তু কেউ কেউ থাকতে চান নিজস্ব সুবিধার পরিমাপে। সমাজের উপরিকাঠামো কিংবা গভীরকাঠমো—দুই ক্ষেত্রেই তাদের দখলদারিত্ব। সুকান্তের গভীর স্বচ্ছ ও দৃষ্টি পড়েছে এই দিকে। ধনিক শ্রেণি, মজুতদার, কালোবাজারি, মধ্যবিত্তকে তিনি দেন প্রতিপক্ষের স্থান। প্রকৃতপক্ষে এরাই নিতে চায় অর্থনীতি ও রাজনীতির দখল। ‘বোধন’ কবিতায় যেমন লিখেছেন:
শোন্ রে মালিক, শোন্ রে মজুতদার!
তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়—
হিসাব কি দিবি তার?
এ কবিতার শেষ দিকে রাজনৈতিক স্লোগানের মতো করে বলেছেন, ‘শোষক আর শাসকের নিষ্ঠুর একতার বিরুদ্ধে/ একত্রিত হোক আমাদের সংহতি।’ অন্যদিকে মধ্যবিত্তের শ্রেণিস্বভাবকে প্রচণ্ড আঘাত করে সুকান্ত বলেন, ‘মধ্যবিত্ত ধূর্ত সুখ ক্রমে ক্রমে আবরণহীন।’ তাঁর কবিতা শাসক ও শোষিতের সংগ্রামকে দ্যোতিত করে, হাজির করে ক্ষমতার সমালোচনা। বাঙালি মধ্যবিত্তের প্রধান কবিদের বড় অংশই ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে নি। বড়সড় হাওয়াবদল ঘটিয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর গদ্যপদ্যের সুবৃহৎ অংশ গেছে ক্ষমতার বিরুদ্ধে। ওই সাহসের ওপর ভর করে এগিয়ে গেছেন মার্কসবাদী কবিরা, যেমন গেছেন সুকান্ত।
সুকান্তের খুব প্রিয় একটি শব্দ ও প্রসঙ্গ ‘ইতিহাস’। তাঁর রচনাবলির বহু অংশে শব্দটি তার প্রবল উপস্থিতি ঘোষণা করে। ‘ইতিহাস’ শব্দ বা প্রসঙ্গটি যে কেবল কবিতার ভাববস্তুর প্রয়োজনে আকস্মিকভাবে এসেছে, তা নয়; সত্যিকার অর্থে সুকান্তের কবিতায় ‘ইতিহাস’ শব্দটি হয়ে ওঠে মানব-ইতিহাসের অধ্যয়ন। ইতিহাসের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক বোঝাতে তিনি লিখেছেন, ‘ইতিহাসের পাতায় তোমরা পড় কেবল মিথ্যে,/ বিদেশীরা ভুল বোঝাতে চায় তোমাদের চিত্তে।’ কিশোর-উপযোগী এই কবিতায় সুকান্ত সিপাহি বিদ্রোহের সারবস্তু হাজির করেছেন। এখানে ছন্দবদ্ধভাবে পরিবেশিত হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসন ও প্রতিরোধের বয়ান।
সামগ্রিকভাবে সুকান্তের ইতিহাস-চিন্তা আবর্তিত হয়েছে মার্কসবাদী ডিসকোর্সের আওতায়। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর সেই সুবচনের কথাই আমাদের বারবার মনে পড়ে, ‘সমাজের এতদিনকার প্রচলিত ইতিহাস হলো শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস।’ তার বাইরে উৎপাদন-সম্পর্কের ভিত্তিতে আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠার যে বয়ান মার্কসবাদী রচনায় প্রতিফলিত হয় সুকান্তের ইতিহাস-চেতনা অগ্রসর হয়েছে সেই পথ ধরে। যেমন দেখা যাচ্ছে তাঁর ‘কনভয়’ কবিতায়:
ইতিহাসের ছাত্র আমি
জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম
ইতিহাসের দিকে।
সেখানেও দেখি উন্মত্ত এক কনভয়
ছুটে আসছে যুগযুগান্তের রাজপথ বেয়ে।
সামনে ধূম-উদ্গীরণরত কামান,
পেছনে খাদ্যশস্য আঁকড়ে-ধরা জনতা—
কামানের ধোঁয়ার আড়ালে আড়ালে দেখলাম, মানুষ।
আর দেখলাম ফসলের প্রতি তাদের পুরুষানুক্রমিক মমতা।
অনেক যুগ, অনেক অরণ্য, পাহাড়, সমুদ্র পেরিয়ে
তারা এগিয়ে আসছে; ঝল্সানো কঠোর মুখে।
ইতিহাসের এই ধারা কেবল তাঁর কবিতার ভাবসম্পদ নয়। অল্প কয়েকটি গল্পেও এসেছে মানব-ইতিহাসের সংগ্রামের প্রসঙ্গ। মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘ক্ষুধা’ গল্পে সুকান্ত দেখিয়েছেন শ্রেণিবিভক্ত সমাজ কী করে মানুষের ব্যক্তি ও পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে ভেঙে দিচ্ছে। দুর্ভিক্ষের বাজারে সম্পর্কগুলোকে বাঁচাতে পারে না ধনী অগ্রজের কাছ থেকে ধার করা চাল কিংবা কন্ট্রোলের চাল। নিরন্ন মানুষের ক্ষুধা শেষ পর্যন্ত যেন অবিনশ্বর সত্য আকারে হাজির। উদ্বন্ধনে ঝুলে স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেয় দুই ভাই। এই ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী, যে কিনা এই গল্পের সক্রিয় চরিত্র নয়, সে দুর্ভিক্ষপীড়িত পরিবার ও সমাজের গল্পকে স্থাপন করে ইতিহাসের প্রেক্ষণবিন্দুতে। কয়েকটি অপমৃত্যুর ঘটনায় তাঁর মনোভূমিতে বিরাট এক পরিবর্তন ঘটে যায়। সুকান্ত সেই বদলকে আঁকেন এভাবে:
লাইনবন্দী প্রত্যেকে প্রতীক্ষা করছে চালের জন্যে। বিনয় ভাবল, এ-প্রতীক্ষা চালের জন্যে, না বিপ্লবের জন্যে? বিনয় স্পষ্ট করল এরা বিপ্লবকে পরিপুষ্ট করছে, অনিবার্য করে তুলছে প্রতিদিনের ধৈর্যের মধ্যে দিয়ে। আর এদের অপরিতৃপ্ত ক্ষুধা করছে তারই পূর্ণ আয়োজন। এরা একত্র, অথচ এক নয়; এর প্রতীক্ষমাণ, তবু সচেষ্ট নয়, এরা চাইছে এতটুকু চেতনার আগুন... এদের মধ্যে আত্মগোপনকারী, ছদ্মবেশী ক্রমবর্ধমান ক্ষুধাকে প্রত্যক্ষ করে বিনয় এদের সংহত, সংঘবদ্ধ ও সংগঠিত করে সেই আগুন জ্বালার প্রতিজ্ঞা নিল। (‘ক্ষুধা’)
এই গল্প মতাদর্শিক ইচ্ছাপূরণের গল্প। গল্পের স্বাভাবিক ধ্রুপদি পরিমিতি এতে নেই; রবীন্দ্রনাথের দিক থেকে ভাবলে ‘তত্ত্ব’ আর ‘উপদেশে’র ঘনঘটা এখানে তীব্র, ‘শেষ হইয়াই হইল না শেষে’র মতো স্বাভাবিক ব্যঞ্জনাও এ গল্পে অবলুপ্ত। মার্কসপড়ুয়া সুকান্ত গল্পের টেকনিকে নয়, মার্কসের লজিকে মেতেছেন। ইতিহাসের যুক্তিতে তিনি মানুষের বিপ্লবী আকুতিকে প্রকাশ করেন, এমনকি জনগণ যখন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত বা চিন্তিতও নন, তখন তিনি বৈপ্লবিক প্রস্তুতিগ্রহণের উদ্দীপনাকে মহিমান্বিত করেন। প্রকৃতপক্ষে মার্কসবাদী ইতিহাসচিন্তার আদলে সুকান্ত হয়ে ওঠেন ভবিষ্যাভিসারী, মানবিক অগ্রসরমানতার কথা বলে কর্মের স্পৃহায় অপেক্ষা করতে থাকেন সেই সুদিনের যেদিন খসে পড়বে শোষণের শৃঙ্খল।
এ কালের ‘পোস্ট-আইডিওলজি’, ‘পোস্ট-হিউম্যান’, ‘পোস্ট-ট্রুথ’ যুগ ইতিহাসের এই ক্রমধারাকে মান্য মনে করে না সত্য। কিন্তু ইতিহাসের অনেক অপরিমেয় যুগ কেটে গেছে শাসক-শোষিতের সম্পর্কের সত্যকে বুঝতে বুঝতে। বাংলা অঞ্চলে যখন ধ্রুপদি মার্কসবাদের চর্চা চলেছে তখন অপার দেশপ্রেমে শোষিতের ভাব-ভাষাকে কাব্যরূপ দিতে গিয়ে অন্য অনেকের মতো সুকান্তও মার্কসবাদকে আশ্রয় করেছিলেন। ওই স্বপ্নসম্ভব কল্পনা থেকে তিনি লিখেছিলেন :
হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলা দেশ
কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে
সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ
জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে।
...
সাবাস, বাংলা দেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয়;
জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।
সুকান্তের চিন্তায় এই দেশচেতনা প্রবল। তাঁর দেশজতাকে দুদিক থেকে ভাবতে পারি— প্রথমত, রাজনৈতিকভাবে দৃষ্টিকোণে সাহিত্যের বিষয় ও চিন্তার দিক থেকে, দ্বিতীয়ত, শিল্পের জনমুখিতার দিক থেকে। অর্থাৎ, তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু দেশমুখী, আবার কবিতার শিল্পায়নও দেশ বা জনতার অভিমুখী। কবিতাকে পাঠকমুখী করার সদিচ্ছা তাঁর ছিল। এ প্রসঙ্গে সুকান্তের একটি প্রায়-অপঠিত প্রবন্ধের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চাই।
‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ শীর্ষক প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৪ সালের অরণি পত্রিকায়। এ প্রবন্ধে সুকান্ত ছন্দ, কবিতা ও আবৃত্তির সম্বন্ধ খুঁজেছেন। তাঁর কাছে শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠেছে কবির লড়াই, পাঁচালি ও কথকতা। খুব বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবতে হয় সুকান্ত আবৃত্তির তাৎপর্য বুঝতে চেয়েছিলেন এমন এক সময়ে যখন শিল্পকলার কোনো স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে আবৃত্তি গড়ে ওঠে নি। সুকান্ত কেন আবৃত্তির কথা বলছেন? জবাব এই, এসবের মধ্যে ‘ছন্দ-শিক্ষার কিছুটা ব্যবস্থা ছিল’।
বাঙালির সাহিত্যকেন্দ্রিক সংস্কৃতির ইতিহাসে কবিতাপাঠের অন্যরকম তাৎপর্যও আছে। নিশ্চয়ই কারও চোখ এড়ানোর সুযোগ নেই যে মুদ্রণ-সংস্কৃতির আগে বাংলা কবিতা বা সাহিত্য ছিল মূলত বাচন ও উচ্চারণের সংস্কৃতি। শ্রোতাদের সামনে কবি বা গায়েন আওড়ে যেতেন শ্লোক। কবির লড়াই, পাঁচালি কিংবা কথকতা সে ধারারই প্রতিনিধি; এই শিল্পযোগাযোগে একক শ্রোতার অস্তিত্ব নেই, আছে বহুশ্রোতা। ছাপাখানার যুগে মুদ্রিত সাহিত্য হয়ে গেল ব্যক্তিক পাঠের বস্তু। কিন্তু নেরুদা, মায়াকোভস্কি কিংবা সুকান্তের মতো কবিরা বাচনের সম্ভাবনার মুলতুবি ঘটান নি। বিস্ময়ের সঙ্গে স্বীকার করতে হয়, এই সেই নেরুদা যিনি পরাবাস্তবতার কবি, এই সেই মায়াকোভস্কি যিনি ফিউচারিজমের কবি— তাঁদের কবিতার শ্রোতাদের বড় একটা অংশ ছিল সাক্ষর-অর্ধসাক্ষর শ্রমজীবী মানুষ। সুকান্তের কবিতা শ্রেণিবিভক্ত সমাজের ওই স্তরে হয়তো পৌঁছায়নি সত্য, তবে পৌঁছেছিল রাজনীতি ও জনতামুখী মানুষের কাছাকাছি; কবিতায় যাঁরা চেনা বাস্তবের প্রতিচ্ছবি পেতে চান, সময়ের উদ্দীপনায় যাঁরা প্রকম্পিত হতে চান, তাদের জন্য সুকান্ত ছিলেন বাংলা কবিতার সহজপাঠ।
ছন্দ, আবৃত্তি কিংবা কাব্যপাঠের সূত্রে সুকান্ত মূলত ঝুঁকতে চান গণমুখীনতার দিকে। তিনি ‘পাঠক’ নামক বর্গটির কথাও বিশেষভাবে মনে রাখেন। আধুনিক কবিতা আর পাঠকের মধ্যে তৈরি হওয়া বিচ্ছেদের মীমাংসায় সহায়ক উপাদান হিসেবে মনে করেছেন ‘আবৃত্তি-উপযোগী ছন্দ’কে। সুকান্ত লিখেছেন, ‘কবিরা নতুন নতুন আবৃত্তি-উপযোগী ছন্দে লিখলে (যা আধুনিক কবিরা লেখেন না) এবং পাঠকরা তা ঠিকমতো পড়লে তবেই আধুনিক কবিতার ক্ষেত্র প্রসারিত হবে, উপেক্ষিত আধুনিক কবিতা খেচর ব্যবস্থা থেকে ক্রমশ জনসাধারণের দৃষ্টিগোচর হবে।’ ‘খেচর ব্যবস্থা’—এই শব্দযুগলের ভেতর সুকান্ত রেখে দিয়েছেন অভ্রান্ত ইঙ্গিত; আধুনিক কবিতা পাঠকের থেকে দূরে সরে গেছে, তিনি তাই কবিতা ও জনতার সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের প্রকল্পনায় ফিরে যান। হয়তো তাই, ছন্দের নানা করুকাজসমেত সুকান্ত হতে চান বোধগম্য, তাঁর ভাষা চায় সরলতার শোভা। আমরা দেখব, পাঠকের শ্রুতিকে আচ্ছন্ন করতে সুকান্ত সহজিয়া ভঙ্গিতে কবিতায় বসিয়েছেন অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্তের সুবিন্যস্ত চাল।
প্রথাগত ছন্দের সীমানা পেরিয়ে সুকান্ত গদ্যছন্দে গল্পও বলেছেন। ভাবা যাক, তাঁর রূপক ধরনের কবিতাগুলোর কথা—‘একটি মোরগের কাহিনী’, ‘সিঁড়ি’, ‘সিগারেট’, ‘দেশলাই কাঠি’। অন্ত্যমিল কিংবা অন্ত্যমিলহীনতা, দরকারি শব্দের সমাবেশ, প্রতীকী ব্যঞ্জনা—সাধারণভাবে এই অবলম্বন নিয়েই সুকান্ত তাঁর কাব্যভাষাকে গড়ে তুলেছিলেন। সাহিত্যের সূক্ষ্ম কলাপ্রকৌশলগত আকাঙ্ক্ষা না থাকলে তিনি বুদ্ধদেব বসুকে ছন্দের বোঝাপড়া নিয়ে চিঠি লিখতেন না, ছন্দ বিষয়ক প্রবন্ধ লেখার জন্য শব্দ খরচ করতেন না। সব মিলিয়ে মানুষের জটিল জাগতিকতাকে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন সহজ ভাষায়।
মজার ব্যাপার হলো, অনেকের চোখে সুকান্তের সহজতাই ছিল সমস্যা। এ মুহূর্তে স্মরণযোগ্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কিছু উক্তি। ‘দেশ’ পত্রিকায় সুনীল লিখেছিলেন ‘সুকান্তর কবিতা বড় বেশী সোজাসুজি, বড় সরল’, ‘কবিতার রহস্যময়তা, শব্দের ধ্বনি-মাধুর্য’ সুকান্তের কবিতায় অনুপস্থিত; কেননা কবিতার কাছে সুনীলের প্রত্যাশা ‘রহস্যময়তা’ ও ‘বিশুদ্ধ শব্দ’। এর বিপরীতে দেখি, সুকান্তের কবিতার সারল্যে কোনো ধরনের বিঘ্ন বোধ করেননি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। উল্টো তিনি প্রশ্ন তুললেন সুকান্তের ‘সরলতার সমগ্র তাৎপর্য সকলের কাছে ধরা’ পড়েছে কিনা। এখানেই থাকেননি তিনি। বাঙালির কাব্যবোধের সীমানাও শনাক্ত করেছেন, লিখেছেন, ‘গভীরতা, ব্যাপ্তি, তীব্রতা, ভাবৈশ্বর্য ইত্যাদি সবকিছুর ধারক ও বাহক হিসাবে সাদামাটা স্পষ্টভাষী সার্থক কবিতা কল্পনা করতে আমরা অপটু ছিলাম, আমাদের অভিজ্ঞতা ও স্বীকৃতি গীতিকবিতা পর্যন্ত।’ সুনীল যেখানে পেয়েছেন সমস্যা, মানিক সেখানে পেয়েছেন ‘বাংলা কাব্য-সাহিত্যে নবজন্মের সূচনা’। ‘মৌলিক কবিতার দৈন্যে’ সুকান্ত যেন এক ‘নতুন চেতনা’।
মানিক যখন ‘নতুন চেতনা’র কথা বলছেন, বুদ্ধদেব বসু তখন শুনিয়েছেন আশাহতের সুর। এ ক্ষেত্রে সংকটের মূলে আছে রাজনীতি। সুকান্ত প্রয়াত হওয়ার পর নিজের সম্পাদনায় প্রকাশিত কবিতা পত্রিকায় ছোট্ট একটি স্মরণগাথা লিখেছিলেন বুদ্ধদেব। সে লেখায় লেগে আছে তরুণ কবির প্রতি এক ঘনিষ্ঠজনের স্নেহ ও মমত্বের আবির। একই সঙ্গে আছে অনুযোগ। সুকান্তের পাঠানো একটি পোস্টকার্ডের জবাবে বুদ্ধদেব লিখেছিলেন, ‘রাজনৈতিক পদ্য লিখে শক্তির অপচয় করছো তুমি; তোমার জন্য দুঃখ হয়।’ মার্কসবাদের প্রতি ভ্রুকুঞ্চিত চোখে বুদ্ধদেব আরও লিখেছিলেন, ‘তার কিশোর-হৃদয়ের স্বাভাবিক উন্মুখতার সঙ্গে পদে-পদে দাঙ্গা বাধিয়ে দিয়েছে একটি কঠিন, সংকীর্ণ তথাকথিত বৈজ্ঞানিক মতবাদ’। হয়তো একটু ক্ষুণ্নমনেই বুদ্ধদেব যোগ করেছিলেন, ‘কবিতাগুলি যেন সেই মতবাদের চিত্রণ মাত্র; জোর গলায় চেঁচিয়ে বলা কবিতা না-হ’য়ে খবরকাগজের প্যারাগ্রাফ হ’লেই যেন মানাতো।’
সুকান্তের প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসু চল্লিশের দশকের বাংলা অঞ্চলের সাহিত্যিক পরিপ্রেক্ষিত বিষয়েও খানিকটা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, ‘যুদ্ধকালীন উদ্ভ্রান্তির সুযোগে দেশের রাজনৈতিক দলগুলি সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক একটি ফ্রন্ট খুললেন, আর আমাদের নবীন লেখকেরা যৌবনের ত্যাগ-প্রবণতায় অধীর হ’য়ে উঠলেন বিকিয়ে দিতে।’ সেই পরিপ্রেক্ষিতে সুকান্ত যেন রাজনৈতিক কবিত্বের শহিদ।
বুদ্ধদেব বসু কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সুকান্তপাঠ আদতে আধুনিক কবিতা বিষয়ক এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির ফসল। কবিতার ‘আধুনিকতা’ বিষয়ক বিবেচনায় তাঁরা ইউরোপের একটি ধারাকেই মান্য মনে করেন—যেখানে আত্মতা প্রধান, কবিতার সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্য অস্বীকৃত, কাঞ্চনমূল্যে গৃহীত হয় শৈল্পিক সৌন্দর্যের ধারণা; এ ধরনের আধুনিকতা সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় কাতর হলেও সামাজিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী নয়। অর্থাৎ সামাজিকভাবে নিষ্ক্রিয়তার দর্শনই তাদের কাছে মান্য ও অনুসরণযোগ্য। আধুনিকতার এই খাতটিকে আমরা হয়তো বলতে পারি ‘বুর্জোয়া আধুনিকতা’। কিন্তু ইতিহাস বলছে, শিল্পসাহিত্যে মার্কসবাদও আধুনিকতার ভিন্ন একটি খাত তৈরি করতে পেরেছিল।
শিল্পত্ববাদীরা প্রধানত ছুটে গিয়েছিলেন ডব্লু বি ইয়েটস, এজরা পাউন্ড, টিএস এলিয়টের দিকে। আরাধ্য হয়ে উঠেছিলেন ফরাসি কবিতার প্রতিভূরা; পঠিত ও অনূদিত হচ্ছিলেন বোদলেয়ার কিংবা র্যাঁবো। অপরদিকে মার্কসবাদীরা আধুনিকতার পথ খুঁজছিলেন প্রতিরোধের কাব্যে। রুশ সাহিত্যের সঙ্গে কবিদের ব্যাপক পরিচিতি ঘটছিল। আফ্রিকার সাহিত্য থেকে উপাদান গ্রহণ করছিলেন কেউ কেউ। ইংরেজির ভাষার মধ্যস্থতায় বাংলায় এলো স্বয়ং ইউরোপের অবক্ষয়ী আধুনিকতা।
কাছাকাছি সময়েই বহাল ছিল প্রতিরোধী ও সংগ্রামী আধুনিকতা। মার্কসবাদের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে সুকান্ত শেষোক্তের অনুসারী। আলোকায়নের উত্তরাধিকার হিসেবে কার্ল মার্কস নিজেও তো আধুনিক। মানুষকে কেন্দ্রে রেখেই তাঁর চিন্তার বিশ্ববিস্তার। সুকান্তের আধুনিকতার কেন্দ্রে তাই কথা বলে ওঠে মানুষ। সক্রিয় থেকেছে মানবায়নের ধারণা। কিন্তু এলিয়ট-প্রভাবিত আধুনিকতার বড় স্বভাব বিমানবায়ন। জীবনের প্রতি প্রভূত টান থাকা সত্ত্বেও জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ কিংবা বুদ্ধদেব মানুষী জীবনকে আমরা খণ্ডবিখণ্ড হয়ে ঝরে পড়তে দেখি; বস্তুমুখিনতার চাপে জীবনকে মনে হয় বিষাদে বিলীন। সুকান্তের কবিতা এই বিষাদকেই উচ্ছেদ করে। মানবিক সম্পর্ক আর তার বিদ্রোহের আখ্যানই ঘোরতরভাবে প্রাধান্য পায়।
সুকান্ত যে ল্যাংস্টন হিউজের অনুসরণে ‘মজুরদের ঝড়’ লেখেন, তা কেবলই দৈবচয়িত অনুবাদমাত্র নয়। লড়াকু মজুরদের ঝড় তিনি নিজেও অনুভব করেছেন। তাই বাছাই করে নিয়েছেন হার্লেম রেনেসাঁর এক কৃষ্ণাঙ্গ কবির কবিতাকে; প্রতিদিন যাদের লড়তে হয়েছে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে; মনে মনে সেতুবন্ধন করতে হয়েছে আফ্রিকার সঙ্গে; কেননা কোনো এক দুঃসময়ে আটলান্টিক পেরিয়ে ক্রীতদাস হয়ে পাড়ি জমাতে হয়েছে আমেরিকার তটভূমে। সেই মানুষগুলোর জন্য সুকান্ত অনুভব করেছেন মরমি টান। কৃষ্ণ চক্রবর্তী সুকান্তের সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন এক স্মৃতিলেখায়:
ল্যাংস্টন হিউজ-এর কবিতা ‘Labour Strom’ নিয়ে গেছি সেদিন। কবিতাটা পড়ার পরই দেখলাম সেই ‘দুরন্ত উচ্ছ্বাস’। কি আনন্দ কবির এ কবিতাটি পেয়ে। কে বলবে তিনি অসুস্থ, কে বলবে তিনি রোগে ভুগছেন। শ্রমিকশ্রেণীর সমর্থনে এমন সুন্দর কবিতা, মুক্তির স্বপ্ন, বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন যে কবি তার লক্ষ্যকে সামনে রেখে এমন কবিতা অনুবাদ না করে কি থাকা যায়! (পৃ. ২২)
কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল আমেরিকার বামপন্থী পত্রিকা Masses and Mainstream-এ। কৃষ্ণ চক্রবর্তীর সূত্রে সুকান্ত সেটি পড়েছিলেন। পড়েই অনুবাদের আগ্রহ বোধ করেছিলেন। রোগশয্যায় শায়িত সুকান্ত একরাতে তা অনুবাদ করেছিলেন। কৃষ্ণ জানাচ্ছেন, ‘মজুরের ঝড়’ কবিতাটি অনুবাদ করার পর তিনি বলেছিলেন, ঐ রকম কবিতা আরও পেলে আমি যেন তার কাছে নিয়ে যাই, তিনি অনুবাদ করবেন। সে সুযোগ আর হয় নি।’ (পৃ৪৩)
সুকান্তের সমগ্র সাহিত্য শেষপর্যন্ত হয়ে উঠেছে ‘প্রতিরোধের সাহিত্য’। আমরা দেখব উপনিবেশিত অঞ্চলগুলোতে জাতীয়তাবাদ ও মার্কসবাদ বিদ্রোহী সত্তায় বিপুলভাবে প্রেরণা জুগিয়েছে। পাবলো নেরুদা, এইমে সেজায়ার, লিওপোল্ড সেঁদর সেঙ্ঘর প্রমুখ কবিরা রচনা করেছেন সোচ্চার পঙ্ক্তিমালা। তাঁদের কবিতায় হাজির হয়েছে জাতীয় বা স্থানীয় ও বহির্দেশীয় উপাদান। এসবের সমন্বয়েই তাঁরা ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাহিত্যিক চক্রব্যুহ রচনা করেছেন। প্রগতিশীলতার বুর্জোয়া চশমায় সুকান্তের আধুনিকতাকে অনেকের কাছে জলো, খেলো, পানশে মনে হলেও আধুনিকতার এই ইতিহাসকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। কেননা মানুষ এখনও ‘মানবিক বিশ্ব’ খোঁজে। সুকান্তকে দেখতে হবে সেই অনুসন্ধিৎসার পথে।
বাংলাদেশের মানুষ তার লড়াই-সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের পাশাপাশি সুকান্তকেও হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেছে। ১৯৪৭-উত্তর মুক্তিসংগ্রাম থেকে শুরু করে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত উচ্চারিত হয়েছে সুকান্তের উক্তি। ষাটের দশকের স্মৃতি আওড়াতে গিয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘গত কুড়ি বছর ধরে সুকান্তর বই বাংলা দেশের প্রায় ঘরে ঘরে স্থান পেয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে তার একটা ছাপা বই থেকে শ’য়ে শ’য়ে হাতে লিখে নকল করে লোকে সযত্নে ঘরে রেখেছ।’ (সুভাষ মুখোপাধ্যায় ১৩৬৪ : ৫)
কারণ গত এক শ-দেড় শ বছর ধরেই এ অঞ্চলের মানুষকে শোষকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হচ্ছে। হয়তো এটাই এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিয়তি। প্রশ্ন হলো, সুকান্ত কতখানি পঠিত হবেন? ইতিহাসের তুমুল বিচূর্ণীকরণের যুগে তিনি কি আর প্রাসঙ্গিক থাকবেন? বিশেষত সাম্প্রতিক বিশ্বকে যখন বলা হচ্ছে পোস্ট-ট্রুথ বা সত্য-উত্তর, পোস্ট-হিউম্যান বা মানব-উত্তর, পোস্ট-আইডিওলজি বা মতাদর্শ-উত্তর যুগ তখন সেই বিশ্বে সুকান্তের অবস্থান কী হবে?
কেননা এই বিশ্বে বলা হচ্ছে, আর কোনো রাজনৈতিক ভাবাদর্শ জন্মাবে না, দর্শন আকারে হাজির হবে না মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক মেসাইয়ার বেশে দেখা দেবেন না কোনো জননেতা; ইতিহাসে আবির্ভূত হবে প্রবল শক্তিধর ‘টেকনোক্রেসি’। পোস্ট-হিউম্যান যুগে হারিয়ে যাবে মানবকেন্দ্রিকতার ধারণা; মানুষ চলে যাবে মানবতার বাইরে। ধূসর হয়ে আসবে মানুষ ও মেশিনের ফারাক। পোস্ট-ট্রুথ যুগের ভাবনা বলে, ‘সত্যে’রও কোনো একমাত্র রূপ থাকবে না। বহুবেশধারী সত্যের মুখোমুখি হবে মানুষ।
পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় প্রযুক্তি, যন্ত্র ও জীবনের একীভূত রূপ কোথায় কখন কী সত্য উৎপাদন করছে, তার সবটা আমরা জানি না। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবেই জানি যে, ‘মানুষ’ নামক একটি বর্গ জ্যান্ত আছে; তারা সক্রিয়, তারা ভাবুক, তারা প্রতিদিন অমানবিকতার গল্প পড়ে, যুদ্ধ আর ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানবিক পৃথিবীর সন্ধান করে; এমনকি এই মানুষই ‘মানুষী’ সভ্যতাকে নিয়ে যেতে চায় অন্য কোনো গ্রহে। মানুষের এই গল্প কোনোদিন ফুরায় না—হোক তা মহাভারত-রামায়ণের যুগের, হোক তা হোমার কিংবা সুকান্তের যুগের। আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে নতুন নতুন আগামী, সুকান্ত যেমন বলেছেন:
জড় নই, মৃত নই, নই অন্ধকারের খনিজ
আমি তো জীবন্ত প্রাণ, আমি এক অঙ্কুরিত বীজ।
মাটিতে লালিত ভীরু, শুধু আজ আকাশের ডাকে
মেলেছি সন্দিগ্ধ চোখ, স্বপ্ন ঘিরে রয়েছে আমাকে। (‘আগামী’ ছাড়পত্র)
মানুষের ইতিহাস— সম্ভাবনার ইতিহাস, অঙ্কুর থেকে জেগে ওঠার ইতিহাস। জন্মশতবর্ষের এই শুভ মুহূর্তে সুকান্তের হাত ধরে আমরা সেই ইতিহাসের কথাই আরও একবার স্মরণ করতে পারি।
রচনাপঞ্জি
কৃষ্ণ চক্রবর্তী (১৯৬০), সুকান্ত : স্মৃতিকথা ও মূল্যায়ন, চিরায়ত প্রকাশনী, কলকাতা
বিশ্বনাথ দে (১৯৮৭), সুকান্ত বিচিত্রা (সম্পাদিত), সাহিত্যতম, কলকাতা
বুদ্ধদেব বসু (১৯৮৭), সুকান্ত বিচিত্রা (সম্পাদিত), সম্পাদক: বিশ্বনাথ দে, সাহিত্যতম, কলকাতা
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৮৭), সুকান্ত বিচিত্রা (সম্পাদিত), সম্পাদক: বিশ্বনাথ দে, সাহিত্যতম, কলকাতা
সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৩৬৪), সুকান্ত-সমগ্র, সারস্বত লাইব্রেরী, কলকাতা
সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯৮৭), সুকান্ত বিচিত্রা (সম্পাদিত), সম্পাদক: বিশ্বনাথ দে, সাহিত্যতম, কলকাতা

কম করে হলেও এক হাজার বছর ধরে কবিতা লিখছে বাংলাভাষী মানুষ; এ অঞ্চলে জন্মেছেন অগণিত ভাবমূর্তিসম্পন্ন কবি। উপাধিপ্রবণ বাঙালি কবিসমাজ তৈরি করে নিয়েছে নানা ধরনের উপাধি—‘কবিকঙ্কন’, ‘বিশ্বকবি’, ‘বিদ্রোহী কবি’, ‘পল্লীকবি’, ‘রূপসী বাংলার কবি’। তবে ‘কিশোর-কবি’ অভিধা পেয়েছেন মূলত একজনই—সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭)। অথচ সুকান্ত তখন পেরিয়ে গেছেন কৈশোরের সীমা। তাঁর কবিতা মোটেই কিশোরশোভন চপলতায় আচ্ছন্ন নয়। বাঙালি তবু তাঁকে কিশোরের দোরগোড়ায়ই আটকে রেখেছে।
এ ধরনের সাংস্কৃতিক উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন সুকান্তের একটি ভাবপ্রতিমা গড়ে দিয়েছে; সেখানে দেখা যাবে, এক তরুণের গালে হাত দেওয়া ছবি, ক্ষয়রোগের মর্মান্তিকতা, ক্লান্তিহীন দারিদ্র্য, স্বপ্নময় তারুণ্য ইত্যাদি। বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে সুকান্ত এভাবেই ঘুরে ফিরে হাজির হন। অনেকেরই হয়তো মনে পড়বে, বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকেও ‘সংস্কৃতিমনা’ বাঙালি পরিবারের বসার ঘরে রবীন্দ্র-নজরুলের পাশে শোভা পেত সুকান্তের ছবি।
এই দৃশ্যকল্পের ভেতর ঘটে যায় সুকান্তের জনপ্রিয় উপস্থাপন। এমনকি বিদ্যায়তনিক গবেষকেরাও পরিচিত দৃশ্যকল্পের অনুশাসনে সুকান্তের মূল্যায়ন করেন। তখন মনে হয়, সুকান্ত ছিলেন এক সম্ভাবনাময় কবি, কিন্তু কবি হিসেবে প্রাপ্তমনস্ক কবিতা উপহার দিতে পারেননি। পার্সি বিশি শেলি, জন কিটস, কিংবা আর্তুর র্যাঁবোর বেলায় এরকম কি ভাবি আমরা? উনিশ বছর বয়সী র্যাঁবোর লেখা কবিতা নিয়ে কম উন্মাদনা করি আমরা? মূল কথাটা হলো একজন কবিকে বয়সের সীমানায় আটকে রেখে মূল্যায়ন করলে কবি ও কবিতার প্রতি সুবিচার হয় না। কবি মূল্যায়িত হতে পারেন তাঁর সৃষ্টিসম্ভারের পরিপ্রেক্ষিতেই। আর তাই, সুকান্ত ভট্টাচার্যকে আমরা দেখতে চাই আধুনিক বাংলা কবিতার পটভূমি ছুঁয়ে।
আমাদের মনে পড়বে, সুকান্তের আয়ুষ্কালের ভেতর বিস্তারিত হয়েছে বাংলা সাহিত্যের গনগনে সূর্য—রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ, জসীম উদ্দীন। বাংলা কবিতার মানচিত্রই তাঁরা বদলে ফেলেছেন। তাঁদের চেয়ে যাঁরা তরুণ—সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সমর সেন—তাঁরাও সাহিত্যিক সিদ্ধিতে উজ্জ্বল। তাঁরা খুঁজে পেয়েছিলেন শিল্পের নিজস্ব ভাষা। সে সময় কবিতার জন্য কেউ ছিলেন শুদ্ধতম শিল্পের অভিমুখী, কেউ কেউ মেনে নিয়েছিলেন সামাজিক দায়বদ্ধতা।
‘শিল্পের জন্য শিল্প’ বনাম ‘মানুষের জন্য শিল্প’—এরকম একটি লড়াইয়ের তোপধ্বনি শোনা গিয়েছিল। উভয় শিবিরের লক্ষ্য স্বতন্ত্র হলেও এক বিষয়ে তাঁরা অভিন্নহৃদয়; আর তা হলো রবীন্দ্রনাথকে যে করে হোক পেরিয়ে যেতেই হবে। রবীন্দ্র-সাহিত্যের বাতাবরণ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার গূঢ়তর সংকল্প জয়ী হয়েছিল। সুকান্ত সেই কালের তরুণতম এক কবি। তিনি বিচরণ করতে পারতেন শিল্পত্বের স্বপ্নভারাতুর অববাহিকায়। কিন্তু না, বিকল্প পথটিকেই তিনি বেছে নিলেন—‘মানুষের জন্য শিল্প’। আবার, রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর কোনো বিরাগ নেই, বরং শ্রদ্ধামিশ্রিত প্রণতি আছে; লিখেছেন ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, ‘পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশে’ শীর্ষক কবিতা।
ততো দিনে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে এসে গেছে নতুন ভাবাদর্শ মার্কসবাদ। ১৯১৭-তে সম্পন্ন রুশ বিপ্লবের খবরাখবর বঙ্গদেশের কবিরা যথাসময়েই পেয়েছেন। মার্কসের চিন্তার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। সাহিত্য ও মাকর্সবাদের সম্পর্ক মজবুত হয়েছে চল্লিশের দশকে। তত্ত্ব ও অনুশীলনে সুকান্ত তাঁর জীবন ও শিল্পের জন্য এই বিশ্ববীক্ষাকে করেছেন জীবনের ধ্রুবতারা। যদিও জাতীয়তাবাদ তখন ভীষণ শক্তিশালী। হিন্দু ও মুসলমান পরিচয়ের রাজনীতি তখন তুঙ্গস্পর্শী। সাহিত্যের মাধ্যমে উজাড় হাতে অনেকেই বিলিয়েছেন জাতীয়তার জয়গান।
সুকান্তের ঝোঁক সেদিকে নয়। ভাবাদর্শিকভাবে তিনি হয়ে উঠলেন ‘আন্তর্জাতিক’— মার্কসাবাদীরা যেমন ভাবেন; অঞ্চলকে ছাড়িয়ে তারা হতে চান বিশ্বব্যাপী সবার, নিপীড়িত জনতার। সুকান্তের কবিতায় তাই চিত্রিত হয় কাশ্মীর, স্তালিনগ্রাদ, প্যারিসের সংগ্রামী ছবি। লেনিন হয়ে ওঠেন তাঁর ভাবাদর্শিক নেতা। লেনিনকে নিয়ে লেখা কবিতায় সুকান্ত অনেকটা রাজনৈতিক সন্দর্ভের মতো করে লিখেছেন :
বিদ্যুৎ-ইশারা চোখে, আজকেও অযুত লেনিন
ক্রমশ সংক্ষিপ্ত করে বিশ্বব্যাপী প্রতীক্ষিত দিন,—
বিপর্যস্ত ধনতন্ত্র, কণ্ঠরুদ্ধ, বুকে আর্তনাদ;
— আসে শত্রুজয়ের সংবাদ। (‘লেনিন’)
তাই বলে নিজের অঞ্চলের কথা বিস্তৃত হলেন, তাও নয়। কেননা মার্কসবাদ সবসময়ই বিশেষ স্তর পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন করে। তাই সুকান্তকে লিখতে হয় ভারতীয় উপমহাদেশের উপনিবেশিত অভিজ্ঞতার বিবরণ। মূলত ঔপনিবেশিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে মার্কসবাদ সুকান্তকে সহায়তা করেছে। তাঁর কবিতায় আমরা পেলাম ‘উপনিবেশ’ কিংবা ‘বিদেশী শাসনে’র সুস্পষ্ট উল্লেখ। ‘চিল’ শীর্ষক কবিতায় উড়ন্ত চিলের চোখে গোটা পৃথিবীকে দেখা গেলো ‘লুণ্ঠনের অবাধ উপনিবেশ’ হিসেবে। ‘বিবৃতি’ কবিতায় সুকান্ত লিখেছেন, ‘নিয়ত অন্যায় হানে জরাগ্রস্ত বিদেশী শাসন।’ ঔপনিবেশিক শাসনের সমালোচনা আর ভারতীয় অঞ্চলের জাতীয় আন্দোলন ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হয়েছে তাঁর কবিতায়। ইউরোপের অপরীকরণের অভিজ্ঞতা থেকে সুকান্ত লিখেছেন:
অনেক খাটুনি, অনেক লড়াই করার শেষে
চারিদিকে ক্রমে ফুলের বাগান তোমাদের দেশে;
এদেশে যুদ্ধ মহামারী, ভুখা জ্বলে হাড়ে হাড়ে—
অগ্নিবর্ষী গ্রীষ্মের মাঠে তাই ঘুম কাড়ে। (‘ইউরোপের উদ্দেশে’)
হিন্দু-মুসলমান বাইনারির বাইরে গিয়ে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাঠ করার মতো অগ্রসর মন ছিল সুকান্তের। এ কারণে কাশ্মীর ভূখণ্ডের মুক্তির স্পৃহাকে কাব্যরূপ দিতে তাঁর মনে কোনো সংশয়ের পাঁক পেঁচিয়ে ওঠে নি। সুকান্ত লিখেছেন:
কাশ্মীর আজ আর জমাট-বাঁধা বরফ নয় :
সূর্য-করোত্তাপে জাগা কঠোর গ্রীষ্মে
হাজার হাজার চঞ্চল স্রোত।
তাই আজ কাল- বৈশাখীর পতাকা উড়ছে
ক্ষুব্ধ কাশ্মীরের উদ্দাম হাওয়ায় হাওয়ায়;
দুলে দুলে উঠছে
লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ঘুমন্ত, নিস্তব্ধ
বিরাট হিমালয়ের বুক। (‘কাশ্মীর’)
সুকান্ত তাঁর পাঠককে দাঁড় করান লড়াইয়ের ময়দানে। কেননা সবাই কোনো-না-কোনো পরিপ্রেক্ষিতে সংগ্রামরত। কিন্তু কেউ কেউ থাকতে চান নিজস্ব সুবিধার পরিমাপে। সমাজের উপরিকাঠামো কিংবা গভীরকাঠমো—দুই ক্ষেত্রেই তাদের দখলদারিত্ব। সুকান্তের গভীর স্বচ্ছ ও দৃষ্টি পড়েছে এই দিকে। ধনিক শ্রেণি, মজুতদার, কালোবাজারি, মধ্যবিত্তকে তিনি দেন প্রতিপক্ষের স্থান। প্রকৃতপক্ষে এরাই নিতে চায় অর্থনীতি ও রাজনীতির দখল। ‘বোধন’ কবিতায় যেমন লিখেছেন:
শোন্ রে মালিক, শোন্ রে মজুতদার!
তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়—
হিসাব কি দিবি তার?
এ কবিতার শেষ দিকে রাজনৈতিক স্লোগানের মতো করে বলেছেন, ‘শোষক আর শাসকের নিষ্ঠুর একতার বিরুদ্ধে/ একত্রিত হোক আমাদের সংহতি।’ অন্যদিকে মধ্যবিত্তের শ্রেণিস্বভাবকে প্রচণ্ড আঘাত করে সুকান্ত বলেন, ‘মধ্যবিত্ত ধূর্ত সুখ ক্রমে ক্রমে আবরণহীন।’ তাঁর কবিতা শাসক ও শোষিতের সংগ্রামকে দ্যোতিত করে, হাজির করে ক্ষমতার সমালোচনা। বাঙালি মধ্যবিত্তের প্রধান কবিদের বড় অংশই ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে নি। বড়সড় হাওয়াবদল ঘটিয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর গদ্যপদ্যের সুবৃহৎ অংশ গেছে ক্ষমতার বিরুদ্ধে। ওই সাহসের ওপর ভর করে এগিয়ে গেছেন মার্কসবাদী কবিরা, যেমন গেছেন সুকান্ত।
সুকান্তের খুব প্রিয় একটি শব্দ ও প্রসঙ্গ ‘ইতিহাস’। তাঁর রচনাবলির বহু অংশে শব্দটি তার প্রবল উপস্থিতি ঘোষণা করে। ‘ইতিহাস’ শব্দ বা প্রসঙ্গটি যে কেবল কবিতার ভাববস্তুর প্রয়োজনে আকস্মিকভাবে এসেছে, তা নয়; সত্যিকার অর্থে সুকান্তের কবিতায় ‘ইতিহাস’ শব্দটি হয়ে ওঠে মানব-ইতিহাসের অধ্যয়ন। ইতিহাসের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক বোঝাতে তিনি লিখেছেন, ‘ইতিহাসের পাতায় তোমরা পড় কেবল মিথ্যে,/ বিদেশীরা ভুল বোঝাতে চায় তোমাদের চিত্তে।’ কিশোর-উপযোগী এই কবিতায় সুকান্ত সিপাহি বিদ্রোহের সারবস্তু হাজির করেছেন। এখানে ছন্দবদ্ধভাবে পরিবেশিত হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসন ও প্রতিরোধের বয়ান।
সামগ্রিকভাবে সুকান্তের ইতিহাস-চিন্তা আবর্তিত হয়েছে মার্কসবাদী ডিসকোর্সের আওতায়। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর সেই সুবচনের কথাই আমাদের বারবার মনে পড়ে, ‘সমাজের এতদিনকার প্রচলিত ইতিহাস হলো শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস।’ তার বাইরে উৎপাদন-সম্পর্কের ভিত্তিতে আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠার যে বয়ান মার্কসবাদী রচনায় প্রতিফলিত হয় সুকান্তের ইতিহাস-চেতনা অগ্রসর হয়েছে সেই পথ ধরে। যেমন দেখা যাচ্ছে তাঁর ‘কনভয়’ কবিতায়:
ইতিহাসের ছাত্র আমি
জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম
ইতিহাসের দিকে।
সেখানেও দেখি উন্মত্ত এক কনভয়
ছুটে আসছে যুগযুগান্তের রাজপথ বেয়ে।
সামনে ধূম-উদ্গীরণরত কামান,
পেছনে খাদ্যশস্য আঁকড়ে-ধরা জনতা—
কামানের ধোঁয়ার আড়ালে আড়ালে দেখলাম, মানুষ।
আর দেখলাম ফসলের প্রতি তাদের পুরুষানুক্রমিক মমতা।
অনেক যুগ, অনেক অরণ্য, পাহাড়, সমুদ্র পেরিয়ে
তারা এগিয়ে আসছে; ঝল্সানো কঠোর মুখে।
ইতিহাসের এই ধারা কেবল তাঁর কবিতার ভাবসম্পদ নয়। অল্প কয়েকটি গল্পেও এসেছে মানব-ইতিহাসের সংগ্রামের প্রসঙ্গ। মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘ক্ষুধা’ গল্পে সুকান্ত দেখিয়েছেন শ্রেণিবিভক্ত সমাজ কী করে মানুষের ব্যক্তি ও পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে ভেঙে দিচ্ছে। দুর্ভিক্ষের বাজারে সম্পর্কগুলোকে বাঁচাতে পারে না ধনী অগ্রজের কাছ থেকে ধার করা চাল কিংবা কন্ট্রোলের চাল। নিরন্ন মানুষের ক্ষুধা শেষ পর্যন্ত যেন অবিনশ্বর সত্য আকারে হাজির। উদ্বন্ধনে ঝুলে স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেয় দুই ভাই। এই ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী, যে কিনা এই গল্পের সক্রিয় চরিত্র নয়, সে দুর্ভিক্ষপীড়িত পরিবার ও সমাজের গল্পকে স্থাপন করে ইতিহাসের প্রেক্ষণবিন্দুতে। কয়েকটি অপমৃত্যুর ঘটনায় তাঁর মনোভূমিতে বিরাট এক পরিবর্তন ঘটে যায়। সুকান্ত সেই বদলকে আঁকেন এভাবে:
লাইনবন্দী প্রত্যেকে প্রতীক্ষা করছে চালের জন্যে। বিনয় ভাবল, এ-প্রতীক্ষা চালের জন্যে, না বিপ্লবের জন্যে? বিনয় স্পষ্ট করল এরা বিপ্লবকে পরিপুষ্ট করছে, অনিবার্য করে তুলছে প্রতিদিনের ধৈর্যের মধ্যে দিয়ে। আর এদের অপরিতৃপ্ত ক্ষুধা করছে তারই পূর্ণ আয়োজন। এরা একত্র, অথচ এক নয়; এর প্রতীক্ষমাণ, তবু সচেষ্ট নয়, এরা চাইছে এতটুকু চেতনার আগুন... এদের মধ্যে আত্মগোপনকারী, ছদ্মবেশী ক্রমবর্ধমান ক্ষুধাকে প্রত্যক্ষ করে বিনয় এদের সংহত, সংঘবদ্ধ ও সংগঠিত করে সেই আগুন জ্বালার প্রতিজ্ঞা নিল। (‘ক্ষুধা’)
এই গল্প মতাদর্শিক ইচ্ছাপূরণের গল্প। গল্পের স্বাভাবিক ধ্রুপদি পরিমিতি এতে নেই; রবীন্দ্রনাথের দিক থেকে ভাবলে ‘তত্ত্ব’ আর ‘উপদেশে’র ঘনঘটা এখানে তীব্র, ‘শেষ হইয়াই হইল না শেষে’র মতো স্বাভাবিক ব্যঞ্জনাও এ গল্পে অবলুপ্ত। মার্কসপড়ুয়া সুকান্ত গল্পের টেকনিকে নয়, মার্কসের লজিকে মেতেছেন। ইতিহাসের যুক্তিতে তিনি মানুষের বিপ্লবী আকুতিকে প্রকাশ করেন, এমনকি জনগণ যখন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত বা চিন্তিতও নন, তখন তিনি বৈপ্লবিক প্রস্তুতিগ্রহণের উদ্দীপনাকে মহিমান্বিত করেন। প্রকৃতপক্ষে মার্কসবাদী ইতিহাসচিন্তার আদলে সুকান্ত হয়ে ওঠেন ভবিষ্যাভিসারী, মানবিক অগ্রসরমানতার কথা বলে কর্মের স্পৃহায় অপেক্ষা করতে থাকেন সেই সুদিনের যেদিন খসে পড়বে শোষণের শৃঙ্খল।
এ কালের ‘পোস্ট-আইডিওলজি’, ‘পোস্ট-হিউম্যান’, ‘পোস্ট-ট্রুথ’ যুগ ইতিহাসের এই ক্রমধারাকে মান্য মনে করে না সত্য। কিন্তু ইতিহাসের অনেক অপরিমেয় যুগ কেটে গেছে শাসক-শোষিতের সম্পর্কের সত্যকে বুঝতে বুঝতে। বাংলা অঞ্চলে যখন ধ্রুপদি মার্কসবাদের চর্চা চলেছে তখন অপার দেশপ্রেমে শোষিতের ভাব-ভাষাকে কাব্যরূপ দিতে গিয়ে অন্য অনেকের মতো সুকান্তও মার্কসবাদকে আশ্রয় করেছিলেন। ওই স্বপ্নসম্ভব কল্পনা থেকে তিনি লিখেছিলেন :
হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলা দেশ
কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে
সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ
জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে।
...
সাবাস, বাংলা দেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয়;
জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।
সুকান্তের চিন্তায় এই দেশচেতনা প্রবল। তাঁর দেশজতাকে দুদিক থেকে ভাবতে পারি— প্রথমত, রাজনৈতিকভাবে দৃষ্টিকোণে সাহিত্যের বিষয় ও চিন্তার দিক থেকে, দ্বিতীয়ত, শিল্পের জনমুখিতার দিক থেকে। অর্থাৎ, তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু দেশমুখী, আবার কবিতার শিল্পায়নও দেশ বা জনতার অভিমুখী। কবিতাকে পাঠকমুখী করার সদিচ্ছা তাঁর ছিল। এ প্রসঙ্গে সুকান্তের একটি প্রায়-অপঠিত প্রবন্ধের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চাই।
‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ শীর্ষক প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৪ সালের অরণি পত্রিকায়। এ প্রবন্ধে সুকান্ত ছন্দ, কবিতা ও আবৃত্তির সম্বন্ধ খুঁজেছেন। তাঁর কাছে শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠেছে কবির লড়াই, পাঁচালি ও কথকতা। খুব বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবতে হয় সুকান্ত আবৃত্তির তাৎপর্য বুঝতে চেয়েছিলেন এমন এক সময়ে যখন শিল্পকলার কোনো স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে আবৃত্তি গড়ে ওঠে নি। সুকান্ত কেন আবৃত্তির কথা বলছেন? জবাব এই, এসবের মধ্যে ‘ছন্দ-শিক্ষার কিছুটা ব্যবস্থা ছিল’।
বাঙালির সাহিত্যকেন্দ্রিক সংস্কৃতির ইতিহাসে কবিতাপাঠের অন্যরকম তাৎপর্যও আছে। নিশ্চয়ই কারও চোখ এড়ানোর সুযোগ নেই যে মুদ্রণ-সংস্কৃতির আগে বাংলা কবিতা বা সাহিত্য ছিল মূলত বাচন ও উচ্চারণের সংস্কৃতি। শ্রোতাদের সামনে কবি বা গায়েন আওড়ে যেতেন শ্লোক। কবির লড়াই, পাঁচালি কিংবা কথকতা সে ধারারই প্রতিনিধি; এই শিল্পযোগাযোগে একক শ্রোতার অস্তিত্ব নেই, আছে বহুশ্রোতা। ছাপাখানার যুগে মুদ্রিত সাহিত্য হয়ে গেল ব্যক্তিক পাঠের বস্তু। কিন্তু নেরুদা, মায়াকোভস্কি কিংবা সুকান্তের মতো কবিরা বাচনের সম্ভাবনার মুলতুবি ঘটান নি। বিস্ময়ের সঙ্গে স্বীকার করতে হয়, এই সেই নেরুদা যিনি পরাবাস্তবতার কবি, এই সেই মায়াকোভস্কি যিনি ফিউচারিজমের কবি— তাঁদের কবিতার শ্রোতাদের বড় একটা অংশ ছিল সাক্ষর-অর্ধসাক্ষর শ্রমজীবী মানুষ। সুকান্তের কবিতা শ্রেণিবিভক্ত সমাজের ওই স্তরে হয়তো পৌঁছায়নি সত্য, তবে পৌঁছেছিল রাজনীতি ও জনতামুখী মানুষের কাছাকাছি; কবিতায় যাঁরা চেনা বাস্তবের প্রতিচ্ছবি পেতে চান, সময়ের উদ্দীপনায় যাঁরা প্রকম্পিত হতে চান, তাদের জন্য সুকান্ত ছিলেন বাংলা কবিতার সহজপাঠ।
ছন্দ, আবৃত্তি কিংবা কাব্যপাঠের সূত্রে সুকান্ত মূলত ঝুঁকতে চান গণমুখীনতার দিকে। তিনি ‘পাঠক’ নামক বর্গটির কথাও বিশেষভাবে মনে রাখেন। আধুনিক কবিতা আর পাঠকের মধ্যে তৈরি হওয়া বিচ্ছেদের মীমাংসায় সহায়ক উপাদান হিসেবে মনে করেছেন ‘আবৃত্তি-উপযোগী ছন্দ’কে। সুকান্ত লিখেছেন, ‘কবিরা নতুন নতুন আবৃত্তি-উপযোগী ছন্দে লিখলে (যা আধুনিক কবিরা লেখেন না) এবং পাঠকরা তা ঠিকমতো পড়লে তবেই আধুনিক কবিতার ক্ষেত্র প্রসারিত হবে, উপেক্ষিত আধুনিক কবিতা খেচর ব্যবস্থা থেকে ক্রমশ জনসাধারণের দৃষ্টিগোচর হবে।’ ‘খেচর ব্যবস্থা’—এই শব্দযুগলের ভেতর সুকান্ত রেখে দিয়েছেন অভ্রান্ত ইঙ্গিত; আধুনিক কবিতা পাঠকের থেকে দূরে সরে গেছে, তিনি তাই কবিতা ও জনতার সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের প্রকল্পনায় ফিরে যান। হয়তো তাই, ছন্দের নানা করুকাজসমেত সুকান্ত হতে চান বোধগম্য, তাঁর ভাষা চায় সরলতার শোভা। আমরা দেখব, পাঠকের শ্রুতিকে আচ্ছন্ন করতে সুকান্ত সহজিয়া ভঙ্গিতে কবিতায় বসিয়েছেন অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্তের সুবিন্যস্ত চাল।
প্রথাগত ছন্দের সীমানা পেরিয়ে সুকান্ত গদ্যছন্দে গল্পও বলেছেন। ভাবা যাক, তাঁর রূপক ধরনের কবিতাগুলোর কথা—‘একটি মোরগের কাহিনী’, ‘সিঁড়ি’, ‘সিগারেট’, ‘দেশলাই কাঠি’। অন্ত্যমিল কিংবা অন্ত্যমিলহীনতা, দরকারি শব্দের সমাবেশ, প্রতীকী ব্যঞ্জনা—সাধারণভাবে এই অবলম্বন নিয়েই সুকান্ত তাঁর কাব্যভাষাকে গড়ে তুলেছিলেন। সাহিত্যের সূক্ষ্ম কলাপ্রকৌশলগত আকাঙ্ক্ষা না থাকলে তিনি বুদ্ধদেব বসুকে ছন্দের বোঝাপড়া নিয়ে চিঠি লিখতেন না, ছন্দ বিষয়ক প্রবন্ধ লেখার জন্য শব্দ খরচ করতেন না। সব মিলিয়ে মানুষের জটিল জাগতিকতাকে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন সহজ ভাষায়।
মজার ব্যাপার হলো, অনেকের চোখে সুকান্তের সহজতাই ছিল সমস্যা। এ মুহূর্তে স্মরণযোগ্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কিছু উক্তি। ‘দেশ’ পত্রিকায় সুনীল লিখেছিলেন ‘সুকান্তর কবিতা বড় বেশী সোজাসুজি, বড় সরল’, ‘কবিতার রহস্যময়তা, শব্দের ধ্বনি-মাধুর্য’ সুকান্তের কবিতায় অনুপস্থিত; কেননা কবিতার কাছে সুনীলের প্রত্যাশা ‘রহস্যময়তা’ ও ‘বিশুদ্ধ শব্দ’। এর বিপরীতে দেখি, সুকান্তের কবিতার সারল্যে কোনো ধরনের বিঘ্ন বোধ করেননি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। উল্টো তিনি প্রশ্ন তুললেন সুকান্তের ‘সরলতার সমগ্র তাৎপর্য সকলের কাছে ধরা’ পড়েছে কিনা। এখানেই থাকেননি তিনি। বাঙালির কাব্যবোধের সীমানাও শনাক্ত করেছেন, লিখেছেন, ‘গভীরতা, ব্যাপ্তি, তীব্রতা, ভাবৈশ্বর্য ইত্যাদি সবকিছুর ধারক ও বাহক হিসাবে সাদামাটা স্পষ্টভাষী সার্থক কবিতা কল্পনা করতে আমরা অপটু ছিলাম, আমাদের অভিজ্ঞতা ও স্বীকৃতি গীতিকবিতা পর্যন্ত।’ সুনীল যেখানে পেয়েছেন সমস্যা, মানিক সেখানে পেয়েছেন ‘বাংলা কাব্য-সাহিত্যে নবজন্মের সূচনা’। ‘মৌলিক কবিতার দৈন্যে’ সুকান্ত যেন এক ‘নতুন চেতনা’।
মানিক যখন ‘নতুন চেতনা’র কথা বলছেন, বুদ্ধদেব বসু তখন শুনিয়েছেন আশাহতের সুর। এ ক্ষেত্রে সংকটের মূলে আছে রাজনীতি। সুকান্ত প্রয়াত হওয়ার পর নিজের সম্পাদনায় প্রকাশিত কবিতা পত্রিকায় ছোট্ট একটি স্মরণগাথা লিখেছিলেন বুদ্ধদেব। সে লেখায় লেগে আছে তরুণ কবির প্রতি এক ঘনিষ্ঠজনের স্নেহ ও মমত্বের আবির। একই সঙ্গে আছে অনুযোগ। সুকান্তের পাঠানো একটি পোস্টকার্ডের জবাবে বুদ্ধদেব লিখেছিলেন, ‘রাজনৈতিক পদ্য লিখে শক্তির অপচয় করছো তুমি; তোমার জন্য দুঃখ হয়।’ মার্কসবাদের প্রতি ভ্রুকুঞ্চিত চোখে বুদ্ধদেব আরও লিখেছিলেন, ‘তার কিশোর-হৃদয়ের স্বাভাবিক উন্মুখতার সঙ্গে পদে-পদে দাঙ্গা বাধিয়ে দিয়েছে একটি কঠিন, সংকীর্ণ তথাকথিত বৈজ্ঞানিক মতবাদ’। হয়তো একটু ক্ষুণ্নমনেই বুদ্ধদেব যোগ করেছিলেন, ‘কবিতাগুলি যেন সেই মতবাদের চিত্রণ মাত্র; জোর গলায় চেঁচিয়ে বলা কবিতা না-হ’য়ে খবরকাগজের প্যারাগ্রাফ হ’লেই যেন মানাতো।’
সুকান্তের প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসু চল্লিশের দশকের বাংলা অঞ্চলের সাহিত্যিক পরিপ্রেক্ষিত বিষয়েও খানিকটা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, ‘যুদ্ধকালীন উদ্ভ্রান্তির সুযোগে দেশের রাজনৈতিক দলগুলি সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক একটি ফ্রন্ট খুললেন, আর আমাদের নবীন লেখকেরা যৌবনের ত্যাগ-প্রবণতায় অধীর হ’য়ে উঠলেন বিকিয়ে দিতে।’ সেই পরিপ্রেক্ষিতে সুকান্ত যেন রাজনৈতিক কবিত্বের শহিদ।
বুদ্ধদেব বসু কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সুকান্তপাঠ আদতে আধুনিক কবিতা বিষয়ক এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির ফসল। কবিতার ‘আধুনিকতা’ বিষয়ক বিবেচনায় তাঁরা ইউরোপের একটি ধারাকেই মান্য মনে করেন—যেখানে আত্মতা প্রধান, কবিতার সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্য অস্বীকৃত, কাঞ্চনমূল্যে গৃহীত হয় শৈল্পিক সৌন্দর্যের ধারণা; এ ধরনের আধুনিকতা সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় কাতর হলেও সামাজিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী নয়। অর্থাৎ সামাজিকভাবে নিষ্ক্রিয়তার দর্শনই তাদের কাছে মান্য ও অনুসরণযোগ্য। আধুনিকতার এই খাতটিকে আমরা হয়তো বলতে পারি ‘বুর্জোয়া আধুনিকতা’। কিন্তু ইতিহাস বলছে, শিল্পসাহিত্যে মার্কসবাদও আধুনিকতার ভিন্ন একটি খাত তৈরি করতে পেরেছিল।
শিল্পত্ববাদীরা প্রধানত ছুটে গিয়েছিলেন ডব্লু বি ইয়েটস, এজরা পাউন্ড, টিএস এলিয়টের দিকে। আরাধ্য হয়ে উঠেছিলেন ফরাসি কবিতার প্রতিভূরা; পঠিত ও অনূদিত হচ্ছিলেন বোদলেয়ার কিংবা র্যাঁবো। অপরদিকে মার্কসবাদীরা আধুনিকতার পথ খুঁজছিলেন প্রতিরোধের কাব্যে। রুশ সাহিত্যের সঙ্গে কবিদের ব্যাপক পরিচিতি ঘটছিল। আফ্রিকার সাহিত্য থেকে উপাদান গ্রহণ করছিলেন কেউ কেউ। ইংরেজির ভাষার মধ্যস্থতায় বাংলায় এলো স্বয়ং ইউরোপের অবক্ষয়ী আধুনিকতা।
কাছাকাছি সময়েই বহাল ছিল প্রতিরোধী ও সংগ্রামী আধুনিকতা। মার্কসবাদের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে সুকান্ত শেষোক্তের অনুসারী। আলোকায়নের উত্তরাধিকার হিসেবে কার্ল মার্কস নিজেও তো আধুনিক। মানুষকে কেন্দ্রে রেখেই তাঁর চিন্তার বিশ্ববিস্তার। সুকান্তের আধুনিকতার কেন্দ্রে তাই কথা বলে ওঠে মানুষ। সক্রিয় থেকেছে মানবায়নের ধারণা। কিন্তু এলিয়ট-প্রভাবিত আধুনিকতার বড় স্বভাব বিমানবায়ন। জীবনের প্রতি প্রভূত টান থাকা সত্ত্বেও জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ কিংবা বুদ্ধদেব মানুষী জীবনকে আমরা খণ্ডবিখণ্ড হয়ে ঝরে পড়তে দেখি; বস্তুমুখিনতার চাপে জীবনকে মনে হয় বিষাদে বিলীন। সুকান্তের কবিতা এই বিষাদকেই উচ্ছেদ করে। মানবিক সম্পর্ক আর তার বিদ্রোহের আখ্যানই ঘোরতরভাবে প্রাধান্য পায়।
সুকান্ত যে ল্যাংস্টন হিউজের অনুসরণে ‘মজুরদের ঝড়’ লেখেন, তা কেবলই দৈবচয়িত অনুবাদমাত্র নয়। লড়াকু মজুরদের ঝড় তিনি নিজেও অনুভব করেছেন। তাই বাছাই করে নিয়েছেন হার্লেম রেনেসাঁর এক কৃষ্ণাঙ্গ কবির কবিতাকে; প্রতিদিন যাদের লড়তে হয়েছে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে; মনে মনে সেতুবন্ধন করতে হয়েছে আফ্রিকার সঙ্গে; কেননা কোনো এক দুঃসময়ে আটলান্টিক পেরিয়ে ক্রীতদাস হয়ে পাড়ি জমাতে হয়েছে আমেরিকার তটভূমে। সেই মানুষগুলোর জন্য সুকান্ত অনুভব করেছেন মরমি টান। কৃষ্ণ চক্রবর্তী সুকান্তের সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন এক স্মৃতিলেখায়:
ল্যাংস্টন হিউজ-এর কবিতা ‘Labour Strom’ নিয়ে গেছি সেদিন। কবিতাটা পড়ার পরই দেখলাম সেই ‘দুরন্ত উচ্ছ্বাস’। কি আনন্দ কবির এ কবিতাটি পেয়ে। কে বলবে তিনি অসুস্থ, কে বলবে তিনি রোগে ভুগছেন। শ্রমিকশ্রেণীর সমর্থনে এমন সুন্দর কবিতা, মুক্তির স্বপ্ন, বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন যে কবি তার লক্ষ্যকে সামনে রেখে এমন কবিতা অনুবাদ না করে কি থাকা যায়! (পৃ. ২২)
কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল আমেরিকার বামপন্থী পত্রিকা Masses and Mainstream-এ। কৃষ্ণ চক্রবর্তীর সূত্রে সুকান্ত সেটি পড়েছিলেন। পড়েই অনুবাদের আগ্রহ বোধ করেছিলেন। রোগশয্যায় শায়িত সুকান্ত একরাতে তা অনুবাদ করেছিলেন। কৃষ্ণ জানাচ্ছেন, ‘মজুরের ঝড়’ কবিতাটি অনুবাদ করার পর তিনি বলেছিলেন, ঐ রকম কবিতা আরও পেলে আমি যেন তার কাছে নিয়ে যাই, তিনি অনুবাদ করবেন। সে সুযোগ আর হয় নি।’ (পৃ৪৩)
সুকান্তের সমগ্র সাহিত্য শেষপর্যন্ত হয়ে উঠেছে ‘প্রতিরোধের সাহিত্য’। আমরা দেখব উপনিবেশিত অঞ্চলগুলোতে জাতীয়তাবাদ ও মার্কসবাদ বিদ্রোহী সত্তায় বিপুলভাবে প্রেরণা জুগিয়েছে। পাবলো নেরুদা, এইমে সেজায়ার, লিওপোল্ড সেঁদর সেঙ্ঘর প্রমুখ কবিরা রচনা করেছেন সোচ্চার পঙ্ক্তিমালা। তাঁদের কবিতায় হাজির হয়েছে জাতীয় বা স্থানীয় ও বহির্দেশীয় উপাদান। এসবের সমন্বয়েই তাঁরা ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাহিত্যিক চক্রব্যুহ রচনা করেছেন। প্রগতিশীলতার বুর্জোয়া চশমায় সুকান্তের আধুনিকতাকে অনেকের কাছে জলো, খেলো, পানশে মনে হলেও আধুনিকতার এই ইতিহাসকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। কেননা মানুষ এখনও ‘মানবিক বিশ্ব’ খোঁজে। সুকান্তকে দেখতে হবে সেই অনুসন্ধিৎসার পথে।
বাংলাদেশের মানুষ তার লড়াই-সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের পাশাপাশি সুকান্তকেও হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেছে। ১৯৪৭-উত্তর মুক্তিসংগ্রাম থেকে শুরু করে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত উচ্চারিত হয়েছে সুকান্তের উক্তি। ষাটের দশকের স্মৃতি আওড়াতে গিয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘গত কুড়ি বছর ধরে সুকান্তর বই বাংলা দেশের প্রায় ঘরে ঘরে স্থান পেয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে তার একটা ছাপা বই থেকে শ’য়ে শ’য়ে হাতে লিখে নকল করে লোকে সযত্নে ঘরে রেখেছ।’ (সুভাষ মুখোপাধ্যায় ১৩৬৪ : ৫)
কারণ গত এক শ-দেড় শ বছর ধরেই এ অঞ্চলের মানুষকে শোষকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হচ্ছে। হয়তো এটাই এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিয়তি। প্রশ্ন হলো, সুকান্ত কতখানি পঠিত হবেন? ইতিহাসের তুমুল বিচূর্ণীকরণের যুগে তিনি কি আর প্রাসঙ্গিক থাকবেন? বিশেষত সাম্প্রতিক বিশ্বকে যখন বলা হচ্ছে পোস্ট-ট্রুথ বা সত্য-উত্তর, পোস্ট-হিউম্যান বা মানব-উত্তর, পোস্ট-আইডিওলজি বা মতাদর্শ-উত্তর যুগ তখন সেই বিশ্বে সুকান্তের অবস্থান কী হবে?
কেননা এই বিশ্বে বলা হচ্ছে, আর কোনো রাজনৈতিক ভাবাদর্শ জন্মাবে না, দর্শন আকারে হাজির হবে না মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক মেসাইয়ার বেশে দেখা দেবেন না কোনো জননেতা; ইতিহাসে আবির্ভূত হবে প্রবল শক্তিধর ‘টেকনোক্রেসি’। পোস্ট-হিউম্যান যুগে হারিয়ে যাবে মানবকেন্দ্রিকতার ধারণা; মানুষ চলে যাবে মানবতার বাইরে। ধূসর হয়ে আসবে মানুষ ও মেশিনের ফারাক। পোস্ট-ট্রুথ যুগের ভাবনা বলে, ‘সত্যে’রও কোনো একমাত্র রূপ থাকবে না। বহুবেশধারী সত্যের মুখোমুখি হবে মানুষ।
পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় প্রযুক্তি, যন্ত্র ও জীবনের একীভূত রূপ কোথায় কখন কী সত্য উৎপাদন করছে, তার সবটা আমরা জানি না। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবেই জানি যে, ‘মানুষ’ নামক একটি বর্গ জ্যান্ত আছে; তারা সক্রিয়, তারা ভাবুক, তারা প্রতিদিন অমানবিকতার গল্প পড়ে, যুদ্ধ আর ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানবিক পৃথিবীর সন্ধান করে; এমনকি এই মানুষই ‘মানুষী’ সভ্যতাকে নিয়ে যেতে চায় অন্য কোনো গ্রহে। মানুষের এই গল্প কোনোদিন ফুরায় না—হোক তা মহাভারত-রামায়ণের যুগের, হোক তা হোমার কিংবা সুকান্তের যুগের। আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে নতুন নতুন আগামী, সুকান্ত যেমন বলেছেন:
জড় নই, মৃত নই, নই অন্ধকারের খনিজ
আমি তো জীবন্ত প্রাণ, আমি এক অঙ্কুরিত বীজ।
মাটিতে লালিত ভীরু, শুধু আজ আকাশের ডাকে
মেলেছি সন্দিগ্ধ চোখ, স্বপ্ন ঘিরে রয়েছে আমাকে। (‘আগামী’ ছাড়পত্র)
মানুষের ইতিহাস— সম্ভাবনার ইতিহাস, অঙ্কুর থেকে জেগে ওঠার ইতিহাস। জন্মশতবর্ষের এই শুভ মুহূর্তে সুকান্তের হাত ধরে আমরা সেই ইতিহাসের কথাই আরও একবার স্মরণ করতে পারি।
রচনাপঞ্জি
কৃষ্ণ চক্রবর্তী (১৯৬০), সুকান্ত : স্মৃতিকথা ও মূল্যায়ন, চিরায়ত প্রকাশনী, কলকাতা
বিশ্বনাথ দে (১৯৮৭), সুকান্ত বিচিত্রা (সম্পাদিত), সাহিত্যতম, কলকাতা
বুদ্ধদেব বসু (১৯৮৭), সুকান্ত বিচিত্রা (সম্পাদিত), সম্পাদক: বিশ্বনাথ দে, সাহিত্যতম, কলকাতা
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৮৭), সুকান্ত বিচিত্রা (সম্পাদিত), সম্পাদক: বিশ্বনাথ দে, সাহিত্যতম, কলকাতা
সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৩৬৪), সুকান্ত-সমগ্র, সারস্বত লাইব্রেরী, কলকাতা
সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯৮৭), সুকান্ত বিচিত্রা (সম্পাদিত), সম্পাদক: বিশ্বনাথ দে, সাহিত্যতম, কলকাতা
.png)

রেলে ‘হরতাল’ ‘হরতাল’ একটা রব উঠেছে! সে খবর ইঞ্জিন, লাইন, ঘণ্টা, সিগন্যাল এদের কাছেও পৌঁছে গেছে। তাই এরা একটা সভা ডাকল। মস্ত সভা। পূর্ণিমার দিন রাত দুটোয় অস্পষ্ট মেঘে ঢাকা চাঁদের আলোর নীচে সবাই জড়ো হল। হাঁপাতে হাঁপাতে বিশালবপু সভাপতি ইঞ্জিন মশাই এলেন। তাঁর লেট হয়ে গেছে।
২ ঘণ্টা আগে
বন্ধুমহলে নাম শুনেছিলুম আগেই; চোখে দেখলুম লেক-লগ্ন একটি ক্লাবের বাইশে শ্রাবণের অনুষ্ঠানে। উজ্জ্বল আলোয়, সুবেশ, চিক্কণ এবং সাধারণত কাব্য সম্বন্ধে উদাসীন মেয়ে পুরুষের ভিড়ের মধ্যে কালো একটি ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে, বেশ চেঁচিয়ে, বেশ স্পষ্ট ক’রে রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে নিজের লেখা একটি কবিতা পড়লো।
৩ ঘণ্টা আগে
কাব্য-সাহিত্যের অনুর্বরতাও এই জন্য যে কবিতা লেখার মজুরীতে কবি বাঁচে না। নতুন যুগের অলঙ্ঘ নির্দেশে তাকে আজ দেহমনে চব্বিশ ঘণ্টার সাহচার্য বরণ করে নিতে হয় তার যে উলঙ্গ ছেলেরা আজ বুলেট খেয়ে মরছে তাদের, কাব্যচর্চা আর জীবিকাচর্চার শোষণে সে ক্ষয় হয়ে যায়।
৪ ঘণ্টা আগে
ভাবা যায়, মাত্র চব্বিশ বছরের কাছাকাছি বয়সে শহীদ কাদরী তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম রেখেছিলেন উত্তরাধিকার। আর জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ গোধূলির গান-এর প্রথম কবিতাটি তিনি শুরু করেন দুটো অনিশ্চয়ক শব্দে—‘জানি না’।
১৮ ঘণ্টা আগে