খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বাস্তবে রূপ দেওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১১: ৫০
খালেদা জিয়া। ছবি: সংগৃহীত

একজন নেতার মৃত্যু একটি দলের জন্য শোকের ঘটনা। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক পরীক্ষাও। নেতা চলে যাওয়ার পর দলটি কী করে, সেটিই প্রমাণ করে সেই নেতার উত্তরাধিকার কতটা গভীর ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপিও এমন এক পরীক্ষার সামনে। জন্মদিনে দলটি তাঁকে স্মরণ করবে। শ্রদ্ধা জানাবে। তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের কথা বলবে। এর বাইরে একটি কঠিন প্রশ্নেরও মুখোমুখি হতে হবে বিএনপিকে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তারা কীভাবে ধারণ করবে?

প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন না। কয়েক দশক ধরে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান চরিত্র। তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দীর্ঘ সময় বিরোধী দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। নির্বাচনে গেছেন। জিতেছেন। হেরেছেন। আবার ফিরে এসেছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সাফল্য আছে। বিতর্ক আছে। ভুল আছে। কিন্তু প্রভাব অস্বীকার করার মতো নয়।

এখন সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিএনপির হাতে। এখানেই মূল পরীক্ষা।

খালেদা জিয়ার রাজনীতির অন্যতম বড় শিক্ষা ছিল জনগণের ভোটের ওপর আস্থা। তাঁর রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি ছিল নির্বাচন। ক্ষমতায় যাওয়ার পথ হিসেবে তিনি ভোটের রাজনীতিকে গ্রহণ করেছিলেন। এই বিশ্বাস বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট এখনো কাটেনি। ভোটের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে রাষ্ট্রের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

তাই বিএনপি যদি সত্যিই খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার ধারণ করতে চায়, তাহলে প্রথম কাজ ভোটের রাজনীতিকে শুধু স্লোগানে না রেখে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত করা। শুধু নিজের ভোট নয়। প্রতিপক্ষের ভোটের অধিকারও মানতে হবে। শুধু নিজের জয়ের অধিকার নয়। অন্যের জয় মেনে নেওয়ার সংস্কৃতিও তৈরি করতে হবে। এখানেই কঠিন পরীক্ষা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল গণতন্ত্রকে শুধু নির্বাচন দিয়ে ব্যাখ্যা করেননি। তিনি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, প্রতিযোগিতা ও বিরোধী মতের সুযোগকে গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখেছেন। অর্থাৎ নির্বাচন থাকবে; কিন্তু প্রতিযোগিতা থাকবে না, এমন ব্যবস্থা গণতন্ত্র নয়। বিরোধী মত থাকবে; কিন্তু তার রাজনৈতিক অধিকার থাকবে না, এটিও গণতন্ত্র নয়। খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার যদি বিএনপি সত্যিই বহন করতে চায়, তাহলে এই শিক্ষা তাদের গ্রহণ করতে হবে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন দলীয় গণতন্ত্রের। বিএনপি দেশের গণতন্ত্রের কথা বলবে, সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু দলটির ভেতরে গণতন্ত্র কতটা থাকবে? সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৃণমূলের ভূমিকা কতটা থাকবে? নেতৃত্ব নির্বাচনে মতের প্রতিযোগিতা কতটা থাকবে? ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ কতটা থাকবে?

এগুলো অস্বস্তিকর প্রশ্ন। কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দাবি করে অগণতান্ত্রিক দল পরিচালনা করা যায় না। রাজনৈতিক দলই গণতন্ত্রের প্রথম বিদ্যালয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট মিশেলস বহু আগে ‘Iron law of oligarchy’-র কথা বলেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, বড় রাজনৈতিক সংগঠনগুলোতে ক্ষমতা ধীরে ধীরে অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিএনপির সামনে তাই চ্যালেঞ্জ হলো ব্যক্তিনির্ভরতা থেকে প্রতিষ্ঠান-নির্ভরতার দিকে যাওয়া।

এখানে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রসঙ্গ অনিবার্য।

খালেদা জিয়ার পর বিএনপি নেতৃত্বের প্রধান মুখ তারেক রহমান। তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখন চেয়ারম্যান। দেশের প্রধানমন্ত্রী। এখন তাঁর সামনে সুযোগ আছে। চ্যালেঞ্জও আছে। সুযোগ হলো, তিনি চাইলে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের উপযোগী করে সাজাতে পারেন। চ্যালেঞ্জ হলো, সেই উত্তরাধিকারকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আবেগের বাইরে নিয়ে যেতে হবে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যদি শুধু খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে, তাহলে সেটি হবে সহজ পথ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট নয়। তাকে প্রমাণ করতে হবে, বিএনপি শুধু একটি পরিবারের রাজনৈতিক দল নয়। এটি আধুনিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে নেতৃত্বের পাশাপাশি নীতি গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে ব্যক্তি নয়; দলীয় প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে আনুগত্যের পাশাপাশি যোগ্যতার মূল্য আছে।

আরেকটি বড় প্রশ্ন নতুন প্রজন্মের। খালেদা জিয়ার সঙ্গে একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক আবেগ জড়িত। কিন্তু আজকের তরুণদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আলাদা। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে বড় হয়েছে। তারা দ্রুত তথ্য পায়। দ্রুত প্রশ্ন করে। প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষায় তারা সহজে সন্তুষ্ট হয় না। তারা শুধু ইতিহাস শুনতে চায় না। ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও জানতে চায়।

তাই বিএনপির সামনে প্রশ্ন, খালেদা জিয়ার রাজনীতিকে তারা নতুন প্রজন্মের ভাষায় কীভাবে ব্যাখ্যা করবে? শুধু ‘আপসহীন নেত্রী’ বললে হবে না। বলতে হবে, সেই আপসহীনতার রাজনৈতিক অর্থ কী। শুধু ‘গণতন্ত্রের নেত্রী’ বললে হবে না। বলতে হবে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে গণতন্ত্রকে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। শুধু ‘ভোটের অধিকার’ বললে হবে না। বলতে হবে, ক্ষমতায় গিয়ে সেই অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত রাখবে। বিএনপি এখন ক্ষমতায়। ভোটের অধিকার বিএনপি কীভাবে রক্ষা করে, সেটি সবাই মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করবে।

এখানে খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি আছে। কারণ বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় গণতন্ত্রের কথা বলা সহজ। ক্ষমতায় গিয়ে গণতন্ত্র রক্ষা করা কঠিন। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় স্বাধীন গণমাধ্যমের কথা বলা সহজ। ক্ষমতায় গিয়ে সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা সহ্য করা কঠিন। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বিরোধী দলের অধিকার দাবি করা সহজ। ক্ষমতায় গিয়ে বিরোধী দলের অধিকার রক্ষা করা কঠিন। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সত্যিকার অর্থে সম্মান করতে হলে বিএনপিকে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দীর্ঘ সময় বিরোধী দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। নির্বাচনে গেছেন। জিতেছেন। হেরেছেন। আবার ফিরে এসেছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সাফল্য আছে। বিতর্ক আছে। ভুল আছে। কিন্তু প্রভাব অস্বীকার করার মতো নয়।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। খালেদা জিয়ার রাজনীতি শুধু বিএনপির জন্য নয়। তিনি বাংলাদেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর জাতীয়তাবাদী রাজনীতি বহু মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ। আমরা দেখেছি, ৫ আগস্টের পর তিনি আর বিএনপির চেয়ারপারসন থাকেননি। দলমত নির্বিশেষে সবার নেতা হয়ে উঠেছিলেন। এই যে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা, এটি যেকোনো রাজনৈতিক নেতার জন্য বিরল সম্মানের। তাই তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে বিএনপির দায়ও বড়। দলটি যদি এই উত্তরাধিকারকে দলীয় সম্পদে পরিণত করে, তাহলে এর রাজনৈতিক পরিসর ছোট হবে। বরং জাতীয়তাবাদ, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকারকে বৃহত্তর জাতীয় রাজনৈতিক দর্শনে রূপ দিতে হবে।

এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের প্রতি রাজনৈতিক সহনশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনীতির বড় সমস্যা প্রতিপক্ষকে শত্রু ভাবার সংস্কৃতি। সরকার বদলায়। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি বদলায় না। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনেরও এমন অধ্যায় আছে, যা এই সংস্কৃতির বাইরে নয়। তাই তাঁর উত্তরাধিকারকে সত্যিকার অর্থে নতুনভাবে ধারণ করতে হলে বিএনপিকে এই চক্র ভাঙতে হবে।

প্রতিপক্ষ থাকবে। বিরোধিতা থাকবে। তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কও থাকবে। কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না। মামলা দিয়ে রাজনীতি বন্ধ করার চেষ্টা থাকবে না। রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় প্রতিশোধের হাতিয়ার বানানো হবে না। এই প্রতিশ্রুতিই হতে পারে খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারের সবচেয়ে বড় আধুনিকীকরণ। কারণ গণতন্ত্র মানে শুধু নিজের স্বাধীনতা নয়। অন্যের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করা। নিজের অধিকারের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের অধিকার স্বীকার করা। নিজের দলের জয় যেমন, তেমনি পরাজয়ের সম্ভাবনাও মেনে নিতে হবে। এই জায়গায় বিএনপির সামনে ইতিহাসের এক বড় সুযোগ রয়েছে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যু তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সমাপ্তি নয়। বরং নতুন অধ্যায়ের শুরু। তাঁর উত্তরাধিকার এখন পরীক্ষিত হবে বিএনপির আচরণে। দলের নীতিতে। সংসদে। প্রশাসনে। গণমাধ্যমের প্রতি আচরণে। বিরোধী দলের প্রতি আচরণে। এমনকি দলের ভেতর ভিন্নমতের প্রতি আচরণে। তাই খালেদা জিয়ার জন্মদিনে বিএনপির সবচেয়ে বড় কাজ শুধু তাঁকে স্মরণ করা নয়; তাঁর রাজনীতির কঠিন শিক্ষাগুলো গ্রহণ করা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এই দায় আরও বেশি। কারণ উত্তরাধিকার শুধু উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া যায় না। উত্তরাধিকার অর্জন করতে হয়। খালেদা জিয়া যে রাজনৈতিক পুঁজি রেখে গেছেন, তা ব্যবহার করা সহজ। কিন্তু সেটিকে নতুন রাজনৈতিক বিশ্বাসে রূপান্তর করা কঠিন।

বিএনপি কি সেই কঠিন পথ বেছে নেবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দরকার। কারণ খালেদা জিয়ার নাম বিএনপির অতীতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ হতে পারে। কিন্তু তাঁর আদর্শ যদি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আচরণে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে সেই সম্পদ ধীরে ধীরে শুধু স্মৃতিতে পরিণত হবে।

খালেদা জিয়াকে সত্যিকার অর্থে বাঁচিয়ে রাখার পথ তাই ব্যানার নয়। স্লোগান নয়। শুধু জন্মদিনের কর্মসূচি নয়। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে জীবন্ত রাখার একমাত্র পথ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সম্মান করা। দলীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা। এবং ক্ষমতাকে জনগণের কাছে জবাবদিহির মধ্যে রাখা।

খালেদা জিয়া বিএনপিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি দিয়ে গেছেন। এখন সেই ভিত্তির ওপর কী নির্মাণ হবে, সেটিই আসল প্রশ্ন।

তাঁর জন্মদিনে তাই বিএনপির সামনে প্রশ্ন একটাই– খালেদা জিয়াকে তারা শুধু স্মরণ করবে, নাকি তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বাস্তবে রূপ দেবে?

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বাস্তবে রূপ দেওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ