ad

জন্মদিন

উত্তর নেই, তবু গান, শহীদ কাদরীর ‘গোধূলির গান’

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ১৩
শহীদ কাদরী। স্ট্রিম গ্রাফিক

ভাবা যায়, মাত্র চব্বিশ বছরের কাছাকাছি বয়সে শহীদ কাদরী তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম রেখেছিলেন উত্তরাধিকার। আর জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ গোধূলির গান-এর প্রথম কবিতাটি তিনি শুরু করেন দুটো অনিশ্চয়ক শব্দে—‘জানি না’।

এই দুই প্রান্তের মাঝখানে প্রায় একটি জীবন। আর সম্ভবত শহীদ কাদরীকে বোঝার জন্য দূরত্বটিও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

উত্তরাধিকার-এর তরুণ কবি বাংলা কবিতায় এমন এক স্বর নিয়ে এসেছিলেন, যাকে বয়সের তুলনায় আশ্চর্য পরিণত মনে হয়েছিল। তারপর তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা, কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই; দীর্ঘ নৈঃশব্দ্য ও দেশান্তর; অনেক পরে আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও; এবং শেষ পর্যন্ত ২০০৯ থেকে ২০১৬-র মধ্যে লিখিত কবিতা নিয়ে গোধূলির গান। (আমি কবি প্রকাশনী থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ সালে প্রকাশিত মুহিত হাসান সংকলিত ও সম্পাদিত কবিতাসমগ্র: শহীদ কাদরী অনুসরণ করেছি। মূল কবিতাগ্রন্থে বিভিন্ন সময়ে লেখা আরও ৬টি কবিতা ছিল। এখানে তা নেই।) পরিমাণে অল্প অথচ দীর্ঘ সময়ে ছড়িয়ে থাকা এই কবিজীবনে ধারাবাহিকতার চেয়ে বিরতি যেমন বেশি, তেমনি প্রতিটি প্রত্যাবর্তনেই একটু বদলে যাওয়া শহীদ কাদরীকে পাওয়া যায়।

তাই গোধূলির গানকে ‘শেষ কাব্যগ্রন্থ’ বললে কেবল একটি তথ্য বলা হয়, বইটির প্রকৃতি নিয়ে কিছুই বলা হয় না। এ যেন শহীদ কাদরীর কবিজীবনের শেষ প্রান্তে রাখা একটি আয়না। তিনি সামনে যতটা তাকাচ্ছেন, পেছনেও ততটাই। বহুদিনের নগর, প্রেম, দেশ, ভাষা, মানুষ, ইতিহাস, কবিতা—সবকিছুকে ছুঁয়ে দেখছেন আবার। কিন্তু তখন হাতটি তরুণ কবির নয়। এই হাত জানে বিচ্ছেদ কী, দেশান্তর কী, বন্ধুহীনতা কী, শরীরের অবনতি কী, এবং সবচেয়ে বেশি জানে—মানুষ সম্পর্কে একবার গড়ে তোলা কোনো বিশ্বাসই ইতিহাসের সামনে চিরকাল অক্ষত থাকে না। সেজন্য গোধূলির গান-এ পুরোনো শহীদ কাদরী হারিয়ে যান না; তাঁর ভেতরের কিছু জিনিসের গ্রহণমাত্রা বদলে যায়।

যেমন এখানে প্রেম আছে, কিন্তু তার সঙ্গে আছে অনুপস্থিতির ভয়। শহর আছে, কিন্তু শহর আর তখন নাগরিক অভিজ্ঞতার মঞ্চ নয়; হত্যার স্মৃতিও বহন করে। প্রতিবাদ আছে, কিন্তু নিজের কবিতার কার্যকারিতা নিয়েও সন্দেহ আছে। প্রকৃতি আছে, অথচ সে আর মানুষের বেদনার জন্য সাজানো কোনো সান্ত্বনাময় পটভূমি নয়।

আর মৃত্যু—যা তরুণ কবির কাছে দূরের সম্ভাবনা হতে পারে—এখানে প্রায় শরীরের ভেতরের প্রতিবেশী।

মাত্র চব্বিশ বছরের কাছাকাছি বয়সে শহীদ কাদরী তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম রেখেছিলেন 'উত্তরাধিকার'।
মাত্র চব্বিশ বছরের কাছাকাছি বয়সে শহীদ কাদরী তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম রেখেছিলেন 'উত্তরাধিকার'।

এই বদলসমূহকে একত্রে দেখলেই বোঝা যায়, গোধূলির গান বার্ধক্যের কবিতা হলেও ক্লান্ত আত্মসমর্পণের বই নয়। বরং দীর্ঘ জীবন পেরিয়ে একজন কবি নিজের পুরোনো নিশ্চয়তাগুলো থেকে কতটুকু সরলেন, আর কী কী শেষ পর্যন্ত ছাড়তে পারলেন না—তার বই।

প্রথম কবিতার ‘জানি না’ তাই আকস্মিক নয়।

কেননা দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পরেও তিনি সর্বজ্ঞ হয়ে ওঠেন না; উল্টো, জ্ঞানের সীমা সম্পর্কেও আরও সতর্ক হয়ে পড়েন। সন্ধ্যার নদী, প্রাচীন দেবদারু, বিস্মৃত নাম—সবটা মিলিয়ে প্রথমে যেন স্মৃতির কোমল ভূগোল তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু কবি ফিরে যান ‘বধ্যভূমি’-তে। তাঁর ‘বিপন্ন সংগীত’ মাড়িয়ে হন্তারকেরা নিরাপদে চলে যায়; অচেনা পাখি রটায় অন্ধকার পরিণতির সংবাদ।

এখানে গোধূলি আর কেবলই জীবনসায়াহ্ন থাকে না। ব্যক্তিগত বয়সের সঙ্গে সভ্যতার বয়সও মিশে যায়। কবির শরীরে আলো কমছে; কিন্তু তিনি যে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছেন, সেখানেও কি আলো খুব বেশি? গোধূলির গান জুড়ে প্রশ্নটির রেশ থেকে যায়।

তবে শহীদ কাদরীর বিশেষত্ব এই যে, অন্ধকার সম্পর্কে তাঁর কোনো বিভ্রম নেই, তবু অন্ধকারকে শেষ বাক্যটি দিতে চান না। ‘এখন সেই সময়’-এ পাতা ঝরে, শোকার্ত শব্দ ওঠে, স্বাধীনতাযুদ্ধের সৈনিকদের স্মৃতি ঝরা পাতার সঙ্গে মিশে যায়; সেই বিধ্বস্ত আবহের মধ্যেই তিনি উচ্চারণ করেন—‘গান থামবে না’।

এই ‘গান থামবে না’-কে কেবল আশাবাদ বললে শহীদ কাদরীর সংশয়কে অপমান করা হয়। তাঁর কাছে কোনো নিশ্চয়তা নেই যে গান পৃথিবী বদলাবে। বরং গোধূলির গান বারবার দেখায়—হন্তারক জিতে যায়, যুদ্ধ ফিরে আসে, মানুষ তার পুরোনো নিষ্ঠুরতার নতুন নতুন যন্ত্র বানায়। এমনকি ইতিহাসও মানুষের সংশোধনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

হোক গোধূলির, তবু গান।

কেননা গান এখানে বিজয়ের পূর্বাভাস নয়; এমন এক অবস্থান, যেখান থেকে কবি নিজেকে সরাতে চান না। তরুণ কবির প্রতিবাদে যে দাপট সম্ভব, বৃদ্ধ কবির এই প্রতিবাদে তার চেয়ে কম শব্দ, কিন্তু বেশি দায়। তিনি জানেন তাঁর কণ্ঠ ট্যাংক থামিয়ে দিতে পারবে না। তারপরও কণ্ঠটি কার পক্ষে থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত তাঁর।

ঠিক এখানে, গোধূলির গান-এর শহীদ কাদরী তাঁর নিজের কবিতাকেও রেহাই দেন না।

‘যদি মুখ খুলি’-তে প্রথমে মনে হয়, তিনি নিজের পুরোনো কাব্যিক অভ্যাসকেই সামনে দাঁড় করিয়েছেন—রাত্রির শরীর, কিন্নরকণ্ঠ নদী, সুন্দর উপমার ভাষা। তারপর নিজের মুখেই সেই ভাষার প্রতি সংশয়: এমন ‘কাব্যিক কথা’ এখন কে শুনবে? কবিতার ভেতরে ঢুকে পড়ে নদীর নাব্যতা, উত্তর বাংলার শীত, আমেরিকা-বেইজিং, ‘সুশীল সমাজ’।

এখানে ভাষা বদলের চেয়েও বড় ঘটনা ঘটছে। একজন কবি নিজের শিল্পের উপযোগিতা পরীক্ষা করছেন। বাস্তব যখন এত নগ্ন, তখন রূপকের প্রয়োজন কী? হত্যাকারীর সামনে কবিতা কী করবে? শহীদ কাদরী স্বীকার করেন, কবিতাকে তিনি গুপ্তঘাতকের বিরুদ্ধে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করতে চেয়েছেন। অথচ কবিতা যেন তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে খেলার মাঠের ছেলেদের কাছে চলে যায়, কিংবা নারীর চুলের অন্ধকারে আশ্রয় নেয়।

যে আত্মবিদ্রুপ এখানে আছে, তার ভেতরেই পরিণত কবির একটি বড় স্বীকারোক্তি লুকিয়ে আছে। কবিতা তাঁর, অথচ পুরোপুরি তাঁর কথামতো চলে না। তিনি তাকে রাজনৈতিক অস্ত্র করতে চান; কবিতা প্রেম, খেলা, সৌন্দর্য, শরীরের দিকে টানে।

এই ব্যর্থতা কবিতাকে ছোট করে না। বরং তার স্বাধীনতা বোঝায়। আর সম্ভবত এ কারণেই ‘আমাদের শেষ গানগুলো’-তে এসে শহীদ কাদরীর দাবি সামান্য বদলে যায়। কবিতা আর বন্দুকের বিকল্প নয়। গানকে দাঁড়াতে হবে মানবিক বন্ধনের পক্ষে, প্রেমের পক্ষে, সন্তানসম্ভবা নারীর পক্ষে, সমুদ্র-পর্বত এবং ঘাসের একটি শিখার পক্ষেও। অর্থাৎ কবিতা দিয়ে জেতার দাবি ক্রমে কবিতার পক্ষ নেওয়ার দায়ে এসে নেমেছে।

একে পরাজয় বলা ঠিক হবে না। বরং কবিতার ক্ষমতা সম্পর্কে অতিরঞ্জিত বিশ্বাস ঝরে পড়ার পরে যা থাকে এটা তা-ই।

শহীদ কাদরীর অন্তিম কবিবোধের একটি গভীর সৌন্দর্য এখানেই।

দীর্ঘ দেশান্তর শহীদ কাদরীর কবিতাকে বদলেছে। তাঁর জীবনের নিঃসঙ্গতা ও মানসিক পরিবর্তনের ইশারা আমাদের জানা আছে। কিন্তু গোধূলির গান-এ নির্বাসনকে শুধু দেশ থেকে দূরে থাকার অভিজ্ঞতা হিসেবে পড়লে তার বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।

‘অপেক্ষা করছি’ কবিতাটি এই সত্যটি খুব মানবিকভাবে উন্মোচিত করে ফেলে।

একজন প্রিয় মানুষ সকালবেলায় বাইরে গেছে। এখনও ফেরেনি। ফোন, এসএমএস, অপেক্ষা—ঘটনাটি এতই দৈনন্দিন যে প্রথমে কোনো বড় কবিতার উপাদান মনে হয় না। কিন্তু অল্প সময়েই কবির উৎকণ্ঠা ইতিহাসের অন্ধকারে ঢুকে যায়। নিজেকে তিনি দেখেন জরাগ্রস্ত, একটি ‘বিদেশি বারান্দায়’ বন্দী মানুষ হিসেবে; আর বিচ্ছেদের মধ্যেই অনুভব করেন মৃত্যুর স্বাদ। এই ভয় বয়সের। আবার ইতিহাসেরও।

যৌবনে কেউ দেরি করলে বিরক্তি হয়, উৎকণ্ঠা হয়, অভিমানও হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ জীবন মানুষকে আরেকটি শিক্ষা দেয়—বেরিয়ে যাওয়া সকল মানুষ ফিরে আসে না।

শহীদ কাদরীর ভয়টিকে আরও বাড়িয়ে দেয় তাঁর স্মৃতি। ব্যক্তিগত অপেক্ষার মধ্যে টুইন টাওয়ার, ইরাক, আফগানিস্তান, কলকাতার দাঙ্গা ঢুকে পড়ে। প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতি তখন শুধু দশ ঘণ্টার নয়; পৃথিবীতে মানুষ হারিয়ে যাওয়ার সমস্ত ইতিহাস যেন তার পেছনে এসে দাঁড়ায়।

এখানে শহীদ কাদরীর প্রেমও অন্য বয়সে পৌঁছেছে। অনুভূতি ক্ষীণ হয়নি। তার ভিতরে মৃত্যুজ্ঞান ঢুকে পড়েছে। এই প্রেম অধিকার চাওয়ার চেয়ে ফিরে আসা চায় বেশি। প্রিয়জনের উপস্থিতি তাই আর স্বাভাবিক অধিকার নয়—প্রতিদিন নতুন করে পাওয়া নিরাপত্তা।

এখানেই শহীদ কাদরীর ‘জানি না’, ‘উত্তর নেই’ এবং ‘সম্ভবত’ এসে একত্র হয়। জীবনের শেষে তিনি উত্তর নিয়ে দাঁড়ান না। দাঁড়ান সাক্ষ্য নিয়ে।

দেশান্তরের গভীর অর্থও হয়তো এখানেই। বিদেশি বারান্দা তাঁর ঠিকানা হতে পারে; তাঁর প্রকৃত নির্বাসন স্মৃতির মধ্যে। বহু শহর তাঁকে ছেড়ে গেছে, অথচ তাঁর ভেতর থেকে যায়। কলকাতা দাঙ্গার স্মৃতি হয়ে, বাংলাদেশ একাত্তর হয়ে, নিউইয়র্ক টুইন টাওয়ার হয়ে, হিরোশিমা-নাগাসাকি ধ্বংসের নাম হয়ে, আউসউইৎজ ও ত্রেবলিংকা মানুষের অমানুষ হয়ে ওঠার সাক্ষ্য হয়ে।

প্রথম জীবনের নগরকবি তাই শেষ জীবনে নগর থেকে সরে যাননি। বরং নগর তাঁর মধ্যে আরও বিপজ্জনকভাবে প্রবেশ করেছে। আগে শহর ছিল বাসের জায়গা। শেষে শহর হয়ে ওঠে স্মরণের জায়গা। এবং সেই স্মৃতি কোনো কোমল নস্টালজিয়া নয়।

কেননা স্মৃতির শব্দ আছে।

ফলে গোধূলির গান পড়তে পড়তে এই শব্দের দিকে কান দিলে বইটির আরেকটি গোপন বিন্যাস খুলে যায়।

প্রথম কবিতাতেই আছে ধ্বনির প্রশ্ন এবং ‘বিপন্ন সংগীত’। পরে ঝরা পাতার আর্তনাদ, শোকার্ত চিৎকার, ফোনের প্রতীক্ষিত শব্দ, গীতবিতানের গান—তার সঙ্গে সাব-মেশিনগান, সাইরেন, গুলি, কুচকাওয়াজ, রাজনৈতিক উল্লাস। ‘আমি প্রার্থনা করেছি তোমার কণ্ঠস্বরের উত্থান’-এ কবি এই ভাঙনের শব্দ থেকে নিস্তার চান; আশ্রয় খোঁজেন প্রিয়তমার কণ্ঠে, রাগসংগীতে।

এ যেন পুরো বইজুড়ে দুই ধরনের শব্দ পাশাপাশি চলছে। এক ধরনের শব্দ মানুষকে বিক্ষত করে। আরেক ধরনের শব্দ মানুষকে বাঁচতে সাহায্য করে। এই বিন্যাসটি প্রথমে খুব সুন্দর একটি সমীকরণ তৈরি করতে পারত—হত্যার শব্দের বিরুদ্ধে সংগীত। কিন্তু শহীদ কাদরী নিজেই সমীকরণটি ভেঙে দেন।

আইখম্যানও পিয়ানো বাজাত।

যে মানুষ অন্য মানুষকে গ্যাস চেম্বারে পাঠানোর কাজে যুক্ত ছিল, সে-ও বাড়ি ফিরে সংগীতের কাছে বসতে পারত। এই একটি স্মৃতি সৌন্দর্যের ওপর শহীদ কাদরীর শেষ বয়সের গভীর সন্দেহ প্রকাশ করে। সংগীত মানুষকে ভালো করে—এমন সহজ সিদ্ধান্ত আর নেওয়া যায় না। কবিতা ভালোবাসে যে মানুষ, সে-ও নিষ্ঠুর হতে পারে। সৌন্দর্য উপভোগের ক্ষমতা নৈতিকতার নিশ্চয়তা নয়।

এই উপলব্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শহীদ কাদরী নিজেও তো কবি—সৌন্দর্যের কারবারি। আইখম্যানের পিয়ানো মনে করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি যেন নিজের শিল্পকেও প্রশ্নের বাইরে থাকতে দেন না।

তাহলে কবিতা কেন? প্রেম কেন? সংগীত কেন? তারা যদি মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নীতিনিষ্ঠ না করে, তাদের প্রয়োজন কোথায়?

শহীদ কাদরী কোনো তাত্ত্বিক উত্তর দেন না। কবিতার ভিতরেই তার একটি মানবিক উত্তর তৈরি হয়। প্রিয়তমার চুল কিংবা সংগীতের কাছে তিনি ইতিহাস ভুলে থাকতে চান না। বরং এত ভাঙনের শব্দ বহন করার জন্য সামান্য আশ্রয় চান।

প্রেম তাই তাঁর কাছে বিস্মৃতির ঘর নয়। স্মৃতি সহ্য করার ঘর। এই পার্থক্যটি গোধূলির গান-এর প্রেমকে গভীর করে।

স্মৃতি সবচেয়ে কঠিন জায়গায় নিয়ে যায় ‘বিশ্বাস-অবিশ্বাসের গল্প’-এ।

একটি মৃত শালিক পড়ে আছে। তার চোখের মণি খুঁটে খাচ্ছে লাল পিঁপড়ে। চারপাশে পৃথিবী ঠিক আগের মতো—আকাশ নীল, গাছের পাতায় কোনো বেদনা নেই। এই দৃশ্যের পর কবির মনে হয়, তাঁর বিশ্বাসগুলোকেও যেন ওই পিঁপড়েরা খেয়ে ফেলেছিল। এখানে বিশ্বাসহানির কারণ মৃত্যু নয় শুধু। মৃত্যুর প্রতি পৃথিবীর বিকারহীনতা।

মানুষের গভীরে হয়তো একটি শিশুসুলভ প্রত্যাশা থেকেই যায়—কোনো প্রাণ যন্ত্রণায় মরলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোথাও সামান্য অন্ধকার নামবে। কিন্তু পাখি মারা যায়, আকাশ নীলই থাকে।

শহীদ কাদরী। সংগৃহীত ছবি
শহীদ কাদরী। সংগৃহীত ছবি

প্রকৃতি নিষ্ঠুর নয়। নিষ্ঠুরতা মানুষের সৃষ্ট শব্দ। প্রকৃতি কেবল নিজের নিয়মে চলে। এই নির্বিকারতাই কবির বিশ্বাসের ওপর বেশি আঘাত করে। তবে শহীদ কাদরীর পরিণত কবিসত্তা শুধু পৃথিবীর দিকে অভিযোগ তুলে থেমে থাকে না। বইয়ের শেষের দিকে ‘হত্যার স্মৃতি’-তে এসে তাঁর চোখ নিজের অতীতেও ফিরে যায়। ফড়িংয়ের ডানা ছেঁড়া, এয়ারগানে কাক মারা, পিঁপড়ে পিষে ফেলা—নিজের শৈশবের নিষ্ঠুরতার স্মৃতি তিনি আর আড়াল করেন না।

রাষ্ট্রীয় গণহত্যার সঙ্গে শিশুর প্রাণীহত্যার মাত্রাগত ও নৈতিক ব্যবধান অবশ্যই বিপুল। কবিও তাদের সমান করেন না। কিন্তু একটি অস্বস্তিকর দরজা খুলে দেন: হন্তারককে শুধু বাইরের মানুষ বানিয়ে রাখলে নিজের নিষ্পাপতার গল্প বলা সহজ হয়।

শহীদ কাদরী এখানে, গোধূলির গান-এ শেষ বয়সের সেই আরামটি নিজের জন্য আর রাখেন না। তিনি বরং জেনারেলের দিকে তাকান। আইখম্যানের দিকে তাকান। তারপর নিজের শিশুহাতের দিকেও। এই তাকানোই তাঁর মানবতাবাদকে আলাদা করে। তিনি মানুষের পক্ষে দাঁড়ান মানুষের মহত্ত্বে মোহিত হয়ে নয়। বরং মানুষ কতখানি ভয়াবহ হতে পারে—নিজেকেসহ—তার কিছুটা জেনেও।

‘মানুষ, নতুন শতকে’-তে মানুষের হাতে আবার ছুরি; হত্যা, পিষ্ট নারী, নিহত শিশু। ‘কোথাও কেউ নেই’-এ প্রণাম করার মতো নায়ক খুঁজে পাওয়া যায় না; ইতিহাস জুড়ে হিরোশিমা, আউসউইৎজ, নাগাসাকি, একাত্তর, ত্রেবলিংকা।

তারপরও শহীদ কাদরী মানুষের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন না। সম্ভবত এখানেই তাঁর শেষ মানবিক অবস্থান সবচেয়ে স্পষ্ট: মানুষ নির্দোষ নয়, তবু পরিত্যাজ্যও নয়। কারণ হত্যার স্মৃতি যে মানুষকে পীড়া দেয়, সেই অনুতাপও মানুষের। যে হাত কাক মেরেছিল, বহু বছর পরে সেই হাতই স্মৃতিটি লিখতে পারে।

বর্বরতা ও বিবেক—দুটিই একই প্রজাতির ভেতরে। শহীদ কাদরীর কবিতা শেষ পর্যন্ত এই অসুবিধাজনক মানুষটির কাছেই থেকে যায়।

ফলে এখানে ‘জেনারেল, তোমাকে’-র ঘাস আরও তাৎপর্যপূর্ণ। জেনারেলের ট্যাংকের বিপরীতে শহীদ কাদরী আরেকটি ট্যাংক আনেন না। আনেন ঘাস। ট্যাংকের সামনে ঘাস হাস্যকর রকম দুর্বল। এক মুহূর্তে পিষে ফেলা যায়। কিন্তু কবি শক্তির সংজ্ঞা বদলে দেন। ট্যাংকের শক্তি ধ্বংসের; ঘাসের শক্তি ফিরে আসার। হিরোশিমার পরে ফুল ফোটে, নাগাসাকির নদীতে আবার নবদম্পতি নৌকায় ওঠে, ধ্বংসের মাটিতে সবুজ ফিরে আসে।

এখানে কোনো অলৌকিক ন্যায়বিচার ঘটে না। ট্যাংক তার হত্যার দায়ে নিজে থেকে ভেঙে পড়ে না। মৃতেরাও ফিরে আসে না।

ফিরে আসে জীবন। ধীরে। এবং প্রায় নির্বিকারভাবেই। এই ধীরতা শহীদ কাদরীর চোখে এক ধরনের শক্তি। কারণ ক্ষমতার সময় ছোট—যত ভয়ংকরই হোক। জীবনের সময় দীর্ঘ। কিন্তু এখানেও তাঁর কবিতা সহজ আশ্বাসে থামে না। ঘাস বধ্যভূমি ঢেকেও দেয়। নতুন জীবন যখন ফিরে আসে, তখন পুরোনো হত্যার চিহ্ন হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ঘাসের পাশে স্মৃতি প্রয়োজন। কেবল মৃতের দিকে তাকিয়ে থাকলে জীবন থেমে যাবে; কেবল নতুন সবুজ দেখলে মৃতেরা মুছে যাবে। শহীদ কাদরীর কবিতা এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়াতে চায়।

বেঁচে থাকা, কিন্তু ভুলে না-যাওয়া। সম্ভবত তাঁর দেশ, ইতিহাস ও নির্বাসনের সঙ্গে সম্পর্কটিও শেষ পর্যন্ত এমনই।

‘উত্তর নেই’-এ এসে সংশয়টি আর ব্যক্তিগত থাকে না। মানুষ কেন হত্যা করে? রাষ্ট্রনায়ক কেন হত্যাযজ্ঞে নামে? সাম্রাজ্য কেন অন্যের ভূমি গ্রাস করে? শিশু কেন ফড়িংয়ের ডানা ছেঁড়ে? উত্তর জানে না গাছ, মাছ, রবীন্দ্রনাথ, এমনকি ইতিহাসও নয়। একজন তরুণ কবি হয়তো এমন প্রশ্নের উত্তরে কোনো মতবাদ, ক্রোধ কিংবা ঘোষণা বেছে নিতে পারতেন। দীর্ঘ জীবন পার করে আসা শহীদ কাদরী আর সেই সহজতায় যেতে পারেন না।

এটিকে কেউ পরাজয় বলতে পারেন, আসলে তা নয়। বরং উত্তর বানিয়ে নেওয়ার লোভ থেকে সরে এসে তিনি জয়-পরাজয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকেন।

প্রথম কবিতার ‘জানি না’ তাই এখানে আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। বহু বছরের অভিজ্ঞতা তাঁকে শেষ পর্যন্ত এমন এক জায়গায় আনে, যেখানে তিনি কিছু প্রশ্নকে প্রশ্ন হিসেবেই রাখতে রাজি।

এই পরিণতি তাঁর কবিতাকে জ্ঞানদাতার কণ্ঠ থেকে রক্ষা করে। শহীদ কাদরী শেষ পর্যন্ত গুরু হন না। কবিই থেকে যান। আর কবির হয়তো সব উত্তরের প্রয়োজনও নেই; কখনো প্রশ্নটিকে এমনভাবে ধরে রাখাই তাঁর কাজ, যাতে আমরা আর সহজ উত্তরে সন্তুষ্ট হতে না পারি। এখানেই গোধূলির গান-এর ‘জানি না’ এবং ‘উত্তর নেই’-এর পরে একটি তৃতীয় শব্দের প্রয়োজন হয়—‘সম্ভবত’।

কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগে প্রেমের আরেকটি ছোট দৃশ্য মনে রাখা দরকার।

‘প্রতিশ্রুতিগুলো’-তে মানুষের শপথে আস্থা নেই। বড় বড় কথায় প্রিয় মানুষকে বোঝানো যাচ্ছে না। কবি শেষে একটি গোলাপ এগিয়ে দেন। গোলাপ অমর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় না; তার যতটুকু আয়ু, ততটুকুই সৌরভ ছড়াবে, তারপর শুকিয়ে যাবে।

এই ছোট কবিতাটি শহীদ কাদরীর শেষ বয়সের প্রেমবোধ সম্পর্কে বড় কথা বলে। যৌবনের প্রেম সহজেই ‘চিরদিন’ বলতে পারে। বার্ধক্য জানে, চিরদিন শব্দটি মানুষের মুখে কতবার মিথ্যা হয়েছে। তাই বৃদ্ধ কবির প্রেমে মহৎ শপথ কমে আসে, উপস্থিতির মূল্য বাড়ে। গোলাপ বিশ্বাসযোগ্য ঠিক এই কারণে যে সে নিজের মৃত্যুকে লুকোয় না। শহীদ কাদরীর অন্তিম কোমলতা এইখানে—নশ্বরতা প্রেমকে অর্থহীন করে না; বরং আরও মূল্যবান করে।

অপেক্ষা করছি-র প্রিয়জন ফিরে আসবে কি না সেই আতঙ্ক, প্রতিশ্রুতিগুলো-র অল্পায়ু গোলাপ, এবং শেষের ‘মৃত্যু’ কবিতা—তিনটিকে পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, তাঁর শেষ প্রেমকবিতার কেন্দ্র আর প্রেমের জয় নয়। উপস্থিতির ক্ষণস্থায়িত্ব। আর এই জ্ঞান মানুষকে কখনো কখনো আরও নম্র করে।

এই নম্রতা লক্ষণীয়। কেননা শহীদ কাদরীর অন্তিম কাব্যভাষাতেও এই নম্রতার সঙ্গে এক আশ্চর্য স্বাধীনতা মিশে আছে। তিনি আর ‘কবিতার ভাষা’কে আলাদা কোনো পবিত্র অঞ্চল হিসেবে রক্ষা করেন না। ‘দ্যুলোক-ভূলোক’-এর পাশে ‘এসএমএস’, ইমন কল্যাণের পাশে সাব-মেশিনগান, দেবদারুর পাশে টুইন টাওয়ার, রবীন্দ্রনাথের পাশে আইখম্যান—সবই একই কাব্যিক জগতে প্রবেশ করে। ‘জগদ্বিখ্যাত পুষ্প’-এর পরেই কথ্য ভঙ্গিতে বলা যায়—‘এসব কথায় চিড়ে ভিজবে না’; যুদ্ধের প্রসঙ্গে ‘বাঘ-টাঘ’ কিংবা ‘অ্যাঁ?’-ও অস্বস্তি তৈরি করে না।

এই ভাষা জীবনের মতোই বিশৃঙ্খল। এবং সেই কারণেই সত্য।

যে পৃথিবীতে সকালে প্রেমিক এসএমএস পাঠায়, দুপুরে যুদ্ধের সংবাদ দেখে, সন্ধ্যায় রবীন্দ্রসংগীত শোনে, রাতেই গণহত্যার ইতিহাস পড়ে—তার কবিতার অভিধান কেন একরঙা হবে?

যেমন এখানে প্রেম আছে, কিন্তু তার সঙ্গে আছে অনুপস্থিতির ভয়। শহর আছে, কিন্তু শহর আর তখন নাগরিক অভিজ্ঞতার মঞ্চ নয়; হত্যার স্মৃতিও বহন করে। প্রতিবাদ আছে, কিন্তু নিজের কবিতার কার্যকারিতা নিয়েও সন্দেহ আছে। প্রকৃতি আছে, অথচ সে আর মানুষের বেদনার জন্য সাজানো কোনো সান্ত্বনাময় পটভূমি নয়।

শহীদ কাদরী প্রথম থেকেই নাগরিক অভিজ্ঞতার কবি ছিলেন; শেষ বয়সে এসে তাঁর ভাষা সেই নাগরিকতার আরও বিস্তৃত পরিণতি লাভ করেছে। পৃথিবীকে ‘কাব্যিক’ করে তোলার বদলে তিনি পৃথিবীর অকাব্যিক উপাদানকেও কবিতার মধ্যে নিতে আরও নির্ভীক হয়েছেন।

এই স্বাধীনতাই তাঁর অন্তিম ভাষাকে বৃদ্ধ হতে দেয়নি।

তবু গোধূলির গান-এর প্রতি আবেগ থেকে একটি ভুল করা ঠিক হবে না—সব কবিতা সমান সিদ্ধ নয়। কোথাও কোথাও বক্তব্য খুব সরাসরি সামনে আসে; হত্যার বিরুদ্ধে ঘোষণামূলক আহ্বান কবিতার ভেতরের জটিলতাকে কিছুটা কমিয়ে দেয়। শহীদ কাদরীর শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত তৈরি হয় অন্য জায়গায়—যেখানে তিনি সিদ্ধান্ত আগে বলেন না, একটি দৃশ্যের কাছে অপেক্ষা করেন।

মৃত শালিকের চোখ। বিদেশি বারান্দায় অপেক্ষারত বৃদ্ধ। আইখম্যানের পিয়ানো। ট্যাংকের পরে ঘাস। শৈশবের ফড়িং। একটি স্বল্পায়ু গোলাপ। শেষের গায়ক পাখি। এই দৃশ্যগুলোতে শহীদ কাদরী বড় কথা বলেন না; বড় কথাটিকে ঘটতে দেন।

এ কারণেই তারা মনে থেকে যায়। হত্যা নিষ্ঠুর—এই সত্য জানা। কিন্তু নিজের শৈশবের নিহত কাক মনে পড়লে সত্যটির মধ্যে নিজেরও একটি অস্বস্তিকর জায়গা তৈরি হয়। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী—এটিও জানা। কিন্তু ট্যাংক চলে যাওয়ার পর ঘাস ফিরে এলে ক্ষমতা ও সময়কে হঠাৎ নতুনভাবে দেখা যায়।

আমরা সবাই মরব—এর চেয়ে পুরোনো সত্য নেই।

কিন্তু শহীদ কাদরী যখন সেই মৃত্যুকে মানুষের মাংসের গভীরে থাকা একটি গায়ক পাখির উড়ে যাওয়া হিসেবে দেখেন, জানা সত্যটি আবার অজানা হয়ে ওঠে।

বড় কবির প্রয়োজন সম্ভবত এখানেই। তিনি সবসময় নতুন সত্য আবিষ্কার করেন না; কখনো পুরোনো সত্যের এমন একটি মুখ দেখান, যা আমরা আগে দেখিনি।

আগে যা দেখিনি, এখান থেকেই শহীদ কাদরীর সমগ্র কবিজীবনের সঙ্গে গোধূলির গান-এর সম্পর্কটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়।

প্রথম উত্তরাধিকার-এর কবি শুরুতেই পরিণত ছিলেন—এই কথা তাঁর সমকালীন পাঠেও এসেছে। কিন্তু পরিণত হয়ে শুরু করা আর অপরিবর্তিত থাকা এক কথা নয়। শহীদ কাদরীর বড় অর্জন হলো—নিজের তৈরি কণ্ঠের বন্দি হয়ে পড়েন না। যে ব্যঙ্গ শুরুতে ছিল, শেষেও আছে; তবে তা এখন নিজের দিকেও ফেরে। যে প্রেম ছিল, তা আছে; কিন্তু তাতে দখলের চেয়ে হারানোর ভয় বেশি। নগর আছে; তবে নগরের আকর্ষণের সঙ্গে ইতিহাসের ক্ষত এসে জুড়ে যায়। প্রতিবাদ আছে; কিন্তু কবিতার ক্ষমতা সম্পর্কে আর সরল দাবি নেই। প্রকৃতি আছে; কিন্তু মানুষের অনুভূতিকে প্রতিফলিত করার জন্য নয়—নিজস্ব, দীর্ঘ, প্রায় নির্বিকার সময় নিয়ে। স্মৃতি আছে; তবে শুধু হারানো সুখ নয়—নিজের নিষ্ঠুরতারও সাক্ষ্য।

এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে বয়স কাজ করে, কিন্তু বয়স একা নয়। দেশান্তর, ইতিহাস, দীর্ঘ নৈঃশব্দ্য, মৃত্যু সম্পর্কে বাড়তে থাকা সচেতনতা—সব মিলে যায়। ফলে গোধূলির গান কোনো পুরোনো কবির নিজস্ব ভঙ্গির পুনরাবৃত্তি নয়। বরং নিজেরই কবিসত্তা থেকে অপ্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা ঝরিয়ে ফেলার বই। শহীদ কাদরী শেষ পর্যন্ত নিজের কবিত্বের ওপরও আধিপত্য দেখান না। কবিতাকে প্রশ্ন করেন। নিজেকে প্রশ্ন করেন। মানুষকে প্রশ্ন করেন। তারপর উত্তর না-পেলে প্রশ্নটিকে নষ্ট করেন না। এই স্বাধীনতাই তাঁর অন্তিম স্বরের সবচেয়ে বড় পরিণতি।

১০

এবং শেষ পর্যন্ত সব পথ এসে মেশে পাখিটির কাছে।

গোধূলির গান-এ পাখি বারবার ফিরে আসে—কখনো অচেনা বার্তাবাহক, কখনো মৃত শালিক, কখনো শিকার; কবির নিজের স্মৃতিতেও আছে নিহত কাক। বইজুড়ে পাখি যেন বারবার মানুষের হিংসার নাগালে পড়ে। তারপর শেষ কবিতা—‘মৃত্যু’।

এত বধ্যভূমি, যুদ্ধ, ট্যাংক, আর্তনাদ, হত্যা, অনিশ্চয়তার পরে শহীদ কাদরী নিজের মৃত্যু নিয়ে বিস্ময়করভাবে অল্প কথা বলেন। মানুষের মাংসের গভীরে বাস করে একটি ‘গায়ক পক্ষী’; একদিন সে উড়ে যায়—‘সম্ভবত’ অন্য কোনো সতেজ বৃক্ষের ডালে। তখন মানুষের মৃত্যু হয়।

এখানে পুরো কাব্যগ্রন্থ যেন হঠাৎ অন্যভাবে দেখা যায়। শুরুতে সংগীত বাইরে—বিপন্ন, হন্তারকের পায়ের নিচে মাড়িয়ে যাওয়ার মতো।

শেষে গান শরীরের ভেতরে। মানুষের মাংসের গভীরে। এই স্থানান্তরটি শহীদ কাদরীর শেষ কবিত্বের সবচেয়ে সুন্দর আবিষ্কারগুলোর একটি। কবিতা সভ্যতাকে রক্ষা করবে কি না তিনি জানেন না। মানুষ শেষ পর্যন্ত ভালো হবে কি না—উত্তর নেই। সৌন্দর্য মানুষকে নীতিনিষ্ঠ করবে—আইখম্যানের পিয়ানো সেই বিশ্বাসও ভেঙে দেয। মৃত্যুর পর কী আছে, সে সম্পর্কেও কোনো ঘোষিত বিশ্বাসে তিনি ফিরে যান না।

শুধু বলেন—‘সম্ভবত’।

শব্দটিতে দ্বিধা আছে, কিন্তু দরজাও আছে। অবিশ্বাস তাকে পুরো বন্ধ করেনি। বিশ্বাস তাকে অন্ধও করেনি। এই সামান্য খোলা জায়গাতেই গায়ক পাখিটি উড়ে যায়।

১১

প্রথম কাব্যের নাম উত্তরাধিকার

শেষ কাব্যের গোধূলির গান

এই দুটি নাম পাশাপাশি রাখলে একটি সুন্দর প্রশ্ন জাগে। তরুণ কবি কী পেয়েছিলেন—তার উত্তরাধিকার নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন; বৃদ্ধ কবি শেষে কী রেখে গেলেন? কোনো চূড়ান্ত দর্শন নয়। মানুষ সম্পর্কে নিরাপদ বিশ্বাস নয়। ইতিহাসের ব্যাখ্যাও নয়। এমনকি কবিতার সর্বশক্তিমান ক্ষমতার দাবিও নয়। রেখে গেলেন কিছু দৃশ্য, যেগুলো থেকে সহজে মুক্ত হওয়া যায় না। একটি মৃত পাখির চোখ। একটি বিদেশি বারান্দা। এক হত্যাকারীর পিয়ানো। একটি ট্যাংকের পরে ফিরে আসা ঘাস। নিজের শৈশবের রক্তহীন অথচ নিষ্ঠুর স্মৃতি। একটি গোলাপ। এবং মানুষের মাংসের গভীরে গান করা একটি পাখি।

সম্ভবত এই উত্তরাধিকার আগের যেকোনো ঘোষণার চেয়ে গভীর। কারণ শেষ বয়সে শহীদ কাদরী মানুষের মহত্ত্বে নয়, মানুষের ভঙ্গুরতায় বেশি মনোযোগী হন।

মানুষের পক্ষে তিনি দাঁড়ান মানুষ মহান বলে নয়; মানুষ আহত হয়, ভুল করে, হত্যা করে, অনুতপ্ত হয়, ভালোবাসে, অপেক্ষা করে এবং মরে—এই সম্পূর্ণ অসম্পূর্ণতার জন্য। এখানেই গোধূলির গান তাঁর কবিজীবনের একটি গভীর সমাপ্তি। এবং এখানেই তাঁর কবিস্বভাবের স্থায়ী পরিচয়ও।

তিনি কখনো পৃথিবীর সঙ্গে সহজ সম্পর্ক রাখতে পারেননি। ভালোবাসার মধ্যেও তাঁর সংশয়, প্রতিবাদের মধ্যেও ব্যঙ্গ, সৌন্দর্যের পাশে বিপর্যয়, আশ্রয়ের ভিতরেও ইতিহাসের শব্দ। শেষ বয়সে এসে এই দ্বৈততা আরও স্বচ্ছ হয়েছে; শুধু তার স্বর নিচু হয়েছে। হয়তো এই কারণেই তাঁর গোধূলি অস্তরাগ নয়। অস্তরাগে আমরা শেষ আলোর সৌন্দর্য দেখি। শহীদ কাদরী শেষ আলোয় বরং জিনিসগুলোকে যেন আরও পরিষ্কার দেখতে চান। তিনি তাকান মৃত পাখির দিকে। হত্যাকারীর দিকে। নিজের শিশুহাতের দিকে। প্রিয় মানুষের ফেরার পথের দিকে। ঘাসের দিকে। মৃত্যুর দিকে। কোনোটির কাছেই সহজ উত্তর পান না। তবু তাকানো বন্ধও করেন না।

সম্ভবত এই মনোযোগই শেষ পর্যন্ত তাঁর কবিতার সবচেয়ে মানবিক নৈতিকতা। পৃথিবী সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েও পৃথিবীর দিকে মনোযোগী থাকা। মানুষ সম্পর্কে বিশ্বাস হারিয়েও মানুষের দিক থেকে মুখ না ফেরানো। কবিতার ক্ষমতার সীমা জেনেও কবিতা না-ছাড়া। মৃত্যুর পরে কী আছে না-জেনেও অজানার জন্য সামান্য একটি জায়গা রেখে দেওয়া।

এখানেই শহীদ কাদরীর ‘জানি না’, ‘উত্তর নেই’ এবং ‘সম্ভবত’ এসে একত্র হয়। জীবনের শেষে তিনি উত্তর নিয়ে দাঁড়ান না। দাঁড়ান সাক্ষ্য নিয়ে। তিনি দেখেন—এটুকু বলেন মাত্র। স্মরণ করেন। নিজের দায়ও বাদ দেন না। আর অন্ধকার যত কাছে আসে, নিজের কণ্ঠটিকে তত কম অলংকারে, আরও উন্মুক্ত করে রেখে যান।

শেষ পর্যন্ত তাই গোধূলির গান মৃত্যুর দিকে যাওয়া একজন কবির বই হয়েও মৃত্যুর বই হয়ে থাকে না। এর গভীরতম ছবিটি মৃত্যু নয়। উড়ে যাওয়া। একটি গায়ক পক্ষী মাংসের গভীর থেকে উঠে যায় কোথাও—কবি জানেন না কোথায়। শুধু অনুমান করেন, হয়তো আরেকটি ‘সতেজ বৃক্ষের দিকে’।

এই ‘হয়তো’-টুকুই শহীদ কাদরীর গোধূলিতে অবশিষ্ট আলো। তার বেশি তিনি দাবি করেন না। তার কমে থামেনও না।

  • সৈকত আরেফিন: প্রাবন্ধিক ও গবেষক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত