ফাবিহা বিনতে হক
-537618-720x405.webp)
বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যেটে এমন এক নাম, যাকে শুধু কবি বা নাট্যকার বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কঠিন। আজ তাঁর ২৭৭তম জন্মদিন। তিনি ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানমনস্ক গবেষক, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা এবং শিল্প-সংস্কৃতির গভীর পর্যবেক্ষক। কিন্তু এত পরিচয়ের মধ্যেও গ্যেটের সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক পরিচয় সম্ভবত ‘ফাউস্ট’ এর স্রষ্টা হিসেবে।
ফাউস্ট ইউরোপীয় লোকগাথার এক কিংবদন্তি চরিত্র। বলা হয়, জ্ঞান ও ক্ষমতার লোভে শয়তানের কাছে নিজের আত্মা বিক্রি করেছিলেন তিনি। এই কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে বিখ্যাত জার্মান সাহিত্যিক ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যেটে তাঁর দুই পর্বের ট্র্যাজেডি ‘ফাউস্ট’ রচনা করেন। প্রায় ছয় দশক ধরে তিনি ফাউস্ট নিয়ে কাজ করেছেন। ফলে ফাউস্ট রচনার এই দীর্ঘ যাত্রায় ‘ফাউস্ট’ চরিত্র সম্পর্কে যেমন গ্যেটের নিজস্ব ধারণা পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি তিনি কীভাবে মানুষ ও জীবনকে দেখতেন, সেটাও বোঝা যায়। গ্যেটের লেখা ‘ফাউস্ট’ নিয়ে লেখার আগে আমাদের জানা দরকার ‘ফাউস্ট’ কে ছিলেন।
ইয়োহান ফাউস্ট সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয়, তাঁর জন্মস্থান ও জন্মসাল নিয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। সম্ভাব্য জন্মস্থান হিসেবে জার্মানির হেলমস্টেডট ও কিন্টলিঙ্গেনের নাম পাওয়া যায় এবং তিনি পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে বা ষোড়শ শতকের শুরুর দিকে জন্মেছিলেন বলে মনে করা হয়।তিনি নিজেকে কখনো জাদুবিদ্যার বিশেষজ্ঞ, কখনো জ্যোতিষী, আবার কখনো চিকিৎসক বা ভবিষ্যৎ গণনাকারী হিসেবে পরিচয় দিতেন। নানা ধরনের অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলে নিজের চারপাশে এক ধরনের রহস্য তৈরি করে রাখতেন।
মনে করা হয়, ফাউস্টের নামের উল্লেখ পাওয়া যায় ১৫০৭ সালে। বেনেডিক্টাইন পণ্ডিত জোহানেস ট্রিথেমিয়ুস এক চিঠিতে তাঁর কথা লিখেছিলেন। তবে সেখানে ফাউস্টের কোনো প্রশংসা ছিল না। বরং ট্রিথেমিয়ুস তাঁকে এমন একজন মানুষ হিসেবে দেখেছিলেন, যিনি ভবঘুরে ও প্রতারক ছিলেন এবং নিজের কথিত অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতেন। ফাউস্টের জীবদ্দশায় তিনি খুব সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি মার্টিন লুথার ও ফিলিপ মেলানখথনের মতো ধর্মসংস্কার আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও তাঁর কথা জানতেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
এর একটা কারণ ছিল, ফাউস্ট নিজেকে আলাদা মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে পারতেন। তিনি এমন সব কাজের দাবি করতেন, যেগুলোর সত্যতা যাচাই করা তখন সহজ ছিল না। ফলে তাঁকে নিয়ে মানুষের কৌতূহলও তৈরি হয়েছিল, ভয়ও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ফাউস্টকে নিয়ে প্রচলিত গল্পের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটে তাঁর মৃত্যুর পরে।
ধারণা করা হয়, ১৫৪০–৪১ সালের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুও রহস্যে ঘেরা ছিল। আর এই রহস্যের মধ্যে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে মানুষের কল্পনা। জাদুবিদ্যা, ভবিষ্যৎ গণনা, অলৌকিক ক্ষমতার দাবি—মৃত্যুর পর সেগুলোর সঙ্গে আরও ভয়ংকর গল্প যোগ হতে থাকে। মুখে মুখে প্রচার পেতে থাকে, ফাউস্টের সঙ্গে শয়তানের চুক্তি হয়েছিল এবং তাঁর কথিত অলৌকিক ক্ষমতার সঙ্গে শয়তানের সম্পর্ক ছিল।
‘ফাউস্ট’-এর মাধ্যমেই যে ইউরোপে শয়তানের গল্প জনপ্রিয়তা পায় এমন না। ইউরোপের খ্রিস্টীয় সংস্কৃতিতে শয়তান, পাপ ও প্রলোভনের গল্প তাঁর বহু আগে থেকেই ছিল। যেমন বাইবেলের Acts গ্রন্থে সাইমন ম্যাগাসের গল্প আছে। আবার সাইপ্রিয়ান অব অ্যান্টিওক, থিওফিলাস অব আদানা এবং পোপ সিলভেস্টার দ্বিতীয়কে ঘিরেও এমন গল্প পাওয়া যায়, যেখানে মানুষ অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রলোভনে পড়ে। মধ্যযুগীয় সাহিত্যেও মার্লিনের মতো জাদুকর চরিত্রের পাশাপাশি ক্লিংসর-এর মতো চরিত্র পাওয়া যায়। তবে ফাউস্টের গল্পে একটি নতুন বিষয় যোগ হয়। ষোড়শ শতকে জার্মানির পরিবর্তনের সময়ে ফাউস্ট হয়ে ওঠেন এমন একজন মানুষের প্রতীক, যে অসীম জ্ঞান ও ক্ষমতা পেতে চায়। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষার পথেই সে শেষ পর্যন্ত নিজের আত্মা হারায়।

১৫৮৭ সালে ফাউস্টের জীবন নিয়ে Historia von D. Johann Fausten নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। সেখানে তাঁর জীবনের সঙ্গে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা, জাদু এবং শয়তানের সঙ্গে সম্পর্কের গল্প যোগ করা হয়। এই বইয়ের মাধ্যমে ফাউস্টের গল্প আরও অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। বইটি প্রকাশের মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে জার্মান ভাষায় ১৬ বার পুনর্মুদ্রিত হয়। পাশাপাশি ড্যানিশ, ইংরেজি, ডাচ, ফরাসি ও চেক ভাষায়ও এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ ফাউস্টের গল্প ধীরে ধীরে ধর্মীয় সতর্কবার্তা থেকে জনপ্রিয় সাহিত্যের গল্পেও পরিণত হতে থাকে।
এরপর ফাউস্টের গল্পে বড় পরিবর্তন আনেন ইংরেজ নাট্যকার ক্রিস্টোফার মার্লো। ষোড়শ শতকের শেষ দিকে তিনি ‘দ্য ট্র্যাজিক্যাল হিস্ট্রি অব দ্য লাইফ অ্যান্ড ডেথ অব ডক্টর ফস্টাস’ রচনা করেন। নাটকটির সঠিক রচনাকাল নিয়ে মতভেদ আছে; সাধারণত ১৫৮৮ থেকে ১৫৯২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এটি লেখা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। মার্লোর বড় পরিবর্তন ছিল—তিনি ফাউস্টকে শুধু প্রতারক বা পাপী হিসেবে দেখাননি। বরং মার্লোর ফাউস্ট একজন সাহসী, বিদ্রোহী ও জ্ঞানপিপাসু মানুষ। তার ভেতরে একদিকে শয়তানের প্রলোভন, অন্যদিকে অনুশোচনা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, এই দুইয়ের লড়াই চলে। পরে ইংরেজ অভিনেতারা মার্লোর নাটক জার্মানিতে নিয়ে যান।
কিন্তু সেখানে গল্পটির গম্ভীর চরিত্র ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। নাটকটি হাস্যরসাত্মক প্রদর্শনীতে পরিণত হয় যা পরে রূপ নেয় পুতুলনাট্যে। ফাউস্টের কাহিনির সঙ্গে গ্যেটের পরিচয় হয় ছোটবেলাতেই; তিনি ফাউস্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি পুতুলনাট্য দেখেছিলেন বলে জানা যায়।
গ্যেটে ‘ফাউস্ট’ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন তরুণ বয়সে। প্রায় ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এর বিভিন্ন অংশ লিখেছেন, বদলেছেন, আবার লিখেছেন। ১৭৯০ সালে ‘ফাউস্ট’ প্রথমে অসম্পূর্ণ অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়। ১৮০৮ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম অংশ। দ্বিতীয় অংশ গ্যেটে জীবনের শেষদিকে সম্পূর্ণ করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর ১৮৩২ সালে প্রকাশিত হয়।
গ্যেটের লেখা ফাউস্ট আগের সাহিত্যিকদের লেখার মতো ছিল না। গ্যেটের কাছে ফাউস্ট হয়ে ওঠে মানুষের সীমাহীন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এটাই গ্যেটের ফাউস্ট এর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। পুরোনো ফাউস্টের গল্পে মূল প্রশ্ন ছিল মানুষ ঈশ্বরের সীমা অতিক্রম করলে কী হয়? গ্যেটের কাছে প্রশ্নটা অনেক বড় হয়ে যায়, মানুষ আসলে কী চায়? কতটা জ্ঞান পেলে সে সন্তুষ্ট হবে? জীবনের কতটা অভিজ্ঞতা পেলে সে বলতে পারবে, এবার আমি পূর্ণ?
গ্যেটের ফাউস্ট প্রচুর জ্ঞান অর্জন করেছে। দর্শন, আইন, চিকিৎসা, ধর্মতত্ত্ব অনেক কিছু পড়েও সে তৃপ্ত নয়। বরং তার মনে হয়েছে, সে অনেক কিছু জানে, অথচ জীবনের আসল সত্যটা এখনও ধরতে পারেনি। এই অতৃপ্তি থেকেই তার শয়তানের প্রতিনিধি মেফিস্টোফিলিসের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। এখানে মেফিস্টোফিলিস শুধু ভয়ংকর শয়তান নয়। সে ফাউস্টের দুর্বলতাগুলোকে সামনে আনে। ফাউস্ট যা চায়, মেফিস্টোফিলিস তাকে তার স্বাদ দিতে চায়। প্রেম, আনন্দ, অভিজ্ঞতা, ক্ষমতা—জীবনের নানা দিকের দরজা তার সামনে খুলে যায়। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফাউস্ট কখনো পুরোপুরি থামতে চায় না। গ্যেটের গল্পে ফাউস্টের এই অতৃপ্তিই তাকে পুরোনো কিংবদন্তির ফাউস্ট থেকে আলাদা করে।
আর সেই কারণেই গ্যেটের ফাউস্ট শুধু শয়তানের সঙ্গে চুক্তির গল্প নয় যেখানে মানুষ তার আত্মা বিক্রি করেছে শয়তানের কাছে। গ্যেটের লেখা ফাউস্ট চরিত্রটি আকাঙ্ক্ষার কারণে অন্য মানুষের জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রেমিকা গ্রেচেনের সঙ্গে তার সম্পর্ক সেই দিকটি সবচেয়ে স্পষ্ট করে। ফাউস্টের ব্যক্তিগত ইচ্ছা আর ব্যক্তিগত থাকে না; তার সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে অন্য মানুষের জীবনেও। ফলে গ্যেটের ফাউস্টে শয়তানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষ নিজেই।
এখানে একটি বিষয় লক্ষনীয়, পুরোনো গল্পে শয়তান ছিল সব বিপদের মূল কারণ। কিন্তু গ্যেটের গল্পে মেফিস্টোফিলিস প্রলোভন দেখায়, কিন্তু ফাউস্টের সিদ্ধান্তগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সে কী চায়, কেন চায়, সেই চাওয়ার জন্য কতদূর যেতে রাজি এবং তার কাজের ফলে কী ঘটে এসব প্রশ্ন সামনে আসে। গ্যেটের ‘ফাউস্ট’ তাই শুধু পাপ ও শাস্তির গল্প নয়; এটি মানুষের জ্ঞান, আকাঙ্ক্ষা, অসন্তোষ এবং জীবনের অর্থ খোঁজার গল্পও।
ফাউস্টকে নিয়ে বিভিন্ন সাহিত্যিকদের এই দীর্ঘ যাত্রায় ফাউস্টের অর্থও বদলে যায়। গ্যেটের হাতে গিয়ে ফাউস্ট হয়ে উঠেন এমন এক মানুষের প্রতীক, যে কখনো সম্পূর্ণ তৃপ্ত হতে পারে না এবং জীবনের অর্থ খুঁজতে ক্রমাগত সামনে এগিয়ে যেতে থাকে।
-537618-480x270.webp)
বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যেটে এমন এক নাম, যাকে শুধু কবি বা নাট্যকার বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কঠিন। আজ তাঁর ২৭৭তম জন্মদিন। তিনি ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানমনস্ক গবেষক, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা এবং শিল্প-সংস্কৃতির গভীর পর্যবেক্ষক। কিন্তু এত পরিচয়ের মধ্যেও গ্যেটের সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক পরিচয় সম্ভবত ‘ফাউস্ট’ এর স্রষ্টা হিসেবে।
ফাউস্ট ইউরোপীয় লোকগাথার এক কিংবদন্তি চরিত্র। বলা হয়, জ্ঞান ও ক্ষমতার লোভে শয়তানের কাছে নিজের আত্মা বিক্রি করেছিলেন তিনি। এই কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে বিখ্যাত জার্মান সাহিত্যিক ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যেটে তাঁর দুই পর্বের ট্র্যাজেডি ‘ফাউস্ট’ রচনা করেন। প্রায় ছয় দশক ধরে তিনি ফাউস্ট নিয়ে কাজ করেছেন। ফলে ফাউস্ট রচনার এই দীর্ঘ যাত্রায় ‘ফাউস্ট’ চরিত্র সম্পর্কে যেমন গ্যেটের নিজস্ব ধারণা পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি তিনি কীভাবে মানুষ ও জীবনকে দেখতেন, সেটাও বোঝা যায়। গ্যেটের লেখা ‘ফাউস্ট’ নিয়ে লেখার আগে আমাদের জানা দরকার ‘ফাউস্ট’ কে ছিলেন।
ইয়োহান ফাউস্ট সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয়, তাঁর জন্মস্থান ও জন্মসাল নিয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। সম্ভাব্য জন্মস্থান হিসেবে জার্মানির হেলমস্টেডট ও কিন্টলিঙ্গেনের নাম পাওয়া যায় এবং তিনি পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে বা ষোড়শ শতকের শুরুর দিকে জন্মেছিলেন বলে মনে করা হয়।তিনি নিজেকে কখনো জাদুবিদ্যার বিশেষজ্ঞ, কখনো জ্যোতিষী, আবার কখনো চিকিৎসক বা ভবিষ্যৎ গণনাকারী হিসেবে পরিচয় দিতেন। নানা ধরনের অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলে নিজের চারপাশে এক ধরনের রহস্য তৈরি করে রাখতেন।
মনে করা হয়, ফাউস্টের নামের উল্লেখ পাওয়া যায় ১৫০৭ সালে। বেনেডিক্টাইন পণ্ডিত জোহানেস ট্রিথেমিয়ুস এক চিঠিতে তাঁর কথা লিখেছিলেন। তবে সেখানে ফাউস্টের কোনো প্রশংসা ছিল না। বরং ট্রিথেমিয়ুস তাঁকে এমন একজন মানুষ হিসেবে দেখেছিলেন, যিনি ভবঘুরে ও প্রতারক ছিলেন এবং নিজের কথিত অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতেন। ফাউস্টের জীবদ্দশায় তিনি খুব সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি মার্টিন লুথার ও ফিলিপ মেলানখথনের মতো ধর্মসংস্কার আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও তাঁর কথা জানতেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
এর একটা কারণ ছিল, ফাউস্ট নিজেকে আলাদা মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে পারতেন। তিনি এমন সব কাজের দাবি করতেন, যেগুলোর সত্যতা যাচাই করা তখন সহজ ছিল না। ফলে তাঁকে নিয়ে মানুষের কৌতূহলও তৈরি হয়েছিল, ভয়ও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ফাউস্টকে নিয়ে প্রচলিত গল্পের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটে তাঁর মৃত্যুর পরে।
ধারণা করা হয়, ১৫৪০–৪১ সালের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুও রহস্যে ঘেরা ছিল। আর এই রহস্যের মধ্যে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে মানুষের কল্পনা। জাদুবিদ্যা, ভবিষ্যৎ গণনা, অলৌকিক ক্ষমতার দাবি—মৃত্যুর পর সেগুলোর সঙ্গে আরও ভয়ংকর গল্প যোগ হতে থাকে। মুখে মুখে প্রচার পেতে থাকে, ফাউস্টের সঙ্গে শয়তানের চুক্তি হয়েছিল এবং তাঁর কথিত অলৌকিক ক্ষমতার সঙ্গে শয়তানের সম্পর্ক ছিল।
‘ফাউস্ট’-এর মাধ্যমেই যে ইউরোপে শয়তানের গল্প জনপ্রিয়তা পায় এমন না। ইউরোপের খ্রিস্টীয় সংস্কৃতিতে শয়তান, পাপ ও প্রলোভনের গল্প তাঁর বহু আগে থেকেই ছিল। যেমন বাইবেলের Acts গ্রন্থে সাইমন ম্যাগাসের গল্প আছে। আবার সাইপ্রিয়ান অব অ্যান্টিওক, থিওফিলাস অব আদানা এবং পোপ সিলভেস্টার দ্বিতীয়কে ঘিরেও এমন গল্প পাওয়া যায়, যেখানে মানুষ অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রলোভনে পড়ে। মধ্যযুগীয় সাহিত্যেও মার্লিনের মতো জাদুকর চরিত্রের পাশাপাশি ক্লিংসর-এর মতো চরিত্র পাওয়া যায়। তবে ফাউস্টের গল্পে একটি নতুন বিষয় যোগ হয়। ষোড়শ শতকে জার্মানির পরিবর্তনের সময়ে ফাউস্ট হয়ে ওঠেন এমন একজন মানুষের প্রতীক, যে অসীম জ্ঞান ও ক্ষমতা পেতে চায়। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষার পথেই সে শেষ পর্যন্ত নিজের আত্মা হারায়।

১৫৮৭ সালে ফাউস্টের জীবন নিয়ে Historia von D. Johann Fausten নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। সেখানে তাঁর জীবনের সঙ্গে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা, জাদু এবং শয়তানের সঙ্গে সম্পর্কের গল্প যোগ করা হয়। এই বইয়ের মাধ্যমে ফাউস্টের গল্প আরও অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। বইটি প্রকাশের মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে জার্মান ভাষায় ১৬ বার পুনর্মুদ্রিত হয়। পাশাপাশি ড্যানিশ, ইংরেজি, ডাচ, ফরাসি ও চেক ভাষায়ও এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ ফাউস্টের গল্প ধীরে ধীরে ধর্মীয় সতর্কবার্তা থেকে জনপ্রিয় সাহিত্যের গল্পেও পরিণত হতে থাকে।
এরপর ফাউস্টের গল্পে বড় পরিবর্তন আনেন ইংরেজ নাট্যকার ক্রিস্টোফার মার্লো। ষোড়শ শতকের শেষ দিকে তিনি ‘দ্য ট্র্যাজিক্যাল হিস্ট্রি অব দ্য লাইফ অ্যান্ড ডেথ অব ডক্টর ফস্টাস’ রচনা করেন। নাটকটির সঠিক রচনাকাল নিয়ে মতভেদ আছে; সাধারণত ১৫৮৮ থেকে ১৫৯২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এটি লেখা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। মার্লোর বড় পরিবর্তন ছিল—তিনি ফাউস্টকে শুধু প্রতারক বা পাপী হিসেবে দেখাননি। বরং মার্লোর ফাউস্ট একজন সাহসী, বিদ্রোহী ও জ্ঞানপিপাসু মানুষ। তার ভেতরে একদিকে শয়তানের প্রলোভন, অন্যদিকে অনুশোচনা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, এই দুইয়ের লড়াই চলে। পরে ইংরেজ অভিনেতারা মার্লোর নাটক জার্মানিতে নিয়ে যান।
কিন্তু সেখানে গল্পটির গম্ভীর চরিত্র ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। নাটকটি হাস্যরসাত্মক প্রদর্শনীতে পরিণত হয় যা পরে রূপ নেয় পুতুলনাট্যে। ফাউস্টের কাহিনির সঙ্গে গ্যেটের পরিচয় হয় ছোটবেলাতেই; তিনি ফাউস্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি পুতুলনাট্য দেখেছিলেন বলে জানা যায়।
গ্যেটে ‘ফাউস্ট’ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন তরুণ বয়সে। প্রায় ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এর বিভিন্ন অংশ লিখেছেন, বদলেছেন, আবার লিখেছেন। ১৭৯০ সালে ‘ফাউস্ট’ প্রথমে অসম্পূর্ণ অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়। ১৮০৮ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম অংশ। দ্বিতীয় অংশ গ্যেটে জীবনের শেষদিকে সম্পূর্ণ করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর ১৮৩২ সালে প্রকাশিত হয়।
গ্যেটের লেখা ফাউস্ট আগের সাহিত্যিকদের লেখার মতো ছিল না। গ্যেটের কাছে ফাউস্ট হয়ে ওঠে মানুষের সীমাহীন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এটাই গ্যেটের ফাউস্ট এর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। পুরোনো ফাউস্টের গল্পে মূল প্রশ্ন ছিল মানুষ ঈশ্বরের সীমা অতিক্রম করলে কী হয়? গ্যেটের কাছে প্রশ্নটা অনেক বড় হয়ে যায়, মানুষ আসলে কী চায়? কতটা জ্ঞান পেলে সে সন্তুষ্ট হবে? জীবনের কতটা অভিজ্ঞতা পেলে সে বলতে পারবে, এবার আমি পূর্ণ?
গ্যেটের ফাউস্ট প্রচুর জ্ঞান অর্জন করেছে। দর্শন, আইন, চিকিৎসা, ধর্মতত্ত্ব অনেক কিছু পড়েও সে তৃপ্ত নয়। বরং তার মনে হয়েছে, সে অনেক কিছু জানে, অথচ জীবনের আসল সত্যটা এখনও ধরতে পারেনি। এই অতৃপ্তি থেকেই তার শয়তানের প্রতিনিধি মেফিস্টোফিলিসের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। এখানে মেফিস্টোফিলিস শুধু ভয়ংকর শয়তান নয়। সে ফাউস্টের দুর্বলতাগুলোকে সামনে আনে। ফাউস্ট যা চায়, মেফিস্টোফিলিস তাকে তার স্বাদ দিতে চায়। প্রেম, আনন্দ, অভিজ্ঞতা, ক্ষমতা—জীবনের নানা দিকের দরজা তার সামনে খুলে যায়। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফাউস্ট কখনো পুরোপুরি থামতে চায় না। গ্যেটের গল্পে ফাউস্টের এই অতৃপ্তিই তাকে পুরোনো কিংবদন্তির ফাউস্ট থেকে আলাদা করে।
আর সেই কারণেই গ্যেটের ফাউস্ট শুধু শয়তানের সঙ্গে চুক্তির গল্প নয় যেখানে মানুষ তার আত্মা বিক্রি করেছে শয়তানের কাছে। গ্যেটের লেখা ফাউস্ট চরিত্রটি আকাঙ্ক্ষার কারণে অন্য মানুষের জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রেমিকা গ্রেচেনের সঙ্গে তার সম্পর্ক সেই দিকটি সবচেয়ে স্পষ্ট করে। ফাউস্টের ব্যক্তিগত ইচ্ছা আর ব্যক্তিগত থাকে না; তার সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে অন্য মানুষের জীবনেও। ফলে গ্যেটের ফাউস্টে শয়তানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষ নিজেই।
এখানে একটি বিষয় লক্ষনীয়, পুরোনো গল্পে শয়তান ছিল সব বিপদের মূল কারণ। কিন্তু গ্যেটের গল্পে মেফিস্টোফিলিস প্রলোভন দেখায়, কিন্তু ফাউস্টের সিদ্ধান্তগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সে কী চায়, কেন চায়, সেই চাওয়ার জন্য কতদূর যেতে রাজি এবং তার কাজের ফলে কী ঘটে এসব প্রশ্ন সামনে আসে। গ্যেটের ‘ফাউস্ট’ তাই শুধু পাপ ও শাস্তির গল্প নয়; এটি মানুষের জ্ঞান, আকাঙ্ক্ষা, অসন্তোষ এবং জীবনের অর্থ খোঁজার গল্পও।
ফাউস্টকে নিয়ে বিভিন্ন সাহিত্যিকদের এই দীর্ঘ যাত্রায় ফাউস্টের অর্থও বদলে যায়। গ্যেটের হাতে গিয়ে ফাউস্ট হয়ে উঠেন এমন এক মানুষের প্রতীক, যে কখনো সম্পূর্ণ তৃপ্ত হতে পারে না এবং জীবনের অর্থ খুঁজতে ক্রমাগত সামনে এগিয়ে যেতে থাকে।
.png)
-06f111-256x144.webp)
অবশ্য সেই সব মধ্যবিত্তিয় রুচির শিক্ষিত শিল্পীরা নিজেরাও খুব ভালো করে জানেন না যে কে এই মাতাল রাজ্জাক। প্রায়শই দেখা যায় তাঁর গান আংশিক কিংবা বিকৃত করে গাইছেন। এমনকি ইন্ডাস্ট্রিগুলোও তাঁকে আর পরিচয় করিয়ে দিতে চান না। আর আমাদের একাডেমিগুলো তো আছেই দূরে ঠেলে দেবার জন্য।
২৭ আগস্ট ২০২৬
আজ যে কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে, তিনি বাংলা সাহিত্যের কালপুরুষ, বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক। আমরা তাঁকে পাঠ করি কবি, সংগীতস্রষ্টা কিংবা সাম্যবাদ ও মানবমুক্তির কণ্ঠস্বর হিসেবে। তাঁর সাহিত্যকর্মের বিস্তার এবং রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবস্থান নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে আলোচনা চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে
২৭ আগস্ট ২০২৬-c94340-256x144.webp)
৭১ বছর আগে আজকের দিনেই মুক্তি পেয়েছিল ‘পথের পাঁচালী’। কিন্তু বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসকে হুবহু পর্দায় তোলেননি সত্যজিৎ রায়। চলচ্চিত্রের প্রয়োজনেই বদলে দিয়েছিলেন কিছু দৃশ্য। কেন ‘পথের পাঁচালী’ দিয়েই চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেছিলেন সত্যজিৎ রায়, কীভাবে অর্থসংকটের মধ্যেও ছবিটি বানিয়েছিলেন, এস
২৬ আগস্ট ২০২৬
‘পদাতিক পদধূলি ঢাকিল আকাশ দিনে অন্ধকার, নাহি রবির প্রকাশ।’ জৈনুদ্দীনের ‘রসুল বিজয়’ গ্রন্থে যুদ্ধের এমন তীব্র ও জীবন্ত বর্ণনা রয়েছে। যে বাংলা কাব্য একসময় প্রধানত স্থানীয় লোককথা, পুরাণ ও ধর্মীয় আখ্যানকে ঘিরে আবর্তিত হতো, সেই কাব্যেই একসময় আরব-ফারসি উৎসের কাহিনি, ইসলামি ইতিহাস ও নবীজির জীবনকেন্দ্রিক
২৬ আগস্ট ২০২৬