রংপুরে ৪ খুন/ছাদেই খুন হন গণপতি-স্ত্রী-মেয়ে, টেনে নেওয়া হয় সিঁড়িতে: পুলিশ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রংপুর

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন। স্ট্রিম ছবি
রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন। স্ট্রিম ছবি

রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডে নিয়ে নতুন তথ্য দিয়েছে পুলিশ। এতে দিনের আলোয় খোলা ছাদেই গণপতিসহ তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যার পর টেনে সিঁড়িতে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে তারা।

আদালতে আসামিদের জবানবন্দির বরাতে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। তিনি বলেন, আসামিদের দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের আগের বক্তব্যের সঙ্গে নতুন কিছু তথ্য যুক্ত হয়েছে। তবে সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকরা নানা প্রশ্ন করলেও কোনো উত্তর না দিয়ে চলে যান তিনি।

এর আগে শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে নগরের মাছুয়াপাড়ার বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তারা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী আয়ুশ (১২) ও মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী আগামী (২৫)। এ ঘটনায় শনিবার রাতেই প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস (২৩) ও মুগ্ধ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করা হয়। পরের দিন রোববার রাতে রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন আদালতে (২) ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়ার পর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

সিদ্ধার্থের জবানবন্দির বরাতে পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ জানান, ইয়াবা সেবনের সুবিধার জন্য সেদিন আসামিরা গণপতির বাসার ছাদে গিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘বাসার ছাদে পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করতে থাকলে তারা খেয়াল করে না, ভোরের আলো ফুটে যায়। সেই রাতে দুজনে আটটা ইয়াবা সেবন করে। জীবনে কখনো তারা এত বেশি ইয়াবা সেবন করে নাই। সর্বোচ্চ দুইটা ইয়াবা একসাথে সেবন করেছিল।’

গণপতি চক্রবর্তীর মৃত্যুর প্রসঙ্গে পুলিশ কমিশনার বলেন, শুক্রবার সকালে গলায় গামছা নিয়ে তিনি ছাদে হাঁটতে গিয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে দেখে ফেলেন। তাদের ধমক দেন তিনি। এতে আত্মসম্মানের ভয়ে গলায় গামছা পেঁচিয়ে গণপতিকে মেরে ফেলে তারা।

শিক্ষকের স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামীর হত্যার বর্ণনায় কমিশনার বলেন, গণপতির মরদেহ ঢেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় শব্দ শুনে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে আসেন। তারা চিৎকার করতে থাকলে মুগ্ধর হাতে থাকা শিক্ষকের গামছা দিয়ে তার স্ত্রীর গলা টিপে ধরে। এ সময় সিদ্ধার্থ এক হাতে মেয়ের গলা ও অন্য হাতে তার মুখ চেপে ধরে। প্রীতিলতার মৃত্যু নিশ্চিতের পর সেই গামছাটি আগামীর গলায় প্যাঁচায় দুজনে। তাতেও মেয়েটির মৃত্যু না হলে পাশে কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে একটি রশি এনে তার গলায় প্যাঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেয় তারা।

এদিকে আসামিরা গণপতির ঘরে ঢুকলে ছেলে প্রিয়ম ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখে। পুলিশ কমিশনার বলেন, শিশুটি সিদ্ধার্থকে তাদের বাসায় কেন জানতে চায়। বিষয়টি কেউ টের পেয়ে যায় কিনা— এই ভয়ে তাকে কাপড় দিয়ে গলা প্যাঁচিয়ে মেরে ফেলে তারা।

পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেন, এর আগে পুলিশ যে তথ্য দিয়েছিল, সেখানে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু প্রিয়মের ওপর হামলা করা হয় বলা হয়েছিল। তবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সিদ্ধার্থের বক্তব্যে শিশুটি ঘুম থেকে উঠে তাঁকে দেখে ফেলার বিষয়টি এসেছে।

আরও দুটি বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ

সিদ্ধার্থ দাসের জবানবন্দিতে তার পূর্বপুরুষের জমি শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীরা কিনেছিল বলে জানতে পেরেছে পুলিশ। কমিশনার বলেন, তার পূর্বপুরুষের জমি সম্ভবত একটু বেশি মূল্যে কেনা হয়েছিল, যার টাকা অংশীদারেরা আনুপাতিক হারে পায় নাই। তিনি বলে, ‘এ নিয়ে মনের মধ্যে একটা ক্ষোভ থাকতে পারে, সে দিকটাও আমরা দেখতেছি।’

সামাজিক ব্যবধানের বিষয়টিও তদন্তে দেখা হচ্ছে জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার ব্রাহ্মণ বংশের লোক। তবে মাছুয়াপাড়ার বেশিরভাগ লোক হলো দাস বংশের। তিনি বলেন, ‘সেখানে একটু ব্যবধান ছিল। অর্থাৎ মেলামেশা, রাস্তাঘাটে দেখা হতো, কিন্তু বাসায় আসা-যাওয়া ছিল না। এটা নিয়েও তাদের মনের মধ্যে কোনো ক্ষোভ থাকতে পারে।’

এর আগে রোববার (২৩ আগস্ট) সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেছিলেন, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) শেষ রাতে শব্দ পেয়ে ছাদে উঠে ইয়াবা সেবন দেখে ফেলায় খুন হন গণপতি। মা ও মেয়েকে সিঁড়িতে খুন করা হয়েছিল। পরে মামলার এজাহার, আলামত, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের বয়ান ঘিরে নানা সমালোচনা তৈরি হয়। এই সব ঘটনার সূত্র চেনে আজ সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে থাকলে কোনো উত্তর না দিয়ে চলে যান পুলিশ কমিশনার।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত