বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়? ফলাফল নিয়ে কোনো জবাবদিহি নেই। কোন মন্ত্রণালয় কত টাকা পেল সেটা জানা যায়, কিন্তু সেই টাকায় কতজনের চাকরি হলো, কত শিশু পুষ্টি পেল, কত রোগী চিকিৎসা পেল, সেই হিসাব প্রায় কখনো সামনে আসে না।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

প্রতি বছর জুনের আগেই একটা প্রত্যাশার মৌসুম তৈরি হয়। পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায় জাতীয় বাজেট নিয়ে আলোচনা জমে ওঠে। বাজেট ঘোষণার পর সেই আলোচনা কয়েক দিন চলে, তারপর স্তিমিত হয়ে যায়। পরের বছর আবার একই চক্র। কিন্তু এই চক্রের বাইরে গিয়ে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, বাজেট কি আসলে কিছু বদলাচ্ছে, তাহলে উত্তর সহজ আসে না।
বাজেটকে আমরা মূলত আয়-ব্যয়ের দলিল হিসেবে দেখি। কিন্তু একটি দেশের বাজেট হওয়া উচিত অর্থনৈতিক রূপান্তরের নীতিপত্র। সেখানে স্পষ্ট থাকবে কোন খাত অগ্রাধিকার পাবে, কর্মসংস্থান কোথায় তৈরি হবে, দরিদ্র মানুষ কীভাবে সুরক্ষা পাবে এবং বিনিয়োগের বাধা কীভাবে কমবে। আমাদের বাজেটে এসব কথা লেখা থাকে, কিন্তু বাস্তবায়নের শক্তিশালী কাঠামো থাকে না। ফলে বাজেট পরিবর্তনের রূপরেখা না হয়ে ঘোষণার বড় দলিল হয়ে যায়।
বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়? ফলাফল নিয়ে কোনো জবাবদিহি নেই। কোন মন্ত্রণালয় কত টাকা পেল সেটা জানা যায়, কিন্তু সেই টাকায় কতজনের চাকরি হলো, কত শিশু পুষ্টি পেল, কত রোগী চিকিৎসা পেল, সেই হিসাব প্রায় কখনো সামনে আসে না। এই ফলাফলভিত্তিক কাঠামো না থাকলে বরাদ্দ বাড়লেও অবস্থার বড় পরিবর্তন হয় না। বরাদ্দ আর ব্যয়ের মধ্যে যে ফাঁক থাকে, সেটা প্রতি বছরই দেখা যায়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির একটি বড় অংশ অব্যয়িত থাকে, নয়তো বছরের শেষে তাড়াহুড়ো করে খরচ দেখানো হয়। এই সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে বাজেটের আকার বাড়িয়ে লাভ নেই।
রাজস্ব সংকট নিয়ে সৎ আলোচনা দরকার। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশের আশেপাশে। দক্ষিণ এশিয়ার গড়ও এর প্রায় দ্বিগুণ। এই সীমিত রাজস্ব দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু অভিযোজন, সবকিছু একসঙ্গে করা সম্ভব নয়। কর বাড়ানোর অর্থ সাধারণ মানুষের ওপর চাপ দেওয়া নয়। কর ফাঁকি কমানো, কর অব্যাহতির তালিকা পর্যালোচনা করা এবং সম্পদশালীদের ওপর কার্যকর কর আরোপ করাটাই আসল কাজ। ব্যবসার জন্য কর কাঠামো পূর্বানুমানযোগ্য না হলে বিনিয়োগকারী পরিকল্পনা করতে পারেন না।
জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে আমরা এখনো আমদানিনির্ভরতার চক্রে আটকে আছি। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ে, ভর্তুকির চাপ বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ে। এটা শুধু বিদ্যুতের সমস্যা নয়, শিল্প উৎপাদন, রফতানি প্রতিযোগিতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির সমস্যা। অথচ বাংলাদেশে সৌরশক্তির বিপুল সম্ভাবনা অব্যবহৃত থাকছে। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের কাছাকাছি।
রুফটপ সোলার, সেচে সৌরশক্তির ব্যবহার এবং শিল্পাঞ্চলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বাজেটে সামঞ্জস্যপূর্ণ বরাদ্দ এখনো নেই। সৌর প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতিতে আমদানি শুল্ক কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য স্পষ্ট নীতিকাঠামো তৈরি করা এখন জরুরি। পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষতার দিকেও নজর দিতে হবে। শিল্প খাতে এনার্জি অডিট, কম সুদের সবুজ ঋণ এবং প্রযুক্তি আপগ্রেডের প্রণোদনা দিলে আমদানির চাপও কমবে।
ব্যাংক খাতের সংকটটা এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ আনুষ্ঠানিক হিসাবেই দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, প্রকৃত চিত্র আরো গভীর বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বারবার পুনঃতফসিল করে ঋণখেলাপিকে সুবিধা দেওয়া হলে সৎ উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর ব্যাংকিং সংস্কৃতি আরো ক্ষয় পায়। অনেক ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে যে চিত্র দেখানো হয়, তা বাস্তব অবস্থার পূর্ণ প্রতিফলন নয়। স্বাধীন সম্পদমান পর্যালোচনা ছাড়া এই সংকটের গভীরতা বোঝা সম্ভব নয়। দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য সময়সীমাবদ্ধ পুনর্গঠন পরিকল্পনা দরকার। যেসব ব্যাংক কার্যত অকার্যকর, তাদের একীভূত করা বা সুশৃঙ্খলভাবে গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা করতে হবে, কিন্তু দুর্বল মালিক বা অসৎ ঋণগ্রহীতাকে রক্ষার দায় রাষ্ট্রের নয়।
ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের প্রসঙ্গটাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পরিচালনা পর্ষদ অনেক ক্ষেত্রে মালিকগোষ্ঠীর সম্প্রসারিত হাত হিসেবে কাজ করেছে। পরিবারের সদস্য বা ঋণগ্রহীতার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পর্ষদে থাকলে ঋণ অনুমোদন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক চাপমুক্তভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং পরিচালকদের যোগ্যতা ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে কঠোর নিয়ম প্রয়োগ না করলে পর্ষদ সংস্কার কাগজেই থাকবে।
শিক্ষায় বিনিয়োগ নিয়ে আমরা যা বলি আর যা করি, তার মধ্যে বড় ফাঁক আছে। একজন শিক্ষার্থী দশ বছর স্কুলে পড়ে মৌলিক ভাষা বা গণিতের দক্ষতা ছাড়াই বেরিয়ে আসছে। জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নের তথ্য বলছে, প্রাথমিক স্তরে শেখার ঘাটতি এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে আছে। বিদেশে যাওয়া শ্রমিকরা নিম্ন দক্ষতার কাজে যাচ্ছেন বলে আয় কম, ঝুঁকি বেশি। প্রবাসী আয়ের গুণগত মান বদলাতে হলে ভাষা, প্রযুক্তি এবং কারিগরি দক্ষতায় বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। জার্মানি বা কোরিয়ার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শিল্প খাতকে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার অংশ করলে কারিগরি শিক্ষার ফলাফল দ্রুত বদলায়। বাজেটে শুধু ভবন নির্মাণ নয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠক্রম উন্নয়ন এবং শিল্প-সংযোগ তৈরিতে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার।
স্বাস্থ্য খাতে একটা বাস্তব চিত্র তুলে ধরা দরকার। রাজশাহীতে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, জেলা পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার কী অবস্থা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ খালি, যন্ত্রপাতি নষ্ট পড়ে আছে, ওষুধের সরবরাহ অনিয়মিত। একজন রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে হয়। সেই যাওয়া-আসার খরচে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার টালমাটাল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ এখনো ব্যক্তির নিজের পকেট থেকে আসে। এটা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চের কাছাকাছি। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা তাই শুধু মানবিক দায় নয়, অর্থনৈতিক বিবেচনাও।
কর্মসংস্থানের সমস্যাটা কি বাজেট দিয়ে সমাধান সম্ভব? পুরোপুরি নয়, তবে বড় একটা অংশ নির্ভর করে সরকারের নীতিগত অবস্থানের ওপর। প্রতি বছর প্রায় বিশ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে আসছে, কিন্তু অর্থনীতি তাদের জন্য পর্যাপ্ত মানের কাজ তৈরি করতে পারছে না। তৈরি পোশাক খাত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু একটি খাতের ওপর নির্ভর করে এত বড় শ্রমশক্তি সামলানো যাবে না। এগ্রো-প্রসেসিং, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি-সেবা, লজিস্টিকস এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ টানতে পারলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বাজেটে কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রণোদনা রাখা যেতে পারে, অর্থাৎ নতুন কর্মী নিয়োগ করলে কর সুবিধা বা আংশিক মজুরি সহায়তার ব্যবস্থা।
আমার মনে হয়, বিনিয়োগ পরিবেশের সবচেয়ে বড় বাধা অবকাঠামো নয়, নীতির অনিশ্চয়তা। একজন উদ্যোক্তা জানতে চান, নিয়মটা কী এবং সেটা কাল বদলাবে কিনা। ঘন ঘন কর নীতির পরিবর্তন, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং মুনাফা ফেরত পাঠানোর জটিলতা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। ওয়ান স্টপ সার্ভিসের কথা বহুদিন ধরে বলা হচ্ছে, কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন আলাদা থাকলে সেটা নামেই থাকে। কাস্টমস, পরিবেশ ছাড়পত্র, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, কোম্পানি নিবন্ধন, সবকিছু ডিজিটাল ও সময়সীমাবদ্ধ না করলে বিনিয়োগকারীর অভিজ্ঞতা বদলাবে না।
আসছে বাজেটটি নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। এই বাজেটে শুধু সংখ্যা বাড়ানো নয়, একটা স্পষ্ট বার্তা দরকার। সেই বার্তা হলো, এবার ফলাফলের হিসাব দিতে হবে। কোন খাতে কত টাকা গেল তার পাশাপাশি সেই টাকায় কী বদলাল, সেটা জনগণ জানতে চায়। বাজেট যদি সত্যিকারের সংস্কারের দলিল হয়, তাহলে প্রতি বছরের এই প্রত্যাশার মৌসুমটা একদিন স্বস্তির মৌসুমে পরিণত হবে।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

প্রতি বছর জুনের আগেই একটা প্রত্যাশার মৌসুম তৈরি হয়। পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায় জাতীয় বাজেট নিয়ে আলোচনা জমে ওঠে। বাজেট ঘোষণার পর সেই আলোচনা কয়েক দিন চলে, তারপর স্তিমিত হয়ে যায়। পরের বছর আবার একই চক্র। কিন্তু এই চক্রের বাইরে গিয়ে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, বাজেট কি আসলে কিছু বদলাচ্ছে, তাহলে উত্তর সহজ আসে না।
বাজেটকে আমরা মূলত আয়-ব্যয়ের দলিল হিসেবে দেখি। কিন্তু একটি দেশের বাজেট হওয়া উচিত অর্থনৈতিক রূপান্তরের নীতিপত্র। সেখানে স্পষ্ট থাকবে কোন খাত অগ্রাধিকার পাবে, কর্মসংস্থান কোথায় তৈরি হবে, দরিদ্র মানুষ কীভাবে সুরক্ষা পাবে এবং বিনিয়োগের বাধা কীভাবে কমবে। আমাদের বাজেটে এসব কথা লেখা থাকে, কিন্তু বাস্তবায়নের শক্তিশালী কাঠামো থাকে না। ফলে বাজেট পরিবর্তনের রূপরেখা না হয়ে ঘোষণার বড় দলিল হয়ে যায়।
বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়? ফলাফল নিয়ে কোনো জবাবদিহি নেই। কোন মন্ত্রণালয় কত টাকা পেল সেটা জানা যায়, কিন্তু সেই টাকায় কতজনের চাকরি হলো, কত শিশু পুষ্টি পেল, কত রোগী চিকিৎসা পেল, সেই হিসাব প্রায় কখনো সামনে আসে না। এই ফলাফলভিত্তিক কাঠামো না থাকলে বরাদ্দ বাড়লেও অবস্থার বড় পরিবর্তন হয় না। বরাদ্দ আর ব্যয়ের মধ্যে যে ফাঁক থাকে, সেটা প্রতি বছরই দেখা যায়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির একটি বড় অংশ অব্যয়িত থাকে, নয়তো বছরের শেষে তাড়াহুড়ো করে খরচ দেখানো হয়। এই সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে বাজেটের আকার বাড়িয়ে লাভ নেই।
রাজস্ব সংকট নিয়ে সৎ আলোচনা দরকার। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশের আশেপাশে। দক্ষিণ এশিয়ার গড়ও এর প্রায় দ্বিগুণ। এই সীমিত রাজস্ব দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু অভিযোজন, সবকিছু একসঙ্গে করা সম্ভব নয়। কর বাড়ানোর অর্থ সাধারণ মানুষের ওপর চাপ দেওয়া নয়। কর ফাঁকি কমানো, কর অব্যাহতির তালিকা পর্যালোচনা করা এবং সম্পদশালীদের ওপর কার্যকর কর আরোপ করাটাই আসল কাজ। ব্যবসার জন্য কর কাঠামো পূর্বানুমানযোগ্য না হলে বিনিয়োগকারী পরিকল্পনা করতে পারেন না।
জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে আমরা এখনো আমদানিনির্ভরতার চক্রে আটকে আছি। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ে, ভর্তুকির চাপ বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ে। এটা শুধু বিদ্যুতের সমস্যা নয়, শিল্প উৎপাদন, রফতানি প্রতিযোগিতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির সমস্যা। অথচ বাংলাদেশে সৌরশক্তির বিপুল সম্ভাবনা অব্যবহৃত থাকছে। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের কাছাকাছি।
রুফটপ সোলার, সেচে সৌরশক্তির ব্যবহার এবং শিল্পাঞ্চলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বাজেটে সামঞ্জস্যপূর্ণ বরাদ্দ এখনো নেই। সৌর প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতিতে আমদানি শুল্ক কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য স্পষ্ট নীতিকাঠামো তৈরি করা এখন জরুরি। পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষতার দিকেও নজর দিতে হবে। শিল্প খাতে এনার্জি অডিট, কম সুদের সবুজ ঋণ এবং প্রযুক্তি আপগ্রেডের প্রণোদনা দিলে আমদানির চাপও কমবে।
ব্যাংক খাতের সংকটটা এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ আনুষ্ঠানিক হিসাবেই দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, প্রকৃত চিত্র আরো গভীর বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বারবার পুনঃতফসিল করে ঋণখেলাপিকে সুবিধা দেওয়া হলে সৎ উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর ব্যাংকিং সংস্কৃতি আরো ক্ষয় পায়। অনেক ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে যে চিত্র দেখানো হয়, তা বাস্তব অবস্থার পূর্ণ প্রতিফলন নয়। স্বাধীন সম্পদমান পর্যালোচনা ছাড়া এই সংকটের গভীরতা বোঝা সম্ভব নয়। দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য সময়সীমাবদ্ধ পুনর্গঠন পরিকল্পনা দরকার। যেসব ব্যাংক কার্যত অকার্যকর, তাদের একীভূত করা বা সুশৃঙ্খলভাবে গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা করতে হবে, কিন্তু দুর্বল মালিক বা অসৎ ঋণগ্রহীতাকে রক্ষার দায় রাষ্ট্রের নয়।
ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের প্রসঙ্গটাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পরিচালনা পর্ষদ অনেক ক্ষেত্রে মালিকগোষ্ঠীর সম্প্রসারিত হাত হিসেবে কাজ করেছে। পরিবারের সদস্য বা ঋণগ্রহীতার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পর্ষদে থাকলে ঋণ অনুমোদন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক চাপমুক্তভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং পরিচালকদের যোগ্যতা ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে কঠোর নিয়ম প্রয়োগ না করলে পর্ষদ সংস্কার কাগজেই থাকবে।
শিক্ষায় বিনিয়োগ নিয়ে আমরা যা বলি আর যা করি, তার মধ্যে বড় ফাঁক আছে। একজন শিক্ষার্থী দশ বছর স্কুলে পড়ে মৌলিক ভাষা বা গণিতের দক্ষতা ছাড়াই বেরিয়ে আসছে। জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নের তথ্য বলছে, প্রাথমিক স্তরে শেখার ঘাটতি এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে আছে। বিদেশে যাওয়া শ্রমিকরা নিম্ন দক্ষতার কাজে যাচ্ছেন বলে আয় কম, ঝুঁকি বেশি। প্রবাসী আয়ের গুণগত মান বদলাতে হলে ভাষা, প্রযুক্তি এবং কারিগরি দক্ষতায় বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। জার্মানি বা কোরিয়ার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শিল্প খাতকে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার অংশ করলে কারিগরি শিক্ষার ফলাফল দ্রুত বদলায়। বাজেটে শুধু ভবন নির্মাণ নয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠক্রম উন্নয়ন এবং শিল্প-সংযোগ তৈরিতে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার।
স্বাস্থ্য খাতে একটা বাস্তব চিত্র তুলে ধরা দরকার। রাজশাহীতে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, জেলা পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার কী অবস্থা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ খালি, যন্ত্রপাতি নষ্ট পড়ে আছে, ওষুধের সরবরাহ অনিয়মিত। একজন রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে হয়। সেই যাওয়া-আসার খরচে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার টালমাটাল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ এখনো ব্যক্তির নিজের পকেট থেকে আসে। এটা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চের কাছাকাছি। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা তাই শুধু মানবিক দায় নয়, অর্থনৈতিক বিবেচনাও।
কর্মসংস্থানের সমস্যাটা কি বাজেট দিয়ে সমাধান সম্ভব? পুরোপুরি নয়, তবে বড় একটা অংশ নির্ভর করে সরকারের নীতিগত অবস্থানের ওপর। প্রতি বছর প্রায় বিশ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে আসছে, কিন্তু অর্থনীতি তাদের জন্য পর্যাপ্ত মানের কাজ তৈরি করতে পারছে না। তৈরি পোশাক খাত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু একটি খাতের ওপর নির্ভর করে এত বড় শ্রমশক্তি সামলানো যাবে না। এগ্রো-প্রসেসিং, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি-সেবা, লজিস্টিকস এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ টানতে পারলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বাজেটে কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রণোদনা রাখা যেতে পারে, অর্থাৎ নতুন কর্মী নিয়োগ করলে কর সুবিধা বা আংশিক মজুরি সহায়তার ব্যবস্থা।
আমার মনে হয়, বিনিয়োগ পরিবেশের সবচেয়ে বড় বাধা অবকাঠামো নয়, নীতির অনিশ্চয়তা। একজন উদ্যোক্তা জানতে চান, নিয়মটা কী এবং সেটা কাল বদলাবে কিনা। ঘন ঘন কর নীতির পরিবর্তন, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং মুনাফা ফেরত পাঠানোর জটিলতা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। ওয়ান স্টপ সার্ভিসের কথা বহুদিন ধরে বলা হচ্ছে, কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন আলাদা থাকলে সেটা নামেই থাকে। কাস্টমস, পরিবেশ ছাড়পত্র, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, কোম্পানি নিবন্ধন, সবকিছু ডিজিটাল ও সময়সীমাবদ্ধ না করলে বিনিয়োগকারীর অভিজ্ঞতা বদলাবে না।
আসছে বাজেটটি নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। এই বাজেটে শুধু সংখ্যা বাড়ানো নয়, একটা স্পষ্ট বার্তা দরকার। সেই বার্তা হলো, এবার ফলাফলের হিসাব দিতে হবে। কোন খাতে কত টাকা গেল তার পাশাপাশি সেই টাকায় কী বদলাল, সেটা জনগণ জানতে চায়। বাজেট যদি সত্যিকারের সংস্কারের দলিল হয়, তাহলে প্রতি বছরের এই প্রত্যাশার মৌসুমটা একদিন স্বস্তির মৌসুমে পরিণত হবে।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

সরকার জ্বালানি তেলের পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে ১.২০–১.৫০ টাকা (প্রায় ১৭–২১%) দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যার সঙ্গে খুচরা দামে আনুপাতিক সমন্বয় হতে পারে।
২০ ঘণ্টা আগে
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি এক অভূতপূর্ব ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, যেখানে ইসরায়েল-আমেরিকা বনাম ইরান ও তার প্রক্সি শক্তিগুলোর মধ্যকার সরাসরি সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ইরানের কৌশলী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, যার সাম্প্রতি
২০ ঘণ্টা আগে
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্টের উত্থান এবং ২০১১ সালে তৃণমূলের ক্ষমতা দখলের পর এই ফলাফল বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে তৃতীয় বড় বাঁক।
১ দিন আগে
বেশ কিছু বছর লেখা বন্ধ ছিল। আবার শুরু করলাম। কারণ এখন আমরা সবাই একটা নতুন কালে আছি। সেই সময়ের সূচনাকে খুব সামনাসামনি থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। আর এখনও খুব কাছাকাছি বসেই দেখতে পাচ্ছি। আমি মনে করি এসব রেকর্ডেড থাকা উচিত। কে জানে, কারো যদি ৫০ বছর পর কাজে লেগে যায়।
১ দিন আগে