আজ এমন একজনের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী, যিনি দুটি দেশের জাতীয় সংগীত লিখেছেন। নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। ২৫ কোটি মানুষের কাছে তিনি প্রাসঙ্গিক। কখনো বা পূজনীয়। অথচ বাংলা ভাষাভাষীদের বাইরে কাউকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা জিজ্ঞেস করে দেখুন। বড়জোর এক মুহূর্তের শূন্য দৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই পাবেন না।
২০১১ সালে সাংবাদিক ইয়ান জ্যাক একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। তিনি অক্সফোর্ড ও পেঙ্গুইন—দুই জায়গা থেকে প্রকাশিত উদ্ধৃতি অভিধান ঘেঁটে দেখেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথের রচনাবলী থেকে একটি লাইনও পাওয়া যায়নি। তাঁর ত্রিশ খন্ড রচনাবলীর একটি লাইনকেও তারা উধৃতি যোগ্য মনে করেনি।
১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথ লন্ডন যাত্রা করেন। সাথে ছিল গীতাঞ্জলির পাণ্ডুলিপি। সেটি ট্রেনের কামরায় হারিয়ে গিয়েছিল। পরে অবশ্য রেলের মালখানা থেকে তা উদ্ধার করা হয়। ডব্লিউ বি ইয়েটস সেই কবিতাগুলো পড়েন। তিনি কবির মস্ত বড় অনূরাগী হয়ে ওঠেন। এর এক বছরের মাথায় রবীন্দ্রনাথ প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে নোবেল জেতেন। গীতাঞ্জলি ডজন ডজন ভাষায় অনুবাদ হলো। ফরাসিতে আঁদ্রে জিদ আর রুশ ভাষায় বরিস পাস্তেরনাক অনুবাদ করলেন। রাতারাতি রবীন্দ্রনাথ এক বিশ্বজনীন বিস্ময় হয়ে উঠলেন।
পাশ্চাত্য প্রথম রবীন্দ্রনাথকে একজন রক্ত-মাংসের কবি বা বুদ্ধিজীবীর চেয়ে ‘প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক ত্রাণকর্তা’ হিসেবেই গ্রহণ করেছিল। তাঁর লম্বা দাড়ি, আলখাল্লা আর শান্ত সৌম্য অবয়ব ভিক্টোরিয়ান যুগের মানুষের কাছে তাঁকে এক ‘খ্রিস্টীয় মূর্তিকল্প’ বা রহস্যময় সন্ন্যাসী হিসেবে তুলে ধরেছিল। তাঁর গীতিনাট্য বা কবিতার কোমলতা পর্যন্ত পাশ্চাত্যের আগ্রহ সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু যখনই তিনি সমকালীন রাজনীতি, আধুনিক শিক্ষা কিংবা উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কঠোর যুক্তি দিতে শুরু করলেন, তখন পাশ্চাত্যের সেই মোহভঙ্গ হলো। তারা একজন ‘মিস্টিক’ বা সুফিবাদী সাধক চেয়েছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন আধুনিক ও যুক্তিবাদী ‘পলিম্যাথ’। এই ভুল প্রত্যাশা আর বাস্তব রবীন্দ্রনাথের মধ্যকার দূরত্বই তাঁকে পরবর্তী সময়ে পাশ্চাত্যের ড্রয়িংরুম থেকে ছিটকে ফেলে দেয়।
একবার ভাবুন তো, পৃথিবী অনেক কবিদের নিয়ে কী মাতামাতি করেছে বা এখনও করছে। মওলানা রুমির কথা ধরুন। তিনি ত্রয়োদশ শতাব্দীর এক পারস্য সুফি সাধক। তাঁর ভাষা ফারসি বিশ্বের খুব অল্প মানুষ বলে। অথচ আজ তাঁকেই আমেরিকার সবথেকে জনপ্রিয় কবি বলা হয়। তাঁর লেখা অসংখ্য ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। লন্ডন থেকে শিকাগোর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর কবিতা পড়ানো হয়। পপ তারকা থেকে পণ্ডিত—সবাই তাঁর কথা বলেন। রুমি ইংরেজিতে লিখতেন না। জন্মসূত্রে তিনিও পশ্চিমা ধারার কবি ছিলেন না। তবুও তিনি সেখানে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। এর পেছনে ছিল একদল একনিষ্ঠ অনুবাদক আর আগ্রহী গবেষক। আর ছিল এক কৌতূহলী পশ্চিমা সমাজ।
রুমির বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার পেছনে কবি কোলম্যান বার্কসের একটি বিশাল ভূমিকা আছে। বার্কস রুমির মধ্যযুগীয় গাম্ভীর্যকে ভেঙে আধুনিক আমেরিকান ইংরেজি আর সহজ ‘ফ্রি ভার্স’-এ রূপান্তর করেছিলেন। এই প্রয়াস আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছেও রুমির দর্শনকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ঠিক উল্টো। তিনি নিজেই তাঁর কবিতার অনুবাদ করেছিলেন। ব্যবহার করেছিলেন তৎকালীন প্রচলিত ভিক্টোরিয়ান অলঙ্কৃত ইংরেজি, যা আজকের দিনে অত্যন্ত সেকেলে আর ‘কাঠখোট্টা’ শোনায়। তাঁর কবিতার সেই ‘তরল’ সাবলীলতা অনুবাদে আটকে আড়ষ্ট হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বদরবারে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এমন একজন আধুনিক অনুবাদক প্রয়োজন, যিনি মূল বাংলার প্রাণ বজায় রেখে সমকালীন বিশ্ব-সাহিত্যের ভাষায় তাঁকে পুনর্জন্ম দিতে পারবেন।
রবীন্দ্রনাথের নাগালেও সব ছিল। তিনি কেবল কবি ছিলেন না। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় গড়েছিলেন। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নাইটহুড ছেড়েছিলেন। বিশ্ব যখন জাতীয়তাবাদের বিপদ বুঝতেই পারেনি, তার কয়েক দশক আগে তিনি তা নিয়ে সবাইকে সতর্ক করেছিলেন। নারী অধিকার আর পরিবেশ নিয়ে তিনি অত্যন্ত আধুনিক কথা লিখে গেছেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে তিনি 'আমার সোনার বাংলা' লিখেছিলেন। এটি আজ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ভারতের জাতীয় সংগীতও তাঁরই সৃষ্টি।
রবীন্দ্রনাথ মূলত বাংলাতেই লিখেছেন। কোনো অনুবাদই তাঁকে পুরোপুরি ধরতে পারেনি। কোনো অনুবাদই তা পারে না। তবে খুব নিবিড় চর্চা অন্য ভাষার কাছে অনুবাদে হলেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আজ বিশ্বজুড়ে যখন উগ্র ডানপন্থার উত্থান ঘটছে, জলবায়ু পরিবর্তন এক চরম সংকটের রূপ নিয়েছে, তখন রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষ আগের লেখাগুলো অবিশ্বাস্যভাবে সমকালীন শোনায়। ১৯১৬-১৭ সালে জাপান ও আমেরিকায় গিয়ে তিনি যেভাবে উগ্র জাতীয়তাবাদের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন, বিশ্ব আজ ঠিক সেই পরিণতির সম্মুখীন। একইভাবে তাঁর ‘মুক্তধারা’ বা ‘রক্তকরবী’ নাটকে যন্ত্রসভ্যতা আর প্রকৃতির শোষণের যে চিত্র তিনি এঁকেছিলেন, তা আজকের পরিবেশবাদী আন্দোলনের মূল সুরের সাথে মিলে যায়। ফলে বিশ্বের আজ রবীন্দ্রনাথকে এড়িয়ে না যাওয়াই যৌক্তিক হওয়ার কথা।
কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল তারা কবির কাছে কী চায়। ১৯৩৫ সাল নাগাদ ইয়েটসও তাঁর দিক থেকে মুখ সরিয়ে নিলেন। কবির পরের দিকের কাজগুলো তিনি বাতিল করে দিলেন। ফিলিপ লারকিন এ নিয়ে আরও বেশি কঠোর ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথকে কেবল একজন ‘কবি’ হিসেবে বিবেচনা করাটাই পাশ্চাত্যের বড় ভুল। তিনি ছিলেন আইনস্টাইন, রোমাঁ রোলাঁ কিংবা এইচ. জি. ওয়েলসের মতো তৎকালীন শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের সমকক্ষ একজন বিশ্ব-চিন্তক। অথচ আজ তাঁকে নিয়ে আলোচনা কেবল সাহিত্যের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ। এমনকি ইংল্যান্ডের ডার্টিংটন হল প্রকল্পের মতো পরীক্ষামূলক শিক্ষাব্যবস্থার পেছনেও তাঁর পল্লী পুনর্গঠন ও শিক্ষা-দর্শনের সরাসরি প্রভাব ছিল। বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর কৌতূহল এবং বিশ্বজনীনতা তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। পাশ্চাত্যের কাছে এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, তারা এক শতাব্দী আগে একজন কবির ছদ্মবেশে থাকা একজন সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিককে চিনতে ব্যর্থ হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ মূলত বাংলাতেই লিখেছেন। কোনো অনুবাদই তাঁকে পুরোপুরি ধরতে পারেনি। কোনো অনুবাদই তা পারে না। তবে খুব নিবিড় চর্চা অন্য ভাষার কাছে অনুবাদে হলেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কবির নিজের করা ইংরেজি অনুবাদগুলো ছিল তড়িঘড়ি করে করা। তাতে তদারকির অভাব ছিল। সেগুলো পাশ্চাত্যের কাছে আসল রবীন্দ্রনাথের একটা ফ্যাকাসে ছবি মাত্র তুলে ধরেছিল। কলকাতার এক আমলা যেমন 'গার্ডিয়ান' পত্রিকাকে বলেছিলেন—রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি অনুবাদগুলো যেন উল্টো দিক থেকে দেখা নকশিকাঁথা।
বর্তমান বিশ্বের পাঠক অনেকটা ‘স্ন্যাকবল’ বা দ্রুত ভোগযোগ্য সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। রুমির ছোট ছোট পঙ্ক্তি বা দু-এক লাইনের মরমী উক্তি বর্তমানের ইনস্টাগ্রাম বা সোশ্যাল মিডিয়া সংস্কৃতির সাথে খুব সহজেই খাপ খেয়ে যায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মূল গভীরতা লুকিয়ে আছে তাঁর দীর্ঘ প্রবন্ধ, বিচিত্র সুরের গান আর বিশাল ক্যানভাসের উপন্যাসে। তাঁকে বুঝতে হলে যে ধরনের ধৈর্য এবং দীর্ঘস্থায়ী নিমগ্নতা প্রয়োজন, আজকের দ্রুতগতির পশ্চিমা সংস্কৃতিতে তার অভাব প্রকট। রবীন্দ্রনাথের দর্শন অনেকটা গভীর সমুদ্রের মতো, যেখানে ডুব না দিলে মুক্তো পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আধুনিক পাশ্চাত্য আজ অগভীর জলেই সন্তুষ্ট থাকতে চায়, যা রবীন্দ্রনাথের মতো একজন ‘মহা-নিমগ্ন’ কবির জন্য বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জনের পথে এক বড় অন্তরায়।
এমন বিশাল মাপের মানুষ কেন বহির্বিশ্বের কাছে আজও এত অদৃশ্য? কারণটা হয়তো এই যে, পাশ্চাত্য প্রথমে তাঁকে ভুল বুঝেছিল। তারপর সেই ভুল ধারণাটুকুও একসময় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু পর্দার আড়ালের আসল রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে চেনার সময় আর তারা পায়নি।