ad

জন্মদিন/‘ভাড়াখাটা গিটারের ভাড়াটে প্রেমিক’ আইয়ুব বাচ্চু ও কষ্ট…কষ্ট…কষ্ট…

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ৪০
আইয়ুব বাচ্চু। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

আইয়ুব বাচ্চুর কথা পড়লে আপনার মনের ক্যানভাসে প্রথমে ঠিক কী ভেসে ওঠে? সেই বিখ্যাত রুপালি গিটার? মঞ্চ কাঁপানো গিটার সলো? অনেকে হয়তো গুনগুন করে উঠবেন ‘চলো বদলে যাই’, ‘ফেরারী মন’ কিংবা ‘মাধবী’র মতো কোনো কালজয়ী সুরের চরণ। কিন্তু এই চেনা ছবিগুলোর ভিড়ে আমার স্মৃতির দরজায় সবার আগে কড়া নাড়ে একটি মাত্র শব্দ—‘কষ্ট’।

এই একটি ‘সাধারণ’ শব্দের পিঠে চড়ে মুহূর্তেই মনে পড়ে যায় আমার ছোটবেলার কথা। মনের কোণে উঁকি দেয় ক্যাসেট প্লেয়ার, ফিতার A-পিঠ আর B-পিঠ উলটে-পালটে গান শোনার দিনগুলো। আমার হাইস্কুলের সহপাঠীদের বেশিরভাগই ছিল তাঁর মহাভক্ত। কখনো কখনো গলা মিলিয়ে আমিও গেয়ে উঠতাম, ‘আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি’ কিংবা ‘আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে’।

‘কষ্ট সিরিজ’-এর গান কেন যে তখন এত ভালো লাগত, এখন ঠিক বলতে পারব না। কারণ, তখন খুব একটা ব্যক্তিগত বিরহের গল্পও ছিল না। বরং আইয়ুব বাচ্চুর গানই যেন আমাদের ভেতরে এক ধরনের বিরহের আবহ তৈরি করত। খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়, পৃথিবীতে প্রেমের গান হিসেবে যে গানগুলো সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে, সেগুলোর বড় অংশই প্রেমের ব্যর্থতা, কষ্ট, বিচ্ছেদ আর অপ্রাপ্তির কথা বলে। অর্থাৎ আমরা তখন কষ্ট থেকে গান শুনিনি; অনেক ক্ষেত্রে গান শুনেই কষ্টের একটা ভাষা শিখেছিলাম।

আইয়ুব বাচ্চুর গানে কষ্ট এতবার, এতভাবে ফিরে এসেছে যে একসময় তা তাঁর গানের বিষয় থেকে তাঁর সংগীতের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। তাঁকে ‘কষ্টের ফেরিওয়ালা’ বলা হয়। এই বিশেষণটি হয়তো কিছুটা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ মনে হতে পার। কিন্তু এর পেছনে বাস্তবতাও আছে। তাঁর একক অ্যালবামের নামই ‘কষ্ট’। সেই অ্যালবামে ‘আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘কষ্ট কাকে বলে’, ‘কি যে কষ্ট আমার’-এর মতো গান। পরে প্রায় সব অ্যালবামে ফিরে এসেছে বেদনা, একাকিত্ব, বিচ্ছেদ, অপ্রাপ্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন?

কেন-এর উত্তর খুঁজতে গেলে যেতে হয় আইয়ুব বাচ্চুর প্রিয় জনরার কাছে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, যেতে হয় ব্লুজের কাছে। ব্লুজ সম্পর্কে আইয়ুব বাচ্চুর নিজের কথাটি এখানে বলা দরকার। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ব্লুজ হচ্ছে কান্নাকাটির জনরা। ব্লুজে গিয়ে আপনি শুধু কান্না করবেন। আপনার যত দুঃখ, যত কষ্ট, সব এই ব্লুজে।’

একজন সংগীতশিল্পী কোনো একটি সংগীতধারাকে কীভাবে দেখছেন, তার মধ্যে তাঁর নিজের সংগীতভাবনাটাও ধরা পড়ে। বাচ্চুর কাছে ব্লুজ ছিল নিজের ভেতরের দুঃখ বের করে দেওয়ার জায়গা। অর্থাৎ কষ্টকে চেপে রাখা নয়, কষ্টকে সংগীতে পরিণত করা।

এই জায়গাটাই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর গানে কষ্টের পুনরাবৃত্তিকে শুধু ব্যক্তিগত বিষণ্নতার হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করলে তাঁর সংগীতদর্শনের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। মনে হয়, বাচ্চুর কাছে কষ্ট ছিল সংগীতের উপাদান। ব্লুজ তাঁকে শিখিয়েছিল, মানুষের ভেতরে জমে থাকা দুঃখও সুরের ভাষা হতে পারে।

আর এখানেই আইয়ুব বাচ্চুর কষ্ট আর তাঁর গিটার এক জায়গায় এসে মিশে যায়।

এই গল্পের শুরু চট্টগ্রামে। কিশোর বয়সে বিটিভিতে নয়ন মুন্সীর গিটার বাজানো দেখে গিটারিস্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন বাচ্চু। তাঁর মনে হয়েছিল, নয়নের মতো গিটার বাজাতে হবে। শুরুটা ছিল নিজের চেষ্টায়। শেখার আগ্রহ ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল অনুশীলনের জেদ।

একসময় নিজের গিটারও ছিল না। বন্ধুর গিটার নিয়ে বাজিয়েছেন। গিটার ভাড়া করেও কনসার্ট করেছেন। এরপর একটার পর একটা গিটার এসেছে তাঁর হাতে।

তারপর? আরও কত কী! হোটেলের ছোট ঘরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন। ঘামে ভিজে যাওয়া শরীর। বাইরে গিয়ে নলকূপের পানি খেয়ে আবার ফিরে এসে গিটার বাজানো। এই গল্পটা মনে রাখা উচিত। তিনি একদিনে ‘আইয়ুব বাচ্চু’ হয়ে ওঠেননি। তা সম্ভবও না।

আজ সেই ক্যাসেট প্লেয়ার নেই। ফিতার A-পিঠ, B-পিঠ বদলে গান শোনার সেই অভ্যাসও নেই। গান এখন এক ক্লিকেই চলে আসে। কিন্তু তাঁর কষ্ট-আবহের গান শুনলে সেই পুরোনো সময়টা এখনও ফিরে আসে। হয়তো আইয়ুব বাচ্চুর সবচেয়ে বড় সাফল্য এটাই। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর তৈরি করা সেই কষ্টের ভাষাটা থেকে গেছে।

নিজেকে তৈরি করার এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াটাই আইয়ুব বাচ্চুর গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা যে ‘জনপ্রিয়’ বাচ্চুকে পরে দেখেছি, তা দেখে সেই সংগ্রাম বোঝার উপায় নেই। তাঁর গাওয়া গানের ভাষায় বলতে গেলে, ক্যারিয়ারের প্রথম দুই দশকের আইয়ুব বাচ্চু ‘ভাড়াখাটা গিটারের ভাড়াটে প্রেমিক’। সেই প্রেম পরে তাঁকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে তাঁর গিটার সংগ্রহ নিয়ে পৃথিবীর যেকোনো গিটারিস্ট ঈর্ষা করতে পারেন।

আইয়ুব বাচ্চু যখন এলআরবি তৈরি করলেন, তখন বাংলার ব্যান্ডসংগীতের শ্রবণভাষাতেও পরিবর্তন এল। আগে কী-বোর্ডের প্রাধান্য ছিল বেশি। বাচ্চু সেই জায়গাটা বদলে দিলেন। এল লিড গিটার।

এই যে নতুন সাউন্ডস্কেপ তৈরি হলো, সাংগীতিক কূপমন্ডূকতার বিরুদ্ধে নতুন দিনের বাংলা গানের যে আন্দোলন হলো, সেখানে অন্যতম ফ্রন্টলাইনার আইয়ুব বাচ্চু। এখানে বাচ্চুর আলাদা বিশেষত্ব ছিল। তিনি আন্দোলনকে মূলধারার সঙ্গে সংঘাতে রেখে থামেননি। বরং মূলধারার শ্রোতাকে রকের কাছে নিয়ে এসেছেন।

১৯৯১ সালে নিজের ব্যান্ড এলআরবি প্রতিষ্ঠা করলেন। পরের বছর প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম ডাবল অ্যালবাম। এরপর একের পর এক গান, অ্যালবাম, কনসার্ট। হার্ড রক থেকে মেলোডি, আনপ্লাগড থেকে ব্লুজ—গিটার হাতে তিনি পরীক্ষা করেছেন নিরন্তর।

এখানেই তাঁর সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক অবদানটি দেখি। তিনি রককে বাঙালির আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। বাঙালির কাছে রকের ভাষা অনুবাদ করেছেন। হার্ডরকের গিটার, ব্লুজের বেদনা, বাংলা মেলোডি আর প্রেম-বিরহের পরিচিত অনুভূতিকে এমনভাবে একসঙ্গে এনেছিলেন যে রক আর কেবল কিছু তরুণের ‘বিদেশি’ সংগীত হয়ে থাকেনি।

আইয়ুব বাচ্চুর বড় গুণ ছিল পূর্বতনদের অবদান অস্বীকার না করা। সাক্ষাৎকারে তিনি বারবার আজম খান, নয়ন মুন্সী, নিলয় দাশসহ তাঁর পূর্বসূরি ও সমসাময়িকদের কথা বলেছেন। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া প্রভাব বা তাঁদের অবদান স্বীকার করতে তাঁর কোনো সংকোচ ছিল না।

এই স্বীকার করার সংস্কৃতিটাও উত্তরাধিকারের অংশ। কারণ বড় শিল্পী নিজের চারপাশের সংগীতের ইতিহাসকেও বড় করেন। তিনি তরুণদের সঙ্গে জ্যাম করতে চাইতেন। নতুনদের সঙ্গে বসতেন, কথা বলতেন, আইডিয়া শেয়ার করতেন। স্বপ্ন ছিল গিটার স্কুল করার, যেখানে গিটারের পাশাপাশি অন্য বাদ্যযন্ত্রও শেখানো হবে। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কিন্তু তাঁর গিটারচর্চা, তাঁর কনসার্ট এবং পরবর্তী প্রজন্মের ওপর প্রভাব, সব মিলিয়ে তিনি অনানুষ্ঠানিক স্কুল রেখে গেছেন।

সেই স্কুলের পাঠ্যসূচিতে ছিল তিনটি জিনিস—পরিশ্রম, গিটার আর ‘ফিল’। আর সম্ভবত সেই অনুভূতির সবচেয়ে বড় নাম ছিল ‘কষ্ট’।

তাই আইয়ুব বাচ্চুকে ‘কষ্টের ফেরিওয়ালা’ বললে কম বলা হয়। এমনকি ‘রকস্টার’ বললেও পুরো মানুষটিকে ধরা যায় না। কারণ, পুরো একটা প্রজন্ম তাদের একাকিত্ব, অপ্রাপ্তি, প্রেম আর হারানোর অনুভূতি খুঁজে পেয়েছে সে গানে। সেখানে শিল্পীর ব্যক্তিগত ভাষা হয়ে উঠেছে সমষ্টিগত ভাষা।

আমাদের কষ্টকে তিনি দূর করতে পারেননি। কেউ পারেও না। কিন্তু তাঁর গান কষ্টের সময় আমাদের একা থাকতে দেয়নি। কখনো ‘সেই তুমি’ হয়ে, কখনো ‘ফেরারী মন’ হয়ে, কখনো ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’ হয়ে তিনি পাশে থেকেছে।

আজ সেই ক্যাসেট প্লেয়ার নেই। ফিতার A-পিঠ, B-পিঠ বদলে গান শোনার সেই অভ্যাসও নেই। গান এখন এক ক্লিকেই চলে আসে। কিন্তু তাঁর কষ্ট-আবহের গান শুনলে সেই পুরোনো সময়টা এখনও ফিরে আসে। হয়তো আইয়ুব বাচ্চুর সবচেয়ে বড় সাফল্য এটাই। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর তৈরি করা সেই কষ্টের ভাষাটা থেকে গেছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

‘ভাড়াখাটা গিটারের ভাড়াটে প্রেমিক’ আইয়ুব বাচ্চু ও কষ্ট…কষ্ট…কষ্ট…