রাহাত মিনহাজ

আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এম মনসুর আলী ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৫ আগস্ট সকালে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং দেশজুড়ে সামরিক ও সান্ধ্য আইন জারির পর খুব সম্ভবত প্রাণ সংশয়ে আত্মগোপনে চলে যান এম মনসুর আলীসহ শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের বেশির ভাগ সদস্য। যদিও এর ব্যতিক্রমও কিছু ছিল। কিছু সদস্য আগ্রহ নিয়ে অথবা বাধ্য হয়ে খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভাতেও যোগ দিয়েছিলেন। তবে মোশতাকের মন্ত্রিসভায় জাতীয় চারনেতা বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামান যোগ দেননি। বলাই বাহুল্য, এই চারনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় গণমাধ্যমের উপর সবসময়ই সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রে আকস্মিক ক্ষমতার পালাবদল, হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক সংঘাত ও টানাপোড়নে এই নিয়ন্ত্রণ খুব সম্ভবত আরও বেশি হয়। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর গণমাধ্যমের ওপর যে খন্দকার মোশতাকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ সময় আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নাম ও নিশানা সংবাদপত্রে পাওয়া মুশকিল ছিল। এমনকি শেখ মুজিবুর রহমানের দাফনের খবর সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করতে পারেনি। শুধু দ্য বাংলাদেশ অবজারভার খুব ছোট্ট করে শেখ মুজিবুর রহমানের দাফনের সংবাদ প্রকাশ করেছিল।
১৮ আগস্ট সংবাদপত্রটিতে প্রকাশিত সংবাদটির শিরোনাম ছিল Mujib buried at Tungipara. তবে খুব সম্ভবত এটি সারাবিশ্বের সংক্ষিপ্ততম সংবাদের মধ্যে অন্যতম। কারণ এই সংবাদটি ছিল মাত্র ২৩ শব্দের। যাতে বলা হয়, ‘The body of former President Sheikh Mujibur Rahman was airlifted to Tungipara on Saturday and buried with full honor at his family yard.’ (18th August, 1975, The Bangladesh Observer)। দ্য বাংলাদেশ অবজারভার ছোট্ট আকারে এই সংবাদ প্রকাশ করলেও সে সময় অন্য কোনো সংবাদপত্র এই সংবাদ প্রকাশের সাহস দেখায়নি। আর বলাই বাহুল্য, এতে শেখ মুজিবুর রহমানের কোন ছবি প্রকাশিত হয়নি। এর আগেই বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি নির্দেশনা জারি করে জব্দ করেছিল মোশতাক সরকার।
-ce9e4c.jpeg)
এই যখন বাস্তবতা তখন ১৮ আগস্ট বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোতে ওপরের ছবিটি প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তর (পিআইডি) থেকে সরবরাহ করা ওই ছবিতে দেখা যায় রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে এম মনসুর আলী বৈঠক করছেন। কিন্তু এই ছবি সংশ্লিষ্ট কোনো সংবাদ বিররণী প্রকাশিত হয়নি। দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, দ্য বাংলাদেশ অবজারভার ও দ্য বাংলাদেশ টাইমস ছবিটি প্রকাশ করলেও এর কোনো সংবাদ বিবরণী ছিল না। খুব সম্ভবত এই বৈঠকের ভিডিও চিত্র সে সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনেও সম্প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু বিস্তারিত কোনো বর্ণনা ছিল না। অনেক গবেষক ও ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন, খন্দকার মোশতাক খুব সম্ভবত এম মনসুর আলীকে তাঁর মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রস্তাব যে এম মনসুর আলী গ্রহণ করেনি ইতিহাসই তার সাক্ষ্য দেয়।
-1fa213.jpeg)
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে এই ছবিটি ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেনের। এই ছবিটি তখনকার চারটি সংবাদপত্রেই প্রকাশিত হয়েছিল ২১ আগস্ট ১৯৭৫, দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ভারতীয় প্রতিক্রিয়া নিয়ে মোশতাক সরকারে ভীতি ও শঙ্কা ছিল। কারণ শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ছিল। এছাড়া ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২৫ বছর মেয়াদি ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি। এই চুক্তিতে বিভিন্ন সংকটজনক পরিস্থিতিতে সহযোগিতা বা হস্তক্ষেপ সম্পর্কত নানা ধারা ছিল। তাই শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা ও তাঁর সরকারের উৎখাতের পর ভারতের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে অনেকেই শঙ্কিত ছিলেন।
১৫ আগস্ট ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেন ভারতের দিল্লিতে ছিলেন। বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় ১৮ আগস্ট সড়ক পথে তিনি ঢাকায় পৌছান। এরপর জরুরি কিছু বৈঠক সেরে বঙ্গভবনে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সমর সেন। এই সাক্ষাতের পরই মোশতাক-সমর সেনের এই ছবি প্রকাশিত হয়। ওই একইদিন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টার ও সোভিয়েত রাশিয়ার চার্জ ডি এ্যাফেয়ার্স জি কে গ্লুসেটস্কিও খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এই তিনজনের সঙ্গে সাক্ষাত নিয়ে প্রকাশিত দৈনিক বাংলার সংবাদের শিরোনাম ছিল, বোস্টার সমর সেন ও গ্লুসেটস্কি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেছেন। ওই সংবাদে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মি. ডেভিড ইউজিন বোস্টার গতকাল বুধবার অপরাহ্নে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি কিছু সময় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অবস্থান করেন। বাসস এ খবর দিয়েছে।

এই সংবাদটির পরের দিকে বলা হয়, ঢাকায় নিযুক্ত বন্ধু দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের চার্জ দ্য এ্যাফেয়ার্স মি. জি কে গ্লুসেটস্কি গতকাল মোশতাক আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কিছু সময় অবস্থান করেন। এছাড়া খবরে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার শ্রী সমর সেন গতকাল বুধবার সকালে রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি কিছু সময় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অবস্থান করেন। বাসসের খবরে বলা হয়, মি. সেনেই হচ্ছেন ঘনিষ্ঠতম বন্ধু দেশ, নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকরী বৈদেশিক মিশনের প্রধান। যিনি প্রথম রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। (২১ আগস্ট, ১৯৭৫, দৈনিক বাংলা)
-f5f049.jpeg)
সরকারী সংবাদ সংস্থার সরবরাহ করা এই সংবাদগুলোতে কতটুকু প্রকৃত পরিস্থিতি উঠে এসেছে তা বলা মুশকিল। বিশেষ করে ২০ আগস্ট খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে সোভিয়েত রাশিয়ার চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জি কে গ্লুসেটস্কি ও ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেনের বৈঠকের বিষয় নিয়ে কৌতুহল খুবই স্বাভাবিক। কারণ এই দুই দেশ ছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের পরমবন্ধু ও রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের সমর্থক।
সোভিয়েত রাশিয়ার প্রতিনিধি জি কে গ্লুসেটস্কির সঙ্গে খন্দকার মোশতাকের বৈঠকের বিষয়ে না জানা গেলেও পরের দিকে সমর সেনের সঙ্গে বৈঠকের আলোচ্যসূচি ও বিষয়বস্তু নিয়ে অনেক তথ্য জানা যায়। ২০১১ সালের ১৫ অক্টোবর কলকাতার দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদক মানস ঘোষ এই ঘটনা প্রবাহ নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ওই বৈঠকে সমর সেন মোশতাককে একটি কূটনৈতিক নোট পড়ে শুনিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল, যদি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করা হয় এবং কোনো দেশের সঙ্গে কনফেডারেশন গঠনের চেষ্টা করা হয় তাহলে ভারতের কাছে থাকা বৈধ চুক্তির (বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি) অধীনে ভারতীয় সেনাবাহিনী যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আপনি যদি নাম পরিবর্তন বা তথাকথিত কনফেডারেশন গঠনের ধারণা থেকে বিরত থাকেন তাহলে ভারত ১৫ আগস্ট যা-ই ঘটে থাকুক না কেন, তাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা হিসেবেই বিবেচনা করবে।
উল্লেখ্য ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর বেতারে বাংলাদেশকে ইসলামিক রিপাবলিক হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের অস্বাভাবিক কিছু তৎপরতাও দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু পরের দিকে অজ্ঞাত বাংলাদেশকে আর ইসলামিক রিপাবলিক ঘোষণা করা হয়নি। এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গে অতিমাত্রায় সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কের দিকেও যায়নি খন্দকার মোশতাকের সরকার। হতে পারে এটি ছিল সমর সেনের কূটনৈতিক নোটের প্রভাব। হতে পারে এতে রাশিয়ান চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জি কে গ্লুসেটস্কিরও কোনো ভূমিকা ছিল। কারণ তখন রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে ১৯৭১ সালে স্বাক্ষরিত শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি বহাল ছিল। একে রাশিয়া বা ভারত কোন রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে একো অপরকে সামরিকভাবে সহযোগিতা করার ধারা ছিল।

আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এম মনসুর আলী ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৫ আগস্ট সকালে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং দেশজুড়ে সামরিক ও সান্ধ্য আইন জারির পর খুব সম্ভবত প্রাণ সংশয়ে আত্মগোপনে চলে যান এম মনসুর আলীসহ শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের বেশির ভাগ সদস্য। যদিও এর ব্যতিক্রমও কিছু ছিল। কিছু সদস্য আগ্রহ নিয়ে অথবা বাধ্য হয়ে খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভাতেও যোগ দিয়েছিলেন। তবে মোশতাকের মন্ত্রিসভায় জাতীয় চারনেতা বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামান যোগ দেননি। বলাই বাহুল্য, এই চারনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় গণমাধ্যমের উপর সবসময়ই সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রে আকস্মিক ক্ষমতার পালাবদল, হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক সংঘাত ও টানাপোড়নে এই নিয়ন্ত্রণ খুব সম্ভবত আরও বেশি হয়। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর গণমাধ্যমের ওপর যে খন্দকার মোশতাকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ সময় আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নাম ও নিশানা সংবাদপত্রে পাওয়া মুশকিল ছিল। এমনকি শেখ মুজিবুর রহমানের দাফনের খবর সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করতে পারেনি। শুধু দ্য বাংলাদেশ অবজারভার খুব ছোট্ট করে শেখ মুজিবুর রহমানের দাফনের সংবাদ প্রকাশ করেছিল।
১৮ আগস্ট সংবাদপত্রটিতে প্রকাশিত সংবাদটির শিরোনাম ছিল Mujib buried at Tungipara. তবে খুব সম্ভবত এটি সারাবিশ্বের সংক্ষিপ্ততম সংবাদের মধ্যে অন্যতম। কারণ এই সংবাদটি ছিল মাত্র ২৩ শব্দের। যাতে বলা হয়, ‘The body of former President Sheikh Mujibur Rahman was airlifted to Tungipara on Saturday and buried with full honor at his family yard.’ (18th August, 1975, The Bangladesh Observer)। দ্য বাংলাদেশ অবজারভার ছোট্ট আকারে এই সংবাদ প্রকাশ করলেও সে সময় অন্য কোনো সংবাদপত্র এই সংবাদ প্রকাশের সাহস দেখায়নি। আর বলাই বাহুল্য, এতে শেখ মুজিবুর রহমানের কোন ছবি প্রকাশিত হয়নি। এর আগেই বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি নির্দেশনা জারি করে জব্দ করেছিল মোশতাক সরকার।
-ce9e4c.jpeg)
এই যখন বাস্তবতা তখন ১৮ আগস্ট বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোতে ওপরের ছবিটি প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তর (পিআইডি) থেকে সরবরাহ করা ওই ছবিতে দেখা যায় রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে এম মনসুর আলী বৈঠক করছেন। কিন্তু এই ছবি সংশ্লিষ্ট কোনো সংবাদ বিররণী প্রকাশিত হয়নি। দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, দ্য বাংলাদেশ অবজারভার ও দ্য বাংলাদেশ টাইমস ছবিটি প্রকাশ করলেও এর কোনো সংবাদ বিবরণী ছিল না। খুব সম্ভবত এই বৈঠকের ভিডিও চিত্র সে সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনেও সম্প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু বিস্তারিত কোনো বর্ণনা ছিল না। অনেক গবেষক ও ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন, খন্দকার মোশতাক খুব সম্ভবত এম মনসুর আলীকে তাঁর মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রস্তাব যে এম মনসুর আলী গ্রহণ করেনি ইতিহাসই তার সাক্ষ্য দেয়।
-1fa213.jpeg)
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে এই ছবিটি ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেনের। এই ছবিটি তখনকার চারটি সংবাদপত্রেই প্রকাশিত হয়েছিল ২১ আগস্ট ১৯৭৫, দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ভারতীয় প্রতিক্রিয়া নিয়ে মোশতাক সরকারে ভীতি ও শঙ্কা ছিল। কারণ শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ছিল। এছাড়া ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২৫ বছর মেয়াদি ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি। এই চুক্তিতে বিভিন্ন সংকটজনক পরিস্থিতিতে সহযোগিতা বা হস্তক্ষেপ সম্পর্কত নানা ধারা ছিল। তাই শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা ও তাঁর সরকারের উৎখাতের পর ভারতের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে অনেকেই শঙ্কিত ছিলেন।
১৫ আগস্ট ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেন ভারতের দিল্লিতে ছিলেন। বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় ১৮ আগস্ট সড়ক পথে তিনি ঢাকায় পৌছান। এরপর জরুরি কিছু বৈঠক সেরে বঙ্গভবনে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সমর সেন। এই সাক্ষাতের পরই মোশতাক-সমর সেনের এই ছবি প্রকাশিত হয়। ওই একইদিন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টার ও সোভিয়েত রাশিয়ার চার্জ ডি এ্যাফেয়ার্স জি কে গ্লুসেটস্কিও খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এই তিনজনের সঙ্গে সাক্ষাত নিয়ে প্রকাশিত দৈনিক বাংলার সংবাদের শিরোনাম ছিল, বোস্টার সমর সেন ও গ্লুসেটস্কি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেছেন। ওই সংবাদে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মি. ডেভিড ইউজিন বোস্টার গতকাল বুধবার অপরাহ্নে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি কিছু সময় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অবস্থান করেন। বাসস এ খবর দিয়েছে।

এই সংবাদটির পরের দিকে বলা হয়, ঢাকায় নিযুক্ত বন্ধু দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের চার্জ দ্য এ্যাফেয়ার্স মি. জি কে গ্লুসেটস্কি গতকাল মোশতাক আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কিছু সময় অবস্থান করেন। এছাড়া খবরে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার শ্রী সমর সেন গতকাল বুধবার সকালে রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি কিছু সময় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অবস্থান করেন। বাসসের খবরে বলা হয়, মি. সেনেই হচ্ছেন ঘনিষ্ঠতম বন্ধু দেশ, নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকরী বৈদেশিক মিশনের প্রধান। যিনি প্রথম রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। (২১ আগস্ট, ১৯৭৫, দৈনিক বাংলা)
-f5f049.jpeg)
সরকারী সংবাদ সংস্থার সরবরাহ করা এই সংবাদগুলোতে কতটুকু প্রকৃত পরিস্থিতি উঠে এসেছে তা বলা মুশকিল। বিশেষ করে ২০ আগস্ট খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে সোভিয়েত রাশিয়ার চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জি কে গ্লুসেটস্কি ও ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেনের বৈঠকের বিষয় নিয়ে কৌতুহল খুবই স্বাভাবিক। কারণ এই দুই দেশ ছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের পরমবন্ধু ও রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের সমর্থক।
সোভিয়েত রাশিয়ার প্রতিনিধি জি কে গ্লুসেটস্কির সঙ্গে খন্দকার মোশতাকের বৈঠকের বিষয়ে না জানা গেলেও পরের দিকে সমর সেনের সঙ্গে বৈঠকের আলোচ্যসূচি ও বিষয়বস্তু নিয়ে অনেক তথ্য জানা যায়। ২০১১ সালের ১৫ অক্টোবর কলকাতার দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদক মানস ঘোষ এই ঘটনা প্রবাহ নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ওই বৈঠকে সমর সেন মোশতাককে একটি কূটনৈতিক নোট পড়ে শুনিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল, যদি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করা হয় এবং কোনো দেশের সঙ্গে কনফেডারেশন গঠনের চেষ্টা করা হয় তাহলে ভারতের কাছে থাকা বৈধ চুক্তির (বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি) অধীনে ভারতীয় সেনাবাহিনী যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আপনি যদি নাম পরিবর্তন বা তথাকথিত কনফেডারেশন গঠনের ধারণা থেকে বিরত থাকেন তাহলে ভারত ১৫ আগস্ট যা-ই ঘটে থাকুক না কেন, তাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা হিসেবেই বিবেচনা করবে।
উল্লেখ্য ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর বেতারে বাংলাদেশকে ইসলামিক রিপাবলিক হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের অস্বাভাবিক কিছু তৎপরতাও দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু পরের দিকে অজ্ঞাত বাংলাদেশকে আর ইসলামিক রিপাবলিক ঘোষণা করা হয়নি। এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গে অতিমাত্রায় সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কের দিকেও যায়নি খন্দকার মোশতাকের সরকার। হতে পারে এটি ছিল সমর সেনের কূটনৈতিক নোটের প্রভাব। হতে পারে এতে রাশিয়ান চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জি কে গ্লুসেটস্কিরও কোনো ভূমিকা ছিল। কারণ তখন রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে ১৯৭১ সালে স্বাক্ষরিত শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি বহাল ছিল। একে রাশিয়া বা ভারত কোন রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে একো অপরকে সামরিকভাবে সহযোগিতা করার ধারা ছিল।
.png)

প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো ঢাকা নগরীও এমন অসংখ্য পরিবর্তনের সাক্ষী। একসময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নবাব কিংবা সমাজের উচ্চবিত্তরা ঢাকায় আসেন। তাঁদের সঙ্গে আসেন নানা ধরনের কারিগর, শিল্পী ও পেশাজীবীরাও। ফলে কলকাতা ও উত্তর ভারতের অনেক পেশা একসময় ঢাকায় প্রচলিত ছিল। সময়ের আবর্তে সেই পেশাগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে
০৯ আগস্ট ২০২৬
‘যুদ্ধ’ শব্দটার সঙ্গে আমাদের পরিচয় অনেক দিনের। টিভি খুললেই যুদ্ধের খবর, ফেসবুকে ঢুকলেই ধ্বংসস্তূপ, আগুন আর মানুষের কান্নার ছবি। এত বেশি দেখতে দেখতে আমরা যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিউজফিড স্ক্রল করতে এখন আর আঙুল থেমে যায় না।
০৬ আগস্ট ২০২৬
চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান নিয়ে এরই মধ্যে বেশকিছু গবেষণা হয়েছে। আজকের লেখায় গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী তিনটি গবেষণা নিয়ে আলোচনা করব। গবেষণাগুলোতে এই গণঅভ্যুত্থানকে তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষকরা বিশ্লেষণ করেছেন।
০৫ আগস্ট ২০২৬
১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম প্রকাশিত হয় মঈদুল হাসানের বই ‘মূলধারা ৭১’। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে এর দ্বিতীয় সংস্করণের সপ্তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও বইটির গুরুত্ব কমেনি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছে এটি আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
২৯ জুলাই ২০২৬