ad

সঞ্চয় করতে চান? মেনে চলুন ৫০-৩০-২০ পদ্ধতি

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

৫০-৩০-২০ কী? স্ট্রিম গ্রাফিক

প্রতি মাসের শুরুতেই আমরা অনেকেই ঠিক করি, এবার কিছু টাকা জমাব। বেতন হাতে আসার পর মনে হয়, এই মাসে আর অযথা খরচ নয়। কিন্তু মাস যত গড়াতে থাকে, সেই পরিকল্পনাও ধীরে ধীরে ভুলে যাই। মাস শেষে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা পকেটের দিকে তাকিয়ে দেখা যায়, জমার মতো টাকা আর অবশিষ্ট নেই।

ফলে সঞ্চয়ের পরিকল্পনা আবারও পিছিয়ে যায়। এর সমাধানও আছে। বিশ্বজুড়ে সঞ্চয় ও বাজেট করার জনপ্রিয় পদ্ধতিগুলোর একটি হলো ৫০-৩০-২০ নিয়ম।

৫০-৩০-২০ কী?

৫০-৩০-২০ বাজেটিং নিয়মটি জনপ্রিয় করেন মার্কিন রাজনীতিবিদ ও আইন অধ্যাপক এলিজাবেথ ওয়ারেন এবং তাঁর মেয়ে অ্যামেলিয়া ওয়ারেন টায়াগি। ২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘অল ইওর ওয়ার্থ: দ্য আল্টিমেট লাইফটাইম মানি প্ল্যান’ বইয়ে তাঁরা এই ধারণাটি তুলে ধরেন। যারা নিয়মিত খরচের হিসাব রাখতে পারেন না, তাদের জন্য এটি বেশ কাজে দেয়।

এই নিয়মে আপনার আয় তিন ভাগে ভাগ করা হয়। ৫০ শতাংশ রাখা হয় প্রয়োজনীয় খরচের জন্য, ৩০ শতাংশ বিভিন্ন ইচ্ছা বা চাহিদা পূরণের জন্য এবং বাকি ২০ শতাংশ সঞ্চয় বা ভবিষ্যতের আর্থিক লক্ষ্যের জন্য।

সহজভাবে বললে, আপনি যদি মাসে ৫০ হাজার টাকা হাতে পান, তাহলে আদর্শ হিসেবে ২৫ হাজার টাকা প্রয়োজনীয় খরচে, ১৫ হাজার টাকা বিভিন্ন ইচ্ছা বা চাহিদা পূরণের জন্য এবং ১০ হাজার টাকা সঞ্চয় বা ভবিষ্যতের আর্থিক লক্ষ্যে রাখতে পারেন।

আয় যত কমই হোক, সম্ভব হলে ছোট অঙ্ক দিয়ে সঞ্চয় শুরু করুন। প্রতিদিনের খরচ লিখে রাখুন, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চিহ্নিত করুন এবং নির্দিষ্ট আর্থিক লক্ষ্য ঠিক করুন। আজকের ছোট সঞ্চয়ই ভবিষ্যতে আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি করতে পারে।

তবে এটিকে খুব কঠোর নিয়ম হিসেবে দেখা উচিত নয়। কারও বাসাভাড়া বেশি হতে পারে, কারও সন্তানের পড়াশোনার খরচ বেশি হতে পারে, আবার কারও আয় অনিয়মিত হতে পারে। তাই নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী বাজেট সাজানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাজেট করার আগে প্রথমে প্রতি মাসে আপনার হাতে কত টাকা আসে, সেই হিসাব রাখতে হবে। মূল বেতনের পাশাপাশি অনেকের অন্যান্য নিয়মিত আয়ও থাকে। সেগুলোও হিসাবের মধ্যে এনে বাজেট করা ভালো।

৫০% প্রয়োজনীয় খরচ

৫০-৩০-২০ নিয়মের সবচেয়ে বড় অংশ হলো প্রয়োজনীয় খরচ। এগুলো এমন ব্যয়, যা না করলেই নয়। বাংলাদেশের সাধারণ পরিবারের ক্ষেত্রে এর মধ্যে থাকতে পারে বাসাভাড়া, খাবার, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, ইন্টারনেট, যাতায়াত, চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষার খরচ।

তবে সবার ক্ষেত্রে এই হিসাব মেলানো সহজ নয়। কারও ৫০ হাজার টাকার আয়ের মধ্যে ১৫ হাজার টাকা শুধু বাসাভাড়াতেই চলে যেতে পারে। তখন অন্য খাতে কোথায় খরচ কমানো যায়, তা দেখতে হবে।

ছোট ছোট খরচও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে যাওয়ার আগে তালিকা তৈরি করলে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমানো সম্ভব। ধরুন, একটি পরিবার সপ্তাহের বাজার করতে তালিকা ছাড়াই দোকানে গেল। প্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি স্ন্যাকস, কোমল পানীয় বা অন্য কিছু কিনে ফেলল। মাস শেষে এই ছোট ছোট খরচই বড় অঙ্কে পরিণত হতে পারে।

তাই সপ্তাহের খাবারের পরিকল্পনা করা, বাজারের তালিকা তৈরি করা এবং সম্ভব হলে বাড়িতে রান্না করা খরচ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।

৩০% বিভিন্ন ইচ্ছা বা চাহিদা পূরণের জন্য

জীবন চালাতে শুধু প্রয়োজনীয় খরচই হয় না। নিজের পছন্দ বা চাহিদা পূরণ করতেও কিছু টাকা খরচ হয়। যেমন বন্ধুদের সঙ্গে খেতে যাওয়া, সিনেমা দেখা, ঘোরাঘুরি, অনলাইন শপিং বা বিভিন্ন সাবস্ক্রিপশন। ৫০-৩০-২০ নিয়মে এসব খরচের জন্য মোট আয়ের ৩০ শতাংশ রাখা হয়।

ধরা যাক, মাসিক আয় ৫০ হাজার টাকা। এর ৩০ শতাংশ হলো ১৫ হাজার টাকা। এই টাকা কীভাবে খরচ করবেন, সেটিও আগে থেকে ঠিক করে নিতে পারেন। যেমন রেস্টুরেন্টে খাওয়ার জন্য ৪ হাজার টাকা, ঘোরাঘুরি বা অন্যান্য বিনোদনের জন্য ৩ হাজার টাকা, অনলাইন শপিংয়ের জন্য ৩ হাজার টাকা এবং মোবাইল বা বিভিন্ন সাবস্ক্রিপশনের জন্য ২ হাজার টাকা রাখতে পারেন। বাকি ৩ হাজার টাকা রাখতে পারেন অন্যান্য ব্যক্তিগত খরচের জন্য।

তবে মাস শেষে যা টাকা বেঁচে থাকবে, তা থেকে সঞ্চয় করার চেষ্টা না করে বেতন পাওয়ার পরই নির্দিষ্ট একটি টাকা আলাদা করে রাখা ভালো। কারণ মাস শেষে যত টাকা থাকবে বলে মনে হয়, বাস্তবে অনেক সময় তত টাকা থাকে না।

তবে ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ আছে বলেই পুরো টাকাটা খরচ করতে হবে, এমন নয়। কোনো মাসে যদি ১২ হাজার টাকা খরচ হয়, তাহলে বাকি ৩ হাজার টাকা সঞ্চয়ে যোগ করতে পারেন। আবার কোনো মাসে খরচ ১৫ হাজার টাকার বেশি হয়ে গেলে পরের মাসে তা কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।

ছোট ছোট খরচের হিসাব না রাখলে মাস শেষে বড় অঙ্কের টাকা চলে যেতে পারে। যেমন প্রতিদিন ১৫০ টাকা নাস্তা বা পানীয়তে খরচ করলে মাসে ৪ হাজার ৫০০ টাকা চলে যায়। তাই প্রতিদিনের খরচ লিখে রাখুন। এতে কোন খাতে বেশি টাকা যাচ্ছে, তা সহজেই বুঝতে পারবেন।

২০% সঞ্চয় করুন

৫০-৩০-২০ নিয়মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ২০ শতাংশ সঞ্চয়। কারণ শুধু আয় করলেই হবে না, ভবিষ্যতের জন্য কিছু টাকা আলাদা রাখাও দরকার।

মাসে ৫০ হাজার টাকা আয় হলে ২০ শতাংশ, অর্থাৎ ১০ হাজার টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব। এভাবে এক বছরে জমতে পারে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই অর্থ জরুরি প্রয়োজনে কাজে লাগানো যেতে পারে।

তবে মাস শেষে যা টাকা বেঁচে থাকবে, তা থেকে সঞ্চয় করার চেষ্টা না করে বেতন পাওয়ার পরই নির্দিষ্ট একটি টাকা আলাদা করে রাখা ভালো। কারণ মাস শেষে যত টাকা থাকবে বলে মনে হয়, বাস্তবে অনেক সময় তত টাকা থাকে না।

হঠাৎ অসুস্থতা, চাকরি হারানো বা পরিবারের জরুরি প্রয়োজনে অপ্রত্যাশিত খরচ আসতেই পারে। তাই আলাদা সঞ্চয় থাকা গুরুত্বপূর্ণ। একসঙ্গে বড় অঙ্কের টাকা জমানো সম্ভব না হলেও সমস্যা নেই। মাসে ২ হাজার বা ৫ হাজার টাকা দিয়েও শুরু করা যায়। মূল বিষয় হলো, নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করা।

এই নিয়ম কি স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে?

অনেকে মনে করেন, হিসাব করে খরচ করলে জীবনের আনন্দ কমে যাবে। আসলে বিষয়টি তার উল্টো। বাজেট আপনাকে নিজের সামর্থ্যের মধ্যে থেকে আনন্দ করার সুযোগ দেয়।

আপনি যদি জানেন, প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা বিনোদনের জন্য রাখা আছে, তাহলে সেই টাকা খরচ করার সময় দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। তবে এক মাসের বাজেট পরের মাসে হুবহু একই থাকবে, এমন নয়। আয় বাড়তে পারে, বাসাভাড়া বাড়তে পারে, নতুন কোনো প্রয়োজন তৈরি হতে পারে। তাই প্রতি মাসের শেষে বসে দেখুন, কোথায় বেশি খরচ হয়েছে এবং পরের মাসে কোথায় পরিবর্তন আনা যায়।

আয় যত কমই হোক, সম্ভব হলে ছোট অঙ্ক দিয়ে সঞ্চয় শুরু করুন। প্রতিদিনের খরচ লিখে রাখুন, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চিহ্নিত করুন এবং নির্দিষ্ট আর্থিক লক্ষ্য ঠিক করুন। আজকের ছোট সঞ্চয়ই ভবিষ্যতে আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি করতে পারে।

তাই বাজেট করার সবচেয়ে ভালো সময় ‘আগামী মাস’ নয়, এখনই।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

সঞ্চয় করতে চান? মেনে চলুন ৫০-৩০-২০ পদ্ধতি