বাপ্পী খান

গান গেয়ে ভেবেছিলাম অনেক কিছু করে ফেলব। কিন্তু সরকারি টিভির এক দালালকে উৎকোচ দিতে হবে বলে আমার গান প্রচারিত হলো না। সে সময় এর খুব চল ছিল। হতাশ হয়ে একসময় গান গাওয়া প্রায় বন্ধই করে দিলাম। তবে সারগামে আড্ডা চলতে থাকল।
তখন আশিকুজ্জামান টুলু ভাই, বাচ্চু ভাই, জেমস ভাই আর ফাল্টি ভাইয়ের সঙ্গে আমার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সেই সময় এলআরবির প্রথম ডাবল অ্যালবামের কাজ প্রায় শেষের দিকে। জেমস ভাইয়ের সুরে ‘ম্যানিলা: পেনফ্রেন্ড’ নামে একটি গান লিখেছিলাম অন্য এক শিল্পীর জন্য। একদিন বাচ্চু ভাই সেই গানের রেকর্ডিংয়ে এসে গানটি শুনলেন।
শুনে তিনি জেমস ভাইকে বললেন, ‘ভালো হয়েছে তো। এটা কার লেখা?’
জেমস ভাই বললেন, ‘এই যে, বাপ্পীর লেখা। ব্যাটাকে জোর করে গান লেখালাম। গায়ক থেকে গীতিকার। হা হা হা।’
কিছুক্ষণ বসে থাকার পর বাচ্চু ভাই আমাকে ডাকলেন। সারগামে একটি ছোট কক্ষ ছিল। সাধারণত বাদল ভাই সেটি ব্যবহার করতেন। জরুরি আলাপের জন্যও কখনো কখনো ঘরটি ব্যবহার করা হতো। আমি সেখানে গেলাম।
বাচ্চু ভাই বললেন, ‘এলআরবির গান রেকর্ড চলছে। তুই গান দে।’
আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। আমি গান লিখব? বললাম, ‘গান তো নেই।’
বাচ্চু ভাই বললেন, ‘কবিতা আছে?’
বললাম, ‘আছে কিছু।’
তিনি বললেন, ‘কালকে নিয়ে আয়।’
সেদিন রাতে আমার অবস্থা খারাপ। বাচ্চু ভাইকে গান দিতে হবে! আমার নিজের সোলো অ্যালবামে আমার লেখা আটটি গান ছিল। সেগুলো প্রয়োজন থেকে কিংবা অতি আবেগে লেখা। কিন্তু বাচ্চু ভাইকে গান দিতে হবে, বিষয়টা আমার কাছে বিস্ময়কর লাগছিল।
আমার দুটি কবিতার খাতা ছিল। একটিতে রোমান্টিক কবিতা, অন্যটিতে সাধারণ জীবনের নানা বিষয় নিয়ে লেখা। ভাবলাম, সবাই তো রোমান্টিক গান করে। আমি অন্য ধরনের কিছু করি। অর্থাৎ রোমান্টিক না করাটাকেই একরকম স্টাইল ধরে নিলাম।
বাস্তব, জীবনঘন, আত্মিক, কাল্পনিক, কল্পকথা এসবের একটা কবিতার খাতা পরের দিন বিকেলে সারগামে নিয়ে গেলাম। বাচ্চু ভাইকে পেলাম না। ফারুক বা ফরিদের কাছে খাতাটা রেখে আসলাম।
অনেক রাতে বাচ্চু ভাই বাসায় ফোন করে বললেন, ‘এটা তুই কী করলি?’
আমি বললাম, ‘কী?’
তিনি হেসে বললেন, ‘কালকে ছয়টায় সারগাম আয়।’
আমি তো নানা কথা ভাবতে শুরু করলাম। মনে হলো, লেখা এতই আজব হয়েছে যে বাচ্চু ভাই হয়তো পছন্দ করেননি। পরের দিন সারগামে গেলাম। বাচ্চু ভাই আমার মাথায় আলতো করে হাত রেখে হাসলেন। ব্যান্ডের স্বপন ভাই, জয় ভাই আর টুটুলও অন্যরকম করে তাকাচ্ছিলেন। এরপর এলআরবির রেকর্ডিং সেশনে ঢোকার সৌভাগ্য হলো।
এবার আমার হার্টফেল করার পালা। সেদিন রেকর্ড হলো ‘পেনশন। আমার চোখে আনন্দের অশ্রু। আমার লেখা কবিতা যে এভাবে গান হয়ে উঠতে পারে, সেটা কখনো ভাবিনি। যাক, সেখান থেকেই শুরু।
এই অ্যালবামে আরও দুটি গান ছিল আমার—‘জীবনের মানে’ ও ‘এক কাপ’। তারপর দিনগুলো কীভাবে কেটে গেছে, তা ঠিক বোঝাতে পারব না। ১৯৯২, ১৯৯৩ ও ১৯৯৪, এই তিন বছর আমি আর বাচ্চু ভাই প্রায় প্রতিদিনই গান নিয়ে বসেছি। আমাদের একটা ‘সং ব্যাংক’ ছিল। কে গান গাইবে, কোন প্রোডাকশনে যাবে, এসবের কোনো হিসাব না করে আমরা শুধু গান জমাতাম। এই তিন বছরেই আমরা দুজনে প্রায় অর্ধশত গান বেঁধেছিলাম।
এক বছর কাজ করার পর ‘সং ব্যাংক’-এ প্রায় দুই ডজন গান জমা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক ডজনই ছিল আমার লেখা। ডাবল অ্যালবাম নিয়ে সারগামের পক্ষ থেকে যে প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল, তারা সেগুলো পূরণ করতে পারেনি। তাই আমরা একটু নাখোশই ছিলাম।
এর মধ্যে একটি মিক্সড অ্যালবামের সূত্রে সাউন্ডটেকের বাবুল ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তিনি এলআরবির অ্যালবাম করার জন্য বাচ্চু ভাইকে অনেক অনুরোধ করছিলেন। কিন্তু বাচ্চু ভাই তখন রাজি হচ্ছিলেন না। সারগামের বাইরে অ্যালবাম করার বিষয়েও তাঁর কিছুটা দ্বিধা ছিল।
আমি বাচ্চু ভাইকে সাহস দিলাম। বললাম, ‘গান তো রেডি। প্রযোজক যে-ই হোক, গান ভালো হলে চলবে।’ বাচ্চু ভাই শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন।

একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে বসে আমাদের কথা চূড়ান্ত হলো। বাচ্চু ভাই শর্ত দিলেন, অ্যালবামে কোনো ফোক গান থাকবে না। তখন অ্যালবামে অন্তত একটি ফোক গান রাখা প্রায় অলিখিত নিয়মের মতো ছিল। বাবুল ভাই সেই শর্তে রাজি হলেন।
এরপর সাউন্ডটেকের সঙ্গে তখনকার সময়ের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিকে চুক্তি চূড়ান্ত হলো। অবশ্য তখন সবকিছুই ছিল মুখের কথায়। লিখিত কোনো চুক্তি করার চল তেমন ছিল না।
তারপর শুরু হলো গান বাছাই। ‘সং ব্যাংক’ থেকে একে একে গান বাছাই করতে শুরু করলাম।
‘মানুষ বনাম অমানুষ’-এর পর ট্র্যাকের ওপর প্রথম গান লিখলাম ‘ক্ষণিকের জন্য’। তখন আমরা খুব বেশি পিংক ফ্লয়েড শুনতাম। তাই অ্যালবামটিতে পিংক ফ্লয়েডের মিউজিকের একটি পরিচ্ছন্ন প্রভাব ছিল। রজার্সও ছিলেন আমাদের খুব প্রিয় গীতিকবি। তাঁর চিন্তাভাবনাগুলো যেন আমাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে উঠে আসে, সেই চেষ্টাও ছিল।
সেখান থেকেই ‘সুখ’। আসলে ‘সুখ’-কে শুধু একটি গান বললে কম বলা হবে। এটিকে বরং গীতিকল্প বলা যায়। আমাকে যে পরিমাণ স্বাধীনতা আইয়ুব বাচ্চু দিয়েছিলেন, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।
একদিন প্যাডে প্র্যাকটিস চলছিল। আমি সেখানে ঢুকে মুচকি হাসছিলাম। বাচ্চু ভাই বললেন, ‘কী এনেছিস, দে।’ আমি খাতাটা এগিয়ে দিলাম।
সেখানে লেখা ছিল:
‘গতকাল রাতে বিবেক আমার
স্বপ্নের কড়া নেড়ে
করল জিজ্ঞেস
আমায় ছাড়া আর কত দিন রবে?’
বাচ্চু ভাই কিছুক্ষণ চিন্তায় ডুবে রইলেন। তারপর আমাকে বললেন, ‘বাপ্পী, এটা কেমনে গান হবে? বাদ দে।’ আমি বললাম, ‘হবে। হবে।’ একটা হাসি দিলাম। দৃষ্টিতে ভরসা দিলাম।
বাচ্চু ভাই টুটুলকে বললেন, ‘ই মেজর ধর তো।’ সম্ভবত ই মেজরই ছিল। আমি চোখ বুজলাম। বাচ্চু ভাইয়ের হাতে যে কী ম্যাজিক ছিল! তাঁকে যতবার গিটার বাজাতে দেখেছি, বাংলাদেশের আর কাউকে এত সুন্দর গিটার বাজাতে দেখিনি। বিশ্বেও এমন গিটারিস্ট খুব কম দেখেছি। এক ঘণ্টার মধ্যেই গান তৈরি হয়ে গেল।
রেকর্ডিং হওয়ার কথা অডিও আর্টে। সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন আজম বাবু ভাই। কোনো এক কারণে মেশিন ড্রাম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। আমি একটু আপত্তি করছিলাম। বাচ্চু ভাই বললেন, আরে শোন না আগে, মেশিন মনে হলে বাদ দিবো। শেষ পর্যন্ত ‘সুখ’ অ্যালবামের পুরো ড্রামস বাচ্চু ভাই নিজেই একটি ভাড়া করা রোল্যান্ড ড্রাম মেশিনে প্রোগ্রাম করেছিলেন।
‘আমি যে কার’ লিরিকটি বাচ্চু ভাইয়ের খুব পছন্দের ছিল। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, জীবনে যত লিরিক নিয়ে কাজ করেছেন, তার মধ্যে এটিই তাঁর সবচেয়ে প্রিয়।

গান গেয়ে ভেবেছিলাম অনেক কিছু করে ফেলব। কিন্তু সরকারি টিভির এক দালালকে উৎকোচ দিতে হবে বলে আমার গান প্রচারিত হলো না। সে সময় এর খুব চল ছিল। হতাশ হয়ে একসময় গান গাওয়া প্রায় বন্ধই করে দিলাম। তবে সারগামে আড্ডা চলতে থাকল।
তখন আশিকুজ্জামান টুলু ভাই, বাচ্চু ভাই, জেমস ভাই আর ফাল্টি ভাইয়ের সঙ্গে আমার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সেই সময় এলআরবির প্রথম ডাবল অ্যালবামের কাজ প্রায় শেষের দিকে। জেমস ভাইয়ের সুরে ‘ম্যানিলা: পেনফ্রেন্ড’ নামে একটি গান লিখেছিলাম অন্য এক শিল্পীর জন্য। একদিন বাচ্চু ভাই সেই গানের রেকর্ডিংয়ে এসে গানটি শুনলেন।
শুনে তিনি জেমস ভাইকে বললেন, ‘ভালো হয়েছে তো। এটা কার লেখা?’
জেমস ভাই বললেন, ‘এই যে, বাপ্পীর লেখা। ব্যাটাকে জোর করে গান লেখালাম। গায়ক থেকে গীতিকার। হা হা হা।’
কিছুক্ষণ বসে থাকার পর বাচ্চু ভাই আমাকে ডাকলেন। সারগামে একটি ছোট কক্ষ ছিল। সাধারণত বাদল ভাই সেটি ব্যবহার করতেন। জরুরি আলাপের জন্যও কখনো কখনো ঘরটি ব্যবহার করা হতো। আমি সেখানে গেলাম।
বাচ্চু ভাই বললেন, ‘এলআরবির গান রেকর্ড চলছে। তুই গান দে।’
আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। আমি গান লিখব? বললাম, ‘গান তো নেই।’
বাচ্চু ভাই বললেন, ‘কবিতা আছে?’
বললাম, ‘আছে কিছু।’
তিনি বললেন, ‘কালকে নিয়ে আয়।’
সেদিন রাতে আমার অবস্থা খারাপ। বাচ্চু ভাইকে গান দিতে হবে! আমার নিজের সোলো অ্যালবামে আমার লেখা আটটি গান ছিল। সেগুলো প্রয়োজন থেকে কিংবা অতি আবেগে লেখা। কিন্তু বাচ্চু ভাইকে গান দিতে হবে, বিষয়টা আমার কাছে বিস্ময়কর লাগছিল।
আমার দুটি কবিতার খাতা ছিল। একটিতে রোমান্টিক কবিতা, অন্যটিতে সাধারণ জীবনের নানা বিষয় নিয়ে লেখা। ভাবলাম, সবাই তো রোমান্টিক গান করে। আমি অন্য ধরনের কিছু করি। অর্থাৎ রোমান্টিক না করাটাকেই একরকম স্টাইল ধরে নিলাম।
বাস্তব, জীবনঘন, আত্মিক, কাল্পনিক, কল্পকথা এসবের একটা কবিতার খাতা পরের দিন বিকেলে সারগামে নিয়ে গেলাম। বাচ্চু ভাইকে পেলাম না। ফারুক বা ফরিদের কাছে খাতাটা রেখে আসলাম।
অনেক রাতে বাচ্চু ভাই বাসায় ফোন করে বললেন, ‘এটা তুই কী করলি?’
আমি বললাম, ‘কী?’
তিনি হেসে বললেন, ‘কালকে ছয়টায় সারগাম আয়।’
আমি তো নানা কথা ভাবতে শুরু করলাম। মনে হলো, লেখা এতই আজব হয়েছে যে বাচ্চু ভাই হয়তো পছন্দ করেননি। পরের দিন সারগামে গেলাম। বাচ্চু ভাই আমার মাথায় আলতো করে হাত রেখে হাসলেন। ব্যান্ডের স্বপন ভাই, জয় ভাই আর টুটুলও অন্যরকম করে তাকাচ্ছিলেন। এরপর এলআরবির রেকর্ডিং সেশনে ঢোকার সৌভাগ্য হলো।
এবার আমার হার্টফেল করার পালা। সেদিন রেকর্ড হলো ‘পেনশন। আমার চোখে আনন্দের অশ্রু। আমার লেখা কবিতা যে এভাবে গান হয়ে উঠতে পারে, সেটা কখনো ভাবিনি। যাক, সেখান থেকেই শুরু।
এই অ্যালবামে আরও দুটি গান ছিল আমার—‘জীবনের মানে’ ও ‘এক কাপ’। তারপর দিনগুলো কীভাবে কেটে গেছে, তা ঠিক বোঝাতে পারব না। ১৯৯২, ১৯৯৩ ও ১৯৯৪, এই তিন বছর আমি আর বাচ্চু ভাই প্রায় প্রতিদিনই গান নিয়ে বসেছি। আমাদের একটা ‘সং ব্যাংক’ ছিল। কে গান গাইবে, কোন প্রোডাকশনে যাবে, এসবের কোনো হিসাব না করে আমরা শুধু গান জমাতাম। এই তিন বছরেই আমরা দুজনে প্রায় অর্ধশত গান বেঁধেছিলাম।
এক বছর কাজ করার পর ‘সং ব্যাংক’-এ প্রায় দুই ডজন গান জমা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক ডজনই ছিল আমার লেখা। ডাবল অ্যালবাম নিয়ে সারগামের পক্ষ থেকে যে প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল, তারা সেগুলো পূরণ করতে পারেনি। তাই আমরা একটু নাখোশই ছিলাম।
এর মধ্যে একটি মিক্সড অ্যালবামের সূত্রে সাউন্ডটেকের বাবুল ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তিনি এলআরবির অ্যালবাম করার জন্য বাচ্চু ভাইকে অনেক অনুরোধ করছিলেন। কিন্তু বাচ্চু ভাই তখন রাজি হচ্ছিলেন না। সারগামের বাইরে অ্যালবাম করার বিষয়েও তাঁর কিছুটা দ্বিধা ছিল।
আমি বাচ্চু ভাইকে সাহস দিলাম। বললাম, ‘গান তো রেডি। প্রযোজক যে-ই হোক, গান ভালো হলে চলবে।’ বাচ্চু ভাই শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন।

একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে বসে আমাদের কথা চূড়ান্ত হলো। বাচ্চু ভাই শর্ত দিলেন, অ্যালবামে কোনো ফোক গান থাকবে না। তখন অ্যালবামে অন্তত একটি ফোক গান রাখা প্রায় অলিখিত নিয়মের মতো ছিল। বাবুল ভাই সেই শর্তে রাজি হলেন।
এরপর সাউন্ডটেকের সঙ্গে তখনকার সময়ের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিকে চুক্তি চূড়ান্ত হলো। অবশ্য তখন সবকিছুই ছিল মুখের কথায়। লিখিত কোনো চুক্তি করার চল তেমন ছিল না।
তারপর শুরু হলো গান বাছাই। ‘সং ব্যাংক’ থেকে একে একে গান বাছাই করতে শুরু করলাম।
‘মানুষ বনাম অমানুষ’-এর পর ট্র্যাকের ওপর প্রথম গান লিখলাম ‘ক্ষণিকের জন্য’। তখন আমরা খুব বেশি পিংক ফ্লয়েড শুনতাম। তাই অ্যালবামটিতে পিংক ফ্লয়েডের মিউজিকের একটি পরিচ্ছন্ন প্রভাব ছিল। রজার্সও ছিলেন আমাদের খুব প্রিয় গীতিকবি। তাঁর চিন্তাভাবনাগুলো যেন আমাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে উঠে আসে, সেই চেষ্টাও ছিল।
সেখান থেকেই ‘সুখ’। আসলে ‘সুখ’-কে শুধু একটি গান বললে কম বলা হবে। এটিকে বরং গীতিকল্প বলা যায়। আমাকে যে পরিমাণ স্বাধীনতা আইয়ুব বাচ্চু দিয়েছিলেন, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।
একদিন প্যাডে প্র্যাকটিস চলছিল। আমি সেখানে ঢুকে মুচকি হাসছিলাম। বাচ্চু ভাই বললেন, ‘কী এনেছিস, দে।’ আমি খাতাটা এগিয়ে দিলাম।
সেখানে লেখা ছিল:
‘গতকাল রাতে বিবেক আমার
স্বপ্নের কড়া নেড়ে
করল জিজ্ঞেস
আমায় ছাড়া আর কত দিন রবে?’
বাচ্চু ভাই কিছুক্ষণ চিন্তায় ডুবে রইলেন। তারপর আমাকে বললেন, ‘বাপ্পী, এটা কেমনে গান হবে? বাদ দে।’ আমি বললাম, ‘হবে। হবে।’ একটা হাসি দিলাম। দৃষ্টিতে ভরসা দিলাম।
বাচ্চু ভাই টুটুলকে বললেন, ‘ই মেজর ধর তো।’ সম্ভবত ই মেজরই ছিল। আমি চোখ বুজলাম। বাচ্চু ভাইয়ের হাতে যে কী ম্যাজিক ছিল! তাঁকে যতবার গিটার বাজাতে দেখেছি, বাংলাদেশের আর কাউকে এত সুন্দর গিটার বাজাতে দেখিনি। বিশ্বেও এমন গিটারিস্ট খুব কম দেখেছি। এক ঘণ্টার মধ্যেই গান তৈরি হয়ে গেল।
রেকর্ডিং হওয়ার কথা অডিও আর্টে। সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন আজম বাবু ভাই। কোনো এক কারণে মেশিন ড্রাম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। আমি একটু আপত্তি করছিলাম। বাচ্চু ভাই বললেন, আরে শোন না আগে, মেশিন মনে হলে বাদ দিবো। শেষ পর্যন্ত ‘সুখ’ অ্যালবামের পুরো ড্রামস বাচ্চু ভাই নিজেই একটি ভাড়া করা রোল্যান্ড ড্রাম মেশিনে প্রোগ্রাম করেছিলেন।
‘আমি যে কার’ লিরিকটি বাচ্চু ভাইয়ের খুব পছন্দের ছিল। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, জীবনে যত লিরিক নিয়ে কাজ করেছেন, তার মধ্যে এটিই তাঁর সবচেয়ে প্রিয়।
.png)
-0f0520.jpeg)
গীতিকারের সঙ্গে সুরকারের একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বছরের পর বছর গান তৈরির সেই অভিন্ন যাত্রায়, সৃষ্টির খোঁজে, সময়ের পরিভ্রমণে সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। সেই যাত্রাপথে সবকিছু সাফল্যের মোড়কে আসে না। আমার কাছে তাই আইয়ুব বাচ্চুর প্রস্থান শুধু একজন রক লিজেন্ড কিংবা বাংলাদেশের রকের মহানায়কের প্রস্থান নয়
৫ ঘণ্টা আগে
রেলে ‘হরতাল’ ‘হরতাল’ একটা রব উঠেছে! সে খবর ইঞ্জিন, লাইন, ঘণ্টা, সিগন্যাল এদের কাছেও পৌঁছে গেছে। তাই এরা একটা সভা ডাকল। মস্ত সভা। পূর্ণিমার দিন রাত দুটোয় অস্পষ্ট মেঘে ঢাকা চাঁদের আলোর নীচে সবাই জড়ো হল। হাঁপাতে হাঁপাতে বিশালবপু সভাপতি ইঞ্জিন মশাই এলেন। তাঁর লেট হয়ে গেছে।
১৫ আগস্ট ২০২৬
বন্ধুমহলে নাম শুনেছিলুম আগেই; চোখে দেখলুম লেক-লগ্ন একটি ক্লাবের বাইশে শ্রাবণের অনুষ্ঠানে। উজ্জ্বল আলোয়, সুবেশ, চিক্কণ এবং সাধারণত কাব্য সম্বন্ধে উদাসীন মেয়ে পুরুষের ভিড়ের মধ্যে কালো একটি ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে, বেশ চেঁচিয়ে, বেশ স্পষ্ট ক’রে রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে নিজের লেখা একটি কবিতা পড়লো।
১৫ আগস্ট ২০২৬
কম করে হলেও এক হাজার বছর ধরে কবিতা লিখছে বাংলাভাষী মানুষ; এ অঞ্চলে জন্মেছেন অগণিত ভাবমূর্তিসম্পন্ন কবি। উপাধিপ্রবণ বাঙালি কবিসমাজ তৈরি করে নিয়েছে নানা ধরনের উপাধি—‘কবিকঙ্কন’, ‘বিশ্বকবি’, ‘বিদ্রোহী কবি’, ‘পল্লীকবি’, ‘রূপসী বাংলার কবি’। তবে ‘কিশোর-কবি’ অভিধা পেয়েছেন মূলত একজনই—সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬