আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের মৃত্যুদিন। বাংলা ভাষার এই জাদুকর কবি আমাদের যা দিয়ে গেছেন, তা কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের বা গোষ্ঠীর নয়, বরং সমগ্র বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। আজ যখন আমরা তাঁকে পাঠ করব, তখন সব ধরণের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক চশমা খুলে রেখে পাঠ করা উচিত।
স্ট্রিম ডেস্ক

বাংলা কবিতার বিশাল ভুবনে আল মাহমুদ এক অবিস্মরণীয় নাম। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে তাঁর আবির্ভাব, আর ২০১৯ সালে প্রস্থান। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি বাংলা সাহিত্যকে যা দিয়েছেন, তা এক কথায় অতুলনীয়। বিশেষ করে তাঁর অমর সৃষ্টি ‘সোনালি কাবিন’ তাঁকে পাঠকের মনে স্থায়ী আসন দিয়েছে।
তবে আল মাহমুদের সাহিত্যজীবনকে শুধু একটি কাব্য দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁর কবিতায় গ্রামবাংলা, লোকজ ঐতিহ্য, প্রেম, রাজনীতি এবং পরবর্তীতে ধর্ম ও বিশ্বাসের যে বিবর্তন দেখা যায়, তা তাঁকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আল মাহমুদের সাহিত্যজীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে ধরা হয় ‘সোনালি কাবিন’ সনেটগুচ্ছকে। এটি কেবল কিছু প্রেমের কবিতা নয়। এটি বাঙালির আত্মপরিচয় খোঁজার এক মহাকাব্যিক প্রকল্পও। কবি এখানে নায়ক, কিন্তু তাঁর কোনো কুলগৌরব নেই। তিনি নিজেকে ‘চাষার দুক্ষু’ বা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।
‘সোনালি কাবিন’-এ কবি হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্যের শেকড় সন্ধান করেছেন। তিনি আর্যদের অভিজাত সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করে অনার্য বা সাধারণ মানুষের সংস্কৃতিকে সামনে এনেছেন। কবিতায় তিনি বেহুলা-লখিন্দরের মিথ ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তা প্রচলিত অর্থে নয়। এখানে বেহুলা কেবল সতী নারী নন, তিনি জীবনসংগ্রামের প্রতীক। লখিন্দরের সাপের কামড় আর বেহুলার সংগ্রাম যেন বাঙালির হাজার বছরের টিকে থাকার লড়াইয়েরই রূপক।
এই কাব্যে দেনমোহর বা কাবিন ছাড়া প্রেমিকা বা স্ত্রীকে গ্রহণ করার যে প্রস্তাব কবি দিয়েছেন, তা অত্যন্ত বৈপ্লবিক। এটি কেবল দারিদ্র্যের প্রকাশ নয়, বরং নারী-পুরুষের সম্পর্কের এক নতুন সমতার ইঙ্গিত। যেখানে অর্থের বিনিময়ে নয়, বরং প্রেম ও বিশ্বাসেই গড়ে উঠবে দাম্পত্য। এখানে নারীর শরীর ও প্রেমকে তিনি প্রকৃতির অনুষঙ্গ হিসেবে দেখেছেন। তিনি গ্রামীণ শব্দ, লোকজ উপমা এবং মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের ভাষাকে এমনভাবে কাব্যে স্থান দিয়েছেন, যা বাংলা কবিতায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
ষাটের উত্তাল সময়ে যখন বাঙালির আত্মপরিচয়ের আন্দোলন বা জাতীয়তাবাদী চেতনা রাজনীতির মাঠ গরম করছে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় বৈপ্লবিক রসায়ন ঘটিয়েছিলেন। তিনি তৎকালীন প্রচলিত স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতির বাইরে গিয়ে জাতীয়তাবাদকে দেখলেন মেহনতি মানুষের মুক্তির চশমায়। তাঁর কবিতায় মার্কসবাদ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ একে অপরের হাত ধরে এমনভাবে উঠে এল যে, মনে হলো একটি ছাড়া অন্যটি অচল। এই মিশ্রণটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও অদ্ভুত, কারণ সেখানে পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের যাপিত জীবনের দর্শনই ছিল প্রধান।
‘সোনালি কাবিন’ সনেটগুচ্ছের গভীরে তাকালে দেখা যায়, কবি সচেতনভাবে নিজেকে এবং তাঁর জাতিকে ‘শোষিত’ শ্রেণি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। মার্কসবাদের মূল কথা—শ্রেণিসংগ্রাম ও সম্পদের সুষম বণ্টন—আল মাহমুদের কবিতায় তাত্ত্বিক জটিলতা এড়িয়ে সহজ কৃষিজীবী মানুষের ভাষায় উঠে এসেছে। তিনি যখন বলেন, ‘আমাদের ধর্ম ফসলের সুষম বণ্টন’, তখন তিনি আসলে সমাজতন্ত্রের সারকথাটিই বলে দেন।
আল মাহমুদ যখন লেখালেখি শুরু করেন, তখন বাংলা কবিতায় কলকাতার আধুনিকতার প্রবল প্রভাব ছিল। বুদ্ধদেব বসু বা জীবনানন্দ দাশের কবিতার ঢং নকল করাই ছিল তখন আধুনিক হওয়ার লক্ষণ। কিন্তু আল মাহমুদ সেই পথে হাঁটেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) মানুষের ভাষা, প্রকৃতি এবং জীবনযাপন কলকাতার থেকে আলাদা।
তিনি সচেতনভাবে তাঁর কবিতায় আঞ্চলিক শব্দ, গ্রামীণ অনুষঙ্গ এবং ইসলামি ঐতিহ্যের শব্দাবলী ব্যবহার করতে শুরু করেন। ‘আনাজ’, ‘জেয়র’, ‘মরদ’, ‘খোয়াড়’, ‘ঠিলা’-এর মতো শব্দগুলো তিনি কবিতার আভিজাত্যের ভেতরে এমনভাবে গেঁথে দিলেন যে, তা আর গ্রাম্য মনে হলো না, বরং হয়ে উঠল আমাদের নিজস্ব আধুনিকতা। তিনি প্রমাণ করলেন, নিজের শেকড়কে অস্বীকার করে মহৎ কবিতা লেখা যায় না। জসীমউদ্দীন গ্রামের কথা বললেও আল মাহমুদ গ্রামের সেই জীবনকে আধুনিক কবিতার ফ্রেমে বন্দি করে তাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছিলেন।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আল মাহমুদের কবিতায় বড় পরিবর্তন আসে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি জেল খাটার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং তাঁর চিন্তাজগতে ধর্ম ও বিশ্বাসের এক প্রবল স্রোত প্রবেশ করে। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’, ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’, ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’—এই কাব্যগ্রন্থগুলোতে তিনি ইসলামি মিথ, ইতিহাস এবং বিশ্বাসের কথা বলতে শুরু করেন।
বাংলাদেশের সাহিত্য সমালোচকদের একটি বড় অংশ তখন তাঁকে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বা ‘মৌলবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, আল মাহমুদ প্রগতিশীলতা থেকে সরে গেছেন। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তিনি আসলে তাঁর আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানেই নিমগ্ন ছিলেন। এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত দার্শনিক বিবর্তন।
একজন কবি কি কেবল আজীবন একই ধরণের কবিতা লিখবেন? টিএস এলিয়ট কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি তাঁদের কবিতায় ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা আনতে পারেন, তবে আল মাহমুদ কেন পারবেন না? তিনি তাঁর কবিতায় ‘হেরা পর্বত’, ‘আল্লার কসম’, ‘জেহাদ’ বা ‘মদিনার অনুষঙ্গ’ এনেছেন কারণ এগুলো তাঁর যাপিত জীবনের ও সংস্কৃতির অংশ। একজন সৎ কবি তাঁর বিশ্বাসের কথা অকপটে বলবেন, এটাই স্বাভাবিক। আল মাহমুদের শেষের দিকের কবিতায় রাজনীতি ও ধর্মের উপস্থিতি থাকলেও, সেখানে কবিত্বের কমতি ছিল না। বরং তিনি ‘বাংলাদেশি মুসলমানের’ সাংস্কৃতিক পরিচয়টিকেই কবিতায় রূপ দিতে চেয়েছিলেন।
বাংলাদেশের সাহিত্যজগৎ দীর্ঘদিন ধরে ‘প্রগতিশীল’ ও ‘প্রতিক্রিয়াশীল’—এই দুই শিবিরে বিভক্ত। এই বিভাজনের কারণে আল মাহমুদের সাহিত্যকর্মের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাহত হয়েছে। আশির দশকের পর থেকে ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ আল মাহমুদকে একপ্রকার কোণঠাসা করে রেখেছিল। মনে করা হতো, তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী বা সাম্প্রদায়িক। অথচ তাঁর কবিতায় বাংলাদেশের মাটি, মানুষ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার (বিশেষ করে গ্রামবাংলার মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা) উপস্থিতি সব সময়ই ছিল।
তাঁর ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ বা পরবর্তী কাব্যগুলোতে তিনি যখন আফগানিস্তান বা মুসলিম বিশ্বের কষ্টের কথা বলেছেন, তখন তা মানবিক জায়গা থেকেই বলেছেন। তিনি যখন বলেন, ‘হত্যাকারীদের কোনো মানচিত্র থাকে না’, তখন তিনি শোষকের বিরুদ্ধেই কথা বলেন। কিন্তু আমাদের সাহিত্যিক রাজনীতির চশমায় তাঁকে ভিন্নভাবে দেখা হয়েছে। অথচ তিনি ছিলেন সেই কবি, যিনি সাহসের সাথে বলেছিলেন, ‘পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা।’
আল মাহমুদকে কেবল ‘সোনালি কাবিন’-এর কবি বা কেবল ‘পরবর্তী জীবনের বিশ্বাসী কবি’ হিসেবে খণ্ডিতভাবে দেখা উচিত নয়। তিনি ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ কবিসত্তা। তাঁর জীবনের প্রথম ভাগে তিনি যেমন প্রেম, কাম এবং সাম্যবাদের কথা বলেছেন, শেষ জীবনে তিনি তেমনি বিশ্বাস, পরকাল এবং নিজের সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যের কথা বলেছেন। এই দুই মিলিয়েই আল মাহমুদ।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, কী করে মাটির কাছাকাছি থেকেও আকাশের দিকে তাকানো যায়। তিনি দেখিয়েছেন, আধুনিক হতে হলে নিজের ধর্ম বা সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিতে হয় না। বাংলা ভাষার এই জাদুকর কবি আমাদের যা দিয়ে গেছেন, তা কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের বা গোষ্ঠীর নয়, বরং সমগ্র বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। আজ যখন আমরা তাঁকে পাঠ করব, তখন সব ধরণের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক চশমা খুলে রেখে পাঠ করা উচিত। তবেই আমরা আবিষ্কার করতে পারব সেই প্রেমিক ও দ্রোহী কবিকে, যিনি বলেছিলেন—
‘বসন বিদার করে নেচে ওঠো মরণের পাশে
নিটোল তোমার মুদ্রা পাল্টে দিক বাঁচার নিয়ম।’
(আল মাহমুদকে নিয়ে স্ট্রিমে প্রকাশিত দুটি লেখা অবলম্বনে)

বাংলা কবিতার বিশাল ভুবনে আল মাহমুদ এক অবিস্মরণীয় নাম। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে তাঁর আবির্ভাব, আর ২০১৯ সালে প্রস্থান। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি বাংলা সাহিত্যকে যা দিয়েছেন, তা এক কথায় অতুলনীয়। বিশেষ করে তাঁর অমর সৃষ্টি ‘সোনালি কাবিন’ তাঁকে পাঠকের মনে স্থায়ী আসন দিয়েছে।
তবে আল মাহমুদের সাহিত্যজীবনকে শুধু একটি কাব্য দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁর কবিতায় গ্রামবাংলা, লোকজ ঐতিহ্য, প্রেম, রাজনীতি এবং পরবর্তীতে ধর্ম ও বিশ্বাসের যে বিবর্তন দেখা যায়, তা তাঁকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আল মাহমুদের সাহিত্যজীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে ধরা হয় ‘সোনালি কাবিন’ সনেটগুচ্ছকে। এটি কেবল কিছু প্রেমের কবিতা নয়। এটি বাঙালির আত্মপরিচয় খোঁজার এক মহাকাব্যিক প্রকল্পও। কবি এখানে নায়ক, কিন্তু তাঁর কোনো কুলগৌরব নেই। তিনি নিজেকে ‘চাষার দুক্ষু’ বা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।
‘সোনালি কাবিন’-এ কবি হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্যের শেকড় সন্ধান করেছেন। তিনি আর্যদের অভিজাত সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করে অনার্য বা সাধারণ মানুষের সংস্কৃতিকে সামনে এনেছেন। কবিতায় তিনি বেহুলা-লখিন্দরের মিথ ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তা প্রচলিত অর্থে নয়। এখানে বেহুলা কেবল সতী নারী নন, তিনি জীবনসংগ্রামের প্রতীক। লখিন্দরের সাপের কামড় আর বেহুলার সংগ্রাম যেন বাঙালির হাজার বছরের টিকে থাকার লড়াইয়েরই রূপক।
এই কাব্যে দেনমোহর বা কাবিন ছাড়া প্রেমিকা বা স্ত্রীকে গ্রহণ করার যে প্রস্তাব কবি দিয়েছেন, তা অত্যন্ত বৈপ্লবিক। এটি কেবল দারিদ্র্যের প্রকাশ নয়, বরং নারী-পুরুষের সম্পর্কের এক নতুন সমতার ইঙ্গিত। যেখানে অর্থের বিনিময়ে নয়, বরং প্রেম ও বিশ্বাসেই গড়ে উঠবে দাম্পত্য। এখানে নারীর শরীর ও প্রেমকে তিনি প্রকৃতির অনুষঙ্গ হিসেবে দেখেছেন। তিনি গ্রামীণ শব্দ, লোকজ উপমা এবং মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের ভাষাকে এমনভাবে কাব্যে স্থান দিয়েছেন, যা বাংলা কবিতায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
ষাটের উত্তাল সময়ে যখন বাঙালির আত্মপরিচয়ের আন্দোলন বা জাতীয়তাবাদী চেতনা রাজনীতির মাঠ গরম করছে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় বৈপ্লবিক রসায়ন ঘটিয়েছিলেন। তিনি তৎকালীন প্রচলিত স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতির বাইরে গিয়ে জাতীয়তাবাদকে দেখলেন মেহনতি মানুষের মুক্তির চশমায়। তাঁর কবিতায় মার্কসবাদ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ একে অপরের হাত ধরে এমনভাবে উঠে এল যে, মনে হলো একটি ছাড়া অন্যটি অচল। এই মিশ্রণটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও অদ্ভুত, কারণ সেখানে পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের যাপিত জীবনের দর্শনই ছিল প্রধান।
‘সোনালি কাবিন’ সনেটগুচ্ছের গভীরে তাকালে দেখা যায়, কবি সচেতনভাবে নিজেকে এবং তাঁর জাতিকে ‘শোষিত’ শ্রেণি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। মার্কসবাদের মূল কথা—শ্রেণিসংগ্রাম ও সম্পদের সুষম বণ্টন—আল মাহমুদের কবিতায় তাত্ত্বিক জটিলতা এড়িয়ে সহজ কৃষিজীবী মানুষের ভাষায় উঠে এসেছে। তিনি যখন বলেন, ‘আমাদের ধর্ম ফসলের সুষম বণ্টন’, তখন তিনি আসলে সমাজতন্ত্রের সারকথাটিই বলে দেন।
আল মাহমুদ যখন লেখালেখি শুরু করেন, তখন বাংলা কবিতায় কলকাতার আধুনিকতার প্রবল প্রভাব ছিল। বুদ্ধদেব বসু বা জীবনানন্দ দাশের কবিতার ঢং নকল করাই ছিল তখন আধুনিক হওয়ার লক্ষণ। কিন্তু আল মাহমুদ সেই পথে হাঁটেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) মানুষের ভাষা, প্রকৃতি এবং জীবনযাপন কলকাতার থেকে আলাদা।
তিনি সচেতনভাবে তাঁর কবিতায় আঞ্চলিক শব্দ, গ্রামীণ অনুষঙ্গ এবং ইসলামি ঐতিহ্যের শব্দাবলী ব্যবহার করতে শুরু করেন। ‘আনাজ’, ‘জেয়র’, ‘মরদ’, ‘খোয়াড়’, ‘ঠিলা’-এর মতো শব্দগুলো তিনি কবিতার আভিজাত্যের ভেতরে এমনভাবে গেঁথে দিলেন যে, তা আর গ্রাম্য মনে হলো না, বরং হয়ে উঠল আমাদের নিজস্ব আধুনিকতা। তিনি প্রমাণ করলেন, নিজের শেকড়কে অস্বীকার করে মহৎ কবিতা লেখা যায় না। জসীমউদ্দীন গ্রামের কথা বললেও আল মাহমুদ গ্রামের সেই জীবনকে আধুনিক কবিতার ফ্রেমে বন্দি করে তাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছিলেন।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আল মাহমুদের কবিতায় বড় পরিবর্তন আসে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি জেল খাটার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং তাঁর চিন্তাজগতে ধর্ম ও বিশ্বাসের এক প্রবল স্রোত প্রবেশ করে। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’, ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’, ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’—এই কাব্যগ্রন্থগুলোতে তিনি ইসলামি মিথ, ইতিহাস এবং বিশ্বাসের কথা বলতে শুরু করেন।
বাংলাদেশের সাহিত্য সমালোচকদের একটি বড় অংশ তখন তাঁকে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বা ‘মৌলবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, আল মাহমুদ প্রগতিশীলতা থেকে সরে গেছেন। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তিনি আসলে তাঁর আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানেই নিমগ্ন ছিলেন। এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত দার্শনিক বিবর্তন।
একজন কবি কি কেবল আজীবন একই ধরণের কবিতা লিখবেন? টিএস এলিয়ট কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি তাঁদের কবিতায় ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা আনতে পারেন, তবে আল মাহমুদ কেন পারবেন না? তিনি তাঁর কবিতায় ‘হেরা পর্বত’, ‘আল্লার কসম’, ‘জেহাদ’ বা ‘মদিনার অনুষঙ্গ’ এনেছেন কারণ এগুলো তাঁর যাপিত জীবনের ও সংস্কৃতির অংশ। একজন সৎ কবি তাঁর বিশ্বাসের কথা অকপটে বলবেন, এটাই স্বাভাবিক। আল মাহমুদের শেষের দিকের কবিতায় রাজনীতি ও ধর্মের উপস্থিতি থাকলেও, সেখানে কবিত্বের কমতি ছিল না। বরং তিনি ‘বাংলাদেশি মুসলমানের’ সাংস্কৃতিক পরিচয়টিকেই কবিতায় রূপ দিতে চেয়েছিলেন।
বাংলাদেশের সাহিত্যজগৎ দীর্ঘদিন ধরে ‘প্রগতিশীল’ ও ‘প্রতিক্রিয়াশীল’—এই দুই শিবিরে বিভক্ত। এই বিভাজনের কারণে আল মাহমুদের সাহিত্যকর্মের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাহত হয়েছে। আশির দশকের পর থেকে ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ আল মাহমুদকে একপ্রকার কোণঠাসা করে রেখেছিল। মনে করা হতো, তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী বা সাম্প্রদায়িক। অথচ তাঁর কবিতায় বাংলাদেশের মাটি, মানুষ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার (বিশেষ করে গ্রামবাংলার মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা) উপস্থিতি সব সময়ই ছিল।
তাঁর ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ বা পরবর্তী কাব্যগুলোতে তিনি যখন আফগানিস্তান বা মুসলিম বিশ্বের কষ্টের কথা বলেছেন, তখন তা মানবিক জায়গা থেকেই বলেছেন। তিনি যখন বলেন, ‘হত্যাকারীদের কোনো মানচিত্র থাকে না’, তখন তিনি শোষকের বিরুদ্ধেই কথা বলেন। কিন্তু আমাদের সাহিত্যিক রাজনীতির চশমায় তাঁকে ভিন্নভাবে দেখা হয়েছে। অথচ তিনি ছিলেন সেই কবি, যিনি সাহসের সাথে বলেছিলেন, ‘পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা।’
আল মাহমুদকে কেবল ‘সোনালি কাবিন’-এর কবি বা কেবল ‘পরবর্তী জীবনের বিশ্বাসী কবি’ হিসেবে খণ্ডিতভাবে দেখা উচিত নয়। তিনি ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ কবিসত্তা। তাঁর জীবনের প্রথম ভাগে তিনি যেমন প্রেম, কাম এবং সাম্যবাদের কথা বলেছেন, শেষ জীবনে তিনি তেমনি বিশ্বাস, পরকাল এবং নিজের সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যের কথা বলেছেন। এই দুই মিলিয়েই আল মাহমুদ।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, কী করে মাটির কাছাকাছি থেকেও আকাশের দিকে তাকানো যায়। তিনি দেখিয়েছেন, আধুনিক হতে হলে নিজের ধর্ম বা সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিতে হয় না। বাংলা ভাষার এই জাদুকর কবি আমাদের যা দিয়ে গেছেন, তা কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের বা গোষ্ঠীর নয়, বরং সমগ্র বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। আজ যখন আমরা তাঁকে পাঠ করব, তখন সব ধরণের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক চশমা খুলে রেখে পাঠ করা উচিত। তবেই আমরা আবিষ্কার করতে পারব সেই প্রেমিক ও দ্রোহী কবিকে, যিনি বলেছিলেন—
‘বসন বিদার করে নেচে ওঠো মরণের পাশে
নিটোল তোমার মুদ্রা পাল্টে দিক বাঁচার নিয়ম।’
(আল মাহমুদকে নিয়ে স্ট্রিমে প্রকাশিত দুটি লেখা অবলম্বনে)

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জন্মদিন ছিল ১২ ফেব্রুয়ারি। ‘মানুষের দমিত স্পৃহা ও শাণিত সংকল্পকে আবর্জনার ভেতর থেকে খুঁজে বের করে আনার’ কথা বলেছিলেন তিনি। এটাই তাঁর সাহিত্যের বিশেষ দিক।
২৯ মিনিট আগে
ভালোবাসা মানে যার কাছে ঋণী, তাকে স্বীকার করা। যে নীরবে রক্ষা করে, তাকে কৃতজ্ঞতা জানানো। এই বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে তাই ভালোবাসার তালিকায় থাকুক সুন্দরবনও।
১ দিন আগে
১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে পহেলা ফাল্গুন কিংবা ভালবাসা দিবস হিসেবেই আমরা জানি। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে আমাদের ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানেন না, ১৯৮৩ সালের এই দিনটি ছিল বাংলাদেশের ছাত্র সমাজের জন্য এক অগ্নিঝরা দিন।
১ দিন আগে
আজ পহেলা ফাল্গুন। বসন্তের প্রথম দিন। শীতের জীর্ণতা সরিয়ে প্রকৃতিতে লেগেছে নতুনের ছোঁয়া। বসন্তে প্রকৃতিতে ঠিক কী কী পরিবর্তন হয়? আর বসন্তের সঙ্গে মনের কোনো সম্পর্ক আছে কি?
১ দিন আগে