মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ
আসলাম আহসান

যে মন কখনো বেসেছে ভালো
এ বরষা তারে করবে উতল
স্মৃতির তটিনী বইবে উজানে
কাজলধারা ঘুমাতে দেবে না।
জলের সাধারণ ধর্ম অনুযায়ী নদী চিরকাল ভাটার দিকে প্রবাহিত হলেও যমুনা একবার ধর্মচ্যুত হয়েছিল। যমুনা উজানে প্রবাহিত হয়েছিল একবার, রাধার বিরহে। এটা জনশ্রুতি। মেহেদী হাসানের (১৯২৭—২০১২) নাম উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে আমাদের স্মৃতির তটিনী উজানে বইতে শুরু করে—এ অনুভূতিকে জনশ্রুতি বলার সুযোগ নেই। ১৩ জুন ২০১২ তাঁর চলে যাওয়ার খবরটা লক্ষ-কোটি ভক্তের মনে সেদিন অনুরণন তুলেছিল এই প্রগাঢ় বিষাদ। মেহেদী হাসানের যথার্থ স্ফূর্তি ঘটেছিল উর্দু গজল ও ফিল্মের গানে। বাংলা গান তাঁর কণ্ঠে অল্প কিছু। যা আছে তাও সর্বত্র সুলভ নয়। তবু, হাতেগোনা এই গান ক’টিতেই সেই অপার্থিব সুরসুধার আস্বাদ পেয়ে যাই আমরা। এই লেখা বঙ্গভূমি তথা বাংলা গানে মেহেদী হাসানের বিচরণক্ষেত্রটিতে আলো ফেলার চেষ্টা।
মোহনলাল দাশ (১৯২৬-১৯৭৪) এ গানটি স্থানীয় কল্যাণী ঘোষকে দিয়ে গাইয়েছিলেন প্রথমে। বাসনা ছিল যদি উঁচু মার্গের কোনো শিল্পীর কণ্ঠে তুলে দেওয়ার। সে সুযোগ আসে ১৯৬৭ সালে। সে বছর চট্টগ্রাম বেতারের আমন্ত্রণে সর্বপ্রথম মেহেদী হাসান এসেছিলেন চট্টগ্রামে, এই বাংলায়। সঙ্গে এসেছিলেন ইকবাল বানু, ফরিদা খানম, সুরাইয়া মুলতানী কর প্রমুখ। মূলত তাঁদের আগমনের পর থেকে এই ভূখণ্ডে গজল অঙ্গের গান জনপ্রিয় হতে শুরু করে। স্মরণীয় এই গানের নেপথ্য কারিগর আশরাফ-উজ-জামান খান (১৯১০—২০০৮)। কর্মমুখর বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই মানুষটি যখন পেশোয়ার বেতারে আঞ্চলিক পরিচালক পদে কর্মরত, তখন থেকেই তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল মেহেদী হাসানের। বর্ণিত সময়ে তিনি চট্টগ্রাম বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক। মূলত তাঁরই আগ্রহ ও উদ্যোগে বেতারে মেহেদী হাসানের কণ্ঠে বাংলা গান রেকর্ড করার ব্যবস্থা করা হয় প্রথমবারের মতো। মোহনলাল দাশের কথা ও সুরে চট্টগ্রাম বেতারে প্রচারিত গানটি ছিল— ‘হারানো দিনের কথা মনে পড়ে যায়’। এ গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল পরে। একই সময়ে আশরাফ-উজ-জামান খানের কথা ও সুরে মেহেদী হাসান আরেকটি বাংলা গান গেয়েছিলেন—‘কেন এত ভালো লাগে তাহারে আমার/ গড়েছে সে কোন বিধি রূপছবি তার’। হারানো দিনের কথা এবং এ গানের সুরের আদল প্রায় অভিন্ন। পর্যাপ্ত প্রচারের অভাবে শ্রবণসুখকর এ গানটি খুব বেশি সংখ্যক শ্রোতা শুনতে পাননি।
পণ্ডিত বারীন মজুমদারের কলেজ অব মিউজিক-এর উদ্যোগে ‘নিখিল পাকিস্তান সঙ্গীত সম্মেলনে’ যোগ দিতে ১৯৭০ সালে বাংলায় আসেন মেহেদী হাসান। ‘শ্রুতিতে স্মৃতিতে বারীন মজুমদার’ গ্রন্থে ইলা মজুমদার লিখেছেন সেই রোমাঞ্চকর মুহূর্তের কথা:
‘মনে পড়ে ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত ‘নিখিল পাকিস্তান সঙ্গীত সম্মেলন’-এর তোলপাড় করা আনন্দ-উদ্দীপনার দিনগুলো। যখন ওস্তাদ নাযাকত—সালামত, ওস্তাদ আমানত—ফতেহ, মেহেদী হাসান, ফরিদা খানম, খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করছেন, আমাদের সম্মেলনে যোগ দিতে এসে মুগ্ধ হলেন কলেজ অব মিউজিক-এর শিল্পমনস্ক মানুষগুলোর সরল সহজ অন্তরের স্পর্শে।’
উল্লেখ্য, শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানাতে কামাল লোহানী পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। সঙ্গীত কলেজের তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে আয়োজিত উক্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে। কলেজ অব মিউজিক-এর নিজস্ব ভবনেও মেহেদী হাসান সঙ্গীত পরিবেশন করেন।
রাজা সাহেব (১৯৮২) ছবিতে মেহেদী হাসানের গাওয়া ঢাকো যত না নয়ন দুহাতে বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে এক অবিস্মরণীয় গান। গানটির নেপথ্যকথা জানতে আলাপ করি এ গানের সুরকার সঙ্গীত পরিচালক আলী হোসেনের সঙ্গে। অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় আলী হোসেন জানান, ঢাকো যত না নয়ন দুহাতে গানটি আলী হোসেনের সুরে মেহেদী হাসান প্রথমত গেয়েছিলেন উর্দুতে বাজুবন্দ ছবির জন্য যে ছবিটি শেষ পর্যন্ত অসমাপ্ত থেকে যায়। মূল উর্দু গানটির গীতিকার ছিলেন আখতার ইউসুফ। গানটি ছিল এরকম—যবভী চলেঙ্গে শাওন কি ঝোঁকে / কালি ঘাটা তুঝে সোনে না দেগি। বাজুবন্দ ছবির নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ ছবির সহপ্রযোজক সার্জেন্ট ফরিদ তার প্রযোজিত পরবর্তী ছবি রাজাসাহেব-এ গানটি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন।
উর্দু গানটির ভাব অবলম্বনে তখন বাংলা গানের বাণী রচনা করেন ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। বাংলা ও উর্দু দুটি গানেরই রেকর্ডিং হয়েছিল লাহোরে। উর্দু ছবিটি মুক্তি না পাওয়ায় ‘ঢাকো যত না নয়ন দুহাতে’ গানটির উর্দু ভার্সন কালি ঘাটা তুঝে সোনে না দেগি গানটি শ্রোতাদের কাছে থেকে যায় অশ্রুত, রেকর্ডিং হওয়া সত্ত্বেও। লাহোরের ওই স্টুডিওতে আজও কি রক্ষিত আছে সেই গান? কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহে? রাজাসাহেব ছবিতে উক্ত গানে ঠোঁট মেলান নায়ক আলমগীর। নায়িকা ছিলেন রোজিনা। গানের সাথে দৃশ্যায়ন হয়েছিল দৃষ্টিনন্দন। গান শুরুর ঠিক আগে নায়ক-নায়িকার কথোপকথন:
—আমাকে তুমি বলে ডাকো।
—তুমি!
দয়িতকে প্রথম বারের মতো তুমি সম্বোধন করার লজ্জায় জড়সড় নায়িকা দুহাতে চোখ ঢেকে ফেলে। (বাইরে তখন অঝোর ধারায় ঝরছে বৃষ্টি। বাতাসের মত্ত ঝাপটার সাথে লড়ছে গাছের ডালপালা।) তখনই গান শুরু—প্রথমে তালবিহীন, ধীর লয়ে: ঢাকো যত না নয়ন দুহাতে। গানে গানে সে কি মধুর মিনতি প্রেমিকের: দুহাতে চোখ ঢেকে ঘুমানোর চেষ্টা তুমি যতই করো, বৃথা। ভেজা হাওয়া তোমাকে ঘুমাতে দেবে না। উর্দু ছবির বর্ষণমুখর রাতের গানগুলো যেন মেহেদী হাসানের কণ্ঠেই মানাত বেশি। রিমঝিম কি বরষাত হ্যায় (বেটি ১৯৬৪), এ্যায় জান এ বাহারান তুঝে কালি ঘাটা সোনে না দেগি (নাজমা ১৯৭০), ভিগি ভিগি রাতমে (ওয়াদা ১৯৭৬)... অপূর্ব সব গান।
১৯৮৫ সালে প্রথম বারের মতো বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় সার্ক সম্মেলন। এ উপলক্ষে মেহেদী হাসানসহ সার্কভুক্ত দেশের শিল্পীদের এক নক্ষত্র সমাবেশ ঘটেছিল ঢাকায়। সে বছর মেহেদী হাসান ওসমানী মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অন্যান্য গানের পাশাপাশি পরিবেশন করেন একটি বাংলা গান—তুমি যে আমার ভালোবাসা যে গানটি কিছুদিন আগেই তিনি রেকর্ড করেছিলেন জান্নাত দোযখ ছবির জন্য। সম্ভবত উক্ত অনুষ্ঠানে গাওয়া গানটি উপস্থিত কোনো শ্রোতা কোনোভাবে সরাসরি রেকর্ড করেছিলেন, যে কারণে বর্তমানে প্রাপ্ত এ গানটির সাউন্ড কোয়ালিটি ভালো নয়। এ অনুষ্ঠানেই প্রথমবারের মতো মেহেদী হাসান তাঁর পুত্র আসিফ হাসানকে এদেশের শ্রোতাদের কাছে শিল্পী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।
ডাবল ভার্সন ছবি জান্নাত দোযখ-এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালের দিকে। এ ছবিতে ব্যবহারের জন্য পাকিস্তানি সুরকার এ. হামিদের সুরে সুবল দাশের সঙ্গীত পরিচালনায় মেহেদী হাসানের কণ্ঠে দুটি গান রেকর্ড করা হয় খান আতাউর রহমানের মগবাজারস্থ শ্রুতি স্টুডিওতে। গান দুটি হলো:
১। তুমি যে আমার ভালোবাসা
কথা: মাসুদ করিম, সুর: এ. হামিদ, শিল্পী: মেহেদী হাসান, সাবিনা ইয়াসমিন
২। সুখেরই স্বপ্ন কে ভেঙে দিল
কথা : মাসুদ করিম, সুর: এ. হামিদ, শিল্পী: মেহেদী হাসান ও রুনা লায়লা (দ্বৈত)
প্রত্যক্ষদর্শী সজল দাশ (সুবল দাশের ছেলে) জানান, রেকর্ডিংয়ের দিন মেহেদী হাসানকে এক নজর দেখার জন্য শ্রুতি স্টুডিওর আশপাশে জড়ো হয়েছিল হাজার হাজার মানুষ। দুঃখের বিষয়, উর্দু ছবিটি শেষ পর্যন্ত নির্মিত হয়নি। মুক্তি পায়নি বাংলা ছবিটিও। তবে ২০০৬ সালে বিসর্জন নামে একটি ছবি মুক্তি পায় যাতে তুমি যে আমার ভালোবাসা গানটি সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ব্যবহৃত হয়েছে। (তাহলে কি জান্নাত দোযখ ছবিটিরই নাম পরিবর্তন করে বিসর্জন নামে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল?) সজল দাশ জানিয়েছেন, গান দুটি তার কাছে এক সময় ক্যাসেটে ধারণ করা ছিল। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
সুখেরই স্বপ্ন কে ভেঙে দিল গানে মেহেদী হাসান আর রুনা লায়লার কণ্ঠের যুগলবন্দিটা কেমন হয়েছিল, আজ আর তা জানার উপায় নেই। আক্ষেপ জাগে, এমন সৃষ্টি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেল এত অল্প সময়ের ব্যবধানে। আমাদের দায়িত্ববোধ!
ব্যক্তিগতভাবে বহু অনুসন্ধান করেও মেহেদী হাসানের কণ্ঠে রেকর্ডকৃত তুমি যে আমার ভালোবাসা’র মূল ভার্সনের হদিস পাইনি, পাওয়া যায়নি এর উর্দু ভার্সন মেরে জিন্দেগী মেরে পাস আ গানটিও। পাকিস্তানের কোনো এক জলসায় মেহেদী হাসানের লাইভ গাওয়া মেরে জিন্দেগী মেরে পাস আ গানটি অবশ্য পাওয়া যায়।
ধীর আলী মিয়ার জন্মজয়ন্তীতে যোগ দিতে এসে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন মেহেদী হাসান। কাছাকাছি সময়ে তিনি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বিএআরসি (বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ সেন্টার)-এর নিজস্ব অডিটোরিয়ামে যা ফার্মগেট পুলিশ বক্সের পেছনে অবস্থিত। সন্ধ্যার পর শুরু হয়েছিল অনুষ্ঠান। টানা দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা গেয়েছিলেন তিনি। সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ওস্তাদ আখতার সাদমানী, পণ্ডিত বারীন মজুমদার, শেখ রিয়াজ উদ্দিন বাদশাসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ।
এ অনুষ্ঠানে এক কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন নায়িকা অঞ্জু ঘোষ। হারমোনিয়াম বাজিয়ে মেহেদী হাসান গেয়ে চলেছেন। বেজ গিটার বাজাচ্ছেন রিচার্ড হ্যানরি কিশোর, তবলায় খোদা নেওয়াজ খান। মেহেদী হাসানের সুরলহরীতে অঞ্জু এতটাই মুগ্ধ ও আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন যে, হঠাৎ কোনো ঘোষণা ছাড়াই তিনি মঞ্চে উঠে পড়েন এবং শিল্পীকে জানান যে, তিনি তাঁকে একটি আংটি উপহার দিতে চান এবং আংটিটি তিনি তা নিজ হাতে শিল্পীকে পরিয়ে দেবেন। অপ্রস্তুত মেহেদী হাসান আংটি নিতে সম্মত হলেও হাতে পরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তিনি অস্বস্তি বোধ করতে থাকেন। ওদিকে অঞ্জুও নাছোড়বান্দা—আংটি তিনি নিজ হাতেই পরাবেন। এই দোটানার মধ্যে হঠাৎ আংটিটি হাত ফসকে পড়ে যায়। শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। অডিটোরিয়াম ভর্তি উৎসুক দর্শক-শ্রোতা তাকিয়ে, কী হয় কী হয়...
নাহ্, পড়ল তো পড়লই, আংটি আর পাওয়া যায়নি। হতাশ অঞ্জু আসনে ফিরে গেলেন। মেহেদী হাসান ফিরে গেলেন তাঁর পরিবেশনায়। অঞ্জুকে ধন্যবাদ জানালেন শিল্পী এবং তাৎক্ষণিকভাবে একটি শায়রি বললেন যার অর্থ এরকম— যা হারিয়ে গেছে, তাকে যেতে দাও। ধরে নাও তা তোমার তকদিরে ছিল না।
সেবার তিনি আমন্ত্রিত হয়েছেন ঢাকা ক্লাবে, প্রেসক্লাবে। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের আমন্ত্রণে কয়েকটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করেন। পুরান ঢাকার চকবাজারের উর্দুভাষীদের আমন্ত্রণে মেহেদী হাসান সেখানেও সঙ্গীত পরিবেশন করেন। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের রজতজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে মেহেদী হাসানের পরিবেশনা এখনো আমাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
যদি গাইতেন, কেমন শোনাত মেহেদী হাসানের কণ্ঠে নজরুলের গজলাঙ্গের গানগুলো? বাংলাভাষী নন উপমহাদেশের এমন অনেক বিখ্যাত শিল্পী নজরুল সঙ্গীত গেয়েছেন। তালাত মাহমুদ গেয়েছেন নিশি ভোর হলো জাগিয়া, আসল যখন ফুলের ফাগুন। নজরুলের গান নিয়ে পুরো অ্যালবাম করেছেন আশা ভোসলে, মোহাম্মদ রফি। হেমন্তের মতো রবীন্দ্রনিমগ্ন শিল্পীও গেয়েছেন নজরুলের দুটি গান। মেহেদী হাসান নজরুলের গান গাইবেন, সেরকম অনুকূল একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল করাচি বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসে ১৯৬৪ সালে। এবার সে প্রসঙ্গ, আসাদুল হকের স্মৃতিকথার সূত্র ধরে:
‘লুৎফর ভাই (শেখ লুৎফর রহমান) অজানা কারণে আমাকে পছন্দ করতেন। তা বুঝতে পারতাম তাঁর পক্ষপাতিত্বে। তিনি বেশ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর দায়িত্ব দিনের আমার উপর, যার বেশির ভাগ তারই সম্পন্ন করার কথা। তেমনি মহররমের রেকর্ডের জন্য গান নির্বাচনের দায়িত্ব দিলেন আমাকে। বিশেষ করে নজরুলের ইসলামী গান। তিনি আমাকে বললেন, “আসাদ গান নির্বাচন করো এবং প্রয়োজনে শিল্পীদের শেখাও। দেখো যেন কোনো হিন্দুয়ানি কথা না থাকে গানের বাণীতে।” আমি সতর্ক হয়েই ১০টি গান বাছাই করলাম। রিহার্সেল শুরু হলো। শেখ লুৎফর রহমান, আমি (আসাদুল হক), মনসুর আহমেদ, দীনা লায়লা, লায়লা এমদাদ (রুনা ও দীনা লায়লার মা), মেহেদী হাসানসহ আরও কয়েকজন, সবার নাম মনে নেই। তার মধ্যে একটি গানের কথা আমার এ মুহূর্তে মনে পড়ছে—“মহররমের চাঁদ এলো রে কাঁদাতে ফের দুনিয়ায়।” বাকি গানগুলোর কথা মনে নেই। কারণ এ গানটিতেই মেহেদী হাসানের উচ্চারণ সমস্যা প্রকটভাবে দেখা দিয়েছিল। অসম্ভব সুন্দর ভরাট গলা, সুরেলা আওয়াজ, কিন্তু উচ্চারণের ত্রুটির জন্য সব গুণই ম্লান হয়ে যাচ্ছিল।’
শেখ লুৎফর রহমান আসাদুল হককে দায়িত্ব দিয়েছিলেন মেহেদী হাসানকে শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ শেখানোর। নিষ্ঠাবান শিল্পী বারবার চেষ্টায় শুধরে নিলেন ত্রুটি। কিন্তু উর্দু ও হিন্দিভাষীদের বাংলা উচ্চারণে যে সাধারণ সমস্যা, তা রয়েই গেল তাঁর উচ্চারণে। চাঁদকে ‘চান্দ’, কাঁদাতেকে ‘কান্দাতে’ বলতে লাগলেন তিনি বারবার। প্রায় ঘণ্টাখানেক চেষ্টায় সে ত্রুটিও শোধরানো গেল। ১০টি গান প্রস্তুত করা হলো। সবগুলো গানই সমবেত কণ্ঠে। শিল্পীদের এমনভাবে বসানো হয়েছিল যাতে মেহেদী হাসানের কণ্ঠই প্রাধান্য পায়। কিন্তু মেহেদী হাসানের আর গাওয়া হয়ে ওঠেনি সে গান। সমস্ত প্রস্তুতি যখন সম্পন্ন, তখনই লাহোর থেকে এক সিনেমার পরিচালক এসে হাজির। তিনি আসেন তার নির্মীয়মান সিনেমায় একটি গজলাঙ্গের গান গাওয়ার প্রস্তাব নিয়ে। পরিচালকের সঙ্গে তখনই চলে যেতে হলো শিল্পীকে। পরবর্তীকালে অবশ্য করাচি বেতারে মেহেদী হাসানের কণ্ঠে নজরুলের কয়েকটি ইসলামী গান প্রচারিত হয়।
পরশে তাহার সোনা হলো যারা
মেহেদী হাসান অননুকরণীয় স্টাইল অনুকরণ-অনুসরণের চেষ্টা করেছেন কেউ কেউ। ভারতের তালাত আজিজ, হরিহরণ মেহেদী হাসানের একনিষ্ঠ অনুসারী। রুনা লায়লার গায়কীতে মেহেদী হাসানের প্রভাব আছে। আরিফুল ইসলাম মিঠুর গায়কী মেহেদী হাসানের কণ্ঠকেই মনে করিয়ে দেয়। ১৯৯৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারিতে বাজারে আসা যে অ্যালবামটি দিয়ে মিঠুর যাত্রা শুরু, ‘তোমার দুটি নয়ন’; এতে মেহেদী হাসানের ঢাকো যত না নয়ন দুহাতে গানটি তিনি চমৎকার গেয়েছেন। অন্য একটি অ্যালবামে মিঠু গেয়েছেন মেহেদী হাসানের স্মরণীয় বাংলা গান ‘হারানো দিনের কথা মনে পড়ে যায়’।
বাংলাদেশে মেহেদী হাসানের সান্নিধ্য পেয়েছেন হাতেগোনা যে ক’জন শিল্পী, তাঁদের মধ্যে শাহনাজ রহমতউল্লাহর নাম আলাদা করে বলতেই হয়। ১৯৭০-এ ‘নিখিল পাকিস্তান সঙ্গীত সম্মেলনে’ যোগ দিতে এসে কলেজ অব মিউজিক-এ মেহেদী হাসান শাহনাজের গান শোনেন। শাহনাজ গেয়েছিলেন ‘তুম মিলে পেয়ার মিলা’ (১৯৬৯) ছবিতে মেহেদী হাসান ও নূরজাহানের দ্বৈতকণ্ঠে গাওয়া একটি গান: আপকো ভুল যায়ে হম। গানটি শুনে মেহেদী হাসান বিস্মিত ও আনন্দিত হন। পরে তাঁকে তিনি কণ্ঠস্বর প্রক্ষেপণ, ব্যঞ্জনা, হারমোনিয়ামে আঙুল সঞ্চালন বিষয়ে কিছু কৌশল শিখিয়ে দেন। স্বল্পকালীন এ তালিম যে বৃথা যায়নি, শাহনাজ রহমতউল্লাহর গায়কীতে তার প্রমাণ মোড়ানো। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথায় আনোয়ার পারভেজের সুরে ‘কিছু কিছু মন আছে প্রতিদান চায় না’ গানটি শাহনাজ রহমতউল্লাহর কণ্ঠে যারা শুনেছেন, বিষয়টি তাঁদের কাছে সুস্পষ্ট
শাহনাজ রহমতউল্লাহর জন্য গানের কথা লিখতে গিয়ে গীত রচয়িতা মেহেদী হাসানের গানের ভাবধারা মাথায় রেখেছেন, এমনটাও মনে হয়েছে কোনো কোনো গান শুনে। আলাউদ্দীন আলীর সুরে নজরুল ইসলাম বাবুর লেখা ‘আরও কিছু দাও না দুঃখ আমায়’ গানটির শেষ অন্তরা লক্ষ করা যাক:
পৃথিবী যাকে দুঃখ দিয়েছে
লাঞ্ছনা যার সাথী হয়েছে
নিয়তি নিঠুর হাতে তাকে তুলে নাও না
এখানে এসে সচেতন শ্রোতার মনে পড়ে যায় সুহাগন (১৯৬৭) ছবিতে এ. হামিদের সুরে গাওয়া মেহেদী হাসানের গাওয়া এ্যায় দুনিয়া ক্যায়া তুঝসে কহে গানটির শেষ অন্তরার বাণী :
সাথী জিনকো লুটগয়ে
ঔর মওতভী জিনসে রুঠগয়ি।
১৯৮৭ সালে মেহেদী হাসানের বিরল সান্নিধ্য লাভ করেন ইয়াসমিন মুশতারী। ইয়াসমিনের কণ্ঠে মেহেদী হাসান তাঁর গজল শুনে তাঁকে ‘গায়েবী সাগরেদ’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কবি তালিম হোসেনের পশ্চিম মালিবাগের বাসায় তাঁর কাছে প্রথাগতভাবে নাড়া বেঁধেছিলেন ইয়াসমিন। সেবার খুলনায় ‘সঙ্গীতা’ সিনেমা হল অডিটোরিয়ামে মেহেদী হাসানকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ফুলে ফুলে সজ্জিত সে জলসায় প্রাণভরে গজল শুনিয়েছেন তিনি। সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রিয় শিষ্যাকে। ইয়াসমিন সে আসরে ওস্তাদের নির্দেশমতো প্রথমে একটি নজরুল সঙ্গীত ও পরে মেহেদী হাসানেরই গাওয়া মেরা নাম হ্যায় মুহাব্বত ছবির একটি গান পরিবেশন করেন—‘তুঝে প্যার করতে করতে মেরি উমর বিত যায়ে’। গান শেষ হওয়ার পর উচ্ছ্বসিত দর্শকদের করতালির আওয়াজ ইয়াসমিন মুশতারীকে আজও আলোড়িত করে।
হতে পারত বাংলা গানের একটা পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম
দেশ বিভাগের অভিঘাত পরিবারসহ ভারতের মেহেদী হাসানকে ঠেলে দেয় পশ্চিম পাকিস্তানে। পশ্চিম পাকিস্তান গেলেন, আসতে পারতেন পূর্ব পাকিস্তানেও (বর্তমান বাংলাদেশ) আসতে পারতেন; পশ্চিমবঙ্গ থেকে যেমন এসেছিলেন সোহরাব হোসেন, আবদুল হালিম চৌধুরী, ইসমত আরা, আফসারী খানম, খন্দকার নূরুল আলম, কলিম শরাফী প্রমুখ শিল্পীবৃন্দ। আব্দুল আলিম, আব্বাস উদ্দিনকেও আমরা পেয়েছি প্রায় একই প্রক্রিয়ায় প্রতিক্রিয়া হিসেবে। পাকিস্তানে জীবন কাটিয়েছেন বলে মেহেদী হাসান বাংলাদেশের কাছে পর হয়ে যাননি। ভারতের মানুষেরও তিনি পরম আপন। শিল্পের কোনো জাত নেই, শিল্পীকে কখনো সীমান্তের কাঁটাতারে আবদ্ধ রাখা যায় না।
২০১০ সালে প্রকাশিত জীবনের শেষ অ্যালবামের শিরোনাম: সারহাদেই (সীমান্ত) মেহেদী হাসানের সেই চেতনাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। ভাববার বিষয়, মেহেদী হাসানের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল দেবু ভট্টাচার্যের, অন্তরঙ্গতা ছিল খান আতাউর রহমান। আলী হোসেনের করাচির বাসায় মেহেদী হাসানের যাতায়াত ছিল। ১৯৬৩ সালে স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসার পর আলী হোসেনের মোহাম্মদপুরের বাসাতেও এসেছেন মেহেদী হাসান। রবিন ঘোষের সাথে তাঁর বন্ধুত্বের কথাও আমাদের জানা। অন্তত চার/পাঁচ বার তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। গোলাম আলীকে দিয়ে ১৯৯২ সালে আসাফউদ্দৌলা করালেন পূর্ণাঙ্গ একটি বাংলা গানের অ্যালবাম—গানের আষাঢ় ক্ষণে। মেহেদী হাসানকে দিয়েও অনুরূপ কিছু করার উদ্যোগ নেওয়া যেত। কেন তা করা হয়নি, এর সদুত্তর নেই।
সুর আর সুরার পার্থক্য কতটুকু—মেহেদী হাসানের কথা এলে শওকত ওসমানের এ উক্তিটি খুব প্রাসঙ্গিক মনে হয়। সুর আসে হৃদয়ের গভীর থেকে যার জন্ম অন্য কোনো ভুবনে। গজল তো ভালোবাসার প্রার্থনা। মরমীবাদের ছোঁয়া তাঁর গীত গজলে থাকলেও শেষ পর্যন্ত জাগতিক প্রেমের মাহাত্ম্যই সেখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে। তিনি গেয়েছেন: দুনিয়া কিসিকি প্যারমে জান্নাতসে কম নেহী। শুনে আমরা ভাবতে উদ্বুদ্ধ হই: দিলে যে-দিলরুবার বাস, হুরের চেয়ে সে কম কীসে!

যে মন কখনো বেসেছে ভালো
এ বরষা তারে করবে উতল
স্মৃতির তটিনী বইবে উজানে
কাজলধারা ঘুমাতে দেবে না।
জলের সাধারণ ধর্ম অনুযায়ী নদী চিরকাল ভাটার দিকে প্রবাহিত হলেও যমুনা একবার ধর্মচ্যুত হয়েছিল। যমুনা উজানে প্রবাহিত হয়েছিল একবার, রাধার বিরহে। এটা জনশ্রুতি। মেহেদী হাসানের (১৯২৭—২০১২) নাম উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে আমাদের স্মৃতির তটিনী উজানে বইতে শুরু করে—এ অনুভূতিকে জনশ্রুতি বলার সুযোগ নেই। ১৩ জুন ২০১২ তাঁর চলে যাওয়ার খবরটা লক্ষ-কোটি ভক্তের মনে সেদিন অনুরণন তুলেছিল এই প্রগাঢ় বিষাদ। মেহেদী হাসানের যথার্থ স্ফূর্তি ঘটেছিল উর্দু গজল ও ফিল্মের গানে। বাংলা গান তাঁর কণ্ঠে অল্প কিছু। যা আছে তাও সর্বত্র সুলভ নয়। তবু, হাতেগোনা এই গান ক’টিতেই সেই অপার্থিব সুরসুধার আস্বাদ পেয়ে যাই আমরা। এই লেখা বঙ্গভূমি তথা বাংলা গানে মেহেদী হাসানের বিচরণক্ষেত্রটিতে আলো ফেলার চেষ্টা।
মোহনলাল দাশ (১৯২৬-১৯৭৪) এ গানটি স্থানীয় কল্যাণী ঘোষকে দিয়ে গাইয়েছিলেন প্রথমে। বাসনা ছিল যদি উঁচু মার্গের কোনো শিল্পীর কণ্ঠে তুলে দেওয়ার। সে সুযোগ আসে ১৯৬৭ সালে। সে বছর চট্টগ্রাম বেতারের আমন্ত্রণে সর্বপ্রথম মেহেদী হাসান এসেছিলেন চট্টগ্রামে, এই বাংলায়। সঙ্গে এসেছিলেন ইকবাল বানু, ফরিদা খানম, সুরাইয়া মুলতানী কর প্রমুখ। মূলত তাঁদের আগমনের পর থেকে এই ভূখণ্ডে গজল অঙ্গের গান জনপ্রিয় হতে শুরু করে। স্মরণীয় এই গানের নেপথ্য কারিগর আশরাফ-উজ-জামান খান (১৯১০—২০০৮)। কর্মমুখর বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই মানুষটি যখন পেশোয়ার বেতারে আঞ্চলিক পরিচালক পদে কর্মরত, তখন থেকেই তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল মেহেদী হাসানের। বর্ণিত সময়ে তিনি চট্টগ্রাম বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক। মূলত তাঁরই আগ্রহ ও উদ্যোগে বেতারে মেহেদী হাসানের কণ্ঠে বাংলা গান রেকর্ড করার ব্যবস্থা করা হয় প্রথমবারের মতো। মোহনলাল দাশের কথা ও সুরে চট্টগ্রাম বেতারে প্রচারিত গানটি ছিল— ‘হারানো দিনের কথা মনে পড়ে যায়’। এ গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল পরে। একই সময়ে আশরাফ-উজ-জামান খানের কথা ও সুরে মেহেদী হাসান আরেকটি বাংলা গান গেয়েছিলেন—‘কেন এত ভালো লাগে তাহারে আমার/ গড়েছে সে কোন বিধি রূপছবি তার’। হারানো দিনের কথা এবং এ গানের সুরের আদল প্রায় অভিন্ন। পর্যাপ্ত প্রচারের অভাবে শ্রবণসুখকর এ গানটি খুব বেশি সংখ্যক শ্রোতা শুনতে পাননি।
পণ্ডিত বারীন মজুমদারের কলেজ অব মিউজিক-এর উদ্যোগে ‘নিখিল পাকিস্তান সঙ্গীত সম্মেলনে’ যোগ দিতে ১৯৭০ সালে বাংলায় আসেন মেহেদী হাসান। ‘শ্রুতিতে স্মৃতিতে বারীন মজুমদার’ গ্রন্থে ইলা মজুমদার লিখেছেন সেই রোমাঞ্চকর মুহূর্তের কথা:
‘মনে পড়ে ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত ‘নিখিল পাকিস্তান সঙ্গীত সম্মেলন’-এর তোলপাড় করা আনন্দ-উদ্দীপনার দিনগুলো। যখন ওস্তাদ নাযাকত—সালামত, ওস্তাদ আমানত—ফতেহ, মেহেদী হাসান, ফরিদা খানম, খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করছেন, আমাদের সম্মেলনে যোগ দিতে এসে মুগ্ধ হলেন কলেজ অব মিউজিক-এর শিল্পমনস্ক মানুষগুলোর সরল সহজ অন্তরের স্পর্শে।’
উল্লেখ্য, শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানাতে কামাল লোহানী পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। সঙ্গীত কলেজের তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে আয়োজিত উক্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে। কলেজ অব মিউজিক-এর নিজস্ব ভবনেও মেহেদী হাসান সঙ্গীত পরিবেশন করেন।
রাজা সাহেব (১৯৮২) ছবিতে মেহেদী হাসানের গাওয়া ঢাকো যত না নয়ন দুহাতে বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে এক অবিস্মরণীয় গান। গানটির নেপথ্যকথা জানতে আলাপ করি এ গানের সুরকার সঙ্গীত পরিচালক আলী হোসেনের সঙ্গে। অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় আলী হোসেন জানান, ঢাকো যত না নয়ন দুহাতে গানটি আলী হোসেনের সুরে মেহেদী হাসান প্রথমত গেয়েছিলেন উর্দুতে বাজুবন্দ ছবির জন্য যে ছবিটি শেষ পর্যন্ত অসমাপ্ত থেকে যায়। মূল উর্দু গানটির গীতিকার ছিলেন আখতার ইউসুফ। গানটি ছিল এরকম—যবভী চলেঙ্গে শাওন কি ঝোঁকে / কালি ঘাটা তুঝে সোনে না দেগি। বাজুবন্দ ছবির নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ ছবির সহপ্রযোজক সার্জেন্ট ফরিদ তার প্রযোজিত পরবর্তী ছবি রাজাসাহেব-এ গানটি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন।
উর্দু গানটির ভাব অবলম্বনে তখন বাংলা গানের বাণী রচনা করেন ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। বাংলা ও উর্দু দুটি গানেরই রেকর্ডিং হয়েছিল লাহোরে। উর্দু ছবিটি মুক্তি না পাওয়ায় ‘ঢাকো যত না নয়ন দুহাতে’ গানটির উর্দু ভার্সন কালি ঘাটা তুঝে সোনে না দেগি গানটি শ্রোতাদের কাছে থেকে যায় অশ্রুত, রেকর্ডিং হওয়া সত্ত্বেও। লাহোরের ওই স্টুডিওতে আজও কি রক্ষিত আছে সেই গান? কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহে? রাজাসাহেব ছবিতে উক্ত গানে ঠোঁট মেলান নায়ক আলমগীর। নায়িকা ছিলেন রোজিনা। গানের সাথে দৃশ্যায়ন হয়েছিল দৃষ্টিনন্দন। গান শুরুর ঠিক আগে নায়ক-নায়িকার কথোপকথন:
—আমাকে তুমি বলে ডাকো।
—তুমি!
দয়িতকে প্রথম বারের মতো তুমি সম্বোধন করার লজ্জায় জড়সড় নায়িকা দুহাতে চোখ ঢেকে ফেলে। (বাইরে তখন অঝোর ধারায় ঝরছে বৃষ্টি। বাতাসের মত্ত ঝাপটার সাথে লড়ছে গাছের ডালপালা।) তখনই গান শুরু—প্রথমে তালবিহীন, ধীর লয়ে: ঢাকো যত না নয়ন দুহাতে। গানে গানে সে কি মধুর মিনতি প্রেমিকের: দুহাতে চোখ ঢেকে ঘুমানোর চেষ্টা তুমি যতই করো, বৃথা। ভেজা হাওয়া তোমাকে ঘুমাতে দেবে না। উর্দু ছবির বর্ষণমুখর রাতের গানগুলো যেন মেহেদী হাসানের কণ্ঠেই মানাত বেশি। রিমঝিম কি বরষাত হ্যায় (বেটি ১৯৬৪), এ্যায় জান এ বাহারান তুঝে কালি ঘাটা সোনে না দেগি (নাজমা ১৯৭০), ভিগি ভিগি রাতমে (ওয়াদা ১৯৭৬)... অপূর্ব সব গান।
১৯৮৫ সালে প্রথম বারের মতো বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় সার্ক সম্মেলন। এ উপলক্ষে মেহেদী হাসানসহ সার্কভুক্ত দেশের শিল্পীদের এক নক্ষত্র সমাবেশ ঘটেছিল ঢাকায়। সে বছর মেহেদী হাসান ওসমানী মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অন্যান্য গানের পাশাপাশি পরিবেশন করেন একটি বাংলা গান—তুমি যে আমার ভালোবাসা যে গানটি কিছুদিন আগেই তিনি রেকর্ড করেছিলেন জান্নাত দোযখ ছবির জন্য। সম্ভবত উক্ত অনুষ্ঠানে গাওয়া গানটি উপস্থিত কোনো শ্রোতা কোনোভাবে সরাসরি রেকর্ড করেছিলেন, যে কারণে বর্তমানে প্রাপ্ত এ গানটির সাউন্ড কোয়ালিটি ভালো নয়। এ অনুষ্ঠানেই প্রথমবারের মতো মেহেদী হাসান তাঁর পুত্র আসিফ হাসানকে এদেশের শ্রোতাদের কাছে শিল্পী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।
ডাবল ভার্সন ছবি জান্নাত দোযখ-এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালের দিকে। এ ছবিতে ব্যবহারের জন্য পাকিস্তানি সুরকার এ. হামিদের সুরে সুবল দাশের সঙ্গীত পরিচালনায় মেহেদী হাসানের কণ্ঠে দুটি গান রেকর্ড করা হয় খান আতাউর রহমানের মগবাজারস্থ শ্রুতি স্টুডিওতে। গান দুটি হলো:
১। তুমি যে আমার ভালোবাসা
কথা: মাসুদ করিম, সুর: এ. হামিদ, শিল্পী: মেহেদী হাসান, সাবিনা ইয়াসমিন
২। সুখেরই স্বপ্ন কে ভেঙে দিল
কথা : মাসুদ করিম, সুর: এ. হামিদ, শিল্পী: মেহেদী হাসান ও রুনা লায়লা (দ্বৈত)
প্রত্যক্ষদর্শী সজল দাশ (সুবল দাশের ছেলে) জানান, রেকর্ডিংয়ের দিন মেহেদী হাসানকে এক নজর দেখার জন্য শ্রুতি স্টুডিওর আশপাশে জড়ো হয়েছিল হাজার হাজার মানুষ। দুঃখের বিষয়, উর্দু ছবিটি শেষ পর্যন্ত নির্মিত হয়নি। মুক্তি পায়নি বাংলা ছবিটিও। তবে ২০০৬ সালে বিসর্জন নামে একটি ছবি মুক্তি পায় যাতে তুমি যে আমার ভালোবাসা গানটি সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ব্যবহৃত হয়েছে। (তাহলে কি জান্নাত দোযখ ছবিটিরই নাম পরিবর্তন করে বিসর্জন নামে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল?) সজল দাশ জানিয়েছেন, গান দুটি তার কাছে এক সময় ক্যাসেটে ধারণ করা ছিল। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
সুখেরই স্বপ্ন কে ভেঙে দিল গানে মেহেদী হাসান আর রুনা লায়লার কণ্ঠের যুগলবন্দিটা কেমন হয়েছিল, আজ আর তা জানার উপায় নেই। আক্ষেপ জাগে, এমন সৃষ্টি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেল এত অল্প সময়ের ব্যবধানে। আমাদের দায়িত্ববোধ!
ব্যক্তিগতভাবে বহু অনুসন্ধান করেও মেহেদী হাসানের কণ্ঠে রেকর্ডকৃত তুমি যে আমার ভালোবাসা’র মূল ভার্সনের হদিস পাইনি, পাওয়া যায়নি এর উর্দু ভার্সন মেরে জিন্দেগী মেরে পাস আ গানটিও। পাকিস্তানের কোনো এক জলসায় মেহেদী হাসানের লাইভ গাওয়া মেরে জিন্দেগী মেরে পাস আ গানটি অবশ্য পাওয়া যায়।
ধীর আলী মিয়ার জন্মজয়ন্তীতে যোগ দিতে এসে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন মেহেদী হাসান। কাছাকাছি সময়ে তিনি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বিএআরসি (বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ সেন্টার)-এর নিজস্ব অডিটোরিয়ামে যা ফার্মগেট পুলিশ বক্সের পেছনে অবস্থিত। সন্ধ্যার পর শুরু হয়েছিল অনুষ্ঠান। টানা দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা গেয়েছিলেন তিনি। সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ওস্তাদ আখতার সাদমানী, পণ্ডিত বারীন মজুমদার, শেখ রিয়াজ উদ্দিন বাদশাসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ।
এ অনুষ্ঠানে এক কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন নায়িকা অঞ্জু ঘোষ। হারমোনিয়াম বাজিয়ে মেহেদী হাসান গেয়ে চলেছেন। বেজ গিটার বাজাচ্ছেন রিচার্ড হ্যানরি কিশোর, তবলায় খোদা নেওয়াজ খান। মেহেদী হাসানের সুরলহরীতে অঞ্জু এতটাই মুগ্ধ ও আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন যে, হঠাৎ কোনো ঘোষণা ছাড়াই তিনি মঞ্চে উঠে পড়েন এবং শিল্পীকে জানান যে, তিনি তাঁকে একটি আংটি উপহার দিতে চান এবং আংটিটি তিনি তা নিজ হাতে শিল্পীকে পরিয়ে দেবেন। অপ্রস্তুত মেহেদী হাসান আংটি নিতে সম্মত হলেও হাতে পরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তিনি অস্বস্তি বোধ করতে থাকেন। ওদিকে অঞ্জুও নাছোড়বান্দা—আংটি তিনি নিজ হাতেই পরাবেন। এই দোটানার মধ্যে হঠাৎ আংটিটি হাত ফসকে পড়ে যায়। শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। অডিটোরিয়াম ভর্তি উৎসুক দর্শক-শ্রোতা তাকিয়ে, কী হয় কী হয়...
নাহ্, পড়ল তো পড়লই, আংটি আর পাওয়া যায়নি। হতাশ অঞ্জু আসনে ফিরে গেলেন। মেহেদী হাসান ফিরে গেলেন তাঁর পরিবেশনায়। অঞ্জুকে ধন্যবাদ জানালেন শিল্পী এবং তাৎক্ষণিকভাবে একটি শায়রি বললেন যার অর্থ এরকম— যা হারিয়ে গেছে, তাকে যেতে দাও। ধরে নাও তা তোমার তকদিরে ছিল না।
সেবার তিনি আমন্ত্রিত হয়েছেন ঢাকা ক্লাবে, প্রেসক্লাবে। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের আমন্ত্রণে কয়েকটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করেন। পুরান ঢাকার চকবাজারের উর্দুভাষীদের আমন্ত্রণে মেহেদী হাসান সেখানেও সঙ্গীত পরিবেশন করেন। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের রজতজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে মেহেদী হাসানের পরিবেশনা এখনো আমাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
যদি গাইতেন, কেমন শোনাত মেহেদী হাসানের কণ্ঠে নজরুলের গজলাঙ্গের গানগুলো? বাংলাভাষী নন উপমহাদেশের এমন অনেক বিখ্যাত শিল্পী নজরুল সঙ্গীত গেয়েছেন। তালাত মাহমুদ গেয়েছেন নিশি ভোর হলো জাগিয়া, আসল যখন ফুলের ফাগুন। নজরুলের গান নিয়ে পুরো অ্যালবাম করেছেন আশা ভোসলে, মোহাম্মদ রফি। হেমন্তের মতো রবীন্দ্রনিমগ্ন শিল্পীও গেয়েছেন নজরুলের দুটি গান। মেহেদী হাসান নজরুলের গান গাইবেন, সেরকম অনুকূল একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল করাচি বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসে ১৯৬৪ সালে। এবার সে প্রসঙ্গ, আসাদুল হকের স্মৃতিকথার সূত্র ধরে:
‘লুৎফর ভাই (শেখ লুৎফর রহমান) অজানা কারণে আমাকে পছন্দ করতেন। তা বুঝতে পারতাম তাঁর পক্ষপাতিত্বে। তিনি বেশ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর দায়িত্ব দিনের আমার উপর, যার বেশির ভাগ তারই সম্পন্ন করার কথা। তেমনি মহররমের রেকর্ডের জন্য গান নির্বাচনের দায়িত্ব দিলেন আমাকে। বিশেষ করে নজরুলের ইসলামী গান। তিনি আমাকে বললেন, “আসাদ গান নির্বাচন করো এবং প্রয়োজনে শিল্পীদের শেখাও। দেখো যেন কোনো হিন্দুয়ানি কথা না থাকে গানের বাণীতে।” আমি সতর্ক হয়েই ১০টি গান বাছাই করলাম। রিহার্সেল শুরু হলো। শেখ লুৎফর রহমান, আমি (আসাদুল হক), মনসুর আহমেদ, দীনা লায়লা, লায়লা এমদাদ (রুনা ও দীনা লায়লার মা), মেহেদী হাসানসহ আরও কয়েকজন, সবার নাম মনে নেই। তার মধ্যে একটি গানের কথা আমার এ মুহূর্তে মনে পড়ছে—“মহররমের চাঁদ এলো রে কাঁদাতে ফের দুনিয়ায়।” বাকি গানগুলোর কথা মনে নেই। কারণ এ গানটিতেই মেহেদী হাসানের উচ্চারণ সমস্যা প্রকটভাবে দেখা দিয়েছিল। অসম্ভব সুন্দর ভরাট গলা, সুরেলা আওয়াজ, কিন্তু উচ্চারণের ত্রুটির জন্য সব গুণই ম্লান হয়ে যাচ্ছিল।’
শেখ লুৎফর রহমান আসাদুল হককে দায়িত্ব দিয়েছিলেন মেহেদী হাসানকে শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ শেখানোর। নিষ্ঠাবান শিল্পী বারবার চেষ্টায় শুধরে নিলেন ত্রুটি। কিন্তু উর্দু ও হিন্দিভাষীদের বাংলা উচ্চারণে যে সাধারণ সমস্যা, তা রয়েই গেল তাঁর উচ্চারণে। চাঁদকে ‘চান্দ’, কাঁদাতেকে ‘কান্দাতে’ বলতে লাগলেন তিনি বারবার। প্রায় ঘণ্টাখানেক চেষ্টায় সে ত্রুটিও শোধরানো গেল। ১০টি গান প্রস্তুত করা হলো। সবগুলো গানই সমবেত কণ্ঠে। শিল্পীদের এমনভাবে বসানো হয়েছিল যাতে মেহেদী হাসানের কণ্ঠই প্রাধান্য পায়। কিন্তু মেহেদী হাসানের আর গাওয়া হয়ে ওঠেনি সে গান। সমস্ত প্রস্তুতি যখন সম্পন্ন, তখনই লাহোর থেকে এক সিনেমার পরিচালক এসে হাজির। তিনি আসেন তার নির্মীয়মান সিনেমায় একটি গজলাঙ্গের গান গাওয়ার প্রস্তাব নিয়ে। পরিচালকের সঙ্গে তখনই চলে যেতে হলো শিল্পীকে। পরবর্তীকালে অবশ্য করাচি বেতারে মেহেদী হাসানের কণ্ঠে নজরুলের কয়েকটি ইসলামী গান প্রচারিত হয়।
পরশে তাহার সোনা হলো যারা
মেহেদী হাসান অননুকরণীয় স্টাইল অনুকরণ-অনুসরণের চেষ্টা করেছেন কেউ কেউ। ভারতের তালাত আজিজ, হরিহরণ মেহেদী হাসানের একনিষ্ঠ অনুসারী। রুনা লায়লার গায়কীতে মেহেদী হাসানের প্রভাব আছে। আরিফুল ইসলাম মিঠুর গায়কী মেহেদী হাসানের কণ্ঠকেই মনে করিয়ে দেয়। ১৯৯৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারিতে বাজারে আসা যে অ্যালবামটি দিয়ে মিঠুর যাত্রা শুরু, ‘তোমার দুটি নয়ন’; এতে মেহেদী হাসানের ঢাকো যত না নয়ন দুহাতে গানটি তিনি চমৎকার গেয়েছেন। অন্য একটি অ্যালবামে মিঠু গেয়েছেন মেহেদী হাসানের স্মরণীয় বাংলা গান ‘হারানো দিনের কথা মনে পড়ে যায়’।
বাংলাদেশে মেহেদী হাসানের সান্নিধ্য পেয়েছেন হাতেগোনা যে ক’জন শিল্পী, তাঁদের মধ্যে শাহনাজ রহমতউল্লাহর নাম আলাদা করে বলতেই হয়। ১৯৭০-এ ‘নিখিল পাকিস্তান সঙ্গীত সম্মেলনে’ যোগ দিতে এসে কলেজ অব মিউজিক-এ মেহেদী হাসান শাহনাজের গান শোনেন। শাহনাজ গেয়েছিলেন ‘তুম মিলে পেয়ার মিলা’ (১৯৬৯) ছবিতে মেহেদী হাসান ও নূরজাহানের দ্বৈতকণ্ঠে গাওয়া একটি গান: আপকো ভুল যায়ে হম। গানটি শুনে মেহেদী হাসান বিস্মিত ও আনন্দিত হন। পরে তাঁকে তিনি কণ্ঠস্বর প্রক্ষেপণ, ব্যঞ্জনা, হারমোনিয়ামে আঙুল সঞ্চালন বিষয়ে কিছু কৌশল শিখিয়ে দেন। স্বল্পকালীন এ তালিম যে বৃথা যায়নি, শাহনাজ রহমতউল্লাহর গায়কীতে তার প্রমাণ মোড়ানো। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথায় আনোয়ার পারভেজের সুরে ‘কিছু কিছু মন আছে প্রতিদান চায় না’ গানটি শাহনাজ রহমতউল্লাহর কণ্ঠে যারা শুনেছেন, বিষয়টি তাঁদের কাছে সুস্পষ্ট
শাহনাজ রহমতউল্লাহর জন্য গানের কথা লিখতে গিয়ে গীত রচয়িতা মেহেদী হাসানের গানের ভাবধারা মাথায় রেখেছেন, এমনটাও মনে হয়েছে কোনো কোনো গান শুনে। আলাউদ্দীন আলীর সুরে নজরুল ইসলাম বাবুর লেখা ‘আরও কিছু দাও না দুঃখ আমায়’ গানটির শেষ অন্তরা লক্ষ করা যাক:
পৃথিবী যাকে দুঃখ দিয়েছে
লাঞ্ছনা যার সাথী হয়েছে
নিয়তি নিঠুর হাতে তাকে তুলে নাও না
এখানে এসে সচেতন শ্রোতার মনে পড়ে যায় সুহাগন (১৯৬৭) ছবিতে এ. হামিদের সুরে গাওয়া মেহেদী হাসানের গাওয়া এ্যায় দুনিয়া ক্যায়া তুঝসে কহে গানটির শেষ অন্তরার বাণী :
সাথী জিনকো লুটগয়ে
ঔর মওতভী জিনসে রুঠগয়ি।
১৯৮৭ সালে মেহেদী হাসানের বিরল সান্নিধ্য লাভ করেন ইয়াসমিন মুশতারী। ইয়াসমিনের কণ্ঠে মেহেদী হাসান তাঁর গজল শুনে তাঁকে ‘গায়েবী সাগরেদ’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কবি তালিম হোসেনের পশ্চিম মালিবাগের বাসায় তাঁর কাছে প্রথাগতভাবে নাড়া বেঁধেছিলেন ইয়াসমিন। সেবার খুলনায় ‘সঙ্গীতা’ সিনেমা হল অডিটোরিয়ামে মেহেদী হাসানকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ফুলে ফুলে সজ্জিত সে জলসায় প্রাণভরে গজল শুনিয়েছেন তিনি। সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রিয় শিষ্যাকে। ইয়াসমিন সে আসরে ওস্তাদের নির্দেশমতো প্রথমে একটি নজরুল সঙ্গীত ও পরে মেহেদী হাসানেরই গাওয়া মেরা নাম হ্যায় মুহাব্বত ছবির একটি গান পরিবেশন করেন—‘তুঝে প্যার করতে করতে মেরি উমর বিত যায়ে’। গান শেষ হওয়ার পর উচ্ছ্বসিত দর্শকদের করতালির আওয়াজ ইয়াসমিন মুশতারীকে আজও আলোড়িত করে।
হতে পারত বাংলা গানের একটা পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম
দেশ বিভাগের অভিঘাত পরিবারসহ ভারতের মেহেদী হাসানকে ঠেলে দেয় পশ্চিম পাকিস্তানে। পশ্চিম পাকিস্তান গেলেন, আসতে পারতেন পূর্ব পাকিস্তানেও (বর্তমান বাংলাদেশ) আসতে পারতেন; পশ্চিমবঙ্গ থেকে যেমন এসেছিলেন সোহরাব হোসেন, আবদুল হালিম চৌধুরী, ইসমত আরা, আফসারী খানম, খন্দকার নূরুল আলম, কলিম শরাফী প্রমুখ শিল্পীবৃন্দ। আব্দুল আলিম, আব্বাস উদ্দিনকেও আমরা পেয়েছি প্রায় একই প্রক্রিয়ায় প্রতিক্রিয়া হিসেবে। পাকিস্তানে জীবন কাটিয়েছেন বলে মেহেদী হাসান বাংলাদেশের কাছে পর হয়ে যাননি। ভারতের মানুষেরও তিনি পরম আপন। শিল্পের কোনো জাত নেই, শিল্পীকে কখনো সীমান্তের কাঁটাতারে আবদ্ধ রাখা যায় না।
২০১০ সালে প্রকাশিত জীবনের শেষ অ্যালবামের শিরোনাম: সারহাদেই (সীমান্ত) মেহেদী হাসানের সেই চেতনাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। ভাববার বিষয়, মেহেদী হাসানের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল দেবু ভট্টাচার্যের, অন্তরঙ্গতা ছিল খান আতাউর রহমান। আলী হোসেনের করাচির বাসায় মেহেদী হাসানের যাতায়াত ছিল। ১৯৬৩ সালে স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসার পর আলী হোসেনের মোহাম্মদপুরের বাসাতেও এসেছেন মেহেদী হাসান। রবিন ঘোষের সাথে তাঁর বন্ধুত্বের কথাও আমাদের জানা। অন্তত চার/পাঁচ বার তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। গোলাম আলীকে দিয়ে ১৯৯২ সালে আসাফউদ্দৌলা করালেন পূর্ণাঙ্গ একটি বাংলা গানের অ্যালবাম—গানের আষাঢ় ক্ষণে। মেহেদী হাসানকে দিয়েও অনুরূপ কিছু করার উদ্যোগ নেওয়া যেত। কেন তা করা হয়নি, এর সদুত্তর নেই।
সুর আর সুরার পার্থক্য কতটুকু—মেহেদী হাসানের কথা এলে শওকত ওসমানের এ উক্তিটি খুব প্রাসঙ্গিক মনে হয়। সুর আসে হৃদয়ের গভীর থেকে যার জন্ম অন্য কোনো ভুবনে। গজল তো ভালোবাসার প্রার্থনা। মরমীবাদের ছোঁয়া তাঁর গীত গজলে থাকলেও শেষ পর্যন্ত জাগতিক প্রেমের মাহাত্ম্যই সেখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে। তিনি গেয়েছেন: দুনিয়া কিসিকি প্যারমে জান্নাতসে কম নেহী। শুনে আমরা ভাবতে উদ্বুদ্ধ হই: দিলে যে-দিলরুবার বাস, হুরের চেয়ে সে কম কীসে!

বিশ্বজুড়ে এখন উন্মাদনা চলছে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ নিয়ে। এই বিশ্বকাপের জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চ কাঁপিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান ডিজে ও সংগীতশিল্পী সঞ্জয় দেব।
৩ ঘণ্টা আগে
সভ্যতার যত গভীরে যাওয়া যায়, পুতুল তত বেশি রহস্যময় হয়ে ধরা দেয়। যদি আপনি ইতিহাসের দিকে তাকান, দেখবেন পুতুল কখনোই কেবল সাধারণ খেলনা ছিল না। এটি ধর্মীয় বিশ্বাস, জাদুবিদ্যা, পূর্বপুরুষের আত্মার সঙ্গে সংযোগ এবং অতীন্দ্রিয় জগতের বিমূর্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করেছে।
৫ ঘণ্টা আগে
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং ইউনিসেফের ২০২৪ সালে যৌথ হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু এখনো কোনো না কোনোভাবে শ্রমের সঙ্গে যুক্ত।
১ দিন আগে
বৃষ্টিবিলাসের জন্য দুপুরের মেন্যুতে রান্না করলেন ইলিশ-খিচুড়ি। কিন্তু এরপর, সারাদিন কাটাবেন কীভাবে? প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যায় কিংবা রাতে দেখতে পারেন কোনো রোমান্টিক সিনেমা।
১ দিন আগে